সংবাদকর্মীদের সুরক্ষায় নতুন আইনের সুফল ও প্রাসঙ্গিক কথা

মঙ্গলবার, মার্চ ২৬, ২০১৩

অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক::

siraz_971b7c-150x150দীর্ঘ এক যুগেরও বেশী সময় ধরে মফস্বল সাংবাদিকতায় জড়িত থাকায় সাংবাদিকতার সজ্ঞাটি আমার কাছে ভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট-বেদনার কথা যিনি সবাইকে জানিয়ে দেন, তিনি সাংবাদিক। যিনি মানুষকে আহ্বান জানান মানুষের পাশে দাঁড়াতে, তিনি সাংবাদিক। পৃথিবীর কোথাও আইনের শাসন ও মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটলে যে মানুষটি সেখানে সবার আগে পৌঁছে যায় তিনি একজন সাংবাদিক। কাজেই সাংবাদিকতাই সম্ভবত একমাত্র পেশা যেখানে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি। এবার আসল কথায় ফিরে যাই।

একজন বিচারকদের দায়িত্ব কোনো মামুলি দায়িত্ব নয় বরং গুরু দায়িত্ব। বিচারকের কাজের সঙ্গে চিকিৎসকের কাজের তুলনা করলে ভুল হবে না। ২০০৭ সালে মহামান্য হাইকোর্ট আদালত অবমাননা আইনের মামলায় রায় প্রদানকালে মন্তব্যে লিখেছিলেন, প্রতিটি চিকিৎসক জীবন্ত মানুষের হৃদয়ে, মস্তকে বা শরীরের অন্যান্য বিশেষ অপরিহার্য ও সংবেদনশীল অঙ্গে অপারেশন করার সময় তার সম্পূর্ণ মনোযোগ শুধু অপারেশনে নিয়োজিত করে থাকেন। কেননা তিনি জানেন তার মনোযোগের সমান্যতম বিঘœ ঘটলে রোগীর প্রাণহানি ঘটতে পারে।

তেমনি একজন আইনবিদ যদি বিচার বিবেচনা না করে তাঁর মক্কেলকে ভুল পথে চালান, তবে তিনি নৈতিকতা ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত হবেন এবং এ কারনে তিনি আইন পেশার অধিকার হারাতে পারেন। ঠিক তেমনি আদালত অবমাননা কখন, কীভাবে হতে পারে সে বিষয়ে প্রত্যেকের বিশেষ করে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে জড়িতদের পরিষ্কার ধারণা থাকা অপরিহার্য।

বর্তমান সময়ে সংবাদকর্মীদের জন্য সবচেয়ে ভীতিকর হলো আদালত সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা বা সংবাদ প্রচার করা। কারণ কী করলে আদালত অবমাননা হয় আর কী করলে হয় না, তা একমাত্র আদালত ছাড়া আর কেউ জানে না। ২০১১ সালের ২ ফেব্র“য়ারী নবম জাতীয় সংসদের অষ্টম অধিবেশনে সংবাদকর্মীদের সুরক্ষার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) বিল ২০১১ পাস করা হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির আগের বিধনানুযায়ী মানহানিকর সংবাদ প্রকাশের অভিযোগে সংবাদপত্রের প্রকাশক, সম্পাদক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে সরাসরি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা যেত। সংশোধিত আইনানুযায়ী এখন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আগে সমন জারির বিধান আরোপ করা হয়েছে। বই বা অন্য কোনো প্রকাশনার লেখক ও প্রকাশকও এ সুবিধার আওতাধীন হবেন।

সরকার অবশ্য অনেক আগেই ঘোষণা দিয়েছিল, তারা সাংবাদিকদের প্রকাশিত সংবাদের জন্য অযথা হয়রানি বা গ্রেপ্তার নিরোধে আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করবেন। সংবাদকর্মীদের জন্য আইন সংশোধনের এমন সরকারি উদ্যোগ আপাতদৃষ্টিতে শুভ মনে হলেও আসলেই সরকার সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা চায় কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। কেবল একটি আইনের একটিমাত্র ধারা সংশোধন করে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নতুন সংশোধনীতে সাংবাদিকদের অধিকার নিশ্চিতকরণে সরকার খুব উল্লেখযোগ্য কোনো কাজও করে ফেলেনি। যা করা হয়েছে তা আইনের সাধারণ নীতি অনুযায়ী পাওয়া সব নাগরিকেরই আইনি অধিকার।

ফৌজদারি কার্যবিধি আইনটি প্রণয়নের সময় সংবাদমাধ্যম এতটা শক্তিশালী ছিল না বা সাংবাদিকতায় এখনকার মতো এত মাত্রাও ছিল না। তবে অষ্টাদশ শতকে সংবাদ ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণের যে মানসিকতা শাসকগোষ্ঠীর ছিল তা এখন খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে, সরকারের কার্যকলাপ দেখলে তা মনে হয় না। অধিকন্তু বর্তমান সংশোধিত আইনটিতেও ইলেক্ট্রনিক সংবাদমাধ্যমগুলো (টেলিভিশন, বেতার, ওয়েবসাইট, মুঠোফোন প্রভৃতি) উপেক্ষিত। এসব মাধ্যমের সংবাদকর্মীরা এ সুবিধা পাবেন কিনা তা স্পষ্ট নয়।

বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় একুশে টিভি বন্ধের মাধ্যমে যে খারাপ সংস্কৃতির সূত্রপাত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার টেলিভিশন চ্যানেল সিএসবি বন্ধ করে তার ধারাবাহিকতা রেখেছে। আর বর্তমান ১৪ দলীয় মহাজোট সরকারের আমলেও সে ধারা অব্যাহত (যমুনা টিভি, চ্যানেল ওয়ান)। দৈনিক আমার দেশ সাময়িক বন্ধের মাধ্যমে সরকার খারাপ নজির তৈরি করেছে এবং বুঝিয়ে দিয়েছে প্রকাশনা মাধ্যমও সরকারের রক্তচক্ষুর বাইরে নয়।

আমাদের দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের রোষানলেই মাঝে মধ্যে পড়ে, যদি তাদের স্বার্থহানিকর (অথচ নিরেট সত্য ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট) কোনোকিছু প্রকাশিত হয়। সংবাদমাধ্যম তখন তাদের শত্রু হয়ে ওঠে এবং নানা পন্থায় (বিজ্ঞাপন বন্ধসহ) তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। সামরিক শক্তিও কখনো কখনো (বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়) এ ব্যাপারে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

অথচ সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ আরোপ সাপেক্ষে সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু ক্ষমতাশীলরা কখনই ‘যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধের ধার ধারে না। নিজেদের পছন্দের ব্যত্যয় ঘটলেই বেআইনি বল প্রয়োগ করে কিংবা প্রি-সেন্সরশিপ করে কিংবা টকশোর অতিথি কারা হবে তাদের নামের ফর্দ ঝুলিয়ে দেয়; আর দোহাই টানে ৩৯ অনুচ্ছেদের ব্যতিক্রমের। কিন্তু কখনই সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে না যে, খবরটি দ্বারা রাষ্ট্র কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো।

আরো রয়েছে একদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অন্যদিকে আদালত অবমাননার খড়গ। ১৯২৬ সালের অপূর্ণ আইন দিয়ে বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আদালত অবমাননা এক ধোঁয়াশা। অথচ নজিরহীনভাবে আপিল বিভাগের বিচারের মাধ্যমে একজন সম্পাদক এর দায়ে জেল খেটছেন। প্রকাশিত সংবাদটি সত্যি আদালত অবমাননার দায়ে পড়ে কিনা সে বিষয়টি নির্ধারণ করার জন্য যেসব বিষয় বিবেচনায় আনা দরকার তার মধ্যে অন্যতম হলো : ১. সংবাদটি অবশ্যই প্রকাশিত হতে হবে; ২. সংবাদপত্রের উল্লিখিত প্রকাশনাটি বিচারাধীন মামলায় ক্ষতিকারক প্রভাব সৃষ্টির জন্য; ৩. প্রকাশনাটি বিচারের স্বাভাবিক গতিতে হস্তক্ষেপ অথবা জনমনে ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টির উদ্দ্যেশে; ৪. মামলাটি বিচারাধীন বা বিচার আসন্ন এ সম্পর্কে প্রকাশনা কালে পত্রিকাটির পরিপূর্ণ জ্ঞান ছিল কিনা? উপরে উল্লিখিত শর্তগুলো সঠিকভাবে পূরণ করা বা না করার ওপর নির্ভর করে আদালত অবমাননা হবে কি হবে না।

ইলেক্ট্রনিক সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য সরকার এখনো কোনো নীতি প্রণয়ন করতে পারেনি। এখনো পর্যন্ত সরকারের ইচ্ছাতেই টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স আসছে-যাচ্ছে। বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে গণমাধ্যমের গলাটিপে ধরার (ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে বেশি) চেষ্টা করা হচ্ছে। আর বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের স্বায়ত্তশাসন? সে তো পরাবাস্তব কোনো বস্তুর নাম। প্রেস কাউন্সিল কার্যকর করার কোনো উদ্যোগও সরকার নিচ্ছে বলে চোখে পড়ছে না।

আজো সরকারের মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের দুর্নীতির কোনো খবর প্রকাশ হলে তারা মানহানির মামলা করেন। অনেক সময় অযথা হয়রানি, ভয়ভীতি বা অত্যাচারও করেন। সেখানে কেবল সমন জারির বিধান সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অপ্রতুল এক সান্ত্বনা মাত্র। এসবের মধ্যেও হলুদ সাংবাদিকতা যে নেই তাও নয়। কিন্তু তা প্রতিরোধেও সরকারের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। বরং মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম বাড়ছে।

কেবল একটি ধারা সংশোধন করে দিন বদলানো সম্ভব নয়। সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে সরকারের উদার মানসিকতা ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্য সবই লোক দেখানো সান্ত্বনা।

বিধান মোতাবেক আদালত অবমাননা দুটি শ্রেণীতে পড়তে পারে, যথা দেওয়ানি আদালত অবমাননা ও ফৌজদারি আদালত অবমাননা। যদি কোনো ব্যক্তি কোনো দেওয়ানি আদালতের দেয়া রায়ে ডিক্রি, আদেশ, রিট অথবা আদালতের পরোয়ানা অমান্য কিংবা আদালতের দেয়া কোনো রায় বা মুচলেকা ভঙ্গ করে থাকেন তবে সেটা আদালত অবমাননা হতে পারে।

দেওয়ানি বিচারিক বিষয়টি নিয়ে আদালত অবমাননা সংবাদপত্রের সঙ্গে জড়িত না হলেও ফৌজদারি আদালত অবমাননার বিষয়টি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত। বেশকিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে যদি প্রশ্ন উত্থাপন করা হয় তবে সে ক্ষেত্রে আদালত অবমাননার বিষয়টি বিবেচনায় আসে। ২০০৭ সালে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের ফৌজদারি বিধির কন্টেম্পট পিটিশন নং ৯৫৭১/২০০৭ (রাষ্ট্র বনাম আদালত অবমাননাকারী) মামলায় স্বয়ং মহামান্য বিচারপতি আদালত অবমাননা সম্পর্কে রায় প্রদান করতে গিয়ে উল্লেখ করে বলেছেন, বিচারকরা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয় তবে সে সমালোচনা সংযত ও বস্তুনিষ্ঠ হওয়া দরকার। একজন বিচারকের রায় নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা করতে আইনগত কোনো প্রকারের বাধা নেই। কিন্তু প্রদত্ত সে রায়ের কারণে বিচারককে ব্যক্তিগতভাবে সমালোচনা করা যাবে না। প্রত্যেকের বিবেচনায় রাখতে হবে আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় আইন বিচারকদের এতটুকু নিরাপত্তা জনগণ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে প্রদান করেছেন। যদি সে রকমটা না হতো তবে বিচারকের মতো সর্বাধিক গুরুদায়িত্ব পালন করতে কেউ রাজি হতেন না। আদালত অবমাননার শাস্তি হচ্ছে কারাদণ্ড, যার মেয়াদ ছয়মাস পর্যন্ত হতে পারে অথবা জরিমানা সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। অবশ্য ক্ষমা প্রার্থণা করলে অবমাননার আসামীকে মুক্তি দেয়া যায়।

লেখক: সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও অ্যাডভোকেট জজ কোর্ট, কুষ্টিয়া।

E-mail: seraj.pramanik@gmail.com