যে দৈনিকের একটাই কপি

সোমবার, এপ্রিল ৬, ২০১৫

:: প্রেসবার্তাডটকম ডেস্ক ::

talkএমন পত্রিকার কথা কখনো কী শুনেছেন যার প্রচার সংখ্যা মাত্র ১; কাগজে নয়, প্রকাশিত হয় ব্ল্যাকবোর্ডে। আর সে পত্রিকা আসবে না আপনার কাছে, বরং পড়তে হলে আপনাকেই যেতে হবে পত্রিকা অফিসে।

ফুটপাতের একপাশে পোঁতা আছে দুটি খুঁটি। খুঁটি দুটিতে আটকে আছে বড় একটি ব্ল্যাকবোর্ড। বোর্ডটির সামনে প্রতিদিন এক-দুবার ঢুঁ মারেন কয়েক হাজার মানুষ। তারা সবাই পত্রিকার পাঠক। ব্ল্যাকবোর্ডটিই একটি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি টক’। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাজা খবরগুলো প্রতিদিন হাতে লিখে প্রকাশিত হচ্ছে এই কাগজে। প্রকাশক, সম্পাদক, প্রতিবেদক সব কাজ করেন একজন মাত্র মানুষ। বয়স তার ৩৭ বছর, নাম আলফ্রেড সারলিফ।

যুদ্ধবিধ্বস্ত লাইবেরিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ডেইলি টকের তিনিই প্রাণপুরুষ। লাইবেরিয়ার ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধের শুরুতে ছিলেন বালক মাত্র। সন্তানকে ফেলে পালিয়ে জান বাঁচিয়েছিলেন সন্ত্রস্ত মা-বাবা। আলফ্রেডকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো একটি সেনা ক্যাম্পে। অপুষ্ট আর লিকলিকে শরীরের বালকটির হাতে ধরিয়ে দেয়া হলো ভারি অস্ত্র। বাঁচতে হলে যুদ্ধ করতে হবে এ বোধ থেকেই যুদ্ধ করলেন, বেঁচে ফিরেও এলেন। ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আবারো শুরু করলেন স্বপ্ন দেখা।

ছোটখাটো সমরাস্ত্র আর গুলির খোসা দিয়ে বানাতে শুরু করলেন শোপিস, স্যুভেনির। পণ্যগুলো বিক্রি করেন লাইবেরিয়ায় কর্মরত আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার কর্মীদের কাছে। সে আয় দিয়ে ভালোই কেটে যাচ্ছিল দিন। তারপরও হতাশা কাটে না। মাথা থেকে দূর হয় না দেশের জন্য কিছু একটা করার তাড়না। এক সময় লেখাপড়া করেছিলেন মিশনারি স্কুলে। নানা ধরনের বই পুস্তক পড়ে ধরে রেখেছিলেন লেখাপড়ার অভ্যাসটা। আলফ্রেড সারলিফ বিশ্বাস করেন ‘জনগণ যত তথ্যসমৃদ্ধ হবে, দেশ তত দ্রুত এগিয়ে যাবে। দেশের খবর রাখলেই মানুষ দেশের উন্নতির জন্য মতামত দেবে, অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হবে। এ জন্য দৈনিক পত্রিকার কোনো বিকল্প নেই।’

চলে এলেন রাজধানী মনরোভিয়ায়। ব্যস্ততম এক সড়কের পাশে ভাড়া নিলেন খুপরি ঘর। ছোট্ট খুপরিটিই তার অফিস। পথের ধারে খুঁটিতে আটকানো ব্ল্যাকবোর্ডই কাগজ ‘দ্য ডেইলি টক’। সাদা চক দিয়ে বোর্ডের মাথায় লিখলেন কাগজের নাম। রাতে পড়ার জন্য বোর্ডের দুই প্রান্তে ঝোলালেন দুটি কেরোসিন বাতি। প্রতিদিন রাতে অফিসে বসে বাছাই করেন সারাদিনে পাওয়া তথ্য। ক’জন বন্ধু মোবাইল ফোনসেটে ছোট ছোট খবর পাঠিয়ে সাহায্য করেন। প্রয়োজনীয় খবর যতœ করে বোর্ডে লেখেন। কিছু খবরে ছবিও জুড়ে দেন।

ছবিগুলো আসলে পুরনো আর বাতিল পোস্টার। বানান শুদ্ধ করতে ব্যবহার করেন তেল চিটচিটে ডিকশনারি। ব্যস, এভাবেই প্রতিদিনের খবর নিয়ে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে ডেইলি টক। প্রচলিত পত্রিকা তো নয়ই, যাদের পত্রিকা কেনার সাধ্য নেই, তাদের ভাষাতেই ছাপা হয় সব খবর। আলফ্রেডের যুক্তি পরিষ্কার, ‘আমরা ঠিক যেভাবে কথা বলি, বাজে কথা বা হালকা গালাগাল করে সমালোচনা করি, সেভাবেই খবরগুলো লিখে দেয়া হয়। কারণ ডেইলি টক আমজনতার কথা বলে।’

দিনের কিছুটা সময় বোর্ড থেকে তুলে ফেলা হয় সব খবর। দলে দলে ছুটে আসা শিশুদের দেয়া হয় অক্ষরজ্ঞান। সরকারের সমালোচনামূলক খবর ছাপানোর দায়ে তাকে ঢুকতে হয়েছে চৌদ্দ শিকের ভেতরেও। ভেঙে দেয়া হয়েছে বোর্ড, উপড়ে ফেলা হয়েছে খুঁটি। কিন্তু আবারো ঘুরে দাঁড়িয়েছেন আলফ্রেড সারলিফ। ফিরে গিয়েছেন পুরনো কাজে।

এত কিছুর পরও কেন লেগে আছেন? প্রশ্নটির জবাব এভাবেই দিয়েছেন বিশ্বের একমাত্র ব্ল্যাকবোর্ড দৈনিকের প্রাণ ভোমরা ‘লাইবেরিয়ার এই ব্ল্যাকবোর্ড স্রেফ খবরের বোর্ড নয়, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক হাতিয়ার।’

সৌজন্যে: মানবকন্ঠ।