গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ

বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২, ২০১৫

:: আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ::

Du VC a a m s arefin siddiqueমহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধিকার আন্দোলনে গণমাধ্যমের ছিল গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র মুক্তিযোদ্ধা ও দেশের স্বাধীনচেতা জনসাধারণের কাছে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম হয়ে উঠেছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে কোণঠাসা পাকিস্তান বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদে উজ্জীবিত হয়েছিল অন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গণমাধ্যমের শক্তিশালী ভূমিকা নিয়ে অনেক গবেষণার উপকরণ রয়েছে।

আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও সে দেশের গণমাধ্যম আমাদের পক্ষে কাজ করেছিল। তারা তাদের রুটিন অনুষ্ঠান বন্ধ করেও স্বাধীনতাকামীদের বিভিন্ন সংবাদ প্রচার করেছিল। তা বিশ্ব জনমত গঠনে রেখেছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কেবল যুক্তরাষ্ট্রই নয় জাপান, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের গণমাধ্যমও আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেছিল। মূলত বিশ্ব গণমাধ্যমের জোরালো প্রচারণার ফলেই বিশ্ব জনমত আমাদের পক্ষে এসেছিল।

স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত রেডিও-টেলিভিশনের বাইরে গিয়ে বেসরকারি অনেক গণমাধ্যম গড়ে উঠেছে। প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। গণমাধ্যমের বিস্তার গণতান্ত্রিক দেশের জন্য অবশ্যই শুভলক্ষণ। তবে এর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। স্বাধীন দেশের প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমগুলোর মধ্য রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির একটি মানসিকতা রয়েছে। ফলে তারা নিজস্ব চিন্তা-চেতনার বাইরে গিয়ে সংবাদ প্রকাশে নিরপেক্ষ হতে পারে না। এর বাইরে স্বল্প বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে ভালো ও মেধাবীরা গণমাধ্যমে কাজ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

আমি গণমাধ্যম মালিকপক্ষের কাছে আহ্বান জানাব, মেধাবীদের গণমাধ্যমে টানার জন্য বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পাশপাশি বহুবিধ সুযোগ বৃদ্ধি করুন। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে। আমাদের দেশে কোনো অন্যায়ের সহজে বিচার হয় না। বিচারপ্রার্থীর সংখ্যাও বেশি। ফলে অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রেই পার পেয়ে যাচ্ছে। গণমাধ্যমকর্মীরা অনেক সময় বিভিন্ন মহলের রক্তচক্ষুর শিকার হন। জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অনেক সাংবাদিক হত্যার ঘটনা ঘটলেও বিচার হয়েছে অল্প কয়েকটি। সাংবাদিক নির্যাতনসহ সব অপরাধের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। তদন্তের নামে সময়ক্ষেপণ না করে দক্ষ ও যোগ্যদের হাতে এ দায়িত্ব দিলে কাজে গতি আসবে। এক্ষেত্রে সরকার, আইন মন্ত্রণালয়, জাতীয় সংসদকে অতি দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা আদায়ের জন্য সরকারের ওপর নির্ভরশীল হওয়া বন্ধ করতে হবে। গণমাধ্যমের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নেওয়া নয়। তাই সরকারের প্রতি বেশি নির্ভরশীল হলে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ। একজন মানুষ অনৈতিক কাজ করলে এর প্রভাব অল্প কয়েকজনের ওপর পড়ে। কিন্তু একটি গণমাধ্যমের অনৈতিক ভূমিকা পুরো সমাজ ও দেশের ওপর প্রভাব পড়বে। তাই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই বিষয়ে আরও সতর্ক থাকতে হবে যেন তাদের কোনো বিতর্কিত ভূমিকায় মুক্তবুদ্ধি, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে অন্তরায় না হয়।

কোনো দল বা পক্ষ নয় বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি জোর দিলে সমাজ ও দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে। দেশে বিপুল সংখ্যক রেডিও ও টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে আমাদের ভেবে দেখতে হবে এই প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর মতো দক্ষ জনশক্তি দেশে আছে কি না। আর এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে গণামাধ্যমের মালিকপক্ষকে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে এর কর্মীদের উন্নতমানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা প্রয়োজনে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করতে হবে।

লেখক: ভাইস চ্যান্সেলর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ।