শোকাহত চট্টগ্রামের সাংবাদিকরা

মঙ্গলবার, ৩১/০৩/২০১৫ @ ৭:৫৪ অপরাহ্ণ

:: প্রেসবার্তাডটকম প্রতিবেদন ::

Ali haidarচট্টগ্রামের সাংবাদিকদের প্রিয় মুখ ও বণিক বার্তার ব্যুরো প্রধান আলী হায়দারের অকাল প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে চট্টগ্রামের গণমাধ্যম অঙ্গনে। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গত সোমবার দুপুর ২টায় ঢাকার বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

আলী হায়দারকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেইসবুকে নানা স্ট্যাটাস দিয়েছেন তার সহকর্মীরা। এ ধরনের কয়েকটি স্ট্যাটাস প্রেসবার্তার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

চ্যানেল২৪ এর চট্টগ্রাম অফিসের ইনচার্জ কামাল পারভেজ লিখেছেন-
একজন শেখ আলী হায়দার। শ্রমিক রাজনীতিতে তার অগাধ দখল। সাংবাদিকতায় এসেও দারুণ উজ্জ্বল। ছিলেন বণিক বার্তার চট্টগ্রামের ব্যুরো প্রধান। পড়তেন প্রচুর। নিয়মিতই পড়ালেখা করেন, অনেক কিছু জানেন-আমার দেখা এমন সাংবাদিকদের অন্যতম। আমার সাথে পরিচয়ও হঠাৎ করে, শ্রমিক আন্দোলনের একটি ঘটনার নিউজ করতে গিয়ে। তখনও পেশা হিসেবে নেননি সাংবাদিকতাকে। তারপর শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে ইন্টারভিউর জন্য কাউকে দরকার হলে তাকেই ফোন দিতাম আগে। মুহুর্তে সমাধান। তার দেয়ার ছিল আরও অনেক কিছুই। কিন্তু হঠাৎ করেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বিদায় হায়দার ভাই। অনেক ভালো থাকবেন। আমরা আপনাকে অনেক মিস করবো।

বণিক বার্তার চট্টগ্রাম ব্যুরোর স্টাফ রিপোর্টার ওমর ফারুক লিখেছেন-
দুপুর সোয়া দু’টার (সোমবার) পর থেকে প্রতিটি ফোন ছিল কান্নার। অসুস্থ হওয়ার পর মনে করছিলাম, সুস্থ হয়ে অফিসে যোগ দেবেন তিনি। কিন্তু না….. কাল থেকে অফিসে এসে হায়দার ভাইকে দেখবো না। ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে… ভালো থাকেন আপনি…..

দেশ টিভির চট্টগ্রাম অফিস প্রধান আলমগীর সবুজ লিখেছেন-
মানুন ভাই, রশিদ মামুন খবরটা দেওয়ার পর নিজের কানকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। কেন এমন, এত তাড়াতাড়ি চলে গেলেন হায়দার ভাই! খুব বেশি না হলেও টুকটাক অনেক স্মৃতি আছে
সব মনে পড়ছে, খবরটা শুনার পর থেকে। মনটা কেমন বিষাদ হযে উঠল! ভালো থাকুন, হায়দার ভাই, অনেক ভালো !!

জিটিভির চট্টগ্রাম অফিস প্রধান অনিন্দ্য টিটু লিখেছেন-
মৃত্যু আসলেই বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের ধার ধারে না / বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, এভাবে মৃত্যু আসতে পারে না … যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন …

সিটিজি নিউজের যুগ্ন বার্তা সম্পাদক পুলক সরকার লিখেছেন-
আমি গভীরভাবে শোকাহত। মহান সৃস্টিকর্তার কাছে তাাঁর আত্মার শান্তি ও সদগতি কামনা করি।

সিটিজি নিউজের সম্পাদক সোয়েব কবির লিখেছেন-
ভাবতেই পারিনি… এতো অল্প সময়ের মধ্যেই ছেড়ে চলে যাবেন তিনি। দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ এ কর্মরত থাকাকালীন পরিচয় এরপর দেশে গেলে প্রায়ই বণিকবার্তার চট্টগ্রাম কার্যালয়ে যেতাম হায়দার ভাইয়ের সাথে আড্ডা দিতে। এইতো মাত্র দেড় মাস আগেও তিনি বলেছিলেন, পরের বার আসলে আবারো দেখা হবে। সেই দেখা আর হলো না…..হায়দার ভাই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। …….. ঢাকার বারডেমে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। দাফন করা হবে খুলনায়। কিন্তু, চট্টগ্রামের যার এতোগুলো সময় কেটেছে, তাঁকে এক নজর শেষ দেখার সুযোগ পেলো না চট্টগ্রামের সংবাদকর্মী, সহকর্মীরা। যা হোক, হায়দার ভাই ভালো থাকুক এবং আপনার রূহের মাগফেরাত কামনা করি।

এশিয়ার টিভির সাংবাদিক লতিফা রুনা লিখেছেন-
বাসা থেকে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হলে প্রায় সময় হায়দার ভাইয়ের সাথে দেখা হতো। আর দেখবো না। খুব কষ্টের বিষয়, বিশ্বাস করতে মন চাচ্ছে না। আল্লাহ হায়দার ভাইকে বেহেস্ত নসিব করুক।

সাংবাদিক গোলাম মোরতাজা আলী লিখেছেন-
আলী হায়দারের জীবনাবসান, বিবর্ণ জীবনটা। কেন যেন জীবনটা আজ বড্ড বিবর্ণ…… হয়তো প্রিয় মানুষটি না ফেরার দেশে চলে যাওয়ায়….. ঝড়-তুফান, রোদ-বৃষ্টি, রাত-দিন, হরতাল-অবরোধ কিছুই তাকে (আলী হায়দার ভাইকে) আটকাতে পারেনি কখনো…. গাড়ী নেই তাতে কি, হেটে চল….. রোদ তাতে কি…. বৃষ্টি তাতে কি, পলিথিন অথবা কচু পাতা মাথায় দিয়ে চলা…… প্রচন্ড দাতে ব্যাথা তাতে কি…. বুকে ব্যাথা তাতে কি….. এমন করে চলার মানুষটি আজ চলছে…. মৃত্যু তাকে কি….. মৃত্যু তাকে কি….. মৃত্যুকে নিজে করেছে আলিঙ্গন… এ যেন মৃত্যু নয়… মৃত্যুকে করেছে জয়….. তবে, হায়দার ভাই আপনার চলে যাওয়াটা বড্ড অসময়ে…, বেলা-অবেলায়, নিরবে-নিস্থব্ধে আপনার শুণ্যতা আমাদের কাঁদাবে প্রতিক্ষণ….

সুপ্রভাত বাংলাদেশের শিফট ইনচার্জ (বার্তা বিভাগ) মোশাররফ রাসেল লিখেছেন-
হায়দার ভাই চলে গেছেন!!! প্রিয় হায়দার ভাই!!! (ঝশ অষর ঐধরফবৎ)….আপনি আমাকে কাঁদিয়ে…আমাকে একা করে এভাবে চলে গেলেন? আমি কি করে ভুলবো আপনার স্নেহ-ভালোবাসার…..গত সপ্তাহেই আড্ডা দিতে দিতে এক পর্যায়ে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক অবস্থার খবর নিয়ে আপনি আমাকে পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন দুই হাজার টাকা…আমার মানিব্যাগে আজও সেই টাকার ১০০০ রয়ে গেছে হায়দার ভাই!! টাকা ফুরোয়নি…..আপনি নিভে গেলেন? আমাকে এখন কে সময়ে-অসময়ে ফোন দিয়ে বলবে..‘রাসেল এখনই এসো! চলে এসো, দাওয়াতে যাবো….শহরের বাইরে….আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি!!’ আমার মন খারাপ লাগলে কার কাছে গিয়ে বলব..‘চলুন শহর থেকে দূরে কোথাও বেড়াতে যাই!’ সাথে সাথে প্রস্তাব মেনে নিয়ে নিজে ড্রাইভ করে নানা ধরনের গল্প করতে করতে কে বেড়াতে নিয়ে যাবে আমায়…আমাদের…… দুপুর থেকে আমার কান্না ঝরছে হায়দার ভাই… আপনার স্মৃতিগেুলো কিভাবে ভুলবো আমি?????? হায় জীবন…এক ছোট কেনো তুমি….? আল্লাহ আপনাকে বেহেশত নসীব করুন। আমীন।

জনকন্ঠের সাবেক সাংবাদিক রাশেদুল হাসান লিখেছেন-
খুব সম্ভবত বিজিএমইএ’র কোন একটি প্রেস কনফারেন্সে। প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে সভাপতি বললেন, আজ হায়দার ভাই কোন প্রশ্ন করলেন না যে। প্রেস কনফারেন্সে আমরা খুব ভয়ে থাকি হায়দার ভাই কোন বিষয় তুলে আমাদের সাইজ করেন। আসলেই হায়দার ভাই সংবাদ সম্মেলনে থাকলেই আমরা অপেক্ষায় থাকি কখন সবচেয়ে মোক্ষম প্রশ্নটি হায়দার ভাই করবেন। আমাদের মধ্যে অনেককেই দেখতাম বিরক্তি দেখাতেন। কিন্তু পরদিন পত্রিকার পাতায় দেখতাম হায়দার ভাইয়ের করা প্রশ্ন থেকেই তিনি সংবাদের রসদ খুঁজে নিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনটি যদি হতো ইংরেজি ভাষায়, তাহলে হায়দার ভাইয়ের বিকল্প কেউ ছিল না। অনেকেই নিজের প্রশ্নটি হায়দার ভাইয়ের হাতে তুলে দিতেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী হায়দার ভাইয়ের জানাশোনার সীমা ছিল সমকালীন অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। প্রায়ই বলতেন ওনার সরাসরি শিক্ষক নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুস গ্রামীণ ব্যাংক চালুর শুরুতেই হায়দার ভাইকে কাজ করতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি রাজি হননি।

হায়দার ভাই, আজ অনেক কথা মনে পড়ছে। আপনার চলে যাওয়ার কথাটি শোনার পর থেকেই নিজেকে খুব অসহায় লেগেছে। তারপরও নিষ্ঠুর সাংবাদিকতা পেশাটা একটা দিনের জন্য মুক্তি দেয়নি। এই অবস্থায় একাধিক রিপোর্ট, বিশেষ রিপোর্ট করতে হয়েছে। কিন্তু বিশ্বাস করেন একটু পর পর আমি ফেসবুকের পাতা খুলে খুলে আপনাকে দেখছিলাম। আমার পরিচিত গন্ডির মধ্যে আজ শুধু আপনাকেই নিয়ে শোকের মাতম। আপনার প্রতিটি হাসিমাখা ছবির নীচেই একেক জনের হাহাকার আমার হৃদয় দুমড়ে মুচরে দিচ্ছিল। আমার মনে হয় না সমকালীন আর কারও মৃত্যুতে সহকর্মীদের মধ্যে আমি এতো হাহাকার দেখেছি। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই আপনার সাংবাদিকতা ক্যারিয়ারের শুরুতেই আপনার সহকর্মী ছিলাম আমি। সদ্য প্রকাশিত সুপ্রভাত বাংলাদেশের প্রাণোচ্ছল তরুণ টীমের সবচেয়ে নবীণ সদস্য ছিলাম আমি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা হওয়ার কারণে আপনার স্নেহ সম্ভবত একটু বেশিই পেয়েছিলাম। আপনি হাটতেন প্রচুর। সারাদিন রাজনীতি আর সংবাদের পেছনে ঘুরে সন্ধ্যায় যখন অফিসে ঢুকতেন তখন ঘামে ভেজা আপনাকে দেখলে মনে হতো বৃষ্টিতে গোসল করে এলেন। বহুদিনের ব্যবহারে জীর্ণ জিন্স প্যান্ট এবং বুকের বোতাম ছেড়া টি-শার্ট ঘামে ভিজে গায়ে লেপ্টে থাকতো। আমি প্রায়ই বকা দিতাম। আর আপনি হাসতেন। কোন হোটেলের বয়কে তার মালিক চাকুরিচ্যুত করলো, কোন গার্মেন্ট কর্মীর গায়ে মালিকপক্ষ হাত তুললো তাদের অধিকার আদায়ে আপনি মিছিল, মিটিং করে বেড়াতেন। পুরোপুরিই নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। আজ বুঝতে পারছি এই মোষ তাড়ানো মানুষটিকে সবাই কতটা ভালোবাসতো।

তরুণ এই আমি কখনই হেটে আপনার সাথে কুলিয়ে উঠতাম না। আমরা বলতাম হায়দার ভাইয়ের কখনও অসুক হবে না। সেই আপনিই কী না স্ট্রোক করে চলে গেলেন মাত্র ৫৬ বছর বয়সে। এটা কিভাবে মেনে নেই হায়দার ভাই? আপনি আমাকে কতটা স্নেহ করতেন সেটা আমি এখনও টের পাই। আজ সত্যিই আমার আর কিছুই ভালো লাগছে না হায়দার ভাই। যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন।

পূর্বকোণের ঢাকা ব্যুরো প্রধান কুদ্দুস আফ্রাদ লিখেছেন-
সম্ভবত গেল বছরের সিইউজে আয়োজিত মে দিবসের আলোচনায় যোগ দিতে গিয়ে হায়দার সাহেবের সঙ্গে পরিচয়। হাত মেলানোর পরেই বললেন, আপনাকে (আমাকে) জানি অনেকদিন থেকে। সরাসরি হয়তো কথা হয়নি সত্য। মাঝে মাঝে আপনার লেখা রিপোর্ট নি:শ্বাসে পড়ে ফেলি। আপনার লেখার স্টাইল আমার খুব পছন্দের। হায়দার সাহেবের কথায় আমি খুবই বিব্রত বোধ করছিলাম। আমি ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁর একটি ভিজিটিং কার্ড চাওয়ার পরেই তিনি বললেন, আমি (তিনি) মুলত একজন শ্রমিক। আমিও নিজেকে শ্রমিক বলার পর, তিনি বললেন আপনারা হচ্ছেন সাংবাদিক শ্রমিক। আর আমি হচ্ছি আসলেই শ্রমিক, শ্রমিক রাজনীতি করি। ওটাই আমার আসল পরিচয়। কৃতজ্ঞতা ভড়া মুখে আরও বললেন, আমি সাংবাদিকতা করছি মুলত চট্টগ্রামের কয়েকজন বন্ধু সাংবাদিকদের আগ্রহে ও তাদের সহায়তায়। ভাবতে অবাক লাগছে, সেই প্রিয় মানুষটি আজ নেই। আর কোনও দিন দেখা হবে না। হায়দার ভাই, আপনি যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন। আমরা বিনম্রচিত্তে আজ আপনাকে স্মরণ করছি। শ্রদ্ধা জানাচ্ছি আপনার বিদেহী আত্মার প্রতি। এমন একজন দরদী মানূষের মৃত্যুতে ডিইউজে পরিবার গভীর শোক জানাচ্ছে।

বাংলামেইলের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট আলম দিদার লিখেছেন-
সাংবাদিকতার হাতেখড়িটা হায়দার ভাইয়ের হাত ধরে সুপ্রভাত বাংলাদেশ-এ থাকাকালীন সময়ে। যিনি ছিলেন আমাদের প্রধান প্রতিবেদক। এরপর একই সময়ে দুই জন দুই পত্রিকায় যোগ দিলাম- খুব কষ্ট লাগাছে.. চোখে অঝোর পানি ঝরছে। গতকাল দিনভর খুব মন খারাপ ছিল। কাজে মন দিতে পারিনি। গভীর রাতে যখন ঘুম ভাঙলো তখনো হায়দার ভাইয়ের কথা মনে পড়লো। কেন? খুব মিস করছি।…

আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাক খন্দকার লিখেছেন-
খুব খারাপ লাগছে। সাংবাদিকতায় তিনি আমার সহকর্মী ছিলেন। অনেক মেধাবী সাংবাদিক ছিলেন আলী হায়দার।

নয়া দিগন্তের মিরসরাই প্রতিনিধি মাঈন উদ্দিন লিখেছেন-
হায়দার ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ শুনে খুব খারাপ লাগছে। তার সাথে আমার দেখা হয়েছিলো একবার। আমাকে সাংবাদিকতা বিষয়ক অনেক উপদেশ দিয়েছিলেন সেইদিন। আল্লাহ তাকে জান্নাত নসিব করুক। আমিন..

যায়য়ায়দিনের সাবেক সাংবাদিক আজাদ মঈনুদ্দীন লিখেছেন-
প্রায় ১০ বছর আগের কথা। দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ তখন সবেমাত্র বাজারে এসেছে। আমি যোগ দেয়ার কিছু দিন পর আসলেন ঝশ অষর ঐধরফবৎ ভাই । বয়সে হায়দার ভাই আমার অনেক বড় হলেও বসতাম পাশাপাশি। তিনি বন্দর বিটে কাজ করতেন , আমি অপরাধ আর রাজনীতিতে। কাজ শুরুর কিছু দিনের মাথায় পতেঙ্গা লালদিয়ার চরে উচ্ছেদ অভিযানে পুলিশ-এলাকাবাসী তুমুল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল। খবর পেয়ে আমি আর অষধসমরৎ ঝধনঁল এক সঙ্গে (বর্তমানে দেশ টিভির ব্যুরো প্রধান) ঘটনাস্থলে গেলাম। হায়দার ভাই বন্দরের পোকা। তিনিও গেলেন ঘটনাস্থলে। সারাদিন খেটেখুটে অফিসে এসে দুটি রিপোর্ট জমা দিলাম। একটি সংঘর্ষের খবর , যেটি পর দিন প্রধান প্রতিবেদন হিসাবে ছাপা হলো । আর একটি ঘটনার পেছনের খবর, যার শিরোনাম ছিল ‘কোথায় দাড়াবে লালদিয়ার চরের মানুষ’। যে রিপোর্টে ওই চরবাসীর দীর্ঘদিনের আইনি লড়াই, বার বার উচ্ছেদ, পূনর্বাসনের নানা প্রতিশ্রুতি, জনপ্রতিনিধিদের প্রতারণার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরলাম। পরদিন স্থানীয় সব দৈনিকের তুলনার আমাদের প্রতিবেদন অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধ ছিল। তখনকার সম্পাদক সৈয়দ আবুল মকসুদ স্যার ও সহযোগী সম্পাদক মুহম্মদ ইদ্রীস ভাই, বার্তা সম্পাদক,জধরংঁষ ইধযধৎ ভাই রিপোর্টের খুব প্রশংসা করলেন। কেন যেন সেদিন আমি একটি রিপোর্টও‘ বাই লাইন ’ দেইনি।

আলী হায়দার ভাইও সেদিন ওই ঘটনা নিয়ে একটি রিপোর্ট করেন। যেটি পরদিন ছাপা হয় তাঁর নামে ‘চারঘন্টার বিরামহীন অভিযান’ শিরোনামে। বড়সড় মানুষটি আসলে কতটা বিনয়ী আমি সেদিন বুঝলাম। নিউজে আমি নাম না দেয়ায় তার সে কী অনুশোচনা ! বার বার বললেন, ‘আপনি নাম না দেয়াতে তিনটি রিপোর্টই মনে হচ্ছে আমার করা। এটা উচিত হয়ি নি।’ আমি অনেক বার বুঝালাম। তবুও তিনি বলে যাচ্ছেন ‘সরি’। এমন অমায়িক মানুষটির সাথে পাশাপাশি টেবিলে প্রায় চার বছর চাকরি করেছি। আমাদের মধ্যে কাজের প্রতিযোগিতা ছিল। কিন্তু অফিসের বাইরে তিনি ছিলেন আমার বড় ভাই। তাকে আমি বার বার বলতাম ‘তুমি’ সম্বোধনের জন্য। কেন যেন আমাকে ‘তুমি’ বলেতেন না। দেখা হলেই শুধু বিপ্লবের গল্প শোনাতেন শ্রমিক আন্দোলন, শ্রেণী সংগ্রাম এবং সবশেষে সাংবাদিকতার এই মানুষটি।
তার মৃত্যু সংবাদটি শুনে বুকে ভেতর হু হু করে উঠল। বার বার ভেসে আসছিল ১০ বছর আগের সেই দিনগুলোর কথা। আলী হায়দার ভাইয়ের মত স্বপ্নচারী মানুষগুলো কেন অসময়ে চলে যাবেন! কাজটি একদম ভাল করেননি হায়দার ভাই। আজ আপনাকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছি না। আপনি যতই বড়জন হোন না কেন, আমি বার বার বলব আপনি ভাল করেননি, একদম ভাল করেননি।

এদিকে মঙ্গলবার বাদ আসর নগরীর জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গনে আলী হায়দারের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নামাজ শেষে মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া ও মোতাজাত পরিচালনা করেন জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম নূর মোহাম্মদ সিদ্দিকী। জানাজা পরিচালনা করেন মাওলানা এহসানুল হক। জানাজায় সহকর্মী, সাংবাদিক, পেশাজীবিসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্তরের মানুষ অংশ নিয়েছেন।