অভিজিৎ হত্যা : এটি কি শুধুই হত্যা

মঙ্গলবার, মার্চ ৩, ২০১৫

:: আবুল কালাম আজাদ ::

Abul Kalam Azadদীর্ঘ সংগ্রাম আর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে সত্তুরের দশকের শুরুতে। অনেক রক্তের দামেও কেনা আমাদের মায়ের ভাষা। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মুক্তি পায় প্রগতিশীল, মানবিক ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমরা জানি, ২১ মানে মাথা নত না করা। ২১ আমাদের অহঙ্কার। ২১ আমাদের চেতনা। এই স্বাধীন সার্বভৌম দেশে একুশের মাসে এখনো জীবন দিতে হচ্ছে প্রগতিশীল লেখককে। মুক্তচিন্তার ধারক বাহককে।

২৬ ফেব্রুয়ারি শতাধিক মানুষ ও পুলিশের সামনে দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে জীবন দিতে হয়েছে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রগতিশীল লেখক ড. অভিজিৎ রায়কে। একুশের মাসে ঘটে যাওয়া এ হত্যাকান্ড নিয়ে বিশ্বব্যাপী চলছে ব্যাপক তোলপাড়। ইতিমধ্যে বিশ্বের নানাপ্রান্ত থেকে এ হত্যাকান্ডের বিচারও দাবি উঠেছে। ভয়ঙ্কর এই হত্যাকান্ডে অবাক দেশ-বিদেশের সচেতন মানুষ। যেখানে মানুষের বিবেক জাগ্রত হয় সে প্রতিষ্ঠানের পাশে ঘটে যাওয়া এ হত্যাকান্ড মানুষকে নির্বাক করে দিয়েছে। পাশেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৩ স্তরের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে এ নির্মম হত্যাকান্ড। বিষয়টি তাই জটিল থেকে জটিলতর। আর প্রশ্ন উঠেছে অভিজিৎ রায় হত্যা; এটি কি শুধুই হত্যা?

আমরা জানি, ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা থেকে ফেরার পথে প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর যেভাবে হামলা হয় ঠিক একইভাবে হামলা হয় ২৬ ফেব্রুয়ারি অভিজিৎ রায়ের ওপর। ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠীর কাছে আমরা যেন জিম্মি হয়ে পড়ছি। বাংলাদেশের স্বাধীন এবং মুক্তচিন্তার প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো অভিজিৎকে। একই ঘটনায় এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে তার স্ত্রী ডা. রাফিদা আহমদ বন্যা। এ হত্যাকান্ডের পাশে চলে বইমেলা। তখন ওই এলাকায় হাজারো মানুষের উপস্থিতি। তার মধ্যেই দুর্বৃত্তরা তাদের যেভাবে কুপিয়েছে এটা কোনভাবেই মেনে নেয়ার নয়। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে কোনভাবেই এ ধরনের হত্যাকান্ড কাম্য নয়। এ হত্যাকান্ডের মাধ্যমে ধর্মান্ধরা আবারো প্রমাণ করতে চাচ্ছে এ দেশে প্রগতিশীল লোকদের স্থান নেই?

বিশ্বব্যাপী আজ জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটছে। জঙ্গীরা বাংলাদেশেও ঘাঁটি গাঁড়তে চাচ্ছে এমনটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের মাটি এবং মানুষ জঙ্গীদের উপযোগী হতে পারবে বলে সহজেই অনুমান করা যায় না। জঙ্গীরা হয়তো এ দেশে ঘাপটি মেরে থাকবে বা থাকতে পারে। কিন্তু কখনই তারা প্রকাশ্য হতে পারবে না বলে আমি বিশ্বাস করি। তবে বর্তমানে যে রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করছে তাতে শুধু জঙ্গী নয়; জঙ্গীবাদেরও উত্থান ঘটতে পারে বলে অভিজ্ঞজনরা মনে করছেন।

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের রচয়িতা লন্ডনপ্রবাসী সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উত্থান একদিনে ঘটেনি, আবার একদিনে তার উচ্ছেদ ঘটানো যাবে না। দেশ স্বাধীন হওয়ার সাড়ে তিন বছর না যেতেই দেশের সেক্যুলার সরকার ও সংবিধান উচ্ছেদ করে জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার স্বাধীনতার শত্রু পলাতক মৌলবাদীদের এবং যুদ্ধাপরাধী ঘাতকদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিষবৃক্ষের চারা রোপণ করেছিল। পরবর্তীকালে তার দলের সাহায্য ও সহযোগিতা পেয়ে সেই বিষবৃক্ষ এখন মহীরুহে পরিণত হয়েছে। একে নির্মূল করা যে সহজ নয়, তার প্রমাণ হুমায়ুন আজাদ থেকে অভিজিৎ রায় পর্যন্ত অসংখ্য নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড।

আমার এ লেখা একজন প্রগতিশীল লেখকের মৃত্যুর নিন্দা জানানো। তাঁর এমন হত্যাকান্ডে আমি কেন কোন বিবেকবান মানুষ চুপ করে থাকতে পারে না। তাই আমার এ লেখনির মাধ্যমে আমি প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আর একই সঙ্গে বলছি আমার চিন্তা কিংবা চেতনার সঙ্গে আপনার মিল না থাকতেই পারে। শুধু আমি নই যে কোন লেখকের বক্তব্য আপনার বা আমার ভালো না লাগতেই পারে তাই বলে তাকে আমি বা আপনি হত্যা করবেন। এটা কোনভাবেই আমি সমর্থন করি না। আপনি তাঁর চিন্তা চেতনার সঙ্গে একমত না হলে লেখনির মাধ্যমে জবাব দেওয়া সমুচিন বলে মনে করি। কাউকে হত্যা করা কোন ধর্ম সমর্থন করে বলে আমার জানা নেই।

অভিজিৎ রায় হত্যাকান্ডে ঘুরে ফিরে জঙ্গী বা জঙ্গী তৎপরতার কথা উঠে আসছে তার কারনটি হলো টুইটারের একটি পোস্ট। টুইটারে একটি পোস্টে আনসার বাংলা-৭ নামের একটি সংগঠন এর দায় স্বীকার করেছে। নিহত অভিজিতের বাবা শিক্ষাবিদ ও মুক্তচিন্তার অগ্রণী ব্যক্তি অধ্যাপক অজয় রায় এ হত্যাকান্ডের জন্য জামায়াতে ইসলামীসহ সাম্প্রদায়িক জঙ্গিগোষ্ঠীকে দায়ী করেছেন। তাই এ হত্যাকা- জুড়ে অবস্থান নিয়েছে ধর্মান্ধ জঙ্গী। অভিজিৎ রায় মুক্তমনন ও প্রগতিশীল চিন্তার ধারক বাহক ছিলেন। তাঁর খুরধার লেখনির মাধ্যমে তিনি সমাজের কাছে সঠিক চিত্র তুলে ধরতেন। তাই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা যারা চায় না, মহান একুশে ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যাদের বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই তাদের কাছে অভিজিৎ শত্রু হিসেবে চিহিৃত হয়েছিলেন। তাই অভিজিৎকে জীবন দিয়ে এর মূল্য দিতে হলো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ড. কাবেরী গায়েন বলেছেন, বারবার এমন ঘটতে পারছে কিভাবে? এই ফেব্রুয়ারিতেই? দেশ স্বাধীন হয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয় মাস যুদ্ধ করে, কিন্তু পাকিস্তান-মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি একটা বড় অংশের মানুষ। আর সেই মনস্তত্ত্বের বিপরীতে যারা নিজেদের প্রগতিশীল বলেন, তাঁরাও ক্রমেই এই মৃত্যু উপত্যকাকে মেনে নিচ্ছেন। প্রশ্ন হলো, এই দেশ কি কেবল কিছু উগ্র ধর্মান্ধের, নাকি মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারীদেরও?

খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ইউনুস, ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার, গোপীবাগের সিক্স মার্ডার, ব্লগার আশরাফুল ইসলাম, চ্যানেল আইয়ের ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক নুরুল ইসলাম ফারুকী, উত্তরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাশিদুল এবং ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকান্ডের ধরণ একই। ব্লগার রাকিব মামুনের ওপর হামলার ঘটনাও একই কায়দায়। এসব ঘটনায় ক্ষুদ্রাস্ত্রের পরিবর্তে খুনিরা ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করেছে।

ভিন্ন সময়ে ভিন্ন স্থানে এসব ব্যক্তি হামলার শিকার হলেও তাদের সবার ওপর হামলার ধরণ ছিল একই। মূলত গলা থেকে দেহের ঊর্ধ্বভাগ অর্থাৎ মাথাই ছিল আক্রমণকারীদের লক্ষ্যবস্তু। এসব হত্যাকান্ডে জেএমবি ও উগ্রপন্থি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সম্পৃক্ততার বিষয় বার উঠে আসছে। অধিকাংশ হত্যাকান্ড হয়েছে হয় ডিসেম্বর অথবা ফেব্রুয়ারি মাসে।

কবি চঞ্চল আশরাফ বলেছেন, অভিজিৎ জাগাতে এসেছিল, কিন্তু আমাদের ঘুম ভাঙেনি। আমরা জেগে উঠলে তো তাকে এভাবে মরতে হতো না। অভিজিৎরা আসে নিজের প্রাণ দিয়ে আমাদেরকে জাগিয়ে তোলার জন্য। তাদের হারিয়ে ফেলার পর আমাদের ঘুম ভাঙে; আমরা একটু নড়াচরা করি। কিছুক্ষনের মধ্যে ফের ঘুমিয়ে পড়ি।

পরিশেষে বলতে চাই, আর কোনভাবেই অস্বীকার করার উপায় নাই যে জঙ্গীবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। থেমে নেই জঙ্গীদের অর্থায়ন। তাই এ গোষ্ঠীকে খুব দ্রুতই দমাতে না পারলে আরো বড় ধরনের ক্ষতি সাধন হবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞজনরা। অভিজিৎ রায়ের হত্যা; এটি শুধুই হত্যা নয়, এটি একটি চেতনার বিরুদ্ধে উগ্র ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠীর যুদ্ধের মাঠে প্রবেশের হুমকি। বাংলাদেশের মাটিতে ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদের ঘাঁটি গড়ে উঠুক এটা আমরা চাই না। আমরা চাই না আইএস, বোকো হারাম, আল-শাবাব, আল-নুসরার মতো জঙ্গিদের আস্থানা বাংলার মাটিতে। বাংলার দামাল ছেলেরা বিভিন্ন দুর্যোগকালে এ দেশের পাশে ছিল আগামীতেও থাকবে। অভিজিতের হত্যার পর এখন আবার তাদের বিবেক জাগ্রত হবে বলে আমার বিশ্বাস।

লেখক : সাংবাদিক, শিল্পসমালোচক ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিল।
ইমেইল: azad_chaty@yahoo.com