বিবৃতি ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

সোমবার, মার্চ ২, ২০১৫

:: প্রভাষ আমিন ::

Provash ameenতথ্য অধিদপ্তরের পাঠানো একটি তথ্যবিবরণী দেখে একটু অবাক হয়েছি। ২৫ ফেব্রুয়ারি পাঠানো তথ্যবিবরণীর শিরোনাম ‘সম্পাদক পরিষদের নামে প্রকাশিত বিবৃতির বিষয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য’। দীর্ঘ তথ্যবিবরণীতে গণমাধ্যমের জন্য অনেক মায়াকান্না আছে। আছে বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য কী কী করেছে তার বিস্তারিত বিবরণ। পড়ে ভালো লাগছে। অনেককিছু আমার জানাও ছিল না। এই তথ্যবিবরণীর কোনো বক্তব্যের ব্যাপারেই আমার কোনো আপত্তি নেই।

ধরে নিচ্ছি, তথ্যবিবরণীর সব তথ্যই সঠিক। কিন্তু এই তথ্যবিবরণীর ব্যাপারে আমার প্রথম আপত্তি শিরোনামে, ‘সম্পাদক পরিষদের নামে’ হবে কেন, এটি তো সম্পাদক পরিষদেরই বিবৃতি। সভাপতির অনুপস্থিতিতে সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ আনাম স্বাক্ষরিত বিবৃতি। আপনি সম্পাদক পরিষদের বিবৃতির প্রতিবাদ করতে পারেন, কিন্তু বিবৃতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে পরিষদকে হেয় করতে পারেন না। যদি সন্দেহই হয় যে এটি সম্পাদক পরিষদের কিনা, তাহলে আর এটার ব্যাপারে এত লম্বা জবাব দিতে হবে কেন? তথ্যবিবরণীতে সম্পাদক পরিষদের বিবৃতিকে ‘বাস্তবতা বিবর্জিত, সত্যের অপলাপ, পক্ষপাতমূলক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও দুর্ভাগ্যজনক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। হা হা হা।

অভিধানে মনে হয় আর কোনো বিশেষণ বাকি ছিল না। তথ্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, ‘বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম একে অপরের পরিপুরক।’ এটা সরকারের বিশ্বাস করার দরকার নেই। এটা সবাই জানে। তথ্যবিবরণীতে আরো দাবি করা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের গণমাধ্যম স্মরণকালের মধ্যে এখন সবচাইতে স্বাধীনভাবে কাজ করছে।’ এই বক্তব্যের ব্যাপারে আমার প্রবল আপত্তি আছে। তাহলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মাপার ব্যারোমিটারটা কি? ‘সবচাইতে স্বাধীন’ মানে কার তুলনায়? যদি বলা হতো, ওয়ান-ইলাভেনের তুলনায়, তাহলে মানতাম। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে ওয়ান-ইলাভেনের সময় নরকে থাকলে, এখন আমরা আছি স্বর্গে। কিন্তু ‘স্মরণকালের মধ্যে সবচাইতে ভালো’ বললে অনেক কথা এসে যাবে।

তথ্যবিবরণীতে গণমাধ্যমের জন্য সরকার ভালো কী কী করেছে, তার বিস্তারিত বিবরণ আছে। কিন্তু খারাপ কী কী করেছে তার উল্লেখ নেই। তাই আমি এই তথ্যবিবরণীটিকে সত্য ধরে নিলেও সম্পুর্ন ভাবতে পারছি না। যদি লেখা থাকতো চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি বন্ধের কথা, যদি লেখা থাকতো আমার দেশ বন্ধের কথা, যদি লেখা থাকতো মাহমুদুর রহমান, আলহাজ্ব মোসাদ্দেক আলী ফালু, আব্দুস সালামের গ্রেপ্তারের কথা, যদি থাকতো ইনকিলাব অফিস থেকে বার্তা সম্পাদককে গ্রেপ্তারের কথা তাহলেই আমরা বুঝতাম সবচাইতে স্বাধীনতার মাপকাঠিটা কি? এটা ঠিক আমার দেশ যা করেছে, তা কোনোভাবেই সাংবাদিকতার মধ্যে পড়ে না। মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে আমার দেশ দেশে প্রায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়েছিল।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষের লোক হলেও আগেই আমি মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছিলাম। কারণ মাহমুদুর রহমান সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ধারণাটিই পাল্টে দিয়েছিলেন প্রায়। পরে যখন মাহমুদুর রহমানের মুক্তি চেয়ে ১৬ সম্পাদক বিবৃতি দেন, তখনও আমি এর প্রতিবাদ করেছি। ইনকিলাবও যা করেছে, তাতে তার সম্পাদককেও গ্রেপ্তার করা যেতো। তা না করে অফিস থেকে বার্তা সম্পাদককে গ্রেপ্তার করে সরকার বাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমি জানি মোসাদ্দেক আলী ফালুকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে তার গুলশান কার্যালয়ের সামনে থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এনটিভির চেয়ারম্যান হিসেবে নয়।

কিন্তু ইটিভি চেয়ারম্যান আব্দুস সালামকে পর্নোগ্রাফি আইনে গ্রেপ্তার করা হলেও তার আসল অপরাধ লন্ডম থেকে তারেক রহমানের বক্তৃতা সরাসরি সম্প্রচার। মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছেন ঠিক আছে, কিন্তু আমার দেশ বন্ধ রেখে কেন শত শত সাংবাদিকের রুটি রুজির ওপর আঘাত হানছে সরকার? কেন এখনও চালু করা হচ্ছে না দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি? এই সব প্রশ্নের জবাব না পেলে ‘স্মরণকালের সবচাইতে স্বাধীন’ এই দাবি ধোপে টেকে না।

স্বাধীনতার প্রমাণ দিতে গিয়ে তথ্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, এখন বাংলাদেশে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক মিলিয়ে ১২০০ পত্রিকা প্রকাশিত হয়, আগের সরকারের আমলে নাকি এই সংখ্যা ছিল ৬০০। এছাড়া ২৬টি বেসরকারি টেলিভিশন, ১১টি এফএম রেডিও, ১৪টি কমিউনিটি রেডিও সম্প্রচারের উদারহরণ টানা হয়েছে। খুব ভালো খবর। এত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সাংবাদিকদের সুবিধা হয়েছে। কিন্তু গণমাধ্যমের সংখ্যা দিয়ে স্বাধীনতা বিচার করা যায় না। সত্যিকারের একটা ইটিভি থাকলেই বোঝা যায় গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন।

আমি আসলে তথ্য অধিদপ্তরের তথ্যবিবরণী নিয়ে লিখতে বসিনি, আমার লেখার ইচ্ছা সম্পাদক পরিষদের বিবৃতি নিয়ে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সম্পাদক পরিষদের সভার পর পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ আনাম স্বাক্ষরিত বিবৃতি নিয়েই আমার যত আশা-হতাশা। আশা এই কারণে যে এই প্রথম সম্পাদক পরিষদকে অনেক সাহসী মনে হচ্ছে, যেমনটি আমি বরাবর চেয়ে এসেছি। এই প্রথম তারা নিজেদের গন্ডি বড় করে ভেবেছে। হতাশা এই কারণে যে এই বিবৃতিটি হতে পারে বাংলাদেশের আর সব সংগঠনের মত সম্পাদক পরিষদেরও বিভক্তির সূত্রপাত। অতি গুরুত্বপূর্ণ এই বিবৃতিতে বলা হয়েছে ‘আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্র ও জাতীয় প্রচার মাধ্যমের পক্ষে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। একদিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে দায়িত্বরত সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, অন্যদিকে সংবাদপত্র ও প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা চলছে।

সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার মাধ্যমের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। সরকার ও প্রশাসন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদ সগ্রহ ও পরিবেশনায় বাধার সৃষ্টি করছে। কখনো কখনো কোনো কোনো পত্রিকা বা টেলিভিশনকে অন্যায়ভাবে বিশেষ দল বা গোষ্ঠির মুখপাত্র হিসেবে তকমা দেয়া হচ্ছে।’
বিবৃতির এ পর্যন্ত পড়ার পর যে কারো মনে হতে পারে, দেশে ভয়াবহ কিছু ঘটে গেছে। হঠাৎ করে বাইরে থেকে কেউ আসলে ধারণা করবেন, এই দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে কিচ্ছু নেই। কিন্তু বিবৃতির এরপরের লাইনটি পড়লেই সব গোমর ফাঁস হয়ে যাবে ‘বিশেষত সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ছবি ও ক্যাপশন ছাপানোকে কেন্দ্র করে সংসদে দেয়া প্রতিক্রিয়া প্রচার মাধ্যমের প্রতি বৈরী মনোভাবেরই প্রকাশ, যা কোনো সরকারের কাছে কাম্য নয়।

সংসদে সম্পাদক ও প্রকাশকদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, যা তাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকিস্বরূপ।’ এত যে শঙ্কা আর অভিযোগ, নিরপেক্ষভাবে কাজ করা কঠিন, প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা খর্বের চেষ্টা, প্রচার মাধ্যমের অধিকারে হস্তক্ষেপ, সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনায় বাধা- তার একমাত্র উদাহরণ ডেইলি স্টার নিয়ে সংসদে আলোচনা। বিবৃতির পরের অংশে আরো কিছু বিষয় আছে, তবে তার আগে ডেইলি স্টার বিতর্ক নিয়ে একটু আলোচনা করতে চাই। গত ১১ জানুয়ারি ডেইলি স্টারের তৃতীয় পাতায় নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের একটি পোস্টারের ছবি ছাপা হয়েছে চার কলামজুড়ে, প্রায় পোস্টার সাইজে।

যদিও ছবিটির শিরোনাম ‘ফ্যানাটিক্স রেইজ দেয়ার আগলি হেডস এগেইন’ এবং ছবিটির ক্যাপশনেও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিতরতার সুযোগে জঙ্গীরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তবুও একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের পোস্টারের ছবি এমনভাবে ছাপা যায় কিনা, ছাপা উচিত কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক। বিতর্কের কারণ হলো ছবিটিতে পোস্টারের লেখা এবং আহ্বান স্পষ্টই পড়া যাচ্ছিল। তাতে সেনাবাহিনীকে সরকারের বিরুদ্ধে উসকানি দেয়া হয়েছে। ডেইলি স্টার যতই বলুক তাদের ইনটেনশন জঙ্গীদের পুনরুত্থার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, তবুও বাংলা মোটরের মোড়ের একটি পোস্টারের আহ্বান সারা দেশ এবং অনলাইনে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার দায় তো ডেইলি স্টারকে নিতেই হবে।

ডেইলি স্টারের এই ছপি ছাপা এবং শিরোনাম দিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা দেখে আমার একটি কথা মনে পড়ে গেল। সম্ভবত ৯১ সালে, পুরানা পল্টনে ফুটপাতে স্টলে দাড়িয়ে পত্রিকা দেখছিলাম। হঠাৎ একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রচ্ছদে চোখ আটকে গেল। প্রচ্ছদজুড়ে এক বিদেশী নায়িকার আধা নগ্ন ছবি। আর প্রচ্ছদ শিরোনাম হলো ‘দৈনিক পত্রিকায় এরকম নগ্ন ছবি কেন?’ পড়ে ঘটনা জানা গেল, কোনো একটি দৈনিক পত্রিকার ভেতরের সিনেমা পাতায় এই ছবিটি ছাপা হয়েছিল। সাপ্তাহিক পত্রিকাটি সেই ছবিটিই তাদের প্রচ্ছদে নিয়ে এসেছে। আর প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে পত্রিকায় নগ্ন ছবি ছাপা সমাজের জন্য কতটা ক্ষতিকর তার বিস্তারিত উপদেশ। সাপ্তাহিক পত্রিকাটি অনেক দিন আমার সংগ্রহে ছিল।

ডেইলি স্টারে হিযবুত তাহরীরের পোস্টারের ছবি প্রায় পোস্টার আকারে ছাপানোটাও তেমনই। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামও মন্তব্য প্রতিবেদনে বারবার বলার চেষ্টা করেছেন, তাদের ইনটেনশন ছিল মানুষকে জানানো, জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন করা। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই, মাহফুজ ভাইয়ের দাবি সত্যি হলেও এটা গুড ইনটেনশনে ব্যাড জার্নালিজম। মাহফুজ ভাই আমার অনেক শ্রদ্ধেয়। আমি যেহেতু ক্লাশরুমে সাংবাদিকতা শিখিনি, তাই অগ্রজ সাংবাদিকরাই আমার শিক্ষক। আর এই শিক্ষকদের মধ্যে মাহফুজ ভাইয়ের নাম থাকবে শুরুর দিকে। তাঁর পিতা আবুল মনসুর আহমেদের লেখা এখনও পাঠ করি দারুণ মুগ্ধতায়। ময়লা পাঞ্জাবি, ছেড়া চটি, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ- সাংবাদিকদের দীনহীন চেহারার বিপরীতে মাহফুজ আনামরা এনেছেন আভিজাত্যের ছোঁয়া।

বাংলা-ইংরেজীতে সমান চোস্ত, মাহফুজ আনামের কথা শুনলে মুগ্ধ হয়ে যাই, ক্ষুরধার লেখনীতে প্রাণিত হই। বাবার মত তাঁর মেয়ে তাহমিমা আনামও সমৃদ্ধ করছেন সাহিত্য। অবশ্য তিনি লিখছেন ইংরেজীতে। আবুল মনসুর আহমেদের নাতনির লেখা আমাদের পড়তে হচ্ছে অন্যের অনুবাদে। সবকিছুর পরও আমি বিনয়ের সাথে বলতে চাই, হিযবুত তাহরীরের পোস্টার ছাপার পক্ষের যুক্তিতে আমি সন্তুষ্ট নই। মাহফুজ ভাইদের কাছ থেকে যা শিখেছি, তাতে আমি এটাকে ব্যাড জার্নালিজমই বলবো। উদাহরণ আছে আরো। ওয়ান ইলাভেনের সময় একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট্ট একটি ঘটনা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ হয়। সেই তুমুল বিস্ফোরনন্মুখ সময়ে শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে সেনাবাহিনীর একটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। গাড়িতে থাকা সেনা কর্মকর্তা নেমে যাওয়ার সময় কেউ একজন তাকে লাথি মারে। ডেইলি স্টারে ছাপা হয়েছিল সেই ছবিটি। পোশাকধারী একজন সেনা কর্মকর্তাকে একজন ছাত্র লাথি মারছে, পেছনে সেনাবাহিনীর গাড়ি দাউ দাউ করে জ্বলছে- এমন ছবি পেয়ে যাওয়া ক্যামেরাম্যানের জন্য ভাগ্য।

অসাধারন ছবিটি ছাপার লোভ হবে যে কারো। কিন্তু ঐরকম আগুন সময়ে এইরকম একটি ছবি ছেপে একটি বাহিনীকে হেয় করা কখনোই ভালো সাংবাদিকতা হতে পারে না। তাতে আগুনে ঘৃতাহুতি হয়। ডেইলি স্টারের সেই ‘সাহসী’ সাংবাদিকতার কারণে আজিজ সুপার মার্কেট ভবনের কত লোককে যে নির্মম সেনা নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ডেইলি স্টার তো তাদের বাঁচাতে পারেনি। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, অসাধারণ সেই ছবিটি ডেইলি স্টারের কারো তোলা ছিল না। আরেকটি উদাহরন দেই। বছর ১০/১২ আগে একবার বিডিআর-বিএসএফ সংঘর্ষ হয়। তখন ডেইলি স্টারে একটি ছবি ছাপা হয়েছিল। যুদ্ধে নিহত এক বিএসএফ সদস্যের লাশ ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে বাঁশ আর দরিতে ঝুলিয়ে আনছিল গ্রামবাসী। সেই ছবি ছাপার পর নৈতিকভাবে সেই যুদ্ধে আমরা হেরে গিয়েছিলাম। কারণ প্রতিপক্ষের সৈনিকের লাশের অবমাননা করাও যুদ্ধাপরাধ।

যে তিনটি ছবির কথা বলছি, তার তিনটিই সত্যি। বিএসএফ সদস্যের লাশের ছবি আর সেনাবাহিনীর গাড়িতে আগুন দেয়ার ছবি দুটি তো ছবি হিসেবে অসাধারণ, এখনও আমার চোখে লেগে আছে। যে কারো লোভ হবে ছাপার জন্য। লোভ সংবরন করতে পারা জীবনের অন্য সব ক্ষেত্রে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আরো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই তিনটি ছবি ছাপার ক্ষেত্রেই আইনগত কোনো বাধা নেই। বড় জোর নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরীরের পোস্টারের ছবি ছাপানোর ব্যাপারে আইনগত প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু বাকি দুটি ছবি ছাপার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।

কিন্তু সাংবাদিকরা সবসময় আইন দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না, বিবেক দিয়ে নেয়। সত্যি বলছি, বিবেকের কাছে দায়বদ্ধতার শিক্ষাটি আমি মাহফুজ ভাইয়ের কাছেই পেয়েছি। এই তিনটি ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠতার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ডেইলি স্টার মিথ্যা কিছু ছাপেনি। কিন্তু যা সত্য তা হুবহু ছেপে দেয়াই ভালো সাংবাদিকতা নয়। তাহলে আর সম্পাদকীয় পদ থাকতো না। মাহফুজ ভাইদের কাছে যা শিখেছি বস্তুনিষ্ঠতার সাথে দায়িত্বশীলতার পরিমিত মিশেলই ভালো সাংবাদিকতা। সব সত্য সংবাদ নয়, সব সংবাদ প্রকাশযোগ্য নয়। ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ বলে একটি টার্ম ইদানিং নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু সেলফ সেন্সরশিপ নেতিবাচক তো নয়ই, খুবই দরকারি জিনিস।

এই তিনটি ঘটনার ক্ষেত্রেই ডেইলি স্টার বার্তা কক্ষ যদি লোভ সংবরণ করতে পারতেন, যদি সেলফ সেন্সরশিপ প্রয়োগ করতে পারতেন তাহলে ব্যাড জার্নালিজমের এমন তিনটি উদাহরণ তৈরি হতো না। তবে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে সংসদে দাড়িয়ে ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছেন, তার তীব্র প্রতিবাদ জানাই আমি। তবে এ ক্ষেত্রে একটা কথা আমার মনে হয়, আমার যদি প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করার অধিকার থাকে, তবে তাঁরও তো আমার সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে। আমারটা যেমন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তাঁরটাও তো মতপ্রকাশের স্বাধীনতাই। প্রধানমন্ত্রী প্রায়শই টেলিভিশন টক শো’কে কটাক্ষ করে নানা কথা বলেন। তাঁর কথাকে আমার কখনো গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ মনে হয় না। বরং মনে হয়, তিনি নিয়মিত টক শো দেখছেন এবং তাঁর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন।

এটা তো ভালো। আমরা তো চাই যাদের উদ্দেশ্যে টক শো, তারা দেখুন, ব্যবস্থা নিন। আমরা সবসময় রাজনীতিবিদদের গালি দিয়ে যাবো, আর ওনারা চুপ করে মুখ বুজে সইবেন, এতটা আশা করা তো ঠিক নয়। তারাও তো মানুষ, সত্য হোক, মিথ্যা হোক তারা তো আত্মপক্ষ সমর্থন করতে চাইবেনই। তারা যতক্ষণ না পর্যন্ত ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে বেআইনী কোনো ব্যবস্থা না নিচ্ছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না টক শো বন্ধ করে দিচ্ছেন, ততক্ষণ তো তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতিও আমাদের সম্মান থাকা উচিত। সম্পাদক পরিষদের বিবৃতিতে উদাহরন হিসেবে নিউ এজ অফিসে তল্লাশীর নামে পুলিশী হয়রানির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু নিউ এজ অফিসে পুলিশী তল্লাশীর ঘটনা অনেক পুরোনো। কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত ডেইলি স্টারের ব্যাপারে সংসদে আলোচনা হয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তা সম্পাদক পরিষদকে উদ্বিগ্ন করেনি।

বিবৃতির দ্বিতীয় অংশ আরো আকর্ষনীয়। সম্পাদক পরিষদ মূলত প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদকদের সংগঠন হলেও এই প্রথম তারা তাদের আওতা বাড়িয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নানা প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছে। একটু দেখে নিই ‘টিভি টক শোকে নানাভাবে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছু টক শো বন্ধ করা হয়েছে। টক শোর অতিথি তালিকা নির্দিষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। লাইভ অনুষ্ঠান প্রচার নিয়ে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। কী প্রচার হবে আর হবে না তা নিয়ে টেলিফোন নির্দেশনাও স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর হস্তক্ষেপ বলে আমরা মনে করি।’ বিবৃতির এই অংশের সাথে আমি বিনয়ের সাথে দ্বিমত পোষণ করছি। বিবৃতিতে ‘কিছু টক শো’ বন্ধ করার অভিযোগ করা হলেও একটি টক শো’তে মাহফুজ আনাম একটি টক শো’র বন্ধের উদাহরন দিতে পেরেছেন। তবে ‘ফ্রন্টলাইন’ বাংলাভিশনের কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে বন্ধ হয়েছে বলে জানা গেছে।

আর ‘ফ্রন্টলাইন’এর উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরী কিন্তু প্রতিদিন মধ্যরাতে চ্যানেল আই’তে টক শো করেন। টক শো’তে নানাভাবে হস্তক্ষেপ, অতিথি তালিকা নির্দিষ্ট করে দেয়া, লাইভ অনুষ্ঠান প্রচার নিয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগও তথ্যভিত্তিক নয়। আমি নিজে মাঝে মধ্যে একটি টক শো উপস্থাপনা করি। আমি নিশ্চিত কওে বলছি, আমাকে কেউ কখনো কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। আমার অতিথি আমি নিজে ঠিক করি এবং আমাদের টক শো’টি বরাবরই লাইভ হয়। ইদানিং বিএনপি নেতাদের বেশিরভাগ আত্মগোপনে আছেন বলে, বিএনপিপন্থি পেশাজীবীদের আানতে হয়। আর এই অভিযোগ যে ঠিক নয়, তা বোঝা যাবে মাহমুদুর রহমান মান্নার সাথে সাদেক হোসেন খোকার টেলিফোন কনভার্সেশন শুনলেই।

মান্না সেখানে দাবি করেছেন, ‘টক শোগুলো আামরা ডমিনেট করি।’ তিনি টক শো’র জন্য বিএনপিপন্থি তরুণদের তৈরি করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন। মান্নার দাবি যদি সত্যি হয়, তাহলে সম্পাদক পরিষদের বিবৃতি ঠিক নয়। বিএনপিপন্থি বা সরকারের সমালোচক বুদ্ধিজীবীরা প্রতিদিনই কোনো না কোনো টিভিতে লাইভ অনুষ্ঠানে কথা বলছেন। এর আগে ফাঁস হওয়া এক টেলিফোন কথোপকথনে শমসের মুবিন চৌধুরী বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বলেছিলেন, মাহফুজউল্লাহকে দিয়ে বলিয়ে দেবো।

বিবৃতিতে টেলিফোন নির্দেশনার কথা বলা হয়েছে। এটা ঠিক টক শো শেষ হলেই প্রতিদিন কারো না কারো ফোন আসে। কিন্তু সেটা নির্দেশনা নয়। সরকারের বিরুদ্ধে বেশি বললে, সরকারি দলের লোকজন ফোন করে; বিএনপির বিরুদ্ধে বেশি বললে, বিএনপির লোকজন ফোন করে। আমি কারো বিরুদ্ধে বললে, তিনি আমাকে ফোনও করতে পারবেন না? ফোন করলেই আমি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গেল বলে রব তুলবো, এটা বোধহয় ঠিক নয়।

সম্পাদক পরিষদ নিয়ে আমি অনেক লিখেছি। মাহমুদুর রহমানের মুক্তি চেয়ে দেয়া ১৬ সম্পাদকের বিবৃতির প্রতিবাদ জানিয়ে তখনই, সম্পাদক পরিষদ ধরনের একটি সংগঠন গঠনের আকাঙ্খার কথা লিখেছিলাম। গঠনের পর তাদের কাছে প্রত্যাশা নিয়ে লিখেছিলাম। আমার আকাঙ্খা ছিল, সম্পাদক পরিষদ হবে জাতির সত্যিকারের বিবেক। আমি তাদের কাছে, সাংবাদিকদের অনুসরনযোগ্য একটি নীতিমালা চেয়েছিলাম। সরকার যখন সম্প্রচার নীতিমালা করলো, তখন একটি সেমিনার করে সম্পাদক পরিষদ একটি নীতিমালা প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু আজও তা পাইনি। সবচেয়ে হতাশ হয়েছি, গতবছর পিয়াস করিমের মৃত্যুর পর একটি উটকো সংগঠন ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে দেশের সকল শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণার পর।

সম্পাদক পরিষদ তাদের বিবৃতিতে, সেই ৯ জনের মধ্যে কেবল তাদের পরিষদের দুই সদস্যসহ তিন সম্পাদককে অবাঞ্ছিত করায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। যেন বাকি ৬ জনকে অবাঞ্ছিত করা ঠিক আছে। তখন আমি ‘স্বার্থপর সম্পাদক পরিষদ’ শিরোনামে একটি লেখাও লিখেছিলাম। কিন্তু আজ যখন সম্পাদক পরিষদ সকল স্বার্থপরতা ঝেরে ফেলে গণমাধ্যমের সামগ্রিক স্বাধীনতা, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নানা দিক নিয়ে বিবৃতি দিলো, তখন কোথায় আমি খুশি হবো, উল্টো বিব্রত হচ্ছি। আগেরবারের স্বার্থপরতা ছিল নিছক সংগঠনগত, এবার তো আরো বেশি, একেবারেই একটি প্রতিষ্ঠানগত। ডেইলি স্টারকে বাঁচাতেই টেনে আনা হয়েছে নিউ এজ, আনা হয়েছে টক শো’র নানা প্রসঙ্গ। এ নিছক দল ভারি করার চেষ্টা।

সভাপতির অনুপস্থিতিতে, হুট করে সময় বদলে বেশিরভাগ সদস্যের অনুপস্থিতি নিশ্চিত করে, ২৪ সদস্যের মধ্যে মাত্র ১০ জনের কোরামে এমন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি দেয়া হয়েছে। যার সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন দেশের বাইরে থাকা সভাপতি গোলাম সারওয়ার, দ্বিমত পোষণ করেছেন বৈঠকে না থাকা শ্যামল দত্ত। আমি এখনও মনে করি সম্পাদক পরিষদের সবচেয়ে প্রভাবশালী, জাতির সত্যিকারের বিবেক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। যে বিবৃতি হতে পারতো তাদের সত্যিকারের বিবেক হয়ে ওঠার পথে যাত্রা শুরু, তাতেই লুকিয়ে আছে বিভক্তির ভ্রুণ। এ বড় হতাশার।

সরকারের তথ্য বিবরণীর দাবি অনুযায়ী, দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নহর বইছে, এটা আমি বিশ্বাস করি না। এখনও অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই এগিয়ে যেতে হবে। কথায় কথায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গেল বলে রব তুললে নিজেদের দুর্বলতাই জাহির করা হয়। কেউ ফোন করলে, তা মোকাবেলা করতে হবে, তাকে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে। সরকার হোক, সরকারি দল হোক, বিরোধী দল হোক, সন্ত্রাসী হোক- কেউ যখন বুঝে যাবে আপনাকে ফোন করেই কাবু করা সম্ভব; তখন তারা বারবার ফোন করবে। সরকারের কারো ফোনের কারণে কোনো পত্রিকা কোনো নিউজ ছাপতে পারেনি, এমন একটি উদাহরণও কিন্তু বিবৃতিতে নেই। বরং বারবার আদালতের বিরুদ্ধে নিউজ করে বারবার আদালতে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে।

নিউজ যদি সত্যি হয়, তাহলে আদালতে গিয়ে বারবার মাফ চাইতে হবে কেন। ডিফেন্ড করা যাবে না, বারবার এমন নিউজ ছাপানো গণমাধ্যমের কোন স্বাধীনতা? সরকারের বিরুদ্ধে ইচ্ছামত লেখা যায়, বলা যায়; একে কি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলে না। সম্প্রচার নীতিমালা প্রত্যাখ্যান করে, এমনকি তথ্যমন্ত্রীর মুখের ওপরও বলা যায়, মানি না; একে কি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলে না। অনেকে মূল সমস্যা বলেন, সেলফ সেন্সরশিপকে। কিন্তু সেলফ সেন্সরশিপ তো দলকানা ব্যক্তি সাংবাদিকের সমস্যা, সরকারের নয়।

যারা হৃদয়ে বিএনপি; তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকলেও বিএনপি, না থাকলেও বিএনপি। যারা হৃদয়ে আওয়ামী লীগ; তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকলেও আওয়ামী লীগের পক্ষে বলবে, না থাকলেও। দলের কাছে বিবেক বন্ধক রাখা এনসব সাংবাদিকদের তথাকথিত সেলফ সেন্সরশিপ দিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মাপা ঠিক হবে না। গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা আমরাও চাই। তবে ‘সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্র ও জাতীয় প্রচার মাধ্যমের পক্ষে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে’ সম্পাদক পরিষদের আচমকা এমন দাবির সাথে আমি একমত হতে পারলাম না। দুঃখিত।

লেখক: সাংবাদিক
সৌজন্যে: আমাদেরসময়ডটকম