হোসাইন জাকিরের মৃত্যু এবং কিছু স্মৃতি

মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৫

:: সাইফ বরকতুল্লাহ ::

Hossain Zakirএক.
২১শে ফেব্রুয়ারি ২০১৫। বিকেল ৬টা। আমি তখন অমর একুশে বইমেলায়।
হঠাৎ আজাদ ভাইয়ের (আবুল কালাম আজাদ, মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক আজকের পত্রিকা) ফোন।
হ্যালো সাইফ ভাই- খবর শুনছেন ? আপনি কোথায় ?
আমি বললাম, না। কীসের খবর ?
জাকির ভাই আর নেই…।

দুই.
জাকির ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় বেশি দিনের নয়। আগেই থেকেই চিনতাম কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় মাত্র তিন মাসের। আমি তখন দৈনিক আজকের পত্রিকায় কাজ করছি। এ অল্প ক’দিনেই তার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। জাকির ভাই দেখতে দীর্ঘ ও সুঠাম দেহের মানুষ। সবসময় হাসিভরা মুখ আর পানের মৌ মৌ গন্ধ ছাড়া তাকে কেউ কখনও দেখেছেন কিনা আমি বলতে পারব না। কথায় কথায় চুটকি বলা ছিল তার প্রাণবন্ত স্বভাব।

তিন.
প্রতিদিনই অফিসে চায়ের আড্ডা হতো। সঙ্গি ছিলাম আমি, দীপঙ্কর দা (দীপঙ্কর গৌতম), আবুল কালাম আজাদ ভাই, এহসান ইসলাম, মোসাদ্দেক বশির। আর আমাদের সাথে মাঝে মাঝে এসে যোগ দিত মৃদুল, সাবিয়া, রিয়া। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে কথায় কথায় পঙক্তি শুনিয়ে দিতেন যে কোনো সময়। কখনো তার চেয়ার থেকে উঠে এসে, মোলায়েম করে ঘাড়ে হাত বুলিয়ে বলতেন নানান কথা। এসবের মধ্যে পেশা বিষয়ক কাজের কথাও থাকতো। সব সময় দেখতাম তিনি রেজিস্ট্রার খাতায় কাজের কথা টুকে রাখতেন।

চার.
নতুনদের জাকির ভাই গুরুত্ব দিতেন। নতুন জয়েন্ট করা রিপোর্টারদের কাজের প্রতি তার উৎসাহ ছিল অসম্ভব ভালো একটা কাজ। তিনি বলতেন, সিনিয়রদের কাজ হলো, তাদের সে প্রতিভাকে বের করে আনা। একটা ক্রিয়েটিভ ও প্রফেশনাল শেইভ দেয়া।

পাঁচ.
জাকির ভাই অসুস্থ হওয়ার পর প্রায়ই ফোন করে খোঁজ নিতাম। একদিন বঙ্গববন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (পিজি)দেখতে গেলাম। আমার সাথে ছিল আজাদ ভাই। মেডিকেলে ঢুকার সাথে আমাদের সাথে যোগ দিল আলতাফ ভাইসহ আরো কয়েক জন সাংবাদিক। হাসপাতালের বেডে তাকে দেখলাম,তখনও তিনি প্রাণবন্ত। সদ্যা হাস্যজ্বল, প্রাণোচ্ছল, সরল প্রকৃতির এমন মানুষ হারিয়ে যাবে বিশ্বাসই হচ্ছিল না।

ছয়.
জাকির ভাইয়ের মৃত্যুতে তরুণ সাংবাদিক নুরুজ্জামান মামুন তার ফেসবুক স্টেটাসে লিখেছেন,গত ঈদের পর দিন সহকর্মী আবদুল্লা মুয়াজ ভাই ও আমি তার বাসায় গিয়েছিলাম দেখার জন্য। বিছানায় শুয়ে বলছিলেন তার কিছুই হবে না। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি অফিস করবেন। এসময় ৭ম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আকাশ আমাদের আপ্যায়ন করেছিল। শিশু ছেলেটির আপ্যায়নে ভিষন মুগ্ধ হয়েছিলাম। মহাকাশ বিজ্ঞানি বানাবেন বলেই আদার করে জাকির ভাই ছেলের নাম রেখেছিলেন আকাশ। আজ রাতে ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটি প্রাঙ্গনে আকাশের মুখখানি দেখে নিরবে কেঁদেছি। নির্ভিক সাংবাদিক জাকির ভাই স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন, কন্যা নিলয় (১৪), ছেলে আকাশ (১১) ও দেড় বছরের স্বপ্ন নামে এক শিশুছেলে ছাড়া আর কিছু রেখে গেছেন বলে মনে হয় না। আকাশ কি বিজ্ঞানি হতে পারবে, না থমকে যাবে তার বাবার স্বপ্ন। যে স্বপ্ন নিয়ে ছোট ছেলের নাম রেখে ছিলেন স্বপ্ন ওরই বা কি হবে।

প্রিয় জাকির ভাই, যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন। শান্তিতে থাকুন।

সাইফ বরকতুল্লাহ : সাংবাদিক ও গণমাধ্যম বিষয়ক লেখক