স্থির ছবির ফ্রেমে হোসাইন জাকির ভাই

শনিবার, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৫

:: সাখাওয়াত হোসেন ::

zakirএটা খুবই দুঃখজনক, যে সম্মান জানানোর কোনো ভাষাই আমার নেই। কতটা কথা, কতটা ভাষা, কতটা সহমর্মীতা আর কতটা সহযোগীতার পর সম্মানের জায়গাটি তৈরি হয়। কখন আমি ভাবতে শিখি তাকে সম্মান জানানো উচিত। যে খুব কাছে, যার সঙ্গে আপনার হৃদয়ের সম্পর্ক, যার হাত ধরে আপনি এক পথ থেকে অপর পথের সন্ধান পান, সেই কি তবে সম্মানের। নাকি সম্মান এক এক জায়গা যা সার্বজনীন। সবাই তা করে না সবারই তা করা উচিত। অপরিচিত হিসাবে আপনি আমার থেকে সম্মান পেতে পারেন। এটা আপনার অধিকার। কিন্ত সেই অধিকার কি সব সময় তৈরি থাকে। আমি আপনাকে জানি না। আপনি এলেন আর আমাদের ধমক দিয়ে বললেন, এটা কেন করলে না।

আমি আতংকে হয়তো ভ্রু কুচকে আপনার দিকে তাকাবো। আর যখন জানবো আপনি আমার বস, তখন হয়তো দাড়িয়ে আপনার প্রতি সম্মান জানানো। যুক্ত করে আরো বলবো, জি করে দিচ্ছি। কিন্ত হৃদয়ের জায়গাটিতে যে ক্ষত হয়েছে বা যে ভয় আপনাকে আপনার বসকে সম্মান জানাতে বাধ্য করেছে, সেটি কি স্থায়ী। না এটি ততক্ষণ পর্যন্ত স্থায়ী না যতক্ষণ না আপনার বস আপনাকে বোঝাতে সক্ষম হচ্ছে, এটি তার স্বভাব সুলভ আচরণ নয়। একের পর এক যখন এমন আচরন আপনি পেতে থাকবেন তখন বসের প্রতি আপনার সম্মান ভয়ে পরিণত হবে। ভয় আপনাকে বাধ্য করবে বসকে সম্মান জানাতে। কিন্ত সময়ের পর সময় যখন আপনার হাতে আসবে তখন আপনার বস আপনার থেকে সেই সম্মান পাওয়ার প্রত্যাশা করতেই পারবেন না।

স্বাভাবিকভাবে একটি উদাহরণ যদি এখানে টানা যায় তাহলে বিষয়টি আরো সহজ হয়ে উঠবে। আপনি আপনার কর্মস্থল পরিবর্তন করে অন্য পরিবেশে যোগ দিলেন। সেখানের পরিবেশ আপনাকে কতটা স্বাভাবিক করবে তা যতটা না আলোচনার বিষয় তার চেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় আপনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন পূর্বের কর্মস্থল থেকে তার শিক্ষা। পূর্বের কর্মস্থল যদি আতংকের হয় আর আপনাকে বাধ্য করে উর্ধ্বতনকে সম্মান দেখাতে হয় তাহলে ভুল করেও হয়তো সেই কর্মস্থলে পা বাড়াবেন না। এটাই স্বাভাবিক।

সম্মান নিয়ে যতটা না কথা বলতে চাচ্ছিলাম তার চেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছিলাম আমার প্রিয় হোসাইন জাকির ভাইয়ের করুণ অবস্থার চিত্র দেখে। অর্থ যে অনেক ক্ষেত্রে জীবনের চেয়ে নগণ্য হয় তা দৃশ্যমান। ভাইয়ের অবস্থা খুব ভাল নেই। কর্মস্থলের একজন সহকর্মী জানালেন, নিশ্বাসটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। ছবিটিও তেমনি প্রমাণ দিচ্ছে। আমি আলোকিত বাংলাদেশে যোগদানের আগে আরো একবার হোসাইন জাকির ভাইয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। মতিঝিলে যুগান্তরের অফিসের নীচে। সাথে ছিলেন যুগান্তরের সিনিয়র সাংবাদিক মনির হোসেন। কথা বলতে বলতে তিনজন দাঁড়ালাম একটি টং দোকানে।

এর আগে অবশ্য হোসাইন জাকির ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। খুব বেশি হলে সেখানে ৩০ মিনিট আলাপন। মনেই হয়নি তিনি আমাকে প্রথম দেখেছেন। কথা আর বাচন ভঙ্গি একটাই আমাকে আকৃষ্ট করেছিল ভুলতে পারিনি। আর যখন আলোকিত বাংলাদেশে যোগদানের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল তখন ভাইয়ের নাম বলতেই একবাক্যে চিনলাম। প্রথমে প্রবেশ করে দেখা হলো শ্রদ্ধেয় বড় ভাই ও দিকপাল শাহনেওয়াজ ভাইয়ের সঙ্গে। সাথে করে নিয়ে গেলেন হোসাইন জাকির ভাইয়ের কাছে। বললেন, আজ থেকে জয়েন করলো। হাসি যেন তার মুখের প্রতিটি বাক্যের আবরণ। কাজ কর। আজকেই একটি বড় নিউজ দাও, লীড করবো।

জানি হাতে এমন নিউজ নেই যে লীড হবে। কিন্ত তারই সেই বাক্যের বাচন ধরন ছিল, তুমিও একজন ভাল রিপোর্টার, তোমাকেও লীড দিতে হবে। কাজ করছিলাম। দীর্ঘ এক বছর ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা হলো। কেমন করে যেন সব ম্যানেজ করে দিতেন। বলে বিশ্বাস করাতে পারবো না, প্রতিদিন একজন রিপোর্টারের লেট নাইট করার কথা। ভাইয়ের এক বছরে একদিন লেট নাইট করেছিলাম। কিছুই বলতেন না। সাপ্তাহিক মিটিং-এ একটি কথা বলতেন, মালিক পক্ষ যতদিন রিপোর্টারদের জন্য স্বতন্ত্র গাড়ি না দিবে ততদিন এভাবেই চলবে। এখন গাড়ি পাওয়া গিয়েছে। কিন্ত ভাই নেই। রিপোর্ট লেখার ফাঁকে ফাঁকে শাহনেওয়াজ ভাইয়ের সঙ্গে জাকির ভাইয়ের রস তত্ত্ব এখনও ফাঁকা টেবিল নাড়া দেয়। ভাই চলে গেলেন, আলোকিত বাংলাদেশ থেকে। যোগদান করলেন প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা আজকের পত্রিকায়। মাঝে একদিন দেখা হলো ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটিতে। কাছে ডেকে বললেন, ভাল করে কাজ করো। আর সমস্যা হলে আমাকে জানাবে। কথা বেশি হয়নি। ফোনে একদিন কথা হয়। খোঁজ খবর নিলেন। সেখানেও উপদেশ দিলেন বড় ভাইয়ের মতোই।
একদিন খবর এলো ভাইয়ের ক্যান্সার হয়েছে। ঘটনার ফাঁকে একটি কথা বলতে ভুলেই গেছি। পান খেতেন প্রচুর। কথা, হাসি আর পান। জর্দার ছোবল হাসির ফাঁকে যেন ঘর বেধে বসেছিল ভাইয়ের মুখে। কাঁদতে ইচ্ছা করছে। মানুষ কেন মরে যায়। যে মানুষগুলো আদর্শ মানুষ তৈরির কারিগর তারা কি সত্যিই মরে যায়। আদর্শ মানুষ বলবো না, যারা মানুষকে মানুষের মর্যাদা দেয় তাদের কি নি:শেষ আছে। হতেই পারে না। হাসপাতালের বেডে ভাইকে দেখতে গিয়েছিলাম। তখনও অনেক সতেজ। কথা বলেন। দেখেই বললেন, সুমন এসেছো। বস। টেনে হাতটা নিলেন। নিয়ে কিছুক্ষণ ধরে রাখলেন। তার একদিন পর ভারত নিয়ে যাওয়া হবে ভাইকে। সবাই অপেক্ষায় থাকলেন ভারত থেকে ফিরে আবার হাস্য উজ্জল ভাইকে আমরা পাব। কিন্ত সেখান থেকেই ফিরে এলেন। তারপর আর দেখা হয়নি। তবে প্রায়ই ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের রেজাউল ভাই দেখা হলেই জিজ্ঞেস করতেন, জাকির ভাই কেমন আছেন?

বলতাম ভাল, কখনও বলতাম ভাল না। তবে ২১ ফেব্রুয়ারি অফিসের কাজের এক মুহুর্তে খবর পেলাম জাকির ভাই চলে গেছেন। না ফেরার দেশে। কাজ যতটুকু করতে পেরেছি ততটুকুতেই মনে হয়েছে, এখন থেকে পেছন থেকে আর কেউ বলবে না, সাখাওয়াত তোমার কাছে কি নিউজ আছে। টিএনটি লাইনে ফোন করে ডেকে বলবে না, তোমাদের কাছে কি আছে একটি লিস্ট করে নিয়ে আস। তবে প্রতিক্ষায় ছিলাম, ভাই আবার ফিরে আসবেন, হাসপাতালের বিছানা থেকে। ভাগ্য তাকে নিয়ে গেছে, স্মৃতির আলপানায় আঁকা এক স্থির ছবির ফ্রেমে।

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ।