ভূয়া সাংবাদিকদের মুখপত্র পাক্ষিক মেহেদী!

সোমবার, মার্চ ২৫, ২০১৩

মোহাম্মদ বেলাল হোছাইন::

pakkhik mehediপাক্ষিক মেহেদী নামক একটি আঞ্চলিক ট্যাবলয়েড পত্রিকা এক সময় কক্সবাজারের চকরিয়ায় বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিল। চ-৩০৫ রেজিস্ট্রেশন নাম্বার সম্বলিত পত্রিকাটির এখন ১৫ বর্ষ চলছে। অভিজ্ঞতার আলোকে পত্রিকাটির আরো বেশী উৎকর্ষতা সাধিত হওয়ার কথা। কারণ এই পত্রিকার প্রধান সম্পাদক জসিম উদ্দিন কিশোর একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক ছিলেন। কিন্তু কালের আবর্তনে তিনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি আরো অনেক সৃষ্টিশীল কাজে জড়িয়ে পড়ায় পত্রিকাটির মান ধরে রাখতে পারেননি। এক পর্যায়ে এটি সম্পাদনা ও প্রকাশনার জন্য তিনি অন্যলোকের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। প্রতি সংখ্যাভিত্তিক আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এই পত্রিকাটির দায়িত্ব অন্যের হাতে চলে যাবার পর থেকে পত্রিকাটি তার স্বকীয়তা হারাতে বসে।

বর্তমানে এটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন সাতকানিয়ার তাজুল ইসলাম। তিনি রসুলাবাদ ফাজিল মাদরাসার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক। এক সময় অনিয়মিতভাবে সাপ্তাহিক পূর্ববাংলা চুক্তিভিত্তিক সম্পাদনা করতেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামে অনেকটা বিজ্ঞাপন ও অজস্র ব্যাক্তির পাসপোর্ট সাইজের ছবিতে ঠাসা বুলেটিন টাইপের পত্রিকা প্রকাশ করে তিনি এক ভিন্নধর্মী (!) সাংবাদিকতা চালু করেছিলেন। পাড়ায় পাড়ায় শ‘শ‘ প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সাতকানিয়ার একটি প্রেসক্লাবের সভাপতির রোষাণলে পড়ে তিনি সেই পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব হারিয়ে চুক্তিতে পাক্ষিক মেহেদীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। এরই মাঝে পবিত্র ওমরাহ পালন করে এসে তিনি খানিক বদলে যান। নিজে সরাসরি পত্রিকা সম্পাদনায় আর যুক্ত হচ্ছেন না।

চুক্তিতে নেয়া মেহেদী সম্পাদনার পুরো দায়িত আরেক চুক্তির মাধমে¡ ছেড়ে দিয়েছেন স’ অধ্যাক্ষরের এক ব্যাক্তির হাতে। বেচারা একটি মাল্টিপারপাস সোসাইটির কর্মচারি। আগে ছিল জুতার দোকানে। পড়ালেখা একেবারেই নগণ্য। সাংবাদিকতার প্রাথমিক অভিজ্ঞানটাও তার নেই। বহুবছর ধরেই নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেয়। কিন্তু কী লিখে তা সে নিজেই বুঝে না। এই ব্যাক্তির হাতে পড়ে একেবারেই মরতে বসেছে পাক্ষিক মেহেদী। এটি এখন ভুল বানান, হাস্যকর সংবাদ, অপ্রাসঙ্গিক কথামালা, ভূয়া সাংবাদিকদের নাম ব্যবহার ইত্যাদির উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে এটি মূলত সাতকানিয়া কেন্দ্রিক প্রচারিত হচ্ছে। তাই সাতকানিয়াবাসির কাছে তা রীতিমত হাসির জোগান দিয়ে চলছে। সেই সাথে পত্রিকা, সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের সম্মানবোধ কমছে। আবার এই পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে গলায় কার্ড ঝুলিয়ে বেশ ক‘জন বেকার ঘুরছে বিভিন্ন কার্যালয়ে, ব্রীকফিল্ডসহ বিভিন্ন লাভজনক জায়গায়।
১৩-২৭ফেব্রুয়ারি তারিখ দিয়ে পত্রিকার ১৫ বর্ষের ২৫তম সংখ্যা হিসেবে সম্প্রতি প্রকাশিত কপিটি পর্যালোচনা করে অপসাংবাদিকতা, ভূয়া সাংবাদিকতা বা ভুল সাংবাদিকতার এক লজ্জাষ্কর নজির চোখে পড়েছে।

পাক্ষিক পত্রিকা হলে মাসে ২বার, বছরে ২৪বার পত্রিকা প্রকাশের সুযোগ থাকে। সেখানে ২৫তম সংখ্যা কিভাবে তারা প্রকাশ করলেন বুঝা গেলনা। পত্রিকার প্রতিটি সংবাদে রয়েছে ভুল বানানের ছড়াছড়ি। একটি/দুটি নয়। শ‘শ‘ভুল। তথ্যে রয়েছে বিরাট বিভ্রান্তি। তামাকুমন্ডি লেইন বণিক সমিতির নির্বাচন হয়ে গেছে। কয়েকজন নির্বাচিতের শুভেচ্ছা বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছে। সেখানেই লেখা হয়েছে আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী!হায়রে সাংবাদিক! আসন্ন শব্দটি কোথায় বসে তাও জানেনা!

মূল পত্রিকা করা হয়েছে ৪ পৃষ্ঠার। সেই সাথে ভিতরে সাপ্লিমেন্টারি হিসেবে সাদাকালো অবয়বে আরো ৪ পৃষ্ঠার একটি পত্রিকা জুড়ে দেয়া হয়েছে। সেটিতে বসানো হয়েছে ১৫ বর্ষ, সংখ্যা ১৯। তারিখ দেয়া হয়েছে ১৫থেকে ২৯ নভেম্বর ২০১২। যথারীতি সেখানেও রয়েছে ভুলের ছড়াছড়ি। তবে সবচেয়ে বেশী অবাক এবং অবিশ্বাস্য বিষয় হলো ১৫থেকে ২৯ নভেম্বর ২০১২তারিখ দিয়ে প্রকাশিত পত্রিকাটির অধিকাংশ নিউজই ২০১৩সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের। এটি কিভাবে সম্ভব?

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিএফপিতে জমা দিয়ে সার্কুলেশন নিয়মিত দেখানোর জন্য বাদ পড়া সংখ্যা চলমান সংখ্যার সাথে জুড়ে দিয়ে এই ২ নম্বরি কাজ করা হচ্ছে। তবে সঠিক তদন্তে এসব গোমর ফাঁস হয়ে গেলে সার্কুলেশন ঠিকই বাতিল হয়ে যেতে বাধ্য। তাছাড়া পত্রিকাটির অধিকাংশ স্থানজুড়ে রয়েছে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও তার আজ্ঞাবাহী কতিপয় ব্যাক্তির ছবি। এসবের মাধ্যমে মূলত সাংবাদিক সমাজ, সাংবাদিকতা পেশা ও সংবাদপত্রের মানহানি ঘটানো হচ্ছে বলেই মনে করছেন সচেতনমহল। তারা এসব নোংরামি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

এসব বিষয়ে পত্রিকাটির মালিক ও প্রধান সম্পাদক জসিম উদ্দিন কিশোরের সাথে যোগাযোগ করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পত্রিকাটি এখন আমি নিজে করতে পারছি না। যাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছি তারাও ঠিকমত করতে পারছেননা বলে বিভিন্নজন অভিযোগ দিয়েছেন। আমি তাদেরকে ডেকেছি। তারা আসবে বলে হরতালের অজুহাত দেখিয়ে আসেননি। আবার ডাকব। অভিযোগ সত্য হলে পত্রিকা নিয়ে নেব।”
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক প্রভাষক তাজুল ইসলাম বলেন, “পত্রিকাটি আমি দেখার সুযোগ পাইনা। এক ব্যক্তিকে এসব দেখার দায়িত্ব দিয়েছি। আয়-ব্যায়, লাভ-ক্ষতি সে-ই দেখে। আমাকে কিছু টাকা দেয়। তাই আমি কিছু দেখি না।

লেখক: সংবাদকর্মী, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম)