আসুন, স্বকীয়তা রক্ষায় উদ্যোগী হই

সোমবার, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৫

:: আকাশ মো: জসিম ::

newsmediaসাংবাদিকতায় আকাল চলছে সারা দেশে! বৃহত্তর নোয়াখালীজুড়ে এ পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ, ভীতিপ্রদ ও আশঙ্কাজনক। এখানে সংবাদপত্রের পেশাদারিত্ব ও মৌলিক মান উন্নয়নে ন্যুনতম কোন নিয়মনীতি রক্ষা করা হয়না। গণমাধ্যমের অবাধ স্রোতের ধারায় বিশেষত ১৯৯১ সালে মিডিয়ার অনুমোদন প্রদানের পরই গণমাধ্যম তার গৌরবোজ্জল স্বকীয়তা রক্ষার সংকটে পতিত হচ্ছে। ১৯৯১ সালের পর বৃহত্তর নোয়াখালী জেলায় যারা সাংবাদিকতার ‘স’র সাথে সম্পৃক্ত নেই; তারাও অনেকে সম্পাদক সেজে বসে আছেন।

আবার, নিয়ম-নীতির ব্যতায় ঘটিয়ে বরাবরই ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইনের তোয়াক্কা না করে সে সময় ধরে এ সময় পর্যন্ত যারা প্রকাশক হয়েছেন তাদের অনেকেরই নুন আনতে পান্তা ফুরায় বললে হয়তো কেউ কেউ রাগে, ক্ষোভে ও অভিমানে বিদগ্ধ হবেন। বাস্তব সত্য হওয়ায় এ কথা বলতে কঠিন হলেও আমাদের প্রকাশনা আইনে বলা হয়েছে, আর্থিক সামর্থ্য আছে এমন ব্যক্তিই সংবাদপত্রের প্রকাশক হতে পারেন। প্রকাশনা আইনের সে নিয়ম রক্ষার স্বার্থে একটি রাষ্ট্রীয় প্রকাশ্য হেয়ালিপনা ও খামখেয়ালিপনায় আমাদের প্রায় প্রকাশক অন্যের হিসাব হতে টাকা স্থানান্তর করে নিজ হিসাবে যোগ করেই সাময়িক সময়ের জন্যে একটি আর্থিক সামর্থ্যপত্র হাসিল করেন। পরবর্তীতে, যার টাকা তার হিসাবেই চলে যায়।

এদিকে প্রকাশনা আইনের তদন্ত প্রতিবেদনকালে রাষ্ট্র সঠিক ও ন্যায়ত প্রতিদেবনে প্রদান বেশ একটা চোখে পড়েনি। প্রশাসনের সঠিক, বস্তনিষ্ঠ, চাতুর্য্যপূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন প্রদানের কর্মক্ষমতার কোন এক সুযোগে বৃহত্তর নোয়াখালীতে সাজাপ্রাপ্ত কিংবা চাঁদাবাজির মামলায় থানার অভিযোগপত্রের ব্যক্তিও সম্পাদক, প্রকাশক সাজার নজির রয়েছে।

একপর্যায়ে, প্রকাশনা আইনের সার্বিক তীক্ষ নজরদারির অভাবে বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রায় প্রকাশক, অনুমোদিত পত্রিকার ২/১টি সংখ্যা বের করে আর্থিক দৈন্যতায় হতাশ, ক্ষান্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে আর টিকিয়ে রাখতে পারেন না পত্রিকার প্রকাশনা। সে কারনে প্রকাশকদের অনেকে কোন একটি দৈনিক তিনমাসেও এবং সাপ্তাহিক বছরের পর বছরও প্রকাশ করার অনিয়মিত ও অসঙ্গতি চিত্র বরাবরই প্র্রামাণ্য।

এরপর, আমাদের প্রকাশকদের সম্পাদিত পত্রিকাগুলোর খবরাখবর পর্যালোচনা করলে একটি অনিয়মিত, অযোগ্য ও কর্মহীন সংবাদপত্রের আসল চেহারা ধরা পড়ে সচেতন পাঠকের চোখে।শুধু তাই নয়, এ জেলায় মৃত ব্যক্তির নামে অনুমোদিত পত্রিকাগুলোরও নিয়ম নীতি না মেনেই প্রকাশক, সম্পাদক হয়ে যান অনেকে রাতারাতি। আইনের সঠিকতা উপলদ্ধি না করে তারা প্রিণ্টার্স লাইনেও ওই মৃত ব্যক্তির নামে প্রকাশক কিংবা সম্পাদক লিখার রেওয়াজ যেন আইনী সিদ্ধ। অথচ মৃত ব্যক্তির নামে প্রকাশিত খবরের দায় -দায়িত্ব কার ঘাড়ে বর্তায়? এ জাতীয় চিন্তা ভাবনাও তাদের নেই।

আবার আমাদের সেসব অনিয়মিত প্রকাশক, সম্পাদকেরা সাংবাদিক নামের যে বা যাদেরই নিয়োগ প্রদান করেন তাদের বেশিরভাগই সাংবাদিক নামের হতাশাগ্রস্ত, অশিক্ষিত, অকর্মন্য, অযোগ্য, অদক্ষ, বর্ণচোরা ও সুবিধাভোগী।

প্রসঙ্গক্রমে, নোয়াখালী পৌরসভার সাবেক এক মরহুম কমিশনারকে একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার পদে পরিচয়পত্র প্রদান করেন ওই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। একদিন ওই কমিশনারের বাড়িতে দৈব কারণে গেলেন আমাদের একজন নিষ্ঠাবান সংবাদকর্মী। তাঁরই উপস্থিতিতে ওই কমিশনার নিজ স্ত্রীকে অশ্রাব্য ও অশ্লীল ভাষায় ধমকিয়ে বললেন, এই দেখ, আমি পত্রিকার স্টাফ রিপোটার। এখন ফোন করলে ডিসি, এসপি এখানে এসে স্যার, স্যার করতে করতে মুখে ফ্যানা তুলবে।

পন্ডিতেরা বলেছেন, ‘পাগলার হাতে কুড়াল দিওনা। তাহলে জাম্বুরা গাছ রাখবে না।’ এসব জেলায় হচ্ছেও তাই। যে যেখানে বসার যোগ্যতা রাখে না; আমাদের প্রশাসন তাকে সম্পাদক, প্রকাশক বানিয়েছে। যাকে তাকে সাংবাদিক নামের পরিচয়পত্র ধরিয়ে দেয়ার কারণে বৃহত্তর নোয়াখালীতে সাংবাদিকতার মানে চরম অবক্ষয় ও ধ্বস নেমেছে। এ যেন অপাত্রে কন্যা দান করলে যা হয়, তার মতো।

মাইজদী মহিলা কলেজ এলাকার একজন কোরআনে হাফেজ কিছুদিন আগে ঢাকার অখ্যাত, অনিয়মিত এক সাপ্তাহিকের কথিত প্রতিনিধি সেজেছেন। এরপর, মোটরসাইকেলের সামনে সাংবাদিক নামের ব্যানার লাগিয়ে চষে বেড়াচ্ছেন শহর, গ্রাম। হালে এই বখাটে ৪/৫টি বিয়ে করে সাংবাদিকতা পেশার বারোটা বাজনোর অভিযোগ অনেকেরই।

সাংবাদিক নামের আরেক বখাটের কোর্ট-টাই দেখে স্থানীয় এক লোক বলেছেন, আরে এটা তো আমাদের গ্রামের ধুন্ধুল। সে আবার, সাংবাদিক হলো কিভাবে! অভিযোগ রয়েছে, ওই কথিত সাংবাদিক বিভিন্ন স্কুলের পরিদর্শনে যান। একপর্যায়ে, স্কুল শিক্ষকদের থেকে দুপুরের ভাতের টাকা পর্যন্ত ভাগিয়ে আনেন। এ বখাটে সংবাদ সংগ্রহের নামে নোয়াখালীর এক এলাকায় জনৈক গৃহস্থের কাছে চাহিদামাফিক সুবিধা না পেয়ে বাড়ির আঙ্গিনায় হৈ-চৈ করা হাঁস, মুরগী, শিম, নারকেল পর্যন্ত তার থলেতে ভরে আনার কথা সর্বজন অবিহিত।

আরেক প্রকাশক, সম্পাদক কাম উকিল যৌনকর্মীর হাতেও তুলে দিয়েছেন সাংবাদিক নামের পরিচয়পত্র। এসব পত্রিকায় স্টাফ রিপোটার কাম যৌনকর্মী আরো কিছু কথিত মানবাধিকার সংস্থার নামের সাথে পদবী ছাপিয়ে নিজের ভিজিটিং কার্ড বিভিন্নœ সরকারী-বেসরকারী কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের টেবিলের নিচে রাখতে দেখা গেছে। বেদনার সাথে উল্লেখ করতে চাই, কোন রকম নামদস্তখত জানা এক নারী কথার ফাঁকে একদিন বললেন, আমিও আপনাদের মতো সাংবাদিকগিরি করি। এ লজ্জা রাখি কোথায়!
এভাবে দিনের পর দিন আমাদের স্থানীয় পত্রিকার প্রকাশক, সম্পাদকদের সহযোগিতায় নোয়াখালীর সাংবাদিকতায় যোগ হচ্ছে পান দোকানী, অডিও-ভিডিও প্লেয়ার মেরামতকারী হতে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জের আইসক্রিম বিক্রেতারাও।

একইভাবে, জাতীয় পর্যায়েও। অনেকে বলেন ঢাকার অগিলে-গলিতে সম্পাদক, প্রকাশকের ভারে হাঁটাচলাও দায়। অথচ, তাদের অনেকেরই কোন কোন জাতীয় দৈনিকের প্রতিনিধি হওয়ারও যোগ্যতা নেই। তারা মূলত পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশক সাজেন ধান্ধাবাজির জন্য। যাদের বেশির ভাগই মফস্বলের কিছু মানুষকে পরিচয়পত্র প্রদান কিংবা পত্রিকা পাঠানোর নামে বাড়তি বানিজ্য আদায়ে তৎপর থাকেন মাসের পর মাস। আবার, এসব ধান্ধাবাজরা একটি জেলায় একাধিক ব্যক্তিকে এই পদ সেই পদ বিকিয়েও সুবিধা হাসিল করছেন নানাভাবে।

রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যমের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে একটি নিয়মনীতি রক্ষা ও পালন করা অতীব জরুরী। না হলে এক সময় অবক্ষয়ের স্রোতে হারিয়ে যাবে আস্থার জায়গাটুকুও। আমরা যারা গণমাধ্যম নামের জায়গাটুকুতে পরিচয় বহন করছি, অন্তত তারা নিজেদের স্বার্থে হলেও যেন এর স্বকীয়তা রক্ষায় উদ্যোগী হই।

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক দিশারী।