মেঘের ৪৬২ সেকেন্ড!

শনিবার, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৫

:: নেসারুল হক খোকন ও ওবায়েদ অংশুমান ::

Sagor Meghমাহির সরোয়ার মেঘ। সাংবাদিক সাগর সরোয়ার-মেহেরুন রুনী দম্পতির একমাত্র সন্তান। বাবা-মা খুন হওয়ার দিন তার বয়স ছিল পাঁচ বছর চার মাস। রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ৫৮/এ/২ নম্বর বাসায় বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকত সে। সাংবাদিকতা পেশায় বাবা-মা দু’জনে ব্যস্ত থাকায় তারা ছেলেকে তেমন সময় দিতে পারতেন না। ফলে বেশির ভাগ সময় নানি নুরুন্নাহার মির্জা ও দুই মামা রোমান ও রিমনের তত্ত্বাবধানে থাকত সে। আর নানির বাসা কাছে হওয়ায় দুই পরিবারের মধ্যে আসা-যাওয়াও বেশি ছিল। হেঁটে গেলে দুই বাসার ব্যবধান মাত্র ৫ মিনিটের পথ। নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দিনটি ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। মায়ের সঙ্গে ঘুমালেও সেদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে সে বাবা-মার লাশ দেখে। এরপর মায়ের মোবাইল হাতে নিয়ে সেই সকালে মেঘ প্রথমে তার মা রুনীর বন্ধু তানভীর এবং পরে নানি নূরুন্নাহার ও মামা রিমনকে বাবা-মায়ের মৃত্যুর সংবাদ দেয়। রুনীর মায়ের পারিবারিক সূত্রে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার পর সংবাদ মাধ্যমেও একই ধরনের খবর প্রকাশিত হয়।

এদিকে যুগান্তরের অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফোনের কললিস্ট (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ওইদিন সকালে রুনীর মোবাইল ফোন থেকে উল্লিখিত তিনজনের মোবাইলে তিন দফায় কল করা হয়েছে। তবে ভয়েস রেকর্ড না পাওয়ায় সত্যিই কে ফোন দিয়েছিল তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এক্ষেত্রে যদি ধরে নেয়া হয় যে, প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী মেঘই তার বাবা-মায়ের মৃত্যু সংবাদ মোবাইল ফোনে মায়ের বন্ধু তানভীর, নানি নূরুন্নাহার ও মামা রিমনকে জানিয়েছে, তাহলে কললিস্টের হিসাব অনুযায়ী মেঘ তাদের সঙ্গে ১৭ মিনিটের ব্যবধানে ৪৬২ সেকেন্ড বা প্রায় ৮ মিনিট কথা বলেছে। এই ৮ মিনিট ফোনালাপের মধ্যে প্রথমে রুনীর মোবাইল থেকে তানভীরের মোবাইল ফোনে কল যায় ৭টা ২১ মিনিটে ও কথা হয় ৮ সেকেন্ড, এরপর দ্বিতীয়বার কল যায় মেঘের নানি নূরুন্নাহারের মোবাইলে ৭টা ২৭ মিনিটে ও কথা হয় ৪৪ সেকেন্ড এবং সবশেষে তিন মিনিট পর ফের নানি নূরুন্নাহারের মোবাইলে কল যায় ৭টা ৩১ মিনিটে।

এ সময় কথা হয় ৪১০ সেকেন্ড। রুনীর মায়ের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মেঘের সঙ্গে এ ফোনালাপ শেষে প্রথমে তার নানি নূরুন্নাহার মির্জা ও ছোট মামা রিমন ঘটনাস্থলে আসেন। এরপর আসেন মেজ মামা রোমান। তবে বাড়ির গৃহকর্মী দেলোয়ারা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, ঘটনার দিন একদম ভোরে আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে বাড়ির লিফটের সামনে রোমান, পাঁচতলার ফ্ল্যাটে দরজা খোলা অবস্থায় নানি নূরুন্নাহার ও মেঘকে ঘরের মধ্যে সোফায় বসে কথা বলতে দেখেছেন। এখানে প্রাপ্ত তথ্য ও ঘটনার বিশ্লেষণে নানা প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।

মেঘের হাতে যেভাবে গেল মোবাইল : ২০১২ সালের ১০ ফেব্র“য়ারি। মেঘের মা রুনী তখন নিজ বাসায়। আর নানি উত্তরা মডেল টাউনের ছয় নম্বর সেক্টরে। মোবাইাল ফোনের কললিস্টের সিডিআর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সকাল ৮টা ১৯ মিনিটে রুনীর সঙ্গে কথা হয় তার মায়ের। সেদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেঘের নানির মোবাইল ফোন সেটটি উত্তরা, আশুলিয়া, ফ্যান্টাসি কিংডম, সাভার এলাকায় অবস্থান করে। পরে তার নানির মোবাইলটি ইন্দিরা রোডের টাওয়ারে প্রবেশ করে ৭টা ৩১ মিনিটে। ওদিকে রুনীর মোবাইলটি ১টা ৫৪ মিনিটে তেজগাঁও এলাকায় অবস্থান করে। এরপরেই তার মোবাইলটি ৩টা ১৭ মিনিটে ইন্দিরা রোডের টাওয়ারে আসে। এ নেটওয়ার্কের আওতায় মোবাইলটি সেখানে ৪টা পর্যন্ত অবস্থান করে। এরপর চলে আসে পশ্চিম রাজাবাজারের টাওয়ারে। অর্থাৎ ধরে নেয়া যায় সে সময় রুনী বাসায় ফিরেছেন। সিডিআর অনুযায়ী ৪টা ৫৫ মিনিটে রুনী বাসা থেকে বেরিয়ে যান ধানমণ্ডি টাওয়ার এলাকায়। সেখান থেকে ৭টা ২৩ মিনিটে ফের মায়ের বাসায় যান। পরে মেঘকে নিয়ে ৮টা ২৮ মিনিটে পশ্চিম রাজাবাজারের নিজ ভাড়া বাসায় চলে আসেন। এরপর মা নুরুন্নাহার মীর্জার সঙ্গে ১৫৮ সেকেন্ড তার সর্বশেষ কথা হয়। সেটিই ছিল তার মায়ের সঙ্গে শেষ আলাপ। ওদিকে মেঘের বাবা সাগর সরোয়ার ১০ ফেব্র“য়ারি দিবাগত রাত ২টায় বাসায় ফেরেন। ততক্ষণে মেঘ মায়ের সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়েছে। মামলার এজাহার অনুযায়ী, সেদিন রাত ২টা থেকে ভোর ৭টা ৩০ মিনিটের মধ্যে অজ্ঞাতদের হাতে খুন হন মেঘের বাবা-মা। মামলার বাদী মেঘের মামা রোমান মামলায় উল্লেখ করেন, ‘৭টা ৩০ মিনিটের দিকে তার ভাগ্নে মেঘ তার মায়ের নম্বরে ফোন দিয়ে বলে, ‘আমার মিম্মি ও বাবা মারা গেছে’।

রুনীর মোবাইলের সিডিআর কী বলে : ১১ ফেব্রুয়ারি। সকাল ৭টা ২১ মিনিট। এ সময় রুনীর মোবাইল থেকে তানভীরকে (রুনীর বন্ধু ও আসামি) কল দেয়া হয়। ৮ সেকেন্ড কথোপকথন হয়। এরপর ৬ মিনিট রুনীর মোবাইল থেকে অন্য কোনো নম্বরে কল যায়নি। কিন্তু ৭টা ২৭ মিনিটে রুনীর মোবাইল থেকে মেঘের নানির মোবাইলে কল দেয়া হয়। যখন এই কল তার নানি রিসিভ করেন তিনি তখন ইন্দিরা রোডের বাসায়। কথা হয় ৪৪ সেকেন্ড। এরপর রুনীর মোবাইল থেকে তিন মিনিট আর কোনো কল দেয়া হয়নি। তবে ৭টা ৩১ মিনিটে ফের রুনীর মোবাইল থেকে তার নানির নম্বরে কল দেয়া হয়। এ সময় কথা হয়েছে ৪১০ সেকেন্ড বা প্রায় ৭ মিনিট। পুরো সময়জুড়ে মেঘের নানি তল্লাবাগ নেটওয়ার্কে ছিলেন। অর্থাৎ ৭টা ৩৮ মিনিট পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন।

ছোট মামা রিমনের সিডিআর কী বলে : মামলার এজাহার অনুযায়ী, ৭টা ৩০ মিনিটে যখন মেঘ তার নানিকে ফোন দিয়ে তার বাবা-মায়ের মৃত্যু সংবাদ জানায়, তখন তার ছোট মামা রিমন অবস্থান করছেন মিরপুর পীরেরবাগ নেটওয়ার্কে। তিনি এয়ারটেলের একটি নম্বর ব্যবহার করেন। এই নেটওয়ার্ক থেকে তিনি পশ্চিম রাজাবাজার নেটওয়ার্কে ঢোকেন ৭টা ৫২ মিনিটে। তবে তিনি যখন তার মায়ের নম্বরে ফোন দেন সময় তখন ৭টা ৪২ মিনিট। কথা হয় ১৯ সেকেন্ড। মাকে যখন তিনি কল দেন তখনও তিনি মিরপুর পীরেরবাগ নেটওয়ার্ক এলাকায়।

মেজ মামা রোমানের সিডিআর কী বলে : রুনীর মায়ের নাম্বার থেকে রোমানের নম্বরে যখন কল দেয়া হয় তখন সময় সকাল ৭টা ৪৯ মিনিট। তখন রোমানের মোবাইলটি তেজগাঁও ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া নেটওয়ার্কে। কথা হয় ২৪ সেকেন্ড। এর এক মিনিট পর ৭টা ৫০ মিনিটে রোমানের মোবাইল থেকে তার মায়ের মোবাইলে কল দেয়া হয়। কথা হয় ১৯ সেকেন্ড। আর ৭টা ৫১ মিনিটে তার মায়ের মোবাইল থেকে রোমানের মোবাইলে কল আসে। কথা হয় ১৬ সেকেন্ড। এর তিন মিনিট পর ৭টা ৫৩ মিনিটে আবার তার মায়ের মোবাইল থেকে রোমানের মোবাইলে ফোন আসে। কথা হয় ৮ সেকেন্ড। রোমানের মোবাইল থেকে রিমনের মোবাইলে কিংবা রিমনের মোবাইল থেকে রোমানের মোবাইলে কোনো কথোপকথন হয়নি। মামলার এজাহারে রোমান বলেছেন, ‘৭টা ৫০ মিনিটের সময় আমার অফিসে কর্মরত থাকা অবস্থায় (ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি) আমার ছোট ভাই রিমন আমার মায়ের মোবাইল থেকে আমার বোন ও ভগ্নিপতির খুন হওয়ার সংবাদ দেয়।’

মামা রিমন ও মেঘের নানির ঘটনাস্থলে আসা : এজাহারে রোমানের দাবি, মেঘের ফোন পেয়ে ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে তার মা নুরুন্নাহার মির্জা ও তার ছোট ভাই রিমন সাগর-রুনীর বাসায় আসেন। রোমানদের পরিবারের দাবি, ঘটনাস্থলে আসার পর মেঘ দরজা খুলে দেয়। আর তার নানি ঘরে ঢোকে। তবে কত মিনিট সময় লেগেছে তাদের ঘটনাস্থলে আসতে, কত মিনিট ধরে মেঘের দরজা খোলার অপেক্ষায় তারা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার কোনো ব্যাখ্যা রোমানদের পরিবার দেয়নি। তবে যুগান্তরকে মেঘের নানি নুরুন্নাহার মির্জা বলেন, ‘মেঘের ফোন পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে যে কাপড়ে ছিলাম তাই পরে আমি দৌড়ে ঘটনাস্থলে আসি। আমার ছোট ছেলে রিমন আমার সঙ্গে আসেনি। পরে আসে সে। আসার পর পশ্চিমরাজাবাজারের রুনীর ভাড়া করা ফ্ল্যাট বাড়ির প্রধান গেট খোলা ছিল। আমার সঙ্গে কোনো দারোয়ানের দেখা হয়নি।’ তবে মেঘের ছোট মামা নওয়াজীশ আলম রিমন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি তখন বাসায়। মেঘের সঙ্গে আমার কথা হয়। মেঘ দু’বার আমার মায়ের মোবাইলে কল দেয়। প্রথমবার কথা হয় অল্পক্ষণ। পরে লাইন কেটে যায়। পরে আবারও সে ফোন দেয়। প্রথমে মায়ের সঙ্গে পরে আমার সঙ্গে কথা হয়।’ তিনি আরও বলেন, কথা বলার পর মা মেঘেদের বাসায় চলে যায়। কিছুক্ষণ পর মাকে আমি কল দিই। তখন মা মোবাইল ফোনে কাঁদতে থাকেন। তখন আমি আমাদের বাসা থেকে ঘটনাস্থলে রওনা দিই। পরে পৌঁছে আমার মায়ের মোবাইল থেকে মেজ ভাই রোমানকে কল দিই। পরে ভাইয়া আসে।’

কয়েকটি প্রশ্ন : মামলা দায়েরের পর তদন্ত করে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। থানা পুলিশের হাতে মামলা থাকাকালীন তদন্তের দায়িত্বে থাকা ঢাকা মহানগর পুলিশের তৎকালীন একজন উপ-কমিশনার যুগান্তরকে বলেন, তদন্তের প্রয়োজনে বহু মোবাইল ফোনের সিডিআর আমরা পর্যালোচনা করি।

রুনী,সাগর, রোমান, রিমন, তার মাসহ অনেকের মোবাইল ফোনের সিডিআর পর্যালোচনা করেছি। তবে কোনো প্রকারের ভয়েস রেকর্ড পাওয়া যায়নি। এরপর ডিবিতে যখন মামলা আসে তখন তদন্তের দায়িত্বে থাকা মহানগর পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, রুনীর মোবাইল থেকে ওই সকালে কে ফোন দিয়েছিল তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কারণ কোনো ভয়েস রেকর্ড পাওয়া যায়নি। তদন্তের সঙ্গে জড়িত ছিলেন র‌্যাবের এমন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ভয়েস রেকর্ড না পাওয়া যাওয়ায় রুনীর মোবাইল থেকে যে কথোপকথন তা কে বলেছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রিমনের সিডিআর অনুযায়ী, ৭টা ৪২ মিনিটের দিকে যখন রিমন তার মায়ের নম্বরে (নুরুন্নাহার মির্জা) ফোন দেন তখন তিনি ছিলেন মিরপুর পীরেরবাগ নেটওয়ার্কে? অথচ এজাহার অনুযায়ী রোমানের মা ও তার ছোট ভাই রিমন তখন ঘটনাস্থলের নেটওয়ার্কে, অর্থাৎ পশ্চিম রাজাবাজারে রুনীদের বাসায়। কেননা এজাহারে বলা হয়েছে, রিমন ৭টা ৪৯ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তার মায়ের মোবাইল থেকে ভাই রোমানকে ফোন দিয়েছেন। অথচ রিমনের মোবাইল ফোনের সিডিআর অুনযায়ী তিনি (রিমন) পশ্চিম রাজাবাজারের নেটওয়ার্কে ঢুকেছেন ৭টা ৫২ মিনিটে। উল্লেখ করা যেতে পারে, মিরপুর পীরেরবাগ থেকে পশ্চিম রাজাবাজারের দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার।

এদিকে এই অসঙ্গতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মামলার বাদী রিমনের মেঝো ভাই রোমান যুগান্তরকে বলেন, এয়ারটেলের নম্বর থেকে কথা বললে দুটি টাওয়ারের (ইন্দিরা রোড, ফার্মগেট ও পীরেরবাগ, মিরপুর) নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। ডিবির তদন্তকারী টিম তাদের এ বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে রিমনের সাত মাসের সিডিআর পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কখনও ইন্দিরা রোডের টাওয়ারটি ধরা পড়েনি। কিন্তু যুগান্তরের অনুসন্ধানে রিমনদের বাসার সামনে থেকে একটি এয়ারটেল নম্বর ব্যবহার করে দেখা যায়, ফোন করলে ৯৯ ভাগ কল ইন্দিরা রোডের টাওয়ার ধরা পড়ে। (চলবে)

সৌজন্যে: যুগান্তর।