প্রথমে আত্মহত্যা পরে চোরকাহিনী

বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৫

:: নেসারুল হক খোকন ও ওবায়েদ অংশুমান ::

Sagor-runi-2২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। সেদিন ছিল শনিবার। কাকডাকা ভোর। কিছুক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে মসজিদে ফজরের নামাজ। ঘটনাস্থল রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ৫৮-এ/২ নম্বর বাড়ি। এই বাড়ির পঞ্চম তলার একটি ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করেন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী। ততক্ষণে ফ্ল্যাটবাড়ির কাজের মহিলা (বুয়া) দেলোয়ারা প্রতিদিনকার মতো সিঁড়ি ঝাড়ু দেয়ার জন্য চলে এসেছেন। কিন্তু বাড়িতে প্রবেশের কলাপসিবল গেটটি একেবারে খোলা দেখে কিছুটা ঘাবড়ে যান দেলোয়ারা। দারোয়ানের কাছে এর কারণ জানতে চেয়ে এক পর্যায়ে ঝাডু নিয়ে উঠে আসেন পঞ্চম তলায়। দেলোয়ারার নজরে পড়ে মেঘদের (সাগর-রুনীর ছেলে) বাসার দরজা কিছুটা খোলা। কৌতূহলবশত উঁকি দিয়ে দেখতে পান, সোফায় বসে মেঘ ও তার নানি কথা বলছেন।

এরপর দেলোয়ারা সিঁড়ি ঝাডু দেয়ার কাজ শেষ করে নিচে নেমে আসেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যে ওপর থেকে মহিলা কণ্ঠের চিৎকার শুনে ছুটে যান তিনি। চিৎকারটি ছিল ‘সুইসাইড বা চোর’। ওপরে ওঠার সময় আর কোনো ফ্ল্যাটের দরজা খোলা না পেয়ে তিনি সোজা মেঘের নানির কাছে গিয়ে চিৎকারের শব্দ শোনার কারণ জানতে চান। জিজ্ঞাসা করেন, ‘খালাম্মা চোর? জবাবে মেঘের নানি নূরুন্নাহার মির্জা বলেন, ‘চোর না, তুমি যাও।’ দেলোয়ারা ফিরে যান। এরপর বাড়ির ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতির নির্দেশ পেয়ে কাজের মহিলা ফের উঠে এসে চিৎকারের ব্যাখ্যা জানতে চান। এ সময় সেখানে উপস্থিত রুনীর ভাই রোমান তাকে ঘরের মধ্যে যাওয়ার ইঙ্গিত দেন। ঘরে ঢুকেই দেলোয়ারার পিলে চমকে যায়। দেখতে পান, ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে সাগর-রুনীর রক্তাক্ত লাশ। বহিরাগত হিসেবে এই কাজের মহিলাই ছিলেন লাশ দেখার প্রথম সাক্ষী।

কাজের মহিলা এই খবর দেয়ার পর ছুটে আসেন ওই ভবনের একটি ফ্ল্যাটের মালিক আবদুর রাজ্জাকের স্ত্রী সহিদা রাজ্জাক। তিনি ঘরে ঢুকে লাশ দেখার পরপরই রুনীর ছোট ভাই রিমন তাকে রান্নাঘরের জানালার সামনে নিয়ে যান। সেখানে জানালার গ্রিলের কাটা অংশ দেখিয়ে বলেন, ‘আন্টি এখান দিয়ে ডাকাতরা বেরিয়ে গেছে।’ সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের পর ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরবেলার প্রথম দৃশ্যপটটি ছিল এ রকমই। যার পুরো চিত্র বেরিয়ে এসেছে কাজের মহিলা দেলোয়ারার মুখ থেকে। গত ৯ ডিসেম্বর যুগান্তরের অনুসন্ধানী টিম কাজের মহিলা দেলোয়ারার মুখোমুখি হলে তিনি ওইদিনের ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা দেন।

দেলোয়ারার মুখে সেদিনের বর্ণনা : ঘটনার দিন ভোরবেলা সিঁড়ি ঝাড়ু দিতে এসে তিনি কী দেখেছিলেন জানতে চাইলে দেলোয়ারা ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় যুগান্তরকে বলেন, ‘তখন ছয়টা না সাড়ে ছয়টা বাজে, এটা আমি বলতে পারব না। তবে তখন একদম ভোর। আমার শাশুড়ি দেখলাম নামাজ পড়তাছে। আমি কি করলাম- উঠে নামাজও পড়লাম না, কিছুই না, আমি ছুটে গেলাম আমার কাজে। আমি মনে করছি, আমার শাশুড়ি নামাজ পড়ে রান্নাবান্না করবে, আমি আমার কাজটা শেষ করে আসি। আমি ওই বাসায় গিয়ে দেখি, গেট একদম খোলা, ডেইলি তো গেট সিটকানি মারা থাকে। কিন্তু এদিন দেখি সরাসরি গেট খোলা। খোলা দেইখা ঢুকছি। ঢুইকা বলতাছি, ‘পলাশ তোমরা কই। গেট একদম খোলা। এহান থেইক্কা যদি মোবাইল-টোবাইল নিয়ে যায়, তাহলে তো কইবা, এই যে বুয়া সহালে আইছিল হেই নিয়ে গেছে। আমি মোবাইলের চিন্তা করতাছি।’ ওই বাসায় দুইটা ছ্যারা আছিল। একটা ছ্যারার নাম হুমায়ুন আছিল। আরেকজনের নাম পলাশ। পলাশরে পাইনি, আমি গিয়ে হুমায়ুনরে পাইছি। হুমায়ুনরে দেহি, ভাতের মাড় গোড় দিতাছে। আমি চুহি দিয়ে দেইক্কা বলতাছি, তুমি যে ভাতের মাড় দেচ্ছ, চোরেরা কিছু নিয়ে গেলে তো কিছু টের পাবা না।

এনামুল বলল, কি করমু। ভাত তো খাইতে হবে। হ্যায় এটা কইলে, আমি ঝাড়ু-বেইঞ্চা হাতে লইছি। ঝাড়ু-বেইঞ্চা হাতে লইয়া দেহি যে, মেঘের একটা লাম্বা কইররা মামা, ফর্সা, সুন্দর, মেঘের মামাডা (মামলার বাদী নওশের আলম রোমান) লিফটের সামনে দাঁড়াইয়া রইছে। আমি ঝাড়ু-বেইঞ্চা লইয়া উপরে উঠে গেছি। আবার দেখলাম, গেটের সামনের দিকে আবার যাইতাছে। তখন আমি ঝাড়ু দিতে গিয়ে উঠছি একবারই পাঁচতলায়। উইঠে ঝাড়ু দিয়ে নামছি। নাইম্মা দেখলাম যে, দরজা খোলা। তয় আমি মনে করছি, মেঘ সহাল ৭টার সময় স্কুলে যায়। মনে হয় মেঘের নানু এজন্য মেঘরে রেডি করতাছে। মেঘের নানু আর মেঘ এক সোফায় বসে রইছে। কথা বলতাছে তারা। গুডু গুডু করে কথা বলতাছে। আমি আবার পাপশটা ঝাড়া দিয়ে নামে আইছি একবার নিচেয়। নিচে যখন ঝাড়ু দিয়ে নামে আইছি তখন দেখি মেঘের ওই মামাডা ওই উপরে উঠতাছে। উপরে উঠতে লাগলে, উপরে ওঠা শেষ হইছে। এম্মি একটা চিৎকার মাইরছে মেঘের নানু। জোরে চিৎকার মাইরছে। ওহন চোর কইল না সুইসাইড কইল আমি বুঝলাম না।

আমি আবার ঝাড়ু-বেইঞ্চাটা নিচে থুইয়া আমি কইতাছি, তাহের ভাই (বাড়ির কেয়ারটেকার), চোর আইল নাকি? মেঘের নানু চিৎকার পাড়তাছে। হ্যায় কইল, দ্যাহেন তো বুয়া কি হইছে? কেয়ারটেকারডা বলতাছে। দেহেন তো বোয়া কি হইছে। আমি আবার সিঁড়ি দিইয়া দৌড়াইয়া যাইয়াগা উঠছি। উঠে যাইয়া কইতাছি, খালাম্মা চোর আইল কোদ্দিয়া। ছাদের এহনে গেটে তালা মারা। আমি সিঁড়ি ঝাড়ু দিতাছি। না লিফটে উপরে উঠল চোর। পরে কইল, চোর না। যাও তুমি। আবার মেঘের মামাডারে দেখতাছি, মোবাইলে কথা বলতাছে। জানালাডার কাছে কথা বলতাছে। আমারে ধুমকি মাইরা বলল, যা-। আমি নিচে নাইম্মা আইয়া পড়ছি। চারতলায় ওই যে সভাপতি আছে। আগে আছিল। নুরুন্নবী সাহেব। এখন নাই। নুরুন্নবী সাহেব বাইরে আইয়া বলতাছে, এত সকালে কান্নাকাডি করে কে? অসুস্থ নাকি কেউ? জিগাইয়া আই তো বোয়া। আমারে তো কিছু বলল না। খালি চোর আর সুইসাইড কইতাছে। এসবই কইতাছে। আর চিৎকার পাড়তাছে। ভালো করে জিগাইয়া আস। কেউ যদি অসুস্থ থাকে তাহলে তো দেখত অইব। পরে আমি যাইয়া বলছি, সভাপতি বলছে। কি হইছে বলতে হইব।

এত সকালে ঘুমের ডিসটাব হইতেছে মানুষের। বলতে হইব। এই সময় মেঘের মামা আমারে হাত দিয়ে ইশারা দিল। ভিতরে যাইতাম আমি। হ’ ভিতরে যাইতাম। আমার মনডা কিরকম-ই লাগল। আমারে ভিতরে যাইতে কই ক্যান? চিৎকার পাড়তাছে কইলেই তো হয়, অসুস্থ। তহন আমি চিন্তা করলাম, খালু যহন পাঠাইছে তহন তো দেইক্কা যাইতে হইব। দেইক্কাই যাই। ঝগড়া-টগড়া নাকি? আমি ভিতরে যাইয়া দাঁড়াইছি, দাঁড়াইয়া দেহি, এক্কেবার সর্বনাশ। একটা লাশ এইভাবে পইড়রা রয়েছে। আরেকটি লাশ ওইভাবে পইড়রা রইছে। দুইটা পাও একসাথে। রুনীর ভরডা (পেটের নাড়িভুঁড়ি) বাইরে রইছে। আমি দেইক্কা আমার চোখ অন্ধকার হয়ে গেছে। সর্বনাশ। খালু সর্বনাশ হয়ে গেছে। কি হইছে? সাংবাদিক দুইডারে মাইরা ফালাইছে। নুরুন্নবী সাহেবরে বলতেছি। কী কস বুয়া? খালু আমারে বলল, কী করবি এখন? আমি কই, আমি কি করমু। যাইয়া তমাল সাহেবরে (ফ্ল্যাট মালিক সমিতির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক বদিউজ্জামান তমাল) বল। তারা তিনতলায় থাকে। তারারে যাইয়া বল। হ্যারা ফ্ল্যাটের মালিক। আমার শরীল যেন কেমন কইরা হালাইছে। প্যাসার কইম্মা গেছে। হাত-পা ঠাণ্ডা হইয়া বমি আইতাছে। পরে আমি স্যারেরে বেল দিছি। স্যার বাথরুমে। সবাই বাথরুমে। রাজ্জাক স্যার নাস্তা খাইতেছে।

হ্যায় নয়টার সময় বের হয়ে যায়। কী হইছে এত সকালে বেল দিছ কেন? তারা মনে করতাছে আমার কিছু সমস্যা হইছে। না, খালু (তমাল) আমার কিছু না। ওই যে উপরে দুজন খুন হইছে। কও কী! পরে তারা আর গ্যাছে না। ম্যাডামগুলো সব গ্যাছে। সব ম্যাডাম যাইয়া দেইককা তো আইল। তারা তো এক্কেবার সবাই কম্পমান হইয়া গ্যাছেগো। কী হইল এডা। পরে আমি কী করলাম, খালুরে বলতাছি। আমার শরীর কেমন যেন লাগে। পরে খালুরে (ফ্ল্যাট মালিক সমিতির তৎকালীন সভাপতি নূরুন্নবী) বলি, আমি চলে যাই। চইল্লা যাও, পুলিশ ধরলে তো টাটকা হুদাই বাইরাইয়া মাইরা ফেলাইব। কিছু জান না। কিছু বোঝ না। যাওগা। এইডা কইয়া গেডে (গেট) আইছি। গেডে আইলে বাইরে বের হতি দেয় না। রুনীর ভাই মোটকা একটা আছে। হ্যায় আমারে বাইর হতে দেয় না। গেডে তালা লাগাইয়া দেছে। পুলিশ না আসা পর্যন্ত কেউ ঢুকতেও পারবে না, কেউ বের হতে পারবে না। পরে আবার গেছি, চারতলায় খালুর কাছে। খালুর কাছে যাইয়া কইছি, খালু আমারে তো বাইর হতে দেয় না। কে তোমারে বাইরে তো দেবে না কেন? তুমি সিঁড়ির কাজ কর। পেডের দায়ে কাজ কর। তোমার কী সমস্যা। পরে খালু নিচে গেছে। বলছে, ওরে ছেড়ে দেন? সিঁড়ির কাজ করে। পরে আমি বাইর হইয়া বের হইয়া আইয়া পড়ছি।’

দেলোয়ারা অনেকটা একদমে এভাবে বর্ণনা দেয়ার পর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ দরজা খোলা পাইছি। কান্নাকাটি এক্কের কিচ্ছু না। ছেলে একডা গেটের সামনে দাঁড়াইয়া রইল। গেড থেকে গিয়ে উপরে উঠল। বোন একডা মরে রইছে। তাগো কোনো কান্নাকাটি কিচ্ছু না। কান্নাকাটি করছে পরে। তার মা কান্নাকাটি করছে না। আমি এডা আগে থেকেই বলছি। মেঘ সোফার ওপরে দাঁড়াইয়া আছিল। মেঘ কোনো কথা বলতাছিল না।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে দেলোয়ারা বলেন, ‘আমারে তো দেখেই বলছে, এহন যা। আমারে প্রথমবারে তো ঢুকতেই দিল না মেঘের নানু। পরে দ্বিতীয়বার যখন নুরুন্নবী খালু পাঠাইল তখন তো আমার শক্তি হইয়া গেছে। পরে তো আমি শক্ত কইররা বলছি, এহন বলতেই হইব। সহালবেলা চিৎকার পাড়তেছেন কেন? আর মেঘরে তো স্কুলে নেয়া-আনা করত মেঘের মামা। সুন্দর লাম্বাডা। তার মামা দিয়ে আইত। তার নানু আনত। রুনীর মারে আমি দেখছি একদম স্বাভাবিক। সোফায় বসে রইছে। হ্যার ভাইও স্বাভাবিক।’ তিনি বলেন, ‘আমি যাওয়ার পর সিঁড়ি ঝাড়ু দিছি। পাঁচতলা থেকে নিচ পর্যন্ত ঝাড়ু দিতে অন্তত ২০ মিনিট সময় লাগে।’

ঘরের ভিতরে গিয়ে তিনি কী দেখেছেন জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি ওদের ঘরে যাইয়া অনুমান দুই মিনিট দেখছি। আমি দেখলাম, লাশটি পড়ে আছে। রুনীর গেঞ্জি গায়ে। গেঞ্জির একটা জায়গায় কাডা। সাগরের মাথার কাছে দেখলাম, ভাঙা ছুরিটা মাথার কাছে পড়ে রইছে। ভাঙা দুই টুকরা মাথার কাছে পড়ে রইছে। কাপড়-চোপড় ছড়ানো-ছিটানো আছিল। ফ্লোরে ওইভাবে রক্ত ছিল না। শরীরে মাখা মাখা রক্ত মাথার নিচে ছিল। আর দেখলাম, পেডটার (পেট) কাছে একটু রক্ত পড়ে রইছে। আর ঘরের মধ্যে তেমন কোনো রক্তই নেই। একটা মুরগির বাচ্চা জবাই করে ছেড়ে দিলেও অনেকটা রক্ত যায়। অনেকটা জায়গায় ছড়ায়। আর দুইডা মানুষ মার্ডার। দুইডা মানুষের রক্তই তো ওইভাবে নাই। ফ্লোর মনে হল, ধোয়ামোছা। অনেক সুন্দর। রক্তের কোনো ছ্যাড়াবেড়াই নাই।’ মোবাইল কোথায় ছিল- এমন প্রশ্নের জবাবে দেলোয়ারা বলেন, মেঘের হাতে দেখলাম মোবাইল। ল্যাপটপ বিছানার ওপর আছিল। ল্যাপটপ আছিল। হ’ বিছানার ওপর আছিল।’

দেলোয়ারার কাছে প্রশ্ন ছিল- আপনি কী জানালার গ্রিল কাটা দেখেছিলেন। জবাবে তিনি বলেন, ‘এক মাস পরে যহন র‌্যাব অফিস থেকে লোক আইল। তখন আমারে ওই বাসার রুমের ভিতর নিয়ে গেল। পরে আমি দাঁড়াইয়া দেইক্কা আইছি। একটা রড কাটা বাঁকানো। হেইডার মধ্যে দিয়ে মানুষ ঢোকা সম্ভব না।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, তারা কান্নাকাটি কেউ করেনি। বাড়িওয়ালার বউ গেলে তো মেঘের নানু চিৎকার পাড়তাছিল। সুইসাইড কয়ে চিৎকার পাড়তাছিল। কেউ মেরে ফেলাইতেছে তা বলতাছে না। সুইসাইড করছে। তিনতলার খালাম্মা গেলে মেঘও একটু কান্নাকাটি করতাছে। পরে মেঘের হাত ধরে তিনতলার খালাম্মা নিয়ে আসল। নিয়ে এসে এক গ্লাস দুধ গুলাইয়ে দিছে। খাইয়া মেঘ বমি করে দিছিল।’

তিনি আরও বলেন, র‌্যাবের জাফর সাহেব একদিন আমারে মেঘের নানিদের বাসায় পাঠাইছিল। রুনীর মায়ের কাছে। আমি গিয়ে জিগাইছি, খালাম্মা মেঘরে দেখতে আইছি। আমার ইচ্ছা হইছে। পরে এ কথা হুনলে মেঘের নানি আমার লগে খুবই খারাপ ব্যবহার করল। খালাম্মা বলল, ‘তুমি নাকি র‌্যাবের কাছে বলছ, আমি নাকি ঘরের ভিতরে আছিলাম। আমি কান্নাকাটি করি নাই। ঘরের ভেতরে আছিলাম তুমি কিভাবে দেখলা। এসব কথাবার্তা র‌্যাবের সাথে বলছ তুমি। পরে আমি কইছি, খালাম্মা আমি তো দেখলাম, আপনি বসে আছেন। যা দেখছি তাই বলছি।’

তবে মামলার বাদী নওশের আলম রোমানের দায়ের করা এজহারে বলা হয়, ‘২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ৭টা ৫০ ঘটিকার সময় আমার অফিসে (ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি) কর্মরত থাকাবস্থায় আমার ছোট ভাই নওয়াজিশ আলম রিমন মোবাইলের মাধ্যমে ফোন করিয়া জানায় যে, আবার বোন মেহেরুন রুনি ও ভগ্নিপতি সাগর সরোয়ার তাদের উক্ত ভাড়াটিয়া বাসায় খুন হইয়াছে। সংবাদপ্রাপ্ত হইয়া আমি তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়া তাহাদের বেডরুমে আমার বোন ও ভগ্নিপতির মৃতদেহ মেঝেতে দেখতে পাই। আমার মাতা নুরুন্নাহার মির্জাসহ আমার ছোট ভাই রিমনের মাধ্যমে জানতে পারি যে, আমাদের ভাগিনা মেঘ অনুমান সকাল ৭টা ৩০মিনিটে আমার মায়ের মোবাইলে ফোন করিয়া বলে আমার মিম্মি (মা) বাবা মারা গেছেন।

সহিদা রাজ্জাক যা বললেন : সেদিন (১১ ফেব্রুয়ারি ২০১২) ঘুম থেকে উঠতে তাদের একটু দেরি হয়। সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে তিনি সাংবাদিক দম্পতিকে হত্যার খবর পান বাসার ইন্টারকমের মাধ্যমে। পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা তমালের স্ত্রী তাকে এই সংবাদ জানিয়েছিলেন। দরজা খুলে তমালকে নিয়ে সহিদা রাজ্জাক নিচে নেমে আসেন। বহিরাগত ঠেকাতে বাড়ির প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দেয়া হয়। এরপর বাড়ির পঞ্চম তলায় বসবাসকারী সাংবাদিক দম্পতির ফ্ল্যাটে যেতে নিচতলা থেকে লিফটে ওঠেন। ফ্ল্যাটে গিয়ে তিনি দেখতে পান, রুনীর মা এবং মেঘ ড্রয়িংরুমে বসে আছে। তাদের সঙ্গে রুনীর দুই ভাই ছাড়াও অপরিচিত দু’জন লোক ছিলেন। এ সময় সহিদা রাজ্জাক ওই দু’জনের পরিচয় জানতে চাইলে তাদের একজনকে সাংবাদিক ও অপরজনকে (লম্বা লোক) ড্রাইভার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন রুনীর পরিবারের সদস্যরা।

পরে লাশের কথা জিজ্ঞেস করলে কক্ষের দিকে ইশারা দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হয় তাদের। ওই কক্ষে গিয়ে সহিদা রাজ্জাক দেখেন সাগরের নিথর দেহের পায়ের কাছে রুনীর রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে আছে। তাদের দুজনের মুখই কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। সাগরের বুকে অসংখ্য কোপ। রুনীর পেট কাটা। তিনি যখন বের হয়ে আসবেন তখন রুনীর ছোট ভাই (নওয়াজীশ আলম রিমন) সাগরের মরদেহের দিকে ইশারা দিয়ে বলেন, ‘আন্টি দেখেন লাল কাপড় দিয়ে হাত-পা বাঁধা। ছুঁয়ে দেখেন না। জীবিত আছে কিনা?’ ‘এরপরই ওই ছোট ভাইটিই রান্নাঘরের আলোচিত সেই কাটা গ্রিল দেখিয়ে বলেন, এই গ্রিল দিয়েই চোরের দল বেরিয়ে গেছে।’ পরে তিনি ওই গ্রিল ধরে দেখেছেন। মনে মনে ভাবছেন, ছোট্ট এই ফাঁক দিয়ে মানুষ বের হতে পারবে! সন্দেহ হয় তার। এছাড়া তিনি ওই সময় রুনীর মাকে কান্না করতে দেখেননি। পরে আত্মীয়-স্বজন এলে অনেক কান্নাকাটি করেছেন রুনীর মা।

ওই সময় মেঘ কোথায় ছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, একই বাড়ির সি-৩ ফ্ল্যাটের বাসিন্দা মিসেস আতাউর মেঘকে তার ফ্ল্যাটে নিয়ে আসেন। এ সময় মেঘের শরীরে রক্তের দাগ দেখা গেছে। বাচ্চাটা ওই ফ্ল্যাটে এসেই বমি করেছে। পরে তাকে খাটে শুইয়ে দেয়া হয়। এরপরই মুন্নি সাহা (এটিএন নিউজের বার্তাপ্রধান মুন্নি সাহা) আসেন। মুন্নি সাহা মেঘকে জিজ্ঞেস করেন বাবা কে আসছিল? চোর আসছিল তোমাদের বাসায়? তখন মেঘ ‘হ্যাঁ’ বলে। মিমির (রুনীকে মেঘ মিমি বলে ডাকত) তাদের পিকনিকে দেখেছিল বলে মেঘ জানায়। এরপর আমরা চলে আসি।’ তিনি জানান, দ্বিতীয়বার গিয়ে দেখি, রুনীর মা সোফায় বসে পাউরুটি খাচ্ছেন।’ এরপর অনেক লোকজন আসে।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওই বাড়ির সিঁড়ি ঝাড়ু দেয়ার কাজে নিয়োজিত দেলোয়ারা তাকে জানিয়েছিল, ভোরবেলা সে ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে একবার রুনীর মাকে কান্নাকাটি করতে দেখে জিজ্ঞেস করেছিল কি হয়েছে? এ সময় তাকে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেয় রুনীর এক ভাই।’

সহিদা রাজ্জাক বলেন, ঘটনার পর নিচে নেমে তিনি গার্ড এনামুল ও রুদ্র পলাশকে পেয়েছিলেন। ঘুমিয়ে ছিল কেয়ারটেকার তাহের। তাহেরকে তারাই ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলেন। ‘এ সময় আমরা গার্ডদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, কে আসছিল বল তো? জবাবে গার্ডরা বলেছিল, না ম্যাডাম কেউ আসেনি।’ এ সময় সহিদা রাজ্জাক ঘটনার আকস্মিকতায় নিজের অভিজ্ঞতার কথাও যুগান্তরকে জানান।

তিনি বলেন, ‘যারাই খুনের ঘটনা ঘটাইছে তাদের এই বাসায় যাতায়াত ছিল।’ ‘এই বাসা থেকে কিভাবে যাওয়া যায়, কিভাবে আসা যায়, কখন লোকজন থাকে বা থাকে না সবই খুনিরা জানে।’ আমার ধারণা ভোর ৪টা-৫টার মধ্যেই এই কাজটা ঘটানো হয়েছে। খুনিরা নামছেও এই সময়টাতে। এটা আমার অনুমান।’ খুনিরা নেমেছেও এই (নিচতলার প্রধান গেট দেখিয়ে) গেট দিয়েই। কেননা ভোরবেলা অনেকেই ফজরের নামাজ পড়তে বেরিয়ে যায়। এ সময় গেট খোলাই থাকে।’

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রান্নাঘরের গ্রিলের যে কাটা অংশ দিয়ে খুনিরা পালিয়েছে বলে দেখানো হয়েছে তা জীবনেও সম্ভব নয়। এক প্রশ্নের জবাবে সহিদা রাজ্জাক বলেন, প্রথমে শুনেছি আত্মহত্যা করেছে। পরে ওই (রিমন) বলেছেন, ডাকাত ডাকাত ওই পথ (রান্নাঘরের গ্রিল দেখিয়ে) দিয়ে বেরিয়ে গেছে।

প্রসঙ্গত, বহুল আলোচিত মামলাটি যখন ডিবির হাতে ছিল তখন তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এ ঘটনার সঙ্গে গ্রিলকাটা চোরদের জোগসাজশ থাকতে পারে। তারা এনিয়ে তদন্ত শুরু করে।

সুইসাইড তথ্যের স্বীকারোক্তি : দেলোয়ারার দেয়া তথ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে রুনীর ভাই এবং মামলার বাদী নওশের আলম রোমান ৯ ফেব্রুয়ারি যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি যখন ফ্ল্যাটে ঢুকেছি তখন নিচে মানুষ ভর্তি।’ তবে সুইসাইডের বিষয়ে রোমান বলেন, ‘সুইসাইডের কথা আমি অফিসেও বলে এসেছি। ওরা সুইসাইড করতে পারে। বাসায় ওরা (মা ও ছোট ভাই) যখন ঢুকেছেন তখন তো তারা ভেতরে কাউকে পায়নি। সে সময় তো কেউ লাশও দেখেনি। আম্মাও দেখেনি।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি যখন আসছি তখন দেখছি, দারোয়ান পলাশকে। আর সেক্রেটারিকে (তমাল)। এছাড়া আমার আর কারও চেহারা মনে নেই। যখন আমি যাই তখন গেটের দরজা বন্ধ। ৮টা বা পৌনে ৮টা হবে। আমি জেনেছি, ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে। আমার মায়ের সঙ্গে আমার ছোট ভাই রিমন গিয়েছিল। রিমনই আমাকে ফোন দিয়ে জানায়।’

ঘটনার বিষয়ে রুনীর ছোট ভাই নওয়াজীশ আলম রিমন যুগান্তরকে বলেন, আমি তো শুধু পাশের ফ্ল্যাট ধাক্কা দিয়েছি। তারা খোলেনি। তবে তিনতলার একজন মহিলা (সহিদা রাজ্জাক) প্রথমে এসেছিলেন।’ সহিদাকে নিয়ে জানালার গ্রিলের কাটা অংশ দেখিয়েছিলেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, গ্রিলের ওখানে তো যাইনি। গ্রিল নিয়ে আমি কোনো কথা বলিনি। ওখান থেকে কোনোভাবেই মানুষের বের হওয়া সম্ভব নয়।’

সেদিনের ঘটনা জানতে চাইলে রুনীর মা নুরুন্নাহার মীর্জা বলেন, ‘আমি ভুলেই গেছি। আমার কিছু মনে নেই। মেঘের ফোন পেয়ে আমি কিভাবে গেছি, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। আমি আগে গেছি। পরে রিমন গেছে। মেইন গেট খোলা পেয়ে গেছি। এগুলো বলে কি লাভ। এগুলো মনে করতে চাইনে।’ (চলবে)

সৌজন্যে: যুগান্তর।

সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন: ভুল দিয়ে শুরু