ভুল দিয়ে শুরু

বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৫

:: নেসারুল হক খোকন ও ওবায়েদ অংশুমান ::

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার, মেহেরুন নাহার রুনির ও তাদের একমাত্র সন্তান মাহিন সরওয়ার মেঘ।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার, মেহেরুন নাহার রুনির ও তাদের একমাত্র সন্তান মাহিন সরওয়ার মেঘ।

বহুল আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনী হত্যাকাণ্ডে দায়ের করা মামলাটিতে ঘটনাস্থলের যে ঠিকানা দেয়া হয়েছে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। এজাহারে উল্লেখ করা ঠিকানা রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে পাওয়া যায়নি। বাড়িটির কোন ফ্ল্যাটে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল তাও উল্লেখ করা হয়নি। আজ বুধবার ঘটনার ৩ বছর অতিক্রম হলেও মামলার মৌলিক এসব গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি আদালতের নজরে আনা হয়নি। প্রথম এজাহার ও সম্পূরক এজাহারে ঘটনার সম্ভাব্য সময়ও দেয়া হয়েছে দুই রকম। আর বাদীর দেয়া এসব তথ্যের কারণে মামলার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলেও মন্তব্য করেছেন কয়েকজন আইনজীবী। এছাড়া পুলিশ সাগর ও রুনীর ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করলেও তা রহস্যজনক কারণে মূল জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এমনকি তদন্ত সংশ্লিষ্টদের হেফাজত থেকে গায়েব হয়ে গেছে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার হওয়া বাড়ির এক দারোয়ানের মোবাইল ফোনও।

এদিকে এই মামলায় দেয়া তথ্যমতে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাগর-রুনীর শিশুপুত্র মাহির সরোয়ার মেঘ এবং খবর পেয়ে প্রথম দেখতে আসা রুনীর মা নূরুন্নাহার মির্জা ও তার ছেলে নওয়াজিশ আলম রিমনের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি আজও নেয়া হয়নি। অথচ তাদের জবানবন্দি নেয়ার জন্য আদালত অনেক আগেই র‌্যাবকে নির্দেশনা দিয়েছিল। আদালতে জমা দেয়া র‌্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদীর অসহযোগিতার কারণে তারা জবানবন্দি দেয়ার জন্য আনতে পারেননি।
উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত রয়েছে, প্রাথমিক তথ্য বিবরণী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং প্রচলিত রীতি যে, ‘ফৌজদারি মামলার বিচারের সময় সর্বদাই ও সঠিকভাবে ইহা উপস্থাপন ও প্রমাণ করা হয়।’ প্রখ্যাত আইনবিদ গাজী শামসুর রহমান ফৌজদারি কার্যবিধির ভাষ্যে উল্লেখ করেছেন, এজাহার একটি মূল্যবান দলিল। অপরাধ বিষয়ে এজাহারই হচ্ছে আদি দলিল। এজাহার হচ্ছে সেই দলিল যার ভিত্তিতে পুলিশ সক্রিয় হয়ে উঠে।

অস্তিত্বহীন ঘটনাস্থল : সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনী ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন পশ্চিম রাজাবাজারের ৫৮/এ/২ বাড়ির ৫ তলার এ-৪ ফ্ল্যাটে। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ওই ফ্ল্যাটেই তারা নৃশংসভাবে খুন হন। ঘটনার পরদিন নিহত রুনীর ছোট ভাই নওশের আলম রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, ৫৮/২/বি পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় তার বোন ও ভগ্নিপতি খুন হয়েছেন। কিন্তু বাড়িটির কোন ফ্ল্যাটে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ড ঘটে তাও উল্লেখ করা হয়নি। যুগান্তরের অনুসন্ধানে বাদীর উল্লেখ করা আলোচিত এই হত্যার ঘটনাস্থলের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে তেজগাঁও থানার আওতাভুক্ত ৫৮/বি/২ পশ্চিম রাজাবাজারে একটি বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। যার সঙ্গে ঘটনাস্থলের কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো প্রকারের যাচাই-বাছাই ছাড়াই অস্তিত্ববিহীন এই ঠিকানাকে হত্যার ঘটনাস্থল হিসেবে লিপিবদ্ধ করেছে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ।

এদিকে বাদী নওশের আলম রোমান ঘটনার ৩ দিন পর ১৪ ফেব্রুয়ারি খোয়া যাওয়া মূল্যবান মালামালের তালিকা উল্লেখ করে শেরেবাংলা নগর থানায় সম্পূরক আরেকটি এজাহার দাখিল করেন। তবে সেখানে ঘটনাস্থলের কোনো ঠিকানা উল্লেখ করা হয়নি। এজাহার ও আলামত জব্দের ঠিকানা পৃথক হওয়ায় আইনজ্ঞরা বলছেন, আলোচিত এ মামলাটিই শেষ করে দেয়া হয়েছে। যার সুবিধা নেবে আসামিপক্ষ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আবু যুগান্তরকে বলেন, আইনের ভাষায় মামলা বাদীকেই প্রমাণ করতে হবে। বাদী যদি ভুল ঠিকানা দিয়ে থাকেন তাহলে তো মামলাই আর থাকে না। এমন কিছু হয়ে থাকলে এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তিনি বলেন, ঘটনা তো সত্য। তাই কেন ভুল ঠিকানা দেয়া হল সে বিষয়ে তদন্ত সংস্থার দায়িত্ব এ বিষয়ে বাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে তদন্ত সংস্থা বিষয়টি আদালতের নজরে আনতে পারে। আদালত স্বপ্রণোদিত হয়েও তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন।

ঢাকা বারের বিশিষ্ট ফৌজদারি আইনজীবী আমিনুল গনি টিটো যুগান্তরকে বলেন, ঘটনাস্থলের ঠিকানাই যদি ভুল হয়ে থাকে তাহলে তো মামলা নড়বড়ে হয়ে যাবেই। এটি মামলার বড় ধরনের ত্রুটি। সংশোধন করা না হলে এর সুবিধা নেবে আসামিপক্ষ। রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলা প্রমাণে ব্যর্থ হবে। এক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তার দায়িত্ব বাদীর ১৬১ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করে একজন সাক্ষীর মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা।
একই বিষয়ে সাবেক পিপি ফারুক আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বাদী ভুল করলেও থানা পুলিশের দায়িত্ব হচ্ছে ঘটনাস্থল নিশ্চিত হওয়া। এ কারণে প্রত্যেক থানায় সংশ্লিষ্ট এলাকার ম্যাপ রয়েছে। তিনি বলেন, যখনই আমলযোগ্য কোনো অপরাধ সম্পর্কে পুলিশ অবহিত হবে তখনই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিজে ঘটনাস্থলে যাবেন অথবা তার অধিন্যস্ত পুলিশ কর্মকর্তা পাঠাবেন। ঘটনাস্থল এবং ঘটনার সময় যাচাই-বাছাই করে মামলা রেকর্ড করবেন এটাই ওসির দায়িত্ব।

ফারুক আহমেদের দেয়া এই আইনি ব্যাখ্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে তৎকালীন শেরেবাংলা নগর থানার ওসি (বর্তমানে গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি) জাকির হোসেন মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মোবাইল ফোনে মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘বাদী যদি ভুল করে থাকেন তা সংশোধনের দায়িত্ব তদন্তকারী কর্মকর্তার। তবে আমার যতদূর মনে পড়ে সঠিক ঠিকানাই লেখা রয়েছে।’ তিনি বলেন, মামলা শেরেবাংলা নগর থানায় বসে টাইপ করা হয়নি। সাংবাদিক নাদিরা কিরনকে সঙ্গে নিয়ে বাদী রোমান টাইপ করা এজাহার থানায় জমা দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে মামলার বাদী নওশের আলম রোমান দাবি করেন, শেরেবাংলা নগর থানায় বসেই মামলার এজাহার দায়ের করেন তিনি এবং তার কথা মতোই মামলার এজাহার লেখা হয়। তিনি বলেন, ‘কিন্তু গত তিন বছরে এ নিয়ে তো কোনো কথা শুনতে পাইনি। আমি তো বাড়ির সঠিক ঠিকানাই লিখেছি।’ তিনি বলেন, ঠিকানা ভুল হলেও এতে কি সমস্যা হয়েছে। এতদিন কি পুলিশ-র‌্যাব এসব কিছুই দেখেনি? এই ভুলের কারণে ভবিষ্যতে আসামিপক্ষ সুবিধা পেতে পারে, আইনি ভাষায় কয়েকজন আইনজীবীর এমন আশংকার কথা জানানো হলে রোমান বলেন, ভবিষ্যৎ পরে। তিন বছর হয়ে গেল কোনো অগ্রগতিই তো দেখছি না। এ মামলায় আর কিছুই হবে না। তিনি বলেন, ‘র‌্যাব আমার সঙ্গে কথা বলছে না। আমার ফোনও ধরছে না।’

এ বিষয়ে মঙ্গলবার এটিএন বাংলার বিশেষ প্রতিনিধি নাদিরা কিরণ যুগান্তরকে বলেন, মামলা দায়ের করার সময় তিনি বাদী রোমানের সঙ্গে ছিলেন। মামলার এজাহার থানায় বসেই কম্পিউটারে কম্পোজ করা হয়েছিল।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-এর সহকারী পরিচালক এএসপি ওয়ারেছ আলী মিয়া যুগান্তরকে বলেন, বাদীর দেয়া ঘটনাস্থলের ঠিকানা অনুযায়ী থানা পুলিশ মামলা রেকর্ড করেছে।

ঘটনার সময় সম্পর্কে দুই ধরনের তথ্য : ২০১২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রোমানের দায়ের করা প্রথম এজাহারে উল্লেখ করা হয় ১১ ফেব্রুয়ারি রাত অনুমান ২টা থেকে সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে তার বোন মেহেরুন রুনী ও ভগ্নিপতি সাগর সরওয়ারকে হত্যা করা হয়েছে। এর দু’দিন পর অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারি সম্পূরক আরেকটি এজাহারে খুনের ঘটনা সম্পর্কে ভিন্ন তথ্য উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, ১১ ফেব্রুয়ারি রাত ২টা থেকে সকাল ৭টার মধ্যে খুনের ঘটনা ঘটে। এতে সাড়ে ৭টা থেকে কমিয়ে ৭টা করা হয়।

এ বিষয়ে একজন সিনিয়র আইনজীবী যুগান্তরকে বলেন, খোলা চোখে ৩০ মিনিট সময় সাধারণ ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু মামলার তদন্তে নানামুখী বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ৩০ মিনিটের ব্যবধানও অনেক প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।

ভিকটিমের মোবাইল ফোনই জব্দ হয়নি : নিহত সাগর সরোয়ার দুটি ও মেহেরুন রুনী একটি মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন। এর মধ্যে সাগর সরোয়ারের একটি মোবাইল ফোন খোয়া যায়। যুগান্তরের তথ্যানুসন্ধানে তার অপর একটি মোবাইল ফোনের সন্ধান মেলে র‌্যাবের কাছে। জানা গেছে, ঘটনার পর পুলিশের তেজগাঁও ডিভিশনের তৎকালীন ডিসি ইমাম হোসেনের নেতৃত্বে শেরেবাংলা নগর থানার এসআই আবু জাফর মো. মাহফুজুল কবির ও এসআই কামাল হোসেন নিহত দম্পতির বাসা থেকে আলামতের একটি জব্দ তালিকা তৈরি করেন। পৃথক তিনটি তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে আদালতে জমা দেয়া জব্দ তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নিহত দম্পতির পাসপোর্ট, ঘড়ি, মানিব্যাগ, রুনীর একজোড়া চটি স্যান্ডেলসহ ১১টি আলামত জব্দ করা হয়েছে। অথচ মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে রুনী ও সাগরের পৃথক দুটি মোবাইল ফোন সেট জব্দ দেখানো হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জব্দ তালিকা প্রস্তুতকারী এসআই আবু জাফর যুগান্তরকে বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে কোনো মোবাইল ফোনই পাননি। একই কথা বলেন, অপর জব্দ তালিকা প্রস্তুতকারী এসআই কামাল উদ্দিন। অন্যদিকে মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই জহিরুল আলম বলেন, ঘটনার পর তাকে জরুরি তলব করে এ মামলা তদন্তের দায়িত্বে দেয়া হয়। তিনি জানান, জব্দ তালিকা অনুযায়ী, তাকে মামলার সংক্ষিপ্ত তদন্তকার্য সমাপ্ত করতে হয়। তবে মোবাইল ফোন সেটের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। আর তাই তিনি কোনো মোবাইল ফোন সেট পরবর্তী তদন্ত সংস্থা ডিবির কাছে দেননি। শেরেৎবাংলা নগর থানা পুলিশ আলোচিত এ মামলাটি ছয়দিন তদন্ত করে। পরে মামলার তদন্তের ভার দেয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে। আর ডিবির তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক রবিউল আলম প্রথমে বলেন, মোবাইল ফোনের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। এর দু’দিন পর তিনি দাবি করেন, র‌্যাবের প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি জাফর উল্লাহকে দুটি মোবাইল ফোন বুঝিয়ে দিয়েছেন। মোবাইল ফোন দুটি কার তা তিনি স্পষ্ট করতে পারেননি। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হল- সাগর ও রুনীর ফোনসেট চিহ্নিত না হলে কিংবা ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা না হয়ে থাকলে তা র‌্যাবের কাছে দেয়ার কোনো সুযোগও নেই।

চাঞ্চল্যকর মামলাটি প্রায় দুই মাস তদন্ত করে ডিবি। পরে তদন্তে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করলে হাইকোর্ট তদন্তের জন্য মামলাটি র‌্যাবের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন। ডিবির তদন্ত কর্মকর্তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, র‌্যাবের বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এ প্রসঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তা ওয়ারেছ আলী মিয়া যুগান্তরকে বলেন, তিনি কোনো মোবাইল ফোন জব্দ করেননি। র‌্যাবের প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা জাফর উল্লাহ ডিবির কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন সেট পেয়েছেন। যার একটি সাগরের। অপরটি রুনীর। তবে তিনি দাবি করেন, মোবাইল ফোন দুটির জব্দ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এ সময় যুগান্তরের কাছে থাকা মূল জব্দ তালিকা দেখানো হলে তিনি স্বীকার করে নেন, আদালতের কাছে জমা দেয়া জব্দ তালিকায় সেই মোবাইল ফোন দুটি নেই।

জব্দ তালিকার প্রয়োজনীয়তা : বাদী রোমান মামলার এজাহারে দাবি করেন, তার ভাগ্নে মাহির সরোয়ার মেঘ রুনীর মোবাইল ফোন দিয়ে তার নানিকে খুন হওয়ার কথা প্রথমে জানায়। আর মেঘের ফোন পেয়ে তার নানি নূরুন্নাহার মীর্জা ও ছোট মামা নওয়াজীশ আলম রিমন ঘটনাস্থলে আসেন। হত্যাকাণ্ডের চারদিন পর সম্পূরক এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, নিহত সাংবাদিক দম্পতির বাসা থেকে আরও একটি মোবাইল ফোন সেট খোয়া গেছে। তবে মোবাইল সেটটি কার তা এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি।

আইনজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে এ ধরনের ফৌজদারি মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন গুরুত্বপূর্ণ একটি আলামত হিসেবে বিবেচিত হয়। মোবাইল ফোনের কললিস্টের সূত্র ধরে বহু অপরাধীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তাই এ ধরনের আলামত জব্দ তালিকায় না থাকলে তদন্তের ক্ষেত্রে নানা জটিলতা ও প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।

৩ মাস পর সম্পূরক এজাহার আদালতে : ঘটনার পরদিন দায়ের করা প্রথম এজাহারে হত্যাকাণ্ডের স্থল থেকে খোয়া যাওয়া মালামালের ব্যাপারে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। এরপর ১৪ ফেব্রুয়ারি সম্পূরক এজাহারে দাবি করা হয়, নিহত সাংবাদিক দম্পতির বাসা থেকে ল্যাপটপ, ১১ ভরি স্বর্ণালংকার ও ১টি মোবাইল ফোন সেট খোয়া গেছে। সম্পূরক এজাহারে বাদী রোমান দাবি করেন, তার বোন ও ভগ্নিপতি খুন হওয়ায় তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যান। ফলে প্রথম এজাহারে খোয়া যাওয়া মালামালের বিষয় তিনি উল্লেখ করতে পারেননি। বাদীর এ আবেদনটি সাধারণ ডায়েরি আকারে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ গ্রহণ করলেও তারা আদালতে এটি উপস্থাপন করেননি। এমনকি ডিবি পুলিশের দুই মাস তদন্তকালীন সময়ও তা আদালতের নজরে আনা হয়নি। তবে র‌্যাবের পক্ষ থেকে ওই বছরের ১৩ মে সম্পূরক এজাহারটি মূল এজাহারের সঙ্গে সংযুক্ত করার আবেদন করা হয়।

এ ধরনের ত্রুটিও মামলার বিচারের সময় আসামি পক্ষের জন্য সহায়ক হবে। দেখা দেবে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে আইনানুযায়ী এজাহার দায়েরের পর যত দ্রুত সম্ভব তা আদালতের নজরে আনতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে তা করা হয়নি।

দুটি মোবাইল ফোন গায়েব : পুলিশ এ ঘটনায় ওই বাড়ির কেয়ারটেকার আবু তাহের, দুই গার্ড এনামুল হক ও পলাশ রুদ্রপালকে আটক করে। এ সময় তাদের তিন জনের মোবাইল ফোন সেটও জব্দ করা হয়। কিন্তু এর মধ্যে এনামুলের ফোন জব্দ তালিকায় দেখানো হলেও অপর দু’জনের মোবাইল সেট জব্দ তালিকায় দেখানো হয়নি। জব্দ তালিকায় দেখানো না হলেও তা ফেরতও দেয়া হয়নি। প্রসঙ্গত, যে মোবাইল ফোন সেটটি জব্দ দেখানো হয় তার পেছনেও বড় এক রহস্যের জটলা তৈরি হয়। ঘটনার দুই মাস পর থানা পুলিশ ও ডিবি পার হয়ে যখন র‌্যাবের হাতে তদন্ত ন্যস্ত হয় তখন এক পর্যায়ে র‌্যাব একটি মোবাইল সেট জব্দ করে। সেটটি ছিল অভিযুক্ত আসামি দারোয়ান এনামুলের। আর তা পাওয়া যায় ১৫ জুলাই ডিবির তৎকালীন একজন পুলিশ কর্মকর্তার ছোট ভাইয়ের কাছে। অপরদিকে কেয়ারটেকার আবু তাহেরকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেয়া হয়। তবে তার মোবাইল ফোনটি জব্দ তালিকায় নেই। আর রুদ্র পলাশের মোবাইল ফোনের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। মামলাটির নথি র‌্যাবের কাছে আসার আগেই তার মোবাইল ফোনটি গায়েব হয়ে গেছে। ঘটনার দিন তদন্তের দায়িত্বে থাকা শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশের সব সদস্যকেই জিজ্ঞাসাবাদ করে র‌্যাব। তারপরও রুদ্র পলাশের মোবাইল ফোনের কোনো হদিস পাননি বলে লিখিতভাবে আদালতকে জানিয়েছেন র‌্যাবের তদন্তকারী কর্মকর্তা। তবে আদালত এ বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, র‌্যাব পলাশের মোবাইল ফোন সেট ও সিডিআরের জব্দ তালিকা তৈরি করেনি। কিন্তু এ মামলায় পলাশের মোবাইল ফোন সেট ও সিডিআর পর্যালোচনা করলে মামলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ রহস্য বেরিয়ে আসতে পারে।

১৬৪ ধারার জবানবন্দি চায় আদালত : গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত নিহত রুনীর মা নূরুন্নাহার মীর্জা, ছোট ভাই নওয়াজিশ আলম রিমন ও নিহত দম্পতির একমাত্র সন্তান মাহির সরওয়ার মেঘের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য তাদের আদালতে হাজির নিশ্চিত করতে আদেশ দেন। আদালত ওই আদেশে বলেন, মাহির সরোয়ার মেঘ এ মামলার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। পরে আদালতের এই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাব উল্লিখিত তিনজনের জবানবন্দি সাক্ষী হিসেবে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা মোতাবেক লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বাদী রোমানের অনীহার কারণে সে উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর তদন্তকারী কর্মকর্তা ওয়ারেছ আলী মিয়া লিখিতভাবে আদালতকে জানান, সাক্ষী হিসেবে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে নওয়াজেশ আলম রিমনসহ তিনজন আদালতে যেতে ইচ্ছুক নয়। বাদী নওশের আলম রোমান নিজেও ওই তিনজনকে আদালতে পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করেন। যে কারণে বারবার চেষ্টা করেও তাদেরকে আদালতে নেয়া সম্ভব হয়নি।

প্রয়োজন মনে করেন না বাদী : আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সাক্ষী হিসেবে পরিবারের তিন সদস্যের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি রেকর্ড প্রয়োজন মনে করছেন না মামলার বাদী নওশের আলম রোমান। কেন এই তিনজনের জবানবন্দি গ্রহণে র‌্যাবকে সহায়তা করা হচ্ছে না জানতে চাইলে রোমান যুগান্তরকে বলেন, ‘আরে ভাই, আমার তো ১৬৪ ধরার জবানবন্দি দরকার নেই। আমার মা’র অবস্থা খারাপ। আমার মা কেন কোর্টে যাবে? মেঘকে কেন আমরা কোর্টে নেব? আমার মা কেন যাবে? কি করতে যাবে? কি জবানবন্দি দেবে আমার মা? র‌্যাব চাচ্ছে, মেঘকে আমরা আদালতে নিয়ে যাই। বাদী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ১৬৪ ধারার জবানবন্দি মারাত্মক কিছু হলেও তাতে আমার কিছু যায় আসে না। অনেক দেখেছি। আমাদের কি আদালত কোনো কাগজ দিয়েছে? র‌্যাবের কথায় আমরা কেন আদালতে যাব? আমরা অনেক বড় বড় আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, আদালতে যাওয়ার কোনো প্রয়োজনই নেই। আদালত কেন আমাদের র‌্যাবকে দিয়ে ডাকাবে?’ (চলবে)

সৌজন্যে: যুগান্তর।