নিষ্ফল তদন্তের তিন বছর

বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৫

:: সাজ্জাদ মাহমুদ খান ::

sagor-runi-murderসাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনী হত্যাকান্ডের তদন্ত কার্যক্রম কার্যত থেমে গেছে। আলোচিত এ হত্যাকান্ডের আজ ৩ বছর পূর্ণ হলেও তদন্তের ফল শূন্য। মামলার দীর্ঘ তদন্তে ২৭ সাংবাদিকসহ ১৫৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্ত কার্যক্রমের ৩২টি অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে আদালতে। তবে সেসব প্রতিবেদনে হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনের কোনো অগ্রগতির কথা নেই। কারা, কেন এ সাংবাদিক দম্পতি হত্যা করল, সে রহস্য অন্ধকারেই থেকে গেছে। থানা পুলিশ আর গোয়েন্দা পুলিশের ব্যর্থতার পর কোটি টাকা ব্যয় করেও র‌্যাবের তদন্তে কোনো আশার বাণী নেই।

দীর্ঘ তদন্তে হত্যা রহস্য উদ্ঘাটন না হওয়ায় নিহতের স্বজনরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। মেহেরুন রুনীর ছোট ভাই নওশের রোমান জানান, বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছি। আল্লাহ বিচার করবে। এ ৩ বছরের সব কিছু দেখে এখন আর বিচারের আশা করতে পারছি না। কোথাও আশার কোনো কিছু দেখছি না। জানি না, এ ঘটনার বিচার কোনো দিন হবে কিনা। মামলার তদন্ত কর্মকর্তারাও এখন কোনো কথা বলছেন না। তবে মামলাটির তদন্ত সংস্থা র‌্যাব জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগারে পাঠানো হত্যার আলামত থেকে পাওয়া ডিএনএ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। মামলার তদন্ত সঠিক গতিতে চলছে। তদন্তেও যথেষ্ট অগ্রগতি আছে। সময়মতো সব কিছু জানা যাবে।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া ফ্ল্যাট থেকে মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনীর ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করা হয়। একদিন পর চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওপর ন্যস্ত করা হয়। ৬২ দিনের মাথায় হাইকোর্টে ব্যর্থতা স্বীকার করে ডিবি। এর পর আদালতের নির্দেশে ওই বছর এপ্রিল মাসে তদন্তভার নেয় র‌্যাব। ভিসেরা পরীক্ষার জন্য সাগর-রুনীর লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে সংস্থাটি। ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী নিহত দম্পতির শিশুপুত্র মাহী সরওয়ার মেঘের সঙ্গে দফায় দফায় কথাও বলে তারা। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতার করা হবে। তৎকালীন পুলিশের আইজিপি শুনিয়েছিলেন প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতির বাণী। তবে দীর্ঘ ৩ বছরের তদন্তে অগ্রগতি শূন্যই রয়ে গেছে।

র‌্যাব জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা সাগর-রুনীর রক্তমাখা জামাকাপড়, বঁটি, মোজাসহ কিছু আলামত পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণাগারে পাঠানো হয়। গত বছর মার্চে ডিএনএ প্রতিবেদন পায় র‌্যাব। ওই প্রতিবেদন পাওয়ার আগ পর্যন্ত র‌্যাব বলে আসছিল, ডিএনএ প্রতিবেদন হাতে এলে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে র‌্যাব। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া ফরেনসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, আলোচিত এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় ৩২ বার তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ প্রতিবেদন দেয়া হয় ২ ফেব্রুয়ারি। হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গ্রেফতার হওয়া সাতজন বর্তমানে কারাবন্দি। সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার হওয়া তানভীর রহমান নামে একজন সম্প্রতি জামিন পেয়েছেন। আদালতের নির্দেশে ফের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে সাগর-রুনীর বাসার নিরাপত্তা রক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনামুল হক ওরফে হুমায়ুনকে। এনামুল ও পলাশ রুদ্র পাল গত মাসে আদালতে ১৬১ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। গ্রেফতারকৃত অন্যরা হলেন রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মোঃ সাইদ, মিন্টু ও কামরুল হাসান অরুণ। তারা ২০১৩ সালের আগস্টে মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক নারায়ণ চন্দ্র হত্যার ঘটনায় র‌্যাব ও ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। তবে তারা কেউ হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেননি।

দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ছে মেঘ : নিহত সাংবাদিক দম্পতির একমাত্র ছেলে মাহী সরওয়ার মেঘ আনন্দ নিকেতন স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ছে। মামা নওশের রোমানই এখন তার খেলার সাথী। নওশেরের ফার্মগেটের বাসা থেকে কলাবাগানের স্কুলে যাতায়াত করে মেঘ। কিন্তু হত্যাকান্ডের পর যারা মেঘের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন, তাদের কেউই পরে তার কোনো খোঁজ নেননি। নওশের রোমান জানান, মেঘ ভালো আছে। এবার দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠল। যারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তারা কখনও মেঘকে একবার দেখতেও আসেননি বলে জানান তিনি।

সৌজন্যে: আলোকিত বাংলাদেশ।