সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান

রবিবার, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৫

:: তৌহিদুর রহমান, আসাম থেকে ফিরে ::

Journalist killসংঘাত ও সহিংসতার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকে রুখে দাঁড়াতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যমকে অসম্প্রাদায়িক চেতনাও লালন করা উচিত। শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য গণমাধ্যম হতে পারে প্রধান হাতিয়ার। ৩০-৩১ জানুয়ারি ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।

‘শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা’- শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ। সেমিনার উদ্বোধন করেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সোমনাথ দাশগুপ্ত।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অধ্যাপক সোমনাথ দাশগুপ্ত বলেন, একটি সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি, সংস্কৃতি থাকে। তবে কখনো কখনো সমাজে সংঘাত ও সহিসংতাও দেখা যায়। তাই সহিংতা, সংঘাত ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গণমাধ্যম বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরো বলেন, ভারত উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রায়িক সম্প্রীতি রয়েছে। আবার বিভিন্ন সময় দুই ধর্মেও মানুষের মধ্যে সংঘাতও হয়েছে। তবে এখন মনে রাখতে হবে, সংঘাত শুধু ধর্মকে কেন্দ্র করে হয় না। বিভিন্ন কারণে সংঘাত হয়ে থাকে। এসব সংঘাতপূর্ণ সংবাদ পরিবেশনে গণমাধ্যমকে সতর্ক হতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সেমিনারে ভারতের বিবিসি একাডেমীর অধ্যাপক রামেন্দু ভট্টাচার্য বলেন, সংঘাত ও সহিংসতার খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে বিশেষ সতর্ক হতে হবে। গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের খেয়াল রাখতে হবে, একটি খবরে সহিংসতা ও সংঘাত আরো বেড়ে যেন না যায়।

কোলকাতার হীরালাল মজুমদার কলেজের সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুজাতা মুখার্জী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্প্রীতি রয়েছে। এই সম্প্রীতি ঐতিহাসিক। তবে অতীতে দেখা গেছে রামরাজ্যের ধোয়া তুলে অশুভ শক্তি দুই দেশের সম্প্রীতি নষ্ট করতে চেয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে দুই দেশের গণমাধ্যমকে সতর্কভাবে সংবাদ পরিবেশন করতে হবে।

আহমেদাবাদের মুদ্রা মিডিয়া ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক টি টি শ্রীকুমার বলেন, ধীরে ধীরে বিশ্ব বদলে যাচ্ছে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে গণমাধ্যম। গণমাধ্যম দিনে দিনে অনেক বেশি ক্রীয়াশীল হয়ে উঠছে। সে কারণে গণমাধ্যমকে অনেক বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। কেননা গণমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাবে সাম্প্রদায়িকতা ও শান্তি বিনষ্ট হতে পারে।

ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক রাজীব ভট্টাচার্য বলেন, সংঘাতময় সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনে সাংবাদিককে চৌকষ হতে হবে। কেননা বিভিন্ন সময় জঙ্গি গোষ্ঠী তাদের নিজেদের স্বার্থে সাংবাদিককে সংবাদ দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সাংবাদিককে মনে রাখতে হবে, তিনি নিজে জঙ্গিগোষ্ঠীর দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছেন কি-না। তাই জঙ্গিগোষ্ঠীর খবর পরিবেশনে গণমাধ্যম কর্মিদের সতর্ক হতে হবে।

আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চার্বাক ও ত্রিপুরার সাংবাদিক তন্ময় চক্রবর্তী যৌথভাবে একটি উপস্থাপনায় বলেন, সংঘাতের সময় পত্রিকায় সম্পাদকীয় কেমন হবে, সেটা খুবই বিবেচনার বিষয়। ১৯৮০ সালে ত্রিপুরার একটি প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক একটি সম্পাদকীয় পরিবেশন করেছিল। সেই সম্পাদকীয়তে ঐতিহাসিক দাঙ্গার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। এতে করে আবারো দাঙ্গা লাগার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। সে কারণে শুধু খবর নয়, সম্পাদকীয় লেখার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে।

সেমিনারে অন্যান্য বক্তারা বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন জাতিগত সমস্যা রয়েছে। তাই এই অঞ্চলের সংঘাতময় খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রেও গণমাধ্যম কর্মিদের সতর্ক থাকতে হবে। কোনো খবরই যে সংঘাতকে উস্কে না দেয়, সে বিষয়টি প্রথমে চিন্তা করতে হবে।

সেমিনারে আরো বক্তব্য রাখেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বরুণজ্যোতি চৌধুরী, অধ্যাপক রমা ভট্টাচার্য, অধ্যাপক এম এম পান্ডে প্রমুখ। সেমিনারে বিভিন্ন দেশ থেকে গণমাধ্যম কর্মিরা যোগ দেন।

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক জনকণ্ঠ।