কমছে সাংবাদিকদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা?

বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৫

:: সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ::

22092012090229pmIstiak_Rezaপ্রযুক্তির বিকাশে বদলে যাচ্ছে সাংবাদিকতার ধরন। আমরা সবাই তা জানি এবং বুঝতেও পারছি। কিন্তু সেই বদলে যাওয়ায় সংবাদকর্মীদের উদ্ভাবনী ক্ষমতাও স্থূল হয়ে আসছে? এমনটাই বলছেন অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফিলিপ মেয়ার সম্প্রতি বেশ কিছু লেখালেখিতে এমনটা বলছেন।

তার বিখ্যাত বই “The Vanishing Newspaper: Saving Journalism in the Information Age” বেশ কয়েক বছর আগের। তবে “The Next Journalism’s Objective Reporting” শিরোনামের সাম্প্রতিক এক লেখায় তিনি বলছেন, গণমাধ্যমকর্মীরা ক্রমেই সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী চিন্তা থেকে সরে আসছে। আর এর কারণ হলো পত্রিকার প্রচার কমছে, টেলিভিশনের দর্শক কমছে আর কমে যাচ্ছে আয়।

উদ্ভাবনী দক্ষতা গণমাধ্যম জগতে বহুল আলোচিত এবং একইসঙ্গে অধরা এক বিষয়। কেউ তা করে দেখায়, কেউ কেউ চেষ্টা করে তা আয়ত্ব করতে। কিন্তু বেশিরভাগ গণমাধ্যমকর্মীই এ নিয়ে ভাবে না বা ভাবতে চায় না। তারা চলে সনাতনী পথে।

তবে উদ্ভাবনী দক্ষতার প্রসার কিন্তু দেখছি আমরা। ফলে যে কেউ আজ প্রযোজক হয়ে যাচ্ছে, তা সেই ইউটিউব হোক, বা সেলফোনে দেওয়া সংবাদ হোক। সংবাদের ওপর সাংবাদিকদের একক কর্তৃত্ব বা মনোপলি কমছে, নাগরিকরাই হয়ে যাচ্ছেন রিপোর্টার। জন-সাংবাদিকতা দখল করে নিচ্ছে সাংবাদিকতার সব শাখা। তবে মেয়ার বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই জন-সাংবাদিকতার একটি নাম আজও ঠিক হয়নি। কেউ বলছেন, ‘সিভিক জার্নালিজম’, কেউ বলছেন ‘সিটিজেন জার্নালিজম’, বা ‘কমিউনিটি জার্নালিজম’।

খবর সংগ্রহ ও প্রচারে আজ আমরা এক ডিজিটাল যুগে আছি। ইন্টারনেটের বিকাশে মানুষ আজ সংবাদ পায় না, নাকি সংবাদই মানুষকে খুঁজে নেয় তা বলা খুব মুশকিল। তথ্য প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থায় মানুষের অভিমত প্রকাশের আর নির্দিষ্ট কোনও স্থান লাগছে না। যে কেউ যেকোনও মতামত তুলে ধরছেন এই জন-সাংবাদিকতার বিশাল জগতে।

এমন এক আংশীদারিত্বের সূচনা হয়েছে, যেখানে সংবাদ আর মানুষকে খুব একটা প্রভাবিত করছে না, মানুষই বরং সংবাদকে প্রভাবিত করছে এবং একই সাথে প্রভাবিত হচ্ছে রাজনীতি, সামাজিক রীতিনীতি। Arianna Huffington এই অবস্থাকে বলছে Hybrid Future of Journalism।

সংবাদের সাথে মানুষের সম্পর্ক বদলেছে, সৃষ্টি হয়েছে নতুন ধরনের সংবাদ গ্রাহক, যারা নিজেরাই আবার সংবাদকর্মী। এই অবস্থায় এক-একটি মানুষ হয়ে উঠছেন খুবই ব্যক্তিকেন্দ্রিক কিন্তু আবার ক্ষমতাধর। নিজের জগৎটাকে পরিণত করছেন ‘দৈনিক আমি’তে। কারণ সে বুঝতে পারছে ব্লগ হোক, ইউটিউব হোক, ফেসবুক বা টুইটার যে মাধ্যমই হোক না কেন তার চিন্তাভাবনার প্রভাব পড়ছে বড় আকারে। তার জ্ঞান, তার ভাবনা, তার আলোচনা, কোনও রাজনৈতিক দল বা বড় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বা বিপক্ষে তার মতামত দেওয়ার জায়গা পেয়ে গেছেন।

এটি এক চরম বাস্তবতা সাংবাদিকদের জন্য, গণমাধ্যমের জন্য। তারা বুঝতে পারছে, অথবা বাধ্য হচ্ছে বুঝতে যে পরিবর্তন প্রয়োজন। কী সেই বুঝতে পারা? তা হলো সাংবাদিকরা আজ আর তথ্য বা বার্তার নিয়ন্ত্রক নয়। আগের যুগে তারাই নির্ধারণ করত কোনটা সংবাদ আর কোনটা নয়, কোন তথ্যের সংবাদমূল্য আছে, কোন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ এবং তা কী করে মানুষকে দেওয়া হবে। মানুষও সেভাবেই গিলতে বাধ্য হতো।

সিএনএন যখন সাত দিন, চব্বিশ ঘণ্টা সরাসরি সম্প্রচার শুরু করলো ১৯৮১ সালে, মানুষ দেখতে পারলো কী ক্ষমতা টেলিভিশনের। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরাসরি সম্প্রচার দেখে মানুষ উদ্বেলিত, উচ্ছ্বসিত ছিল অনেকদিন। টিভি সেটের সামনে থেকে সরে যাওয়া ছিল কঠিন সিদ্ধান্ত। কিন্তু এখন হাতে হাতে ওয়েব ভিডিও। ব্রেকিং নিউজ এখন টিভি পর্দায় আসার আগে পাওয়া যায় টুইটারে-ফেসবুকে।

মানুষ বিশেষ করে তরুণরা এই উদ্ভাবনকে পছন্দ করছে। প্রযুক্তিনির্ভর তারুণ্য আজ তথ্যের নিয়ন্ত্রক, প্রচারক এবং তারাই প্রভাবিত করছে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে। আর এতে করে রাজস্ব কমছে সনাতনী গনমাধ্যমের।

বাঁচা-মরার লড়াইয়ে পত্রিকা ও সম্প্রচার মাধ্যম। তারাও এখন ছুটছেন সাইবার জগতে, জন-সাংবাদিকতা স্রোতে মিশতে। কিন্তু মেয়ার বলছেন, এভাবে শুধু এলেই হবে না। কারণ জায়গাটি দখল করেছে সাধারণ মানুষ। অসাধারণ উদ্ভাবনী কোনও কনটেন্ট না নিয়ে এখানে এলে প্রত্যাখ্যাতই হতে হবে।

প্রচলিত ব্যবসার ধরনে টিকে থাকার সুযোগ নেই। আয় কখনো বাড়বে না, কমতেই থাকবে। মেয়ারের পরামর্শ আয়ের নতুন উৎস খোঁজার। ব্র্যান্ড বা খ্যাতিকে পুঁজি করে নতুন জানালা খুলতে হবে এসব মাধ্যমকে। এই ভার্চুয়াল জগত চায় বিশ্বস্ত সঙ্গী যে তার সব চাওয়াকে গুরুত্ব দিবে, তার অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করবে।

ব্যবসায় উদ্ভাবনী দক্ষতা ছাড়া কোনদিনও টিকে থাকা যায় না, এ কথা অনেক পুরনো। কিন্তু গণমাধ্যম আজ যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে তাকে ব্যাখ্যা করা খুব জটিল। গণযোগাযোগ বিশষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ চিন্তাভাবনা নয়, তুমি ‘ডিসরাপটিভ’ কিছু করো টিকে থাকার জন্য। অর্থাৎ উল্টোপথে, সৃজনশীল পথে হাঁটতে হবে, নিজের মতো করে। তবেই তৈরি হবে তোমার আলাদা ব্র্যান্ড। এখন হবে exemplary journalism, মানুষের সাথে সরাসরি, খোলামেলা কথা।

লেখক: পরিচালক (বার্তা), একাত্তর টিভি
সৌজন্যে: বাংলাট্রিবিউন।