গণমাধ্যম বনাম গণতন্ত্রের প্রত্যাশা

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৯, ২০১৫

:: আকাশ মো. জসিম ::

newsmediaগণতন্ত্র এবং গণমাধ্যম একটি অপরটির সমর্থক ও পরিপূরক। একটি ছাড়া অপরটি পুরোপুরিই কল্পানাতীত ও সংকটাপন্ন। গণতন্ত্র থাকলে গণমাধ্যমও অত্যাবশ্যকীয়ভাবে থাকতে বাধ্য। গণতন্ত্র বিপন্ন হলে গণমাধ্যম তা পূনরুদ্ধারের চেষ্টায় সচেষ্ট হয় যুগ-যুগ ধরে, দেশে-দেশে। বোধ করি সে কারণে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলে এটি পরিগণিত।

পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোর রীতি-রেওয়াজে কোন কালে কোন গণমাধ্যমই শৃংখলিত হয়নি। আর যদি হয়েই থাকে তবে তা গণঅস্তিত্ব হারিয়ে নিজ মাধ্যমইে পরিগণিত হয়। একসময় সেসব গণমাধ্যম তার স্বীয় মর্যাদার ঠিকানায় থাকে না। আমাদের দেশেও যেমন থাকেনি দলীয় আদর্শ লালিত গণমাধ্যমগুলো।
তবে, আমরা সহজ, সরল, সত্য ও সুন্দরভাবে বিশ্বাস করি কোন গণমাধ্যম স্বীয় মর্যাদা হারানোর পেছনে তার পরিচালকও কমবেশী দায়ী। পরিচালিত গণমাধ্যম জনপ্রত্যাশার জায়গায় বিঘ্ন ঘটালে গণমানুষের বিশ্বাস, ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সর্বোপরি আস্থা হারানোই স্বাভাবিক।

একটি বিষয় প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করতে চাই যে, আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় কোন সংবাদপত্র প্রকাশকালে জনপ্রত্যাশার অঙ্গিকারনামায় প্রস্তাবিত পত্রিকার প্রকাশক, সম্পাদক ও মূদ্রাক্ষরিকের মতবাদ বা কার্যকলাপ স্থলে বস্তনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও বিশ্লেষণধর্মী বলে স্বীকৃতি প্রদান করলেও পরবর্তীতে সে জায়গা থেকে বিচ্যুতি কোনভাবেই অঙ্গিকারনামা রক্ষার সহায়ক নয়।

অথচ, আমাদের পুরো দেশ এবং রাষ্ট্র জুড়ে উপরোক্ত নিয়ম-নীতি ক্রমেই লংঘিত হয়ে চলছে অহরহ ও ধারাবাহিকভাবে। রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিশীল সে গণমাধ্যমগুলোর কর্ণদ্বাররা নীতিচ্যুতি ঘটিয়ে করছেন একক পক্ষপাতিত্ব ও চরম দলবাজি। কেউ সরকার পক্ষে কেউবা বিরোধীদের। আর তখনই ফাটল ধরছে আমাদের আস্থার জায়গায়।

তবে, এক্ষেত্রে বিশিষ্ট সাংবাদিক মাহফুজ আনাম, নাইমুল ইসলাম খানসহ কেউ কেউ নাগরিক সমাজের পক্ষে কিছুটা হলেও সোচ্চার ও ন্যায়পরায়ণতা রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন। একইসাথে, তাঁরা সত্যকে সত্য বলার অকার্পণ্য ও প্রাণবন্ত চেষ্টা আমাদের গণমাধ্যমের চিত্তাকর্ষণ ও শক্তি সঞ্চারে অনেকটা অবদান রাখার চেষ্টা দেখে আমরা আশান্বিত।

মহান স্বাধীনতা সংগ্রামেও এদেশের গণমাধ্যম কর্মীরা দলবাজি ও পক্ষপাতিত্ব করেছেন, তবে তা ছিল একটি রাষ্ট্রের একটি দেশ, পুরো জাতির মহান স্বাধীনতার প্রশ্নে।

সম্প্রতিককালে, স্বাধীন দেশের সাংবাদিকদের মধ্যে দলবাজি, পক্ষপাতি আমাদের মহান সাংবাদিকতা পেশা কিংবা জাতিকেও বিভক্ত করার অপপ্রয়াস দেখে আমরা স্তম্ভিত, বিস্মিত ও প্রশ্নবিদ্ধ। নাগরিক হিসেবে আমাদের দলবাজি করার অধিকার আছে, তবে তাও কতটুকু? রাজনৈতিক দলের কর্মী কিংবা নেতার খাতায় নাম লিখিয়ে গণমাধ্যম কর্মীও নিরপেক্ষতার ভান-বনিতা কতটা সহনীয় ও সমীচিন তাও একজন পেশাদার গণমাধ্যম কর্মীকে ভাবিয়ে তোলা সহজ ও স্বাভাবিক।

ইতোমধ্যে ঢাকার এক থানায় বিশিষ্ট সাংবাদিক নেতা ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদকে আসামী করে গাড়ি পোড়ানোর মামলা রুজু করেছেন থানার পুলিশ। এ ঘটনায় জাতীয় প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিক নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা তীব্র নিন্দা জানিয়ে শওকত মাহমুদের নাম প্রত্যাহারের দাবি করেছেন।

দুর্ভাগ্যজনক, খবরটি শুনে আমরা লজ্জিত ও ব্যথিত হয়েছি। একইসাথে একজন গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে এ কথা বলা অবান্তর হয় না যে জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতিকে যদি এরুপ ঘৃণ্য একটি মামলায় আসামী করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কারো সম্মান অক্ষুন্ন রাখার সহায়ক হয় না।

এক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে গণমাধ্যমের কিংবা এ পেশায় নেতৃত্বদানকারীদের মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাঁরা কি দলবাজির শৃংখল খুললে মর্যাদা সহায়ক হয় না!

আমরা মনে করি, বিশিষ্ট সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, আবেদ খান কিংবা মনজুরুল আলম খান বুলবুলরা কোন একটি দলের হয়ে একপেশে ও নির্লজ্জ দুতিয়ালি যদি ন্যায় ও সঙ্গত হয়; তাহলে শওকত মাহমুদ কিংবা রুহুল আমিন গাজিরা কোন পক্ষপাতিত্বকে অপরাধ হিসেবে মনে করা কতটা যুক্তিযুক্ত ও সমঅধিকার ভিত্তিক?

আবার, মহান মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগানের কৃতিত্ব কিংবা ইতিহাস নিয়ে যখন তাঁরা বলেন, তখন আমাদের মধ্যে এ বোধদয় হওয়াও দরকার যে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে শওকত মাহমুদদের সমর্থিত দলের নেতার অবদানও অনেক। আবার, গণমাধ্যম কর্মীর ছদ্মাবরণে জাসদ, বাসদ, কমিউনিষ্ট কিংবা নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা রেখে নিরপক্ষেতার আবরণও কোন গণমাধ্যম কর্মীর মর্যাদা ও পেশাদারিত্ব রক্ষার সহায়ক নয়।

ইদানিংকালে দেখছিলাম, রাষ্ট্র ব্যবস্থায় একটি গোষ্ঠিীর পক্ষে সমাজের কিছু সুবিধাভোগী, স্বাার্থান্বেষী ও মোহপ্রিয়রা চাটুকারিতা কিংবা মিথ্যাচারিতা করতে পারলেই বলা হয় তিনি খুবই জানেন ও বুঝেন। অপরগোষ্ঠিীর পক্ষে গেলেই যেন যতসব। নিজের যেন সত্যাচার অপরেরটি অনাচার! এ এক হীনতা, দৈন্যতা ও নির্লজ্জতা আমাদের পুরো সমাজ ব্যবস্থায় বিশাল এক অন্তরায়ের উদাহরণ।

কিন্তু, জাতির গণমাধ্যমের কতেক সাংবাদিক নেতা শুধু নিজ ও স্বীয় দর্পণকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রাণান্তর চেষ্টায় অন্যদের হেয় করতেও একটুখানি চিন্তিত হন না। সম্প্রতি, একটি বেসরকারী চ্যানেলের টকশো অনুষ্ঠানে এক (আওয়ামী ঘরোনার) সাংবাদিক নেতা বলেছেন, শওকত মাহমুদ, রুহুল আমিন গাজী একজন নেত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা। সাংবাদিকতা কিংবা নেতৃত্ব দিতে হলে সেসব থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তিনি সেসব বলতে গিয়ে সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরী একটি ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক; অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদেও দায় দায়িত্ব পালন ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা ভোগের সত্যতা বেমালুম ভুলে গেছেন দেখে আমরা দু:খিত।

তাই, জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে এবং সার্বিক পেশাদারিত্ব কিংবা গণতন্ত্রের স্বার্থে এ কথা অকপটে আমারও বলতে ইচ্ছে হয়, এখনই সিদ্বান্ত নিতে হবে ‘হয় গণমাধ্যম কর্মী; নয়তো রাজনৈতিক দলের তল্পিবাহক।’ একইসাথে দু’টো রেখে কোন এক সাধু সংবাদকর্মী সাজার ভান-বনিতা কোন গণমাধ্যম কর্মীর শিষ্টাচার কিংবা গণতন্ত্রের জন্য শুভ, সুন্দর, সহজ ও সহায়ক নয়।

লেখক : সম্পাদক, দৈনিক দিশারী ও নোয়াখালী প্রতিনিধি, দৈনিক বাংলাদেশ সময় ও ডেইলী সান।