বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত কিরণ সাহা

শনিবার, জানুয়ারি ২৪, ২০১৫

:: ইন্দ্রজিৎ রায় ::

kiron sahaকিরণ সাহা দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে একাগ্রচিত্তে সাংবাদিকতা পেশায় একজন পেশাদার ও সৎ সাংবাদিক হিসেবে সব মহলের কাছে পরিচিত ছিলেন। টানা ১৪বছর দৈনিক যুগান্তরের যশোর ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। সবার প্রিয় এই মানুষটি ২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যুগান্তর যশোর ব্যুরো অফিসে কর্মরত অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তাঁর অকাল প্রয়াণে ব্যাথিত স্বজন, বন্ধু শুভাকাক্সক্ষী।

আমি অনুজ সহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে এক গভীর সম্পর্কের জালে আবদ্ধ হয়েছিলাম। তাঁর প্রয়াণে অভিভাবকহীন একজন তারুণের চলা কেমন কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং সেটা টের পেয়েছি গত একটি বছর। একটি বিশাল বটবৃক্ষের সুশীতল ছায়ায় দুটি বছর কাজ করেছি। সুখে দুখে তার কাছে আশ্রয় পেয়েছি। সেই মানুষটি আমাদের মাঝে নেই। তাঁর শূন্যতা পূরণ হবার নয়। বিগত একটি বছর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে কাজ করতে গিয়ে অনুভব করেছি কর্তব্য ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করা কতটা চ্যালেঞ্জিং। প্রতিটি পদে পদে প্রিয় মানুষটির শূন্যতা অনুভব করেছি।

সংকটে সংগ্রামে তাঁর নীতি আদর্শ আর দিকনির্দেশনা আমাকে প্রেরণা দেয় প্রতিটি মুহূর্তে। তাঁর দেখিয়ে যাওয়া পথে হাঁটছি। একজন অভিভাবক হিসেবে তিনি আমাকে শাসন করেছেন যেমন, তেমনি সোহাগও করেছেন। সেদিন তিনি অভিভাবকের ভূমিকায় ছিলেন। তাই হয়তো আজ আমি তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস পেয়েছি। প্রতিটি মুহূর্তে তার স্মৃতি আমাকে তাড়িত করে। কোনটি করা উচিত আর কোনটি করা উচিৎ নয় সে ব্যাপারে তার দিকনির্দেশনা আজও আমার স্মৃতিতে ভাস্বর। আমি অনুভবের অনুভূতি থেকে তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করছি।

কিরণ সাহা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক হিসেবে দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন আমৃত্যু। কিরণ সাহা ২০০০ সালে দৈনিক যুগান্তর যশোর অফিসে ব্যুরো প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। তিনি যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও অবিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। তিনি দীর্ঘ কয়েক বছর যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

এছাড়াও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহসভাপতি ছিলেন। যশোর প্রেসক্লাবেও বেশ কয়েকবার সহ-সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সাংবাদিকতার হাতে খড়ি গোপালগঞ্জ থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘আলোর দিশারী’ পত্রিকার মাধ্যমে। মকসুদপুর প্রতিনিধি হিসেবে এ পত্রিকার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ছিলেন। পরবর্তীতে যশোরে এসে কলেজে পড়াশুনার পাশাপাশি দৈনিক ‘স্ফুলিঙ্গে’ শিক্ষানবিশ স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন। সেটি ১৯৭৭ কিংবা ১৯৭৮ সাল হবে।

পেশাগত দক্ষতার গুণে পদোন্নতি পেয়ে এ পত্রিকায় তিনি দীর্ঘদিন বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। স্ফুলিঙ্গে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ৮২ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক দেশবাংলায় যশোর জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করেন। এ পত্রিকার সাংবাদিক হওয়ার সুবাদে ওই বছরই তিনি যশোর প্রেসক্লাবের সদস্য পদ লাভ করেন। পরবর্তীতে দৈনিক খবর ও বাংলাবাজার পত্রিকায়ও যশোর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন।

প্রচার বিমুখ এই মানুষটি সাংবাদিকতার পাশাপাশি ছড়া লেখায়ও হাত পাকিয়েছিলেন। এছাড়া সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ, চাঁদেরহাট, পুনশ্চ যশোরসহ আরো কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৫৪ সালের ৫ জুলাই গোপালগঞ্জের মকসুদপুরে উপজেলার অজপাড়া গাঁ মহারাজপুরে জন্ম গ্রহণ করেন।

তাঁকে হারানোর এক বছর পূর্তিতে স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে যুগান্তর স্বজন সমাবেশ ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। আজ বিকেল সাড়ে ৪টায় উদীচী চত্বরে সাংবাদিক, ছড়াকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কিরণ সাহার স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। একই সাথে শহরের পুরাতন কসবা আজিজ সিটির বাসভবনে স্বর্গীয় কিরণ সাহার আত্মার শান্তি কামনায় পরিবারের পক্ষ থেকে গীতা পাঠ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। তথ্যসূত্র: পাক্ষিক যশোরের কাগজ।

লেখক: সাংবাদিক, দৈনিক যুগান্তর, যশোর ব্যুরো।