সফলতার রহস্য ‘টিম স্পিরিট’: নতুন বার্তার সম্পাদক সরদার ফরিদ

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ১০, ২০১৩

(নতুন বার্তা ডটকম’র যাত্রা শুর উপলক্ষ্যে প্রিয়.কম’র পক্ষ থেকে সম্পাদক সরদার ফরিদ আহমদের একটি সাক্ষাৎকার নেয়া হয় গত ১৮ নভেম্বর। প্রিয়.কম-এ ২০ নভেম্বর আপলোড করা সাক্ষাৎকারটি প্রেস বার্তার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।)

image_787_0
(প্রিয় টেক) বন্ধ হয়ে গেছে দেশের বহুল প্রচারিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল “বার্তা২৪ ডটনেট”। চালু হয়েছে “নতুন বার্তা” নামের একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল। অল্প দিনেই বার্তা২৪ ডটনেটকে পাঠক প্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার নেপথ্য কারিগর ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক সরদার ফরিদ আহমদ। তিনি এবার তার আগের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে চালু করেছেন “নতুন বার্তা”। তিনি প্রিয়.কমের সাথে বাংলাদেশে অনলাইন নিউজ পোর্টালের বর্তমান ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন।

প্রিয় টেক: বার্তা২৪ ছেড়ে নতুন মিডিয়া হাউজ করার প্রেক্ষাপট কি ছিল?
সরদার ফরিদ আহমদ: অনেকগুলো প্রেক্ষাপট ছিল। তার মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের হস্তক্ষেপ এবং মফস্বল সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে জটিলতা ছিল প্রধান কারণ। তাছাড়া মালিকপক্ষ থেকে সম্প্রতি নিউজে যে লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল তারা কোয়ালিটিসম্পন্ন ছিল না। মফস্বলে যারা আমার সাথে কাজ করেন তাদের অনেকেই আমার পরিচিত। কাউকে বিনা পয়সায় কাজ করানোর পক্ষে আমি নই। আর তাই গত ১৫ সেপ্টেম্বর মালিকপক্ষের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত হয় নভেম্বরের ১ তারিখ আমি চাকরি ছাড়ছি। সেপ্টেম্বরের শেষ সাত দিন আমি ছুটিতে ছিলাম। এ সময় যারা নতুন জয়েন করেছিল তাদের সাথে মালিকের বিরোধ হলে তাদের ছাঁটাই করা হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে বার্তা২৪-এর প্রতিষ্ঠাতা। ইচ্ছা ছিল বার্তা২৪ বেঁচে থাকুক। কিন্তু মালিকের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বার্তা২৪-কে আর বাঁচানো গেল না। মালিকের সাথে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। বকেয়া যা পড়েছে সেগুলোর ব্যাপারে বিরোধে যেতে চাইনি। তারা অক্টোবর পর্যন্ত বেতন পরিশোধ করেছেন।

প্রিয় টেক: নতুন অনলাইন মিডিয়া হাউজ করছেন, তার নাম কি রেখেছেন? কেমন সাড়া পাবেন বলে আশা করছেন?
সরদার ফরিদ আহমদ: নতুন খবর দিতে চাই, তাই নাম রেখেছি ‘নতুন বার্তা’। ওয়েবসাইটের ঠিকানা http://natunbarta.com। গত ১৪ নভেম্বর সকাল ১০টায় প্রথম নিউজ আপলোড করে অনলাইন নিউজ সাইটটি প্রাথমিক যাত্রা শুরু করেছে। আগামী ১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এর পথচলা শুরু হবে। আমরা নতুন এই সাইট নিয়ে অনেক আশাবাদী। আশার কথা হচ্ছে আমরা অল্প কয়েকদিনেই এলেক্সার বাংলাদেশে শীর্ষ ২৫০০ ওয়েবসাইটের তালিকায় চলে এসেছি। মানুষ নিরপেক্ষ নিউজ চায়। প্রফেশোনালিজম বাদ দিয়ে মিডিয়া চালানো সম্ভব নয়। আমাদের এখানে বসিং সিস্টেম নেই বলে সবাই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আমি ব্যক্তিগতভাবে টিভি ও কাগজের পত্রিকায় কাজ করা লোক। এখন অনলাইনে কাজ করে অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাই আমি আশাবাদী এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভালো কিছু উপহার দিতে পারবো।

প্রিয় টেক: বার্তা২৪ তো অনেক ভালো করেছিলেন। আপনার ওই অনলাইন পত্রিকাটি ভালো করার রহস্য কী ছিল?
সরদার ফরিদ আহমদ: আমাদের সফলতার গুপ্তরহস্য ছিল ‘টিম স্পিরিট’। আমি আগেই বলেছি আমাদের এখানে কোনো বসিং সিস্টেম নেই। এখানে একে অন্যকে সহযোগিতা করার মানসিকতা বেশি রাখে বলে আমাদের সফলতা অর্জন করা অনেক সহজ ছিল। এছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, ‘দলবাজ’ মিডিয়া মানুষ পছন্দ করে না। দলীয় লোকও দলবাজি পছন্দ করে না। পছন্দ করলে জামায়াতে ইসলামের লোক দৈনিক সংগ্রাম পছন্দ করতো, বিএনপির লোক দৈনিক দিনকাল আর আ.লীগের লোক দৈনিক জনকণ্ঠ পছন্দ করতো। দলের সবাই পছন্দের পত্রিকা পড়লে এগুলোর সার্কুলেশনও অনেক বাড়তো। তাই আমরাও দলবাজি নিউজ করতাম না। আমরা কখনও গুজব নিউজ প্রকাশ করিনি। দ্রুত নিউজ পরিবর্তন করে নতুন নিউজ দিতাম। নিউজে সব সময় সর্বশেষ তথ্য দিয়েছি। পাঠক চাইলে সহজেই পেছনের নিউজ খুঁজে পেতেন। মোটকথা, সব সময় ভালো নিউজ করার চেষ্টা ছিল বলে পাঠক আমাদের বিশ্বাস করতেন। ফলে খুব দ্রুতই আমাদের সফলতা এসেছে।

প্রিয় টেক: ‘নতুন বার্তা’র মালিকানায় কারা রয়েছেন?
সরদার ফরিদ আহমদ: একাধিক শিল্পপতি এর সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন। যদিও মিডিয়ার মালিকানার খবর গোপন থাকে না। কিন্তু আপাতত তাদের নাম বলছি না। তবে এতটুকু বলতে পারি যে, চারজন শিল্পপতি মিলে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন এবং তারাই এ পত্রিকার মালিকানায় থাকবেন।

প্রিয় টেক: ‘নতুন বার্তা’র অফিস কোথায় নিয়েছেন? কতজন স্টাফ নিয়ে শুরু করলেন?
সরদার ফরিদ আহমদ: আপাতত ৭০ কাকরাইল শওকত মাহমুদের ‘ইকনোমিকস’-এর অফিসটি ক্যাম্প অফিস হিসেবে ব্যবহার করছি। নতুন অফিস এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বার্তা২৪ যেহেতু সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে তাই মানবিকভাবে সব স্টাফকে এখানে রাখার চেষ্টা করেছি। যারা তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ ছিলেন তাদেরও প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করে নিয়েছি। প্রাথমিক অবস্থায় ঢাকায় ৩৫ জন এবং ঢাকার বাইরে ৮০ জন নিয়ে আমাদের পথচলা শুরু হয়েছে।

প্রিয় টেক: ‘নতুন বার্তা’য় নতুনত্ব কী আছে? পাঠকের জন্য কি কোনো চমক রেখেছেন?
সরদার ফরিদ আহমদ: আমরা অনেক কিছুই নতুন রেখেছি। নতুন লেআউট, নতুন লিঙ্ক, গুড এডিটিং ইত্যাদি। একটি নিউজ আপলোড করার আগে এডিটিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এডিটিংয়ের অভাবে টেলিভিশনের স্ক্রলেও আমরা ভুল লেখা দেখতে পাই। বড় বড় পত্রিকাও নিয়মিত ভুল করে চলেছে। ভুল লেখা দেখলে পাঠক বিরক্ত হয়। আমরা সে ভুল করছি না। আমাদের এডিটিং ডেস্ককে শক্তিশালী করা হয়েছে। একটি সুন্দর লেখা পাঠকের সামনে প্রকাশের আগে ৪০% সাংবাদিকের এবং ৬০% ডেস্কের অবদান থাকা দরকার। তাহলে ভালো সংবাদ বের হয়ে আসবে। আর সে কাজটিই আমরা নিশ্চিত করেছি।

প্রিয় টেক: বার্তা২৪ ভালো করার পর আপনার দৃষ্টিতে দেশে অনলাইন পত্রিকার সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?
সরদার ফরিদ আহমদ: বাংলাদেশে অনলাইন পত্রিকার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন কর্পোরেট হাউজ এখন এই নিউ মিডিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। আপনারা জেনে অবাক হবেন, কম্পিউটার বা ল্যাপটপে মানুষ অনলাইন পত্রিকা দেখলেও এখন অনলাইন পত্রিকা পাঠকের মেজর অংশ মোবাইল ফোনে খবর দেখে। দেশে মোবাইল ফোন ইউজারের সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে গেছে। তাই অনলাইন পত্রিকার ভিজিটরও বাড়ছে। আগে অনলাইন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে অনাগ্রহ দেখালেও এখন এ সেক্টরে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছে। গত এপ্রিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি জরিপে বলা হয়েছে, তথ্য জানার জন্য মানুষ সব থেকে বেশি অনলাইনে ঢুকছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত পত্রিকা ‘নিউজউইক’ বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু তারাও অনলাইন সংস্করণ চালু রেখেছে। সারা পৃথিবীতে গাণিতিক হারে নয় জ্যামিতিক হারে ইন্টারনেট ইউজার বাড়ছে। টেকনোলজির উন্নতি হচ্ছে। তথ্যের জন্য তরুণরা পত্রিকাকে পছন্দ না করে ভার্চুয়াল জগতকে বেশি পছন্দ করছে। তাই এখানে সম্ভাবনা কেমন তা সহজেই অনুমান করা যায়। এছাড়া অনলাইনে ১৬ থেকে ৪০ বছর বয়সের মানুষ বেশি আসে। তাই বিজ্ঞাপনদাতারা এখানে তাদের টার্গেট পিপুল পাচ্ছেন। পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপনের বিস্তারিত দিতে গেলে খরচের পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু এখানে একটি মাত্র লিঙ্ক দিলেই ইউজাররা ওই কোম্পানির ওয়েবসাইটে ঢুকে যাবতীয় তথ্য পেয়ে যাচ্ছেন। রেডিও-টেলিভিশনের চেয়েও এখানে বিজ্ঞাপনের মূল্য কম। সব মিলে দেশে অনলাইন পত্রিকার সম্ভাবনা অনেক। বাংলাদেশে অনলাইন পত্রিকার সম্ভাবনা সম্পর্কে আরেকটি তথ্য আপনাকে দিচ্ছি। দেশে দুটি কাগজের পত্রিকা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে অনলাইন মাধ্যমে আসছে খুব শিগগির। এদেশের একটি দৈনিক পত্রিকা তাদের অনলাইন সংস্করণে মাসে ৩৩ লাখ টাকা খরচ করে আয় করে তিন কোটি টাকা। এবার অনুমান করুন দেশে অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্ভাবনা কতটুকু।

প্রিয় টেক: দেশে অনলাইন পত্রিকার সম্ভাবনা নিশ্চিত করা যাবে কিভাবে?
সরদার ফরিদ আহমদ: দেখুন, বাংলাদেশে ৪০০ শতাধিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল রয়েছে। কিন্তু পাঠককে যদি প্রশ্ন করা হয় তারা কয়টি অনলাইন পত্রিকার নাম জানেন, তাহলে বড়জোর ১০/১২টির নাম তারা বলতে পারবেন। অনলাইন নিউজ পোর্টাল মানসম্পন্ন না হলে তার সম্ভাবনা বাড়বে না। কোয়ালিটির অভাবে দেশে অধিকাংশ পত্রিকা-টেলিভিশন সারভাইভ করতে পারছে না। কিছু পত্রিকা-টেলিভিশন কোয়ালিটির জন্য লাভজনক অবস্থানে থাকলেও অধিকাংশ লোকসানে রয়েছে। শুধু চাকরির মানসিকতা থাকলে অনলাইন পত্রিকার কোয়ালিটি বাড়ানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন হচ্ছে, যারা এ সেক্টরের কাজ করছেন তাদের চাকরির জন্য কাজ নয়, ভালোবেসে কাজ করতে হবে। কোয়ালিটি, ভালোবাসা এবং প্রফেশোনালিজম থাকলে অনলাইন পত্রিকার সম্ভাবনা নিশ্চিত করা যাবে।

প্রিয় টেক: এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে জানতে চাই। বাংলাদেশে অনলাইন নিউজ পোর্টালের জন্য অনলাইন খসড়া নীতিমালা নিয়ে যে বিতর্ক হচ্ছে, সে সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
সরদার ফরিদ আহমদ: বাংলাদেশে অনলাইন খসড়া নীতিমালা যারা করেছেন, তারা এ বিষয়ে অভিজ্ঞ নন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তারা এখানে রেডিও-টেলিভিশনের নীতিমালাটি রিপ্লেস করেছেন। খসড়া নীতিমালায় তারা ভুল করে ‘সম্প্রচার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। লোকাল হোস্ট করে অনলাইন পত্রিকা চালানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু লোকাল হোস্ট দিয়ে অনলাইন পত্রিকা চালানো সম্ভব নয়। নীতিমালায় বলা হয়েছে, অনলাইন পত্রিকায় অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু এটা অনলাইনের বৈশিষ্ট্য নষ্ট করবে। বলা হয়েছে, বিদেশি পত্রিকায় যা ছাপা হয় তা ছাপাতে পারবে না। এ ব্যাপারে পত্রিকা, রেডিও এবং টেলিভিশনের ক্ষেত্রে কোনো আইন না থাকলেও অনলাইনের বেলায় আইনের কথা বলা হয়েছে, যা হাস্যকর। বর্তমান তথ্যমন্ত্রী প্রযুক্তিবান্ধব মানুষ। আমি নিশ্চিত, তিনি গণমাধ্যমবিরোধী কোনো আইন করবেন না।

প্রিয় টেক: অনলাইন নিউজ পোর্টাল নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
সরদার ফরিদ আহমদ: আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করেছি। মিডিয়াকেন্দ্রিক আমার জীবন। টেলিভিশন, পত্রিকা-সব জায়গাতেই কাজ করেছি। কিন্তু কেন যেন অনলাইন মাধ্যমকে ভালোবেসে ফেলেছি। তাই কখনই অনলাইন ছেড়ে যাবো না।

সর্বশেষ