পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ

রবিবার, ২৪/০৩/২০১৩ @ ১১:৪২ অপরাহ্ণ

এস এম আতিক:

journo_1299674995_7-Womenরাজশাহীর স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোতে প্রায়ই জেন্ডার অসংবেদনশীল শব্দ, বাক্য বা বাক্যাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। জেন্ডার ইস্যু নিয়ে কাজ করছে এমন বেশ কিছু বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন ও এই প্রতিবেদকের নিজস্ব গবেষণায় বিষয়টি উঠে এসেছে। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ, জেষ্ঠ্য সাংবাদিক ও উন্নয়ন কর্মীরা মনে করছেন, স্থানীয় সাংবাদিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবেই এমনটি ঘটছে। তবে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলো যদি এ ব্যাপারে এগিয়ে আসে তাহলে এ সমস্যা সহজেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলেও মন্তব্য তাদের।

গত ৬ মাসে রাজশাহীর ৬টি সংবাদপত্র (সোনার দেশ, সোনালী সংবাদ, সানশাইন, নতুন প্রভাত, আমাদের রাজশাহী, উপচার) নিয়ে এ প্রতিবেদকের নিজস্ব গবেষণায় উঠে এসেছে- অনেক ক্ষেত্রেই সংবাদপত্রগুলো জেন্ডার নিরপেক্ষ নয়। দুই/একটি পত্রিকার ভাষা মারাত্মক জেন্ডার পক্ষপাতদুষ্ট। সংবাদপত্রগুলোতে পুরুষ ও নারী ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। নারীদের সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে চেহারা, বয়স এবং অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক (ওমুকের জননী, তমুকের কন্যা) দিয়ে। অন্যদিকে পুরুষকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তার কাজ, সাফল্য, অর্জন কিংবা অবস্থান দিয়ে।

এ ছাড়া অপরাধের ঘটনায় (ধর্ষণ, হত্যা, এসিড নিক্ষেপ কিংবা নির্যাতন) নারী যখন সংবাদে এসেছে তখন প্রায়শই মর্যাদাহানিকর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে নারীর চেহারা, বয়স, সম্পর্ক বিষয়গুলোকে ফেনিয়ে তোলা হয়েছে। নারীদের গতানুগতিক চিহ্নিত করে তাদের আচরণকে মেয়েলি হিসেবে ব্যাখ্যা দেয়ারও প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে সংবাদপত্রগুলোতে পরিবেশিত সংবাদে। উল্লিখিত সংবাদপত্রগুলোতে শতাধিকবার যেসব জেন্ডার অসংবেদনশীল শব্দ ব্যবহার রয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- ‘নারী ঘটিত কেলেংকারি’, ‘চরিত্রহীনা’, ‘সম্ভ্রমহানি’, ‘ইজ্জতের নিরাপত্তা’, ‘সতীত্ব সম্পর্কে সন্দেহ’, ‘সুন্দরী গৃহবধূ’ ‘লালসা পূরণ’, ‘ছলনাময়ী’, ধর্ষণণের বর্ণনায় লেখা হয়েছে ‘পুরো রাত’, পর্যায়ক্রমে, ‘পরনের শাড়ি খুলে অর্ধ উলঙ্গ করে’, ‘দেহ মিলন’, যৌনাঙ্গে ব্লেড ঢুকে দেয়াসহ অসংখ্য শব্দ।

এ প্রতিবেদকদের ব্যক্তিগত গবেষণা ছাড়াও এসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট (এসিডি) সহ বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের জরিপ, পর্যবেক্ষণ ও সমীক্ষাতেও এসব তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে সাংবাদিকদের নিয়ে এসিডি আয়োজিত এক কর্মশালাতেও এ বিষয়গুলো ব্যাপক আলোচিত হয়।

স্থানীয় একটি পত্রিকার একজন প্রতিবেদক যার লেখায় বেশ কিছু জেন্ডার অসংবেদনশীল শব্দ পাওয়া গেছে তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার সময় তিনি জানান, যেসব শব্দকে অসংবেদনশীল বলা হচ্ছে তা তিনি জানতেনই না। অনেকদিন ধরেই তিনি সাংবাদিকতা করছেন এবং এ ধরনের শব্দও লিখছেন। তাকে কেউ এ পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে সতর্কও করেননি। প্রশিক্ষণ পেলে এ সমস্যা তার থাকবে না বলেও জানালেন এ প্রতিবেদক।

দৈনিক সানশাইনের বার্তা সম্পদক আহসান হাবিব অপু এ প্রসঙ্গে বলেন, স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদ বিভাগের যারা কাজ করছেন তারা সবাই পেশাদার সাংবাদিক নন। অনেকে শখের বশেও সাংবাদিকতায় এসেছেন। জেন্ডার সংবেদনশীল করার জন্য সাংবাদিকদের শতভাগ পেশাদারিত্ব করা দরকার। এজন্য সম্মানজনক মজুরির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে বর্তমান অবস্থার উন্নতি হবে বলেও মনে করেন রাজশাহীর এ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মুসতাক আহমেদ মনে করেন, সঙ্গত কারণে গণমাধ্যমের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক এবং তাই এই মাধ্যমের ভাষা কোনোক্রমেই জেন্ডার অসংবেদনশীল হওয়া কাক্সিক্ষত নয়। বিশেষ করে, সংবাদপত্রে নারী-পুরুষ সম্পর্ক ও নারী-সংশ্লিষ্ট যেকোনো সংবাদ পরিবেশনকালে বাড়তি সতকর্তা অবলম্বন করা প্রয়োজন, যাতে সমাজে নারী হেয় প্রতিপন্ন না হয়। আর এ জন্য সাংবাদিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রদান জরুরি বলে মন্তব্য করেন এ গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ।

এ ব্যাপারে এসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্টের (এসিডি) নির্বাহী পরিচালক সালীমা সারওয়ার বলেন, সাংবাদিকদের জেন্ডার সংবেদনশীল করে তোলার জন্য তারা নিয়মিত সেমিনার, কর্শশালা ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করছেন। তিনি মনে করেন, সাংবাদিকতা পেশায় নারীদের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করাও জরুরি। এ ব্যাপারে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বানও জানান রাজশাহীর এই বিশিষ্ট উন্নয়ন কর্মী।
সৌজন্যে: ভোরের কাগজ।