প্লিজ সাংবাদিকতাকে কলঙ্কিত করবেন না

বৃহস্পতিবার, ২২/০১/২০১৫ @ ৬:৩৮ অপরাহ্ণ

:: ইয়াকুব নবী ইমন ::

emonসাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকদের মধ্যে মারামারি, দাঙ্গা হাঙ্গামা নিত্য ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কে কত চাপাবাজি, দলবাজি করতে পারবে তার প্রতিযোগীতায় নেমেছেন কিছু সাংবাদিক নামধারী প্রতারক। কিছু সুবিধাভোগী সাংবাদিক নেতাদের নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডে গোটা সাংবাদিক সমাজই আজ হুমকির মুখে পড়েছে। নিজের গোত্রের ভাইয়ের রক্তের দাগ মাড়িয়ে হলেও এরা নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। এরা এতোই দলবাজ যে বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারি সাংবাদিক দম্পতি চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনি হত্যাকান্ডও তাদের একত্রিত করতে পারেনি। আপন সহকর্মী ভাইয়ের মৃত্যুতেও তারা লোভের কাছে হার মেনেছে।

প্রিয় পাঠক মাত্রই জানেন, বিগত কয়েক বছরে দেশে সাংবাদিক হত্যাকান্ড ও সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। বাংলাদেশের কোন সরকারই সাংবাদিক হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনেনি। সব সাংবাদিক হত্যাকান্ডের সাথেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা জড়িত থাকায় তখনকার সরকার যে কোন সাংবাদিক হত্যাকান্ড ধামাচাপা দিতে ব্যস্ত থাকতো।

রাজধানী ঢাকায় সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিক হত্যা, গুম, নির্যাতন, মামলা-হামলার ঘটনা ঘটেছিল। এসব ঘটনার দু একটির মামলা হলেও আজ পর্যন্ত কোন অপরাধীর বিচার হয়নি। বিচার হবেই বা কি করে! এই বিচার না হওয়ার পিছনেও সাংবাদিকদের দলাদলি কাজ করে। ঢাকায় এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনি ও মাছরাঙ্গা টিভির বার্তা সম্পাদক সাগর সারওয়ার খুনের সাথেও একটি সাংবাদিক গোষ্টি জড়িত ছিল। তারা খুন হওয়ার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহারা খাতুন ২৪ ঘন্টার মধ্যে আসামী গ্রেফতারের হুংকার দিয়েছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছ্ইু হয়নি।

পরের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর জাতীয় প্রেসক্লাবের এক অনুষ্ঠানে সাগর-রুনি হত্যাকান্ড নিয়ে বাজে মন্তব্য করায় এক সাংবাদিক নেতা (যিনি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাজে মন্তব্য করতে নিষেধ করেন। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ওই সাংবাদিক নেতার ঝড়গা বিবাদও হয়। অনুষ্ঠানটি সরাসরি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। ওই সাংবাদিক নেতার ভূমিকা সেদিন আমার কাছে খুব ভালো লেগেছিল।

সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের পর দেশ-বিদেশে নিন্দার ঝড় উঠে। প্রতিবাদ সমাবেশে উত্তাল হয়ে উঠে সর্বত্র। আমি তখন চৌমুহনী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। সাগর-রুনি হত্যার প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবে প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধনে আমিসহ প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা চৌমুহনী প্রেস ক্লাবের ব্যানারে গিয়ে অংশগ্রহন করেছিলাম। সেদিনের প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধনে সারা দেশ থেকে হাজার হাজার সাংবাদিক উপস্থিত হন। সব ভেদাভেদ ভূলে সাংবাদিক নেতারা সবাই এক মঞ্চে। সবার একটাই দাবী ছিল সাগর-রুনি হত্যাকারীদের বিচার হতেই হবে। আমি আশায় বুক বাধলাম। এই বুঝি আমাদের সুদিন ফিরে আসলো। সাংবাদিক হত্যাকান্ডের বিচার মনে হয় পাবো। কিন্তু বিধিবাম আমার এই আশা ও বিশ্বাস বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।

একদিন হঠাৎ করে সাংবাদিকদের মধ্যে বিবাধ সৃষ্টি হলো। সাংবাদিক সমাবেশে হামলার ঘটনা ঘটলো। রহস্যজনক কারণে কিছু সাংবাদিক নেতা সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের বিচার চাওয়া থেকে নিবৃত হয়ে গেলেন। তৎকালীন স্বারাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় প্রতিবাদকারী সাংবাদিক নেতাকে সরকারের একটি পদে বসানো হল। তার অনুসারীদের কিছু সুযোগ সুবিধা ধরিয়ে দেয়া হলো। এর মধ্য দিয়ে সাগর-রুনি হত্যার বিচারের দাবী থেমে গেল। এখন বিগত ১ বছরেও কেউ আর সাগর-রুনি হত্যার বিষয়ে কোন কথা বলছে না বা তেমন রিপোর্টিং হচ্ছেনা।

২০১৫ সালের প্রথম সপ্তাহে বিএনপির অবরোধ চলাকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের একি চিত্র দেখলাম আমি। সাংবাদিকরা নিজেদের পেশাগত মর্যাদা অতীত ঐতিহ্য ভূলে দলীয় নেতাকর্মীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। সেখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাংবাদিকরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। প্রেসক্লাবে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হামলা, সাংবাদিকদের মারধর এক কলংকজনক অধ্যায়ের রচনা করলো। এর জন্যও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পন্থী সাংবাদিক নেতারা দায়ী। জাতীয় ভাবে তাদের বিভক্তির কারণে বর্তমানে দেশের মফস্বল শহরগুলোতে একই অবস্থা বিরাজ করছে। অথচ এমনতো হওয়ার কথা ছিল না।

দেশের যে কোন ক্লান্তিলগ্নে সাংবাদিকরা তাদের কলম দিয়ে জাতিকে দিক নির্দেশনা দেবে, দেশের হাল ধরার জন্য যোগ্য নাগরিক সৃষ্টি করবে। যারা সমাজের দর্পন বা আয়না তাদের চেহারা যদি কলঙ্কিত হয় তাহলে জাতির ভবিষৎ কোথায়! কবে আমাদের সাংবাদিক নেতাদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। কবে আমরা সকল সাংবাদিক হত্যার বিচার পাবো। তাই সাংবাদিক নেতাদের কাছে আবেদন, প্লিজ সাংবাদিকতা পেশাটিকে আর কলঙ্কিত করবেন না। আসুন দেশ ও জাতির স্বার্থে আমরা সবাই এক মঞ্চে দাঁড়াই আর বলি আত্মমানবতার সেবায় নিবেদিত হোক সাংবাদিকতা।

লেখক: ইয়াকুব নবী ইমন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক জাতীয় নিশান, নোয়াখালী।