একুশে টিভি: দু’পক্ষের অবস্থানে ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন

মঙ্গলবার, ২০/০১/২০১৫ @ ৯:৪০ অপরাহ্ণ

:: রেজা রায়হান ::

etv logoএক যুগের ব্যবধানে দেশের প্রথম বেসরকারি টেরিস্ট্রেরিয়াল টিভি চ্যানেল একুশে টেলিভিশন নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার এবং বিরোধী দল বিএনপির অবস্থানে বেশ নাটকীয় পরিবর্তন হয়েছে। দেশের এক সময়ের বহুল আলোচিত ও ব্যাপক জনপ্রিয় একুশে টেলিভিশনের ব্যাপারে দু’পক্ষের অবস্থানে ১৮০ ডিগ্রী পরিবর্তনের পেছনে মূলত: রাজনৈতিক বিবেচনাই কাজ করেছে।

এ পরিবর্তন এতটাই বিপরীতধর্মী যে, এক সময়ে যারা একুশের মৃত্যু ঘটিয়েছে তারাই এখন এর র্দীঘায়ু কামনা করছে। আর জন্মদাতারাই আজ একুশের ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এর মৃত্যু নিশ্চিত করতে চাইছে। তবে এ মৃত্যু চিরস্থায়ী না হলেও, বর্তমান সরকারের আমলে “একুশে টেলিভিশন” কে যে “কোমা”য় (জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে) থাকতে হবে তা ইতোমধ্যে অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া গেছে! আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না করা হলেও ক্যাবল অপারেটররা দেশের অভ্যন্তরে এর সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়ে একুশে টেলিভিশনকে দর্শকদের রিমোট কন্ট্রোলের আওতার বাইরে নিয়ে গেছে।

অনেকটা একই ধরনের ঘটনা গত বছরের শেষ দিকে পাকিস্তানের জনপ্রিয় জিও টিভিকে কেন্দ্র করে ঘটেছিল। সে দেশের ক্ষমতাধর গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক সাংবাদিক হামিদ মিরকে হত্যার জন্য গুলি করেছে বলে তার ভাইয়ের অভিযোগ জিও টিভি প্রচার করলে সেনাবাহিনী ক্ষিপ্ত হয়। সেনাবাহিনীর চাপে সেনানিবাসসহ দেশের অনেক অঞ্চলেই ক্যাবল অপারেটররা জিও টিভির প্রদর্শন বন্ধ করে দেয়। জিও টিভির লাইসেন্স বাতিল করা নিয়েও নানা কাণ্ড ঘটে। অবশ্য পাকিস্তানে সামরিক শাসক জেনারেল মোশাররফের আমলে ২০০২ সালে গঠিত “পাকিস্তান ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া রেগুলেটরী অথরিটি” (পিমরা) (যা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে নেই!) সম্মত না হওয়ায় জিও টিভিকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যায়নি। নওয়াজ শরীফের সরকার জিও টিভির পক্ষে থাকায় জিও টিভি এ যাত্রায় রক্ষা পায়। বাংলাদেশে টিভি চ্যানেলগুলোর লাইসেন্স না থাকায় (এদের মূলত: অনুষ্ঠান রপ্তানির অনুমোদন রয়েছে) যে কোন অজুহাতে বন্ধ করায় বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক সরকারের কোন সমস্যা নেই। তবে চেয়ারম্যান আব্দুস সালামকে রাষ্ট্রদোহিতার মামলায় গ্রেফতার ও রিম্যান্ডে নিলেও সরকার একুশে টেলিভিশনকে বন্ধ না করে অবশ্য এক ধরনের সৌজন্য প্রদর্শন করেছে!

একুশের প্রতি আওয়ামী লীগ-বিএনপির মনোভাবের এ “বৈপ্লবিক পরিবর্তনে”র সাথে এর মালিকানায় পরিবর্তনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। লাইসেন্সের মালিক হবার সুবাদে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এএস মাহমুদ ও তার ছেলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরহাদ মাহমুদই ছিলেন একুশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। র্যাং গস গ্রুপের রউফ চৌধুরী, ইস্টকোস্ট গ্রুপের আজম জে চৌধুরী, স্কয়ার গ্রুপের তপন চৌধুরী, সাবেক এফবিসিসিআই সভাপতি ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন, জার্মান প্রবাসী আব্দুস সালাম প্রমুখ “সরকারের অনুপ্রেরণা”য় একুশে টেলিভিশন লি: এ বিনিয়োগে করলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংখ্যাগরিষ্ঠ এ শেয়ারহোল্ডারদের কোন ভূমিকাই ছিল না। কিছু বিদেশি (বেনামী) শেয়ারও ছিল। শেয়ার হোল্ডারদের সাথে এএস মাহমুদের মনকষাকষি চলছিল। একবার শেয়ার হোল্ডাররা বেঁকে বসলে এএস মাহমুদ আত্মহত্যার হুমকি দেন।

২০০২ সালে একুশে টিভি বন্ধ হবার পর এএস মাহমুদ বিদেশে চলে যান এবং ভগ্নহৃদয়ে প্রবাসেই ইন্তেকাল করেন। পরবর্তীতে আব্দুস সালাম সব শেয়ার কিনেছেন বলে দাবি করেন। বন্ধ একুশের মালিকানা নিয়ে তখন তার এ দাবির কেউ বিরোধিতা করছেন বলে শোনা যায়নি। দীর্ঘ আইনী লড়াইয়ের পর একুশে টেলিভিশন স্যাটেলাইটে সম্প্রচারের অনুমোদন পায়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর আব্দুস সালাম আশা করেছিলেন পুনরায় একুশে হারানো টেরিস্ট্রেরিয়ালের সুবিধা পাবে। তবে তার সে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় একুশে টেলিভিশন প্রথমে নানা অনিয়ম ও জনদুর্ভোগ নিয়ে রিপোটিং শুরু করে, যা আস্তে আস্তে সরকারের সমালোচনায় উন্নীত হয়। এ বিরোধের কারনে গত ৬ জানুয়ারিতে আব্দুস সালামকে গ্রেফতার ও ১২ জানুয়ারি দেশদ্রোহিতার মামলা দায়ের ও রিম্যান্ডের মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগুচ্ছে। ইতোপূর্বে একুশে টেলিভিশনকে লাইসেন্স ফি বকেয়ার কারণে মামলার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিদিন-এ অডিট প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদকের একটি প্রতিবেদনে কোন পাওনা না থাকার বিষয়টি প্রকাশিত হলে ওই মামলা আর আগায়নি।

একুশে টেলিভিশন নিয়ে বিতর্ক

আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৮ সালে বেসরকারি মালিকানায় টেরিস্টেরিয়াল পদ্ধতিতে টেলিভিশন চ্যানেল স্থাপন ও পরিচালনার জন্য খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দরপত্র (প্রস্তাব) আহবান করে। ওই বছরের ২৬ জুন আগ্রহী ১৭টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব জমা দেয়। প্রস্তাবদাতাদের মধ্যে বেশিরভাগই তদানীন্তন আওয়ামী লীগ সরকারের, বিশেষ করে আব্দুল আউয়াল মিন্টু, সালমান রহমান প্রমুখের মতো প্রধানমন্ত্রীর কতিপয় ঘনিষ্টজনও ছিলেন। লাইসেন্স যেহেতু একটি দেয়া হবে, তাই আগেই বেছে নেয়া হয় এএস মাহমুদের প্রস্তাবিত একুশে টেলিভিশনকে। আর সে থেকেই বিতর্কের শুরু।

বিটিভির প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আনিসুর রহমানকে আহ্বায়ক করে গঠিত কারিগরি মানদন্ড নিরূপণ কমিটি ১৯৯৮-এর ৯ জুলাই প্রাপ্ত ১৭টি প্রস্তাব মূল্যায়ণ করে প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে একুশের প্রস্তাবকে প্রথম করে মোট ৮টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব বিবেচনার সুপারিশ করা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১৯৯৯ সালের ৯ মার্চ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তথ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব একুশে টেলিভিশনের সাথে “লাইসেন্সিং এগ্রিমেন্ট” স্বাক্ষর করেন। এটাই সম্প্রচার খাতে দেশের প্রথম ও শেষ লাইসেন্স। এ চুক্তির ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ সালের ২৯ জুন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বিটিভি এবং একুশে টেলিভিশনের মধ্যে “কো-সাইট এগ্রিমেন্ট ফর টিভি ট্রান্সমিশন ফ্যাসিলিটিজ” নামে একটি চুক্তি হয়। এ চুক্তির আওতায় ভাড়ার বিনিময়ে দেশব্যাপী বিটিভির এন্টেনা ও অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ পায় একুশে। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সম্প্রচার শুরু করে দেশে-বিদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে একুশে টেলিভিশন। এ হচ্ছে ঘটনার একদিকে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ শেষে ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী হাসান মাহমুদ ও আরো কয়েকজন বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী একুশে টেলিভিশনের লাইসেন্সের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে (৫০৫০/২০০১নং) রিট পিটিশন দায়ের করেন। ওই রিটে তথ্য সচিবকে ১ নং বিবাদী করা হয়। তথ্য মন্ত্রণালয় যথারীতি জবাব দেয়। পরবর্তীতে রিট পিটিশনকারী মামলায় জয়ী হয় এবং দরপত্র বাছাই প্রক্রিয়ায় কারচুপির কারণে একুশে টেলিভিশনকে প্রদত্ত লাইসেন্স অবৈধ বলে হাইকোর্ট বিভাগ রায় দেয়।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে একুশে কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। ওই রায়ের ওপর একাধিক পুনর্বিবেচনার আবেদনও আপিল বিভাগে নাকচ হয়ে যায়। ফলে একুশে টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ এবং লাইসেন্সিং এগ্রিমেন্ট বাতিল হয়।

একুশেকে লাইসেন্স প্রদানে জালিয়াতি

বেসরকারি মালিকানায় টেরিস্ট্রেরিয়াল পদ্ধতিতে টেলিভিশন চ্যানেল স্থাপন ও পরিচালনার অনুমোদন দানের জন্য প্রাপ্ত প্রস্তাব মূল্যায়নে তথ্য মন্ত্রাণালয় বিটিভির ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমানের নেতৃতে ৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির মূল মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবকে সর্বাধিক সন্তোষজনক এবং ৩টি প্রস্তাবকে গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়। ১০টি প্রস্তাব অযোগ্য বিবেচিত হয়। অন্য একটি প্রস্তাব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় মূল্যায়নের জন্যই বিবেচিত হয়নি।

৯৮ সালের ৯ জুলাইর মূল মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বাধিক সন্তোষজনক প্রস্তাব বলে বিবেচিত ৩টি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে: ১. মাল্টিমোড ট্রান্সপোর্ট কনসালট্যান্ট (প্রস্তাবক: মাহবুব আনাম, কর্ণধার আব্দুল আউয়াল মিন্টু); ২. ইন্ডিপেনডেন্ট মিডিয়া সার্ভিসেস (প্রস্তাবক: জিলহুরাইন জায়গীরদার) এবং বেক্সিমকো মিডিয়া লি. (প্রস্তাবক: ইকবাল আহেমদ, কর্ণধার সালমান এফ রহমান)।

২য় বিবেচনায় যে ৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হতে পারে বলে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে তা হচ্ছে: ১. বাংলাদেশ নিউজ সার্ভিস (প্রস্তাবক: শাহাবুদ্দিন আহমেদ); ২. বাংলাদেশ স্কাই নেটওয়ার্ক লি. (প্রস্তাবক: নাসির উদ্দিন ইউসুফ) এবং প্রচার বিজ্ঞাপনী সংস্থা (প্রস্তাবক: দেওয়ান সফিঊল আবেদীন)

মূল্যায়নে যে ১০টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব যোগ্য বিবেচিত হয়নি তা হচ্ছে : ১. মাল্টিমিডিয়া প্রডাকশন কোং লি. (প্রস্তাবক: মাহফুজুর রহমান, এটিএন বাংলা); ২. গ্লোবাল সাপ্লাইয়ার্স লি. (প্রস্তাবক: সাইফুল বারী, কর্নধার শাহজাদ আলী, এনটিভির পূর্বসুরী চ্যানেল টেন এর মালিক); ৩. আজকের দর্পণ (প্রস্তাবক: কাজী শাহেদ আহমেদ, আজকের কাগজ); ৪. ইউএনবি (প্রস্তাবক: এনায়েত উল্লাহ খান); ৫. একুশে টেলিভিশন (প্রস্তাবক: এ এস মাহমুদ); ৬. সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লি. (প্রস্তাবক: হোসেন আখতার); ৭. লিবারেশন টেলিভিশন চ্যানেল অব বাংলাদেশ লি. (প্রস্তাবক: এ এফ এম ফখরুল ইসলাম মুন্সী, সাবেক উপমন্ত্রী); ৮. নেশান ওয়াইড কমিউনিকেশন লি: (প্রস্তাবক: মো: নুরুল হক ভূইয়া); ৯. বাংলাদেশ টেলিভিশন নেটওয়ার্ক (প্রস্তাবক: ড. পিএস আখতার) এবং ১০. বাংলাদেশ ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন (প্রস্তাবক: ফাল্গনী হামিদ)

মাইনার্ড (বাংলাদেশ) লি. (প্রস্তাবকারী: ফজলুল বারী) এর প্রস্তাবের সাথে ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট/আয়কর রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট জমা না দেয়া এটি মূল্যায়নের জন্যই বিবেচিত হয়নি।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এএস মাহমুদের একুশে টেলিভিশনকে আগেই লাইসেন্স দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল (বাংলাদেশের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে এটা অস্বাভাবিক নয়)। বিবিসির খ্যাতনামা সাংবাদিক ও ’৭১ সালের ২৫ মার্চ ঢাকায় পাকবাহিনীর বর্বর হত্যাযজ্ঞের খবর প্রথম বহির্বিশ্বে প্রকাশকারী প্রত্যক্ষদর্শী সায়মন ড্রিং তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহে একুশে টেলিভিশনের সাথে লাইসেন্স পাবার আগেই যুক্ত হন। কিন্তু মূল্যায়নে একুশের প্রস্তাব অযোগ্য বিবেচিত হওয়ায় তদানীন্তন তথ্য সচিব এম আকমল হোসেইন ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাঈদের টনক নড়ে। জানা যায়, আনিসুর রহমান কমিটিকে চাপ প্রয়োগ করে কেবলমাত্র একুশে টেলিভিশনকে যোগ্য দেখাতে মূল্যায়ন প্রতিবেদন বদল করতে বলা হয়। সরকারি চাকুরি করে সরকারের অভিপ্রায় অনুযায়ী কাজ না করা বাংলাদেশে সম্ভব নয় বলেই চাকুরি বাঁচাতে কমিটি আরেকটি প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে একুশেসহ ৮টি প্রস্তাব সন্তোষজনক বিবেচিত বলে উল্লেখ করা হলেও শেষ পর্যন্ত কোন যৌক্তিকতা প্রদর্শন ছাড়াই একমাত্র লাইসেন্সটি একুশে টেলিভিশনকে দেয়ার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। বেসরকারি টেরিস্ট্রেরিয়াল টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স পায় একুশে টেলিভিশন।

অপরাধী তার অপরাধের কোন না কোন চিহ্ন রেখে যায় বলে অপরাধ বিজ্ঞানে যে কথা বলা আছে, এক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। আনিসুর রহমান কমিটির প্রথম মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সব কপি ধ্বংস না করেই একই তারিখের একই স্মারকে একুশের প্রস্তাবকে যোগ্য দেখিয়ে দ্বিতীয় প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। কমিটির মাধ্যমে এটি বাইরে চলে আসে এবং এ প্রতিবেদকও তখন এর কপি পান। এটাই একুশের জন্য পরবর্তীকালে “কাল” হয়ে দাঁড়ায়। অবশ্য তদানীন্তন তথ্য সচিব এম আকমল হোসেইন (সম্প্রতি পরলোকগত) শুরুতেই বুঝিয়েছিলেন, একুশে টেলিভিশনের জন্য যা করা হয়েছে তাতে সবাই একসময় ফেঁসে যাবেন। একুশে টেলিভিশনকে লাইসেন্স দেয়ার কিছুদিন আগে এক রাতে এ প্রতিবেদককে ইস্কাটনের বাসায় ডেকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত সচিব এ নিয়ে কথা বলেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব ড. এসএ সামাদকেও (বর্তমানে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান) একটি চিঠি দেন। কিন্তু সে সময় একুশের প্রস্তাবটি প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকায় তা দ্রুত অনুমোদিত হয়।

আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গী, আন্তর্জাতিক মান ও উন্নত প্রযুক্তির কারণে দেশের প্রথম বেসরকারি টেরিস্ট্রেরিয়াল চ্যানেল একুশে টিভি প্রচন্ড জনপ্রিয়তা লাভ করে। ২০০২ সালের ২৯ আগষ্ট উচ্চ আদালতের রায়ে চ্যানেলটি বন্ধ হয়ে গেলেও আদালতই স্যাটেলাইটে একুশে টেলিভিশনকে সম্প্রচারের সুযোগ করে দেয়। কিন্তু বিএনপি সরকার নানা অজুহাতে তা চালু করতে দেয়নি। একটি গণতান্ত্রিক (সভ্য!) দেশে যা কাংখিত ছিল না। পরে নতুন সত্বাধিকারী আব্দুস সালাম আইনী লড়াইয়ে জিতে ২০০৫ সালে পুনরায় এ বিষয়ে আদালতের অনুমোদন পান। তবে বিএনপি সরকারের মেয়াদে একুশে টিভিকে সম্প্রচারে আসতে দেয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, তত্ত্বাবয়ায়ক সরকারের সময় একুশে টেলিভিশন যাতে টেরিস্ট্রেরিয়াল সম্প্রচারের সুযোগ না পায় সেজন্য বিএনপি সরকারের বিদায়ের বিটিভির জন্য টেরিষ্ট্রিয়াল সুবিধা সংরক্ষণ করতে পেছনের তারিখ দিয়ে ২০০৬ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবয়ায়ক সরকারের সময়ে ২০০৬ সালের ১ ডিসেম্বর একুশে পুনরায় সম্প্রচার শুরু করে এবং ১/১১ এর পর ২০০৭ সালের জুনে এর ২৪ ঘন্টা সম্প্রচার শুরু হয়।

একুশের জন্ম অবৈধ হলেও তার মৃত্যু কাঙ্ক্ষিত ছিল না। টেরিস্ট্রেরিয়াল লাইসেন্স বাতিল করলেও উচ্চ আদালত একুশে টিভিকে হয়তো এ বিবেচনায় স্যাটেলাইটে চালু রাখতে বলেছিল। যদি একুশের বৈধতার চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে বর্তমানে সম্প্রচারে থাকা ও সম্প্রচারের জন্য অপেক্ষমান কোন স্যাটেলাইট চ্যানেলই আইন ও প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী বৈধ নয়। সবাই আনুষ্ঠান/ভিডিও ক্যাসেট রপ্তানিকারক হিসেবে অনাপত্তিপত্র প্রাপক মাত্র। আর এসএনজির মাধ্যমে উপগ্রহে (আকাশের ঠিকানায়) যে অনুষ্ঠান পাঠানো হয় (আপলিংক) তাকে কোন যুক্তিতেই অনুষ্ঠান রপ্তানি বলা যায় না। ফলে সময় এসেছে নির্মোহ ভিত্তিতে পুরো বিষয়টির আইনী বৈধতা দেয়ার। ড. গোলাম রহমানের নেতৃত্বে সম্প্রতি সম্প্রচার কমিশনের কাঠামো ও কার্যবলীসহ আইন প্রণয়নে সরকার গঠিত ৩৮ সদস্যের কমিটি এ ব্যাপারে সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। না হলে ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তন হলে বর্তমান অনেক চ্যানেলকেই একুশের পরিনতি, এমনকি সিএসবি, চ্যানেল ওয়ান, ইসলামিক টিভি বা দিগন্ত টিভির দুর্ভাগ্য বরণ করতে হতে পারে।

জালিয়াতির কারণে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে একুশে টেলিভিশনের লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ’৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আহূত বেসরকারি মালিকানায় টেলিভিশন চ্যানেল স্থাপন ও পরিচালনা সম্পর্কিত দরপত্র (প্রস্তাব) পুনরুজ্জীবিত হয়। ওই দরপত্রের ভিত্তিতে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি মালিকানায় টেলিভিশন চ্যানেল স্থাপনের নতুন লাইসেন্স প্রদানই পদ্ধতিগতভাবে বৈধ ও স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু একুশে টেলিভিশনের লাইসেন্স বাতিল হলেও বৈধ অন্য প্রস্তাবদাতাদের মধ্য থেকে অন্য কাউকে নতুন লাইসেন্স দেয়া হয়নি। বরং এর আগেই উচ্চ আদালতে একুশের বৈধতার মামলা চলাকালে যমুনা টেলিভিশনকে অযাচিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে একুশের মতই টেরিস্ট্রেরিয়াল ও স্যাটেলাইট চ্যানেল হিসেবে সম্প্রচারের অনুমোদন দেয়া হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে দৈনিক যুগান্তরের একচ্ছত্র সমর্থন ও অন্যান্য সুবিধাদি প্রদানের বিনিময়ে এটা দেয়া হয়েছে বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে। তবে অল্পদিনের মধ্যে যমুনা গ্রুপের সাথে বিএনপি সরকারের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটলে যমুনা টিভিকে আর সম্প্রচারে আসতে দেয়া হয়নি। জন্মদাতা বিএনপি সরকারই যমুনা টিভির যমদূত রূপে আবির্ভূত হয়। তবে আদালতের রায়ের পরেও বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার যমুনা টিভিকে নিয়ে বিএনপির মতই নোংড়া খেলা খেলেছে। দীর্ঘ আইনী লড়াইয়ের পরেও বিষয়টির নিষ্পত্তি না হওয়ায় যমুনা টিভিকে ভিন্ন পথে সম্প্রচারে আসতে হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

রেডিও-টিভিকে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে যথার্থই স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা ছাড়াও বেসরকারি উদ্যোগে দায়িত্বশীল রেডিও-টিভি প্রতিষ্ঠা ছিল বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার। একুশে টেলিভিশনকে নিয়ে আইনী লড়াই শেষ হওয়ায় এটাই স্বাভাবিক ছিল যে বিএনপি সরকার নতুন করে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল অনুমোদন দেয়ার উদ্যোগ নেবে। তবে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল স্থাপনের জন্য অনুমোদন দেয়ার আগে অবশ্যই সরকারকে এ জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ক্ষমতা অর্জন ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একুশে টেলিভিশনকে লাইসেন্স দেয়ার আগে ’৯৯-এর ১৬ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয় এ সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে বললেও আইন প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (রেগুলেটরি অথরিটি) প্রতিষ্ঠা না করেই তথ্য মন্ত্রণালয় একুশে টেলিভিশনকে লাইসেন্স দেয়। বিএনপি সরকারও আওয়ামী লীগ সরকারের পথ অনুসরণ করেছে। বিএনপি সরকারের সময় মন্ত্রিসভা সম্প্রচার আইনের খসড়া অনুমোদন করেনি। এখনও কোন আইন ছাড়াই চলছে বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল, যেখানে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ও কয়েক হাজার মানুষের চাকুরির কোন আইনী সুরক্ষা নেই।

একুশে টেলিভিশনের জন্মের পেছনের কথা

বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি টেরিস্ট্রিয়াল টেলিভিশন চ্যানেল একুশে টেলিভিশনের জন্মের নেপথ্য কথা হয়তো এখন সংশ্লিষ্ট অনেকেরই মনে নেই। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে দীর্ঘ প্রায় তিন দশক প্রশাসনিক বিষয়ে রিপোর্টিংয়ের কারণে এ সম্পর্কিত ঘটনাবলী এখনও এ প্রতিবেদকের সংগৃহীত সরকারি কাগজপত্রে ও স্মৃতিতে রয়ে গেছে।

বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম বিএনপি সরকারের সময় ১৯৯৪ সালে বিটিভির দ্বিতীয় চ্যানেলটি টেরিস্ট্রেরিয়াল ও স্যাটেলাইটে সম্প্রচারের উদ্যোগ নেয়া হয়। টিএন্ডটি বোর্ডের (বর্তমানে বিটিসিএল) দুর্বল মাইক্রোওয়েভ লিংক দিয়ে ঢাকা কেন্দ্রের সাথে দেশের বিভিন্ন স্থানের উপকেন্দ্রগুলোর নিরবিচ্ছিন্ন সংযোগ দেয়া সম্ভব ছিল বলেই শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচারের জন্য বিটিভির দ্বিতীয় চ্যানেলটি টেরিস্ট্রিয়াল ও উপগ্রহের মাধ্যমে সম্প্রচারের কথা ভাবা হচ্ছিল। (৫০ বছর বয়সী অনেকেরই হয়তো মনে আছে, আগের দিনে হঠাৎ বিটিভির অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেলে টিভির পর্দায় ভেসে উঠতো, “মাইক্রোওয়েভ লিংকে ত্রুটির কারণে সম্প্রচারের বিঘ্ন ঘটছে বলে আমরা দু:খিত!”) একই সময়ে ক্যাবল/স্যাটেলাইট টিভির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী টেলিভিশন সম্প্রচারে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ফলে মন্ত্রিসভার অনুমোদনক্রমে ১৯৯৩ বিটিভির অলস সময়ে সিএনএন ও বিবিসির সংবাদ পুনঃসম্প্রচার করা হয়। অন্যান্য বিভিন্ন সংস্থাও তাদের অনুষ্ঠান বাংলাদেশ পুনঃসম্প্রচারের জন্য আবেদন করে। এ প্রেক্ষিতে ৯৩ সালের ৮ জুন মন্ত্রিসভা নিন্মোক্ত সিদ্ধান্ত নেয়: (ক) “সিএনএন, বিবিসি, স্টার টিভি ও বিভিন্ন উপগ্রহ সম্প্রচার সংস্থাসমূহের অনুষ্ঠান পুনঃসম্প্রচারের জন্য বেসরকারি খাতে পৃথক টেলিভিশন চ্যানেল স্থাপন সংক্রান্ত সার-সংক্ষেপের প্রস্তাব অনুমোদন করা হইল না।; (খ) সরকারিভাবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য পৃথক ও নতুন একটি চ্যানেল স্থাপন করা হবে। উপরোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয় বরাবরে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হইবে।”

এর পরপরই হংকং ভিত্তিক কৃত্রিম উপগ্রহ এশিয়াস্যাট-২ এর একটি ট্রান্সপন্ডার ভাড়া এবং উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র স্থাপনের যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ২৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি প্রস্তাব মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদিত হয়। ‘৯৩ সালের ২৪ নভেম্বর একনেক সভায় ৯৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় বিটিভির দ্বিতীয় চ্যানেল প্রবর্তনের প্রকল্প অনুমোদিত হয়। তবে ‘৯৫ সালের ৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত একনেকের আরেকটি সভায় বিটিভির দ্বিতীয় চ্যানেলটি সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানায় স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে তা মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। এতে একটি পৃথক কোম্পানির মাধ্যমে দ্বিতীয় চ্যানেল স্থাপনের কথা বলা হয়। কিন্তু এ প্রস্তাব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ সম্পর্কিত প্রকল্প একনেক সভায় চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের আগেই ১৯৯৪ সালে খালেদা জিয়ার প্রথম বিএনপি সরকারের তথ্যমন্ত্রী ব্যরিস্টার নাজমুল হুদা পাকিস্তান টেলিভিশনের (পিটিভি) মত বিটিভির দ্বিতীয় চ্যানেলটিও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত করেন। এ জন্য ৫০ কোটি টাকায় এশিয়াস্যাট-২ (তখনও পৃথিবীর কক্ষপথে উৎক্ষেপন করা হয়নি বলে উৎক্ষেপন সফল হবে কি না তার নিশ্চয়তাও ছিল না) ভাড়া করার একটি প্রস্তাব সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠাতে তথ্য মন্ত্রণালয় সার-সংক্ষেপ তৈরি করে। তখন এশিয়ার আকাশে কয়েকটি স্যাটেলাইট থাকলেও দরপত্র আহ্বান বা দর যাচাই ছাড়াই উচ্চমূল্যে এশিয়াস্যাট-২ ভাড়া করা হচ্ছে মর্মে এ প্রতিবেদকের একটি প্রতিবেদন ’৯৪ সালে দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। এশিয়াস্যাটের প্রতিনিধিত্বকারী স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সিলভিয়া ইন্টারন্যাশনালের (মালিক সম্প্রতি সউদী আরবে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ) পক্ষে তদ্বিরকারী মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এক সময়ের এডিসি ক্যাপ্টেন (অব.) মাজহার ক্ষিপ্ত হয়ে বাংলাবাজার পত্রিকায় এসে উত্তেজনা সৃষ্টি করলে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। পত্রিকার ঐ প্রতিবেদনের কারণে তথ্য মন্ত্রনালয় ক্রয় কমিটিতে সে সময় আর এশিয়াস্যাট-২ ভাড়া করার প্রস্তাবটি পাঠায়নি। এরইমধ্যে আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির প্রেক্ষিতে তথ্যমন্ত্রী নাজমুল হুদা আপিল বিভাগকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব প্রদানের প্রস্তাব দিলে তাকে মন্ত্রিত্ব হারাতে হয়। পরে বাণিজ্যমন্ত্রী শামসুল ইসলামকে তথ্য মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব দেয়া হয়। এর কিছুদিন পর তথ্য মন্ত্রণালয় এশিয়াস্যাট-২ ভাড়ার প্রস্তাবটি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠায় এবং তা সভার আলোচ্যসূচিভুক্ত হয়। সভার ঘণ্টাখানেক আগে তথ্যমন্ত্রীকে টেলিফোনে এ প্রতিবেদক এ বিষয়টি জানালে দুর্নীতি ও দুর্নামের ভয়ে তথ্যমন্ত্রী বিষয়টিকে সভার আলোচ্যসূচি থেকে প্রত্যাহার করে নেন। এরপর আর এ বিষয়ে কোন অগ্রগতি হয়নি।

১৯৯৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিটিভির দ্বিতীয় চ্যানেল নিয়ে ফাইল চালাচালি ও সভা অনুষ্ঠিত হয়। এক পর্যায়ে পূর্বের ধারাবাহিকতায় সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে বিটিভির দ্বিতীয় চ্যানেল চালুর প্রস্তাবও চূড়ান্ত হয়। তবে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, বিটিভির দ্বিতীয় চ্যানেলে বেসরকারি খাতে টেরিস্ট্রেরিয়াল টিভির লাইসেন্স দেয়া হবে।

এশিয়াস্যাট-২ ভাড়া নেয়ায় দুর্নীতির খবর দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় না ছাপা হলে এবং পরবর্তীতে তথ্যমন্ত্রী শামসুল ইসলাম আগাম এশিয়াস্যাট-২ ভাড়ার প্রস্তাবটি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি থেকে প্রত্যাহার করে না নিলে টেরিস্ট্রেরিয়াল ও স্যাটেলাইট চ্যানেল হিসেবে এভাবে হয়তো একুশে টেলিভিশনের জন্মই হত না। তবে সে সময় একুশে টেলিভিশনের জন্ম না হলেও অবাধ তথ্য প্রবাহের এ যুগে ভালো একটা কিছু অবশ্যই হত। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গকারী বাংলাদেশের মানুষ সব সময়ই ভালো কিছু প্রত্যাশা করে থাকে!

সূত্র: অনলাইন নিউজ বাংলাদেশ।