হলুদ সাংবাদিকতা গণমাধ্যমের বৈশিষ্ট্য!

রবিবার, ১৮/০১/২০১৫ @ ৯:৫৭ পূর্বাহ্ণ

:: জিল্লুর রহমান মন্ডল পলাশ ::

ZILLUR RAHMAN MONDAL PALASHগণতন্ত্রের এ সংজ্ঞার সাথে বাস্তবতার রয়েছে বিশাল ফারাক। রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে বিরোধী দল প্রাতিষ্ঠানিক গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় খুবই জরুরী। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বরাবরই বিরোধী দলগুলো গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে দেশের গণমাধ্যমগুলো। তাই স্বার্থন্বেষী মহলগুলো গণমাধ্যমের দখল নিতে প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। সেই সঙ্গে সাংবাদিকতার মধ্যেও শুরু হয়েছে প্রতিযোগিতা, তবে এ প্রতিযোগিতা দুই ধরনের, এক প্রকৃত সাংবাদিকতা আর দুই হলুদ সাংবাদিকতা।

আমি ছোট থেকে শখের বশেই লেখাখেখি শুরু করি। মাঝে মাঝে আমার পরিচিত দুই একজনের কাছে লেখার বিষয়ে পরামর্শ চেয়েও বারবার অবজ্ঞার শিকার হয়েছি। তবে আমার লেখা ও আগ্রহ দেখে অনেকে আমাকে সাহস দিয়ে বলেছিলেন তুমিই পারবে, এগিয়ে চলো নিজের মেধা ও মননে। যার ফলে আমি উপজেলা প্রতিনিধি থেকে জেলা প্রতিনিধি হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছি যায়যায়দিনে। শুধু যায়যায়দিন নয় আমি দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করছি। এছাড়া সাদুল্যাপুর উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করছি। সত্যিই এক সময় নিজের প্রয়োজনেই আমাকে আরো বেশি সাহসী হতে হয়েছিল। যাক সে কথা, সাহস আর আদর্শ নিয়ে গর্ব করার জন্য এ লেখা নয়।

আমার সাংবাদিকতা শুরু থেকে আজ পর্যন্ত আমি বিশেষ করে পরিচিত ভাল সাংবাদিকদের অনুকরণ-অনুসরণ করি খুবই বেশি। এমন অনেক সাংবাদিক আছেন, যাদের লেখার ধরন, কৌশল, ইচ্ছা, শক্তি আর সাহসের কোনটাই আমাকে তাদের কাছে টানতে পারেনি। তবে হাতে গোনা কয়েকজনের সাংবাদিকতা আমাকে আজও দারুনভাবে আকৃষ্ট করে তোলে। হয়তো তাদের দেখানো পথেই আজ আমার এই পথ চলা।

১৯৯৯ থেকে অদ্য পর্যন্ত আমি জেলার সাংবাদিকদের সাংগঠনিক বিষয়ে সমন্নয় দেখেছি কিন্তুু স্থিতিতিভাবে এ সমন্নয় দীর্ঘদিন থাকেনি। এক শ্রেণীর পত্রিকা কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি শুণ্যতায় কিছু অর্ধ শিক্ষিত সুবিধাবাদী হলুদ সাংবাদিকতার মনোভাব বেছে নিয়ে প্রকৃত সাংবাদিকদের বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলছে। এ কারণে জেলা ও উপজেলার সাংবাদিকদের মধ্যে বিরোধ থাকায় রয়েছে একাধিক সংগঠন। অর্ধশতাধিক পত্রিকার সাংবাদিক রয়েছেন শুধু জেলা শহরে। এরমধ্যে অনেকেই আছেন যাদের পত্রিকা জনসাধারণ কোনদিনেও হাতে পান না।

পাঠকের চোখে পড়েনি এমন পত্রিকার সাংবাদিকেই বেশি। আর কোনদিন ওই সাংবাদিক একটা নিউজও পাঠান না তার পত্রিকায়। তবুও দাপটে চষে বেড়াচ্ছেন সাংবাদিক পরিচয়ে। তবে বিভিন্ন উপজেলায় জাতীয় পত্রিকার সাংবাদিক রয়েছেন হাতেগোনা ৮ থেকে ১০ জন। এরমধ্যে দায়িত্বপূর্ন সঠিক নির্ভীক ও দৃঢ়চেতা সাংবাদিকতা করেন ৪ থেকে ৬ জন। এতে তাদের অনেক প্রতিকুলতার মধ্যে দিয়ে কর্তব্য পালন করতে হচ্ছে। বাকি সাংবাদিকরা কপি সাংবাদিকতায় ব্যস্ত থাকেন।

এছাড়া হলুদ সাংবাদিকরা কৌশলে সাংবাদিকতায় লিপ্ত রয়েছে অত্যন্ত দাপট ও ক্ষমতার সঙ্গে। বর্তমানে জেলা ও উপজেলার কয়েকজন সাংবাদিক রয়েছেন যারা নির্লজ্জের মতো সুবিধা আদায় করতে সুযোগ মতো যখন যার সঙ্গে ভাব জমে তার সঙ্গেই জমে উঠে হলুদ সাংবাদিকতা ও বিভিন্ন অফিস প্রতিষ্ঠান দাপটে বেড়ান। মাঝে মধ্যে এমন ধরনের নির্মম ঘটনা ঘটে কিন্তুু তা কোন পত্রিকায় আসে না। আবার কোন একটি বিষয় বা ঘটনা সংবাদ নয় সেটিই স্থানীয় সাংবাদিকরা তার মনের অবেগ হিংসা দিয়ে সুন্দর করে পত্রিকায় তুলে ধরেন। এছাড়াও যে সকল সংবাদের বিষয়বস্তু অসাধু এবং ভিত্তিহীন অথবা যেগুলোর প্রকাশনায় বিশ্বাস ভঙ্গের আশংকা আছে সে সকল সংবাদ প্রকাশ করতেও এখানকার সাংবাদিকরা বেশ উৎসাহ বোধ করে থাকেন।

নাম সর্বস্ব ও অস্তিত বিহীন পত্রিকার আইডি কার্ড পকেটে নিয়ে জেলা ও উপজেলার যে কোন প্রান্তে কোন ধরণের তাৎক্ষনিক ঘটনা, অপরাধ, মামলা সহ ঘটনার সংবাদ পেলে চিহিত কয়েকজন হলুদ সাংবাদিক ছুটে যান সেখানে। সংবাদ হোক আর না হোক উভয় পক্ষের নিকট বুঝিয়ে নানা কৌশলে টাকা আদায় করাই তাদের কাজ। এতে যে যত টাকা দিতে পারছেন তাকে সন্তুষ্ট করতেই সংবাদ প্রকাশ করছেন। পরে কেউ প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ দিতে চাইলে ইঞ্চি কলাম হিসাবে মোটা অংকের টাকাও আদায় করছেন।

এতে যদি ওই প্রতিবাদে কোন সাংবাদিক/প্রতিবেদককে প্রতিহিংসা বশত চাঁদাবাজ উল্লেখসহ হলুদ সাংবাদিক বলা হয় তাতেও কোন বাধবিচার না করেই তা প্রকাশ করা হচ্ছে। অথচ সংশ্লিষ্ট পত্রিকা মালিকরা এ বিষয়ে কোন কৈফিয়ত বা ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করেন না। আসলেই ভয় কি? পত্রিকা অফিসে টাকা পাঠালেই তো সব হারাম একেবারে হালাল হয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে প্রকৃত সাংবাদিকরা একটি সঠিক সংবাদ প্রকাশ করে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি ও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন।

আমি মনে করি, যাদের সাংবাদিকতায় ভীতি কাজ করে তাদের উচিত সাংবাদিকতা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়া। সংশ্লি¬ষ্ট গণমাধ্যমগুলোর উচিত এমন প্রতিনিধিদের ব্যাপারে নতুন করে চিন্তা করা। স্থানীয় সাংবাদিকদের এ ভীতি পুরো গণমাধ্যমের জন্য লজ্জাকর। ঢাকায় এসির নিচে বসে যারা সংবাদ এডিটিং করে, তারা আরও কত যে গুরুত্বপূর্ণ ও মর্মান্তিক সংবাদ এডিটিং থেকে বঞ্চিত হয়, তা কী জানা আছে?

জেলা ও উপজেলায় সাংবাদিকদের কোন ঐক্য নেই, সাংবাদিকরা আজ বিভিন্ন মেরুতে বিভক্ত। তবে ব্যতিক্রম শুধু সাদুল্যাপুর উপজেলায়। এখানকার সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রেসক্লাবে অবস্থান করছেন। এছাড়া অনান্য উপজেলায় সাংবাদিকদের একজনের উপর আঘাত আসলে সম্মিলিতভাবে কোন প্রতিবাদ হয় না। যে দেশের জাতীয় পর্যায়ে সাংবাদিকদের কোন ঐক্য নেই, সেখানে তৃণমূল পর্যায়ে এর বেশি কী আর আশা করা যায়। এটি শুধু একটি জেলা বা উপজেলার চিত্র নয়, সাংবাদিকতায় এ অবস্থা মনে হয় আজ সারা দেশেই বিরাজ করছে। গণমাধ্যম বাড়ছে কিন্তু আজ গণমাধ্যমের কোন অভিভাবক নেই। গণমাধমের কোন চেইন অব কমান্ড নেই। বিশাল এ গণমাধ্যম থেকেই খোদ সাংবাদিকরাই বিভিন্নভাবে নিগৃহিত, প্রতারিত ও বঞ্চিত হচ্ছেন। গণমাধ্যমের নেতৃত্বকে আজ একাংশ দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে।

গণমাধ্যমের বিভক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন স্বার্ন্থনেস্বী মহল নিজেদের অপকর্ম চালাচ্ছেন। গণমাধ্যম আজ ব্যবসায়িক বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এখানে নীতি-নৈতিকতা বির্সজিত। হলুদ সাংবাদিকতা আমাদের গণমাধ্যমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এখন বস্তনিষ্ঠ ও তথ্যবহুল প্রতিবেদনেও সংশ্লিষ্টদের টনক নড়ে না। গণমাধ্যমের কর্মীদের মধ্যে পরষ্পর রেষারেষি, অশ্রদ্ধা ও হলুদ সাংবাদিকতার কারণে অনেক সময় মানুষের মনে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এখন জরুরীভাবে প্রয়োজন সাংবাদিকদের চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠা করা। দেশের প্রেসক্লাবগুলোর প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে সাংবাদিকদের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

গণমাধ্যমের চলমান দুঃসময় আরো ঘণীভূত হচ্ছে। কিছু দানব গণমাধ্যমকে গিলে খাচ্ছে। গণমাধ্যমের দুই অংশের নেতাদের প্রতি আকুল আবেদন, এখনই যদি গণমাধ্যমের চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না হয় তবে গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি অনাস্থা তৈরি হতে পারে। এখন সময়ের দাবী, সাংবাদিকদের দল-মতের ঊর্দ্ধে উঠে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অতীতের মত দেশের প্রয়োজনে সাংবাদিকদের গনতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ প্রক্রিয়া যত দ্রুত সম্ভব শুরু করতে হবে। পাশপাশি এসব ক্ষেত্রে পত্রিকা কর্তৃপক্ষের সুনজর, কৈফিয়ত ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দৃঢতা থাকলে হলুদ সাংবাদিকতার জন্ম হতো না বলেই সমাজ সচেতন মহলের অভিমত। দেশ, জাতি, সমাজ, অনৈতিকতা রোধ ও মানবকল্যাণের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সবার আরো সজাগ হওয়া দরকার।

লেখক : গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক যায়যায়দিন ও দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম।
ইমেইল: [email protected]