গণতন্ত্রের বিকাশে গণমাধ্যমের ভূমিকা

শুক্রবার, ২২/০৩/২০১৩ @ ৬:১৪ অপরাহ্ণ

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী::

press_clubসংবাদপত্রের একটা বড় পরিচয় সংবাদমাধ্যম। অর্থাৎ সংবাদ প্রচারই তার মুখ্য উদ্দেশ্য। ইংরেজি নিউজ (News)) কথাটিরও উৎপত্তি নর্থ, ইস্ট, ওয়েস্ট ও সাউথ এই দিকগুলো থেকে। উত্তর, পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ_ এই চারদিকের ঘটনাই হলো নিউজ বা খবর। একেবারে গোড়ার দিকে সংবাদপত্রের উদ্দেশ্য ছিল কেবল পাঠকের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়া। কোনো মতামত প্রচার নয়। রয়টার নামক বার্তা সংস্থাটির যিনি প্রতিষ্ঠাতা, তিনিও মতামত নয়, মত নিরপেক্ষভাবে সংবাদ প্রচারের উপরই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের আগে কোনো কোনো দেশে মানুষ হাতে লিখে চিঠি অথবা খবর শিক্ষিত কবুতরের সাহায্যে আত্দীয়স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবের কাছে পাঠাত। যুদ্ধকালীন সময়ে গোয়েন্দা কবুতরও ব্যবহার করা হয়েছে শত্রুপক্ষের খবর পাচারের জন্য। প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ও সংবাদ পাচারে গোয়েন্দা কবুতরের ব্যবহারের কথা জানা যায়।

গত শতকের গোড়ায় অবিভক্ত বাংলাদেশে সেবক, মোহাম্মদী, আজাদ, পয়গাম ইত্যাদি নানা সাপ্তাহিক ও দৈনিক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা এবং রাজনীতিক মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর কাছে গল্প শুনেছি, বাংলাদেশে যখন কোনো সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থা ছিল না, তখনো মানুষ কাছে-দূরের খবর জানতে চাইত। তখন তাদের এই খবর জানার চাহিদা পূরণ করতেন গ্রাম্য কবিয়ালরা। তারা কোনো ঘটনা ঘটলে মুখে মুখে তা নিয়ে কবিতা বা গান লিখে তা চতুর্দিকে প্রচার করতেন।

মওলানা সাহেব এই ধরনের একটি ঘটনার কথা বলেছিলেন। এক জামাই শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে কি কারণে রাগান্বিত হয়ে গুলি চালিয়ে শ্বশুর, শাশুড়ি ও বউকে মেরে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে কবিয়ালরা গান বেঁধে খবরটা চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। তাদের গানের ধুয়া ছিল,

‘জামাই বাবুর কি যে গুণ

এক গুলিতে তিনটা খুন।’

ব্রিটিশ আমলের বাংলাদেশে ভাওয়ালের রাজাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা প্রচেষ্টা, ক্ষুদিরামের ফাঁসি ইত্যাদি ঘটনা নিয়ে অজস্র গান, কবিতা ছড়ানো হয়েছে। পুঁথি এবং পালা রচনা করা হয়েছে। ক্ষুদিরামের গান এবং ভাওয়াল সন্ন্যাসীর পালা এখনো দুই বাংলার লোকমুখে প্রচলিত।

বাংলাদেশে (অবিভক্ত) সিসার বাংলা টাইপ আবিষ্কার এবং মুদ্রণযন্ত্র আমদানি হওয়ার পর মুদ্রিত সংবাদপত্রের আবির্ভাব ঘটে। প্রাথমিক উদ্যোগ খ্রিস্টান পাদ্রিদের। তারা সংবাদ প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে ধর্ম প্রচারও করতেন। তারপর শুরু হয় বাংলা সংবাদপত্রের প্রচার।

বাংলাদেশে ব্রিটিশ আমলে সংবাদপত্র প্রকাশের সেই প্রথম যুগে সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থাকে কি গণমাধ্যম বলা হতো? আমার ঠিক জানা নেই। গবেষকরা বলতে পারবেন। তবে এ কথা ঠিক সদ্য ইংরেজি শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্তের ভদ্রলোক শ্রেণী প্রথম তাদের দাবি-দাওয়া, অভাব-অভিযোগ ‘সদাশয় ইংরেজ সরকার বাহাদুরকে’ জানানোর জন্যও সংবাদপত্র প্রকাশ করেছিলেন। শুধু সংবাদ প্রকাশ নয়, ধর্ম সংস্কার ও সমাজ সংস্কারের তাগিদও ছিল তখনকার সংবাদপত্রে। ফলে সংবাদপত্রগুলো মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য হলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গেও তার একটা যোগাযোগ গড়ে ওঠে।

আমি সংবাদপত্রের ইতিহাস ঘাঁটতে যাব না। বাংলাদেশে এককালের সংবাদ মাধ্যম কি করে ধীরে ধীরে গণমাধ্যম হয়ে উঠল এবং অভিজাত ভদ্রলোক শ্রেণীর মুখপত্র থেকে সাধারণ মানুষের মুখপত্র হয়ে উঠল তার অতীত-বর্তমান নিয়ে একটু আলোচনা করতে চাই। ব্রিটিশ বাংলায় হিন্দু মধ্যবিত্তের অনেক পরে মুসলিম মধ্যবিত্তের আবির্ভাব কিন্তু অতীতের সামন্তবাদী পরিবেশ ও প্রভাব থেকে তখনো তার মুক্তি ঘটেনি। শিক্ষার অভাবে ধর্মান্ধতা ও মজহাবি ঝগড়ার মধ্যে তাদের সমাজ জীবন আবর্তিত হতো। একটা উদাহরণ দেই, এটাও মওলানা আকরম খাঁ সাহেবের কাছ থেকে শোনা।

অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানদের মধ্যে মজহাবি ঝগড়া ছিল প্রচণ্ড, বিশেষ করে হানাফি (সুনি্ন) ও মোহাম্মদী সম্প্রদায়ের মধ্যে। মোহাম্মদী সম্প্রদায় আবার কোনো মজহাবে বিশ্বাস করত না। তারা ছিলেন লা মজহাবি। মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন লা মজহাবি। এই সময় কলকাতা থেকে ‘হানাফি’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হতো। এই পত্রিকাটি অন্য মজহাবকে, বিশেষ করে লা মজহাবি মোহাম্মদী সম্প্রদায়কে তীব্র ভাষায় আক্রমণ চালাত। ধর্মীয় তত্ত্ব নিয়েও তর্কবিতর্ক চলত।

হানাফিদের বক্তব্যের জবাব দেওয়ার জন্যই সাপ্তাহিক মোহাম্মদী কাগজের জন্ম। প্রথমে মওলানা আকরম খাঁ পত্রিকাটির বেতনভোগী সম্পাদক হন। পরে কাগজটির মালিকানা লাভ করে দৈনিক সেবক, দৈনিক আজাদ, অর্ধসাপ্তাহিক পয়গাম ইত্যাদি আরও অনেক কাগজের জন্ম দেন। ততদিনে দেশে ব্রিটিশ-বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন জমে উঠেছে। হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত কাগজগুলো তাতে যোগ দেয়। মুসলমানদের দ্বারা পরিচালিত অধিকাংশ কাগজও ধর্মপ্রচার ও মজহাবি ঝগড়া বাদ দিয়ে এই রাজনৈতিক আন্দোলনে শরিক হয়। মওলানা আকরম খাঁর দৈনিক সেবক ছিল কংগ্রেসের সমর্থক, পরে দৈনিক আজাদ বের করার পর তিনি মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান আন্দোলনে সমর্থন দিতে থাকেন।

রাজনৈতিক আন্দোলন, বিশেষ করে স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা উপমহাদেশের অবিভক্ত বাংলায় সংবাদপত্রগুলোকে জনগণের এবং গণআন্দোলনের খুব কাছাকাছি এনে দাঁড় করায়। তখন কাগজগুলোর গায়ে দলীয় মালিকানার ছাপ ছিল। অবিভক্ত বাংলায় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বাইরে সাম্যবাদী আন্দোলনের ঢেউয়ে কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলন গড়ে উঠলে এই আন্দোলন-ভিত্তিক সংবাদপত্রের প্রকাশও শুরু হয়। যেমন কবি নজরুল ইসলামের লাঙল, গণবাণী, ধূমকেতু অথবা কুষ্টিয়ার কৃষকপ্রজা নেতা শামসুদ্দীন আহমদের দৈনিক কৃষক। কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকা শ্রমিক ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো থেকে চাঁদা তুলে বের করা হয়। পাকিস্তান আমলে নৌপরিবহন শ্রমিকদের মুখপত্র হিসেবে নারায়ণগঞ্জ থেকে বের হতো সাপ্তাহিক সংগ্রাম। ভাষা আন্দোলনের প্রথম মুখপত্রগুলোর অন্যতম ছিল ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সৈনিক।

রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ এবং গণমুক্তির রাজনীতিই দেশের সংবাদ মাধ্যমকে জনগণের কাতারে এনে দাঁড় করা এবং অধিকাংশ সংবাদপত্রকেই কমবেশি গণমাধ্যমে পরিণত করে। ফলে অনেক পত্রিকাই ভদ্রলোকদের পত্রিকা থেকে সাধারণ মানুষের পত্রিকায় (রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও) পরিণত হয়। পত্রিকার ভাষা ও বাবু ভাষা থেকে জনভাষায় রূপান্তরিত হতে থাকে। পাকিস্তান আমলে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাক আওয়ামী লীগের অঘোষিত মুখপত্র হিসেবে পরিচিত থাকলেও পত্রিকার সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ‘মোসাফির’ ছদ্মনামে ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ নামে যে কলামটি লিখতেন, তাতে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা এমনভাবে ব্যবহার করতেন যে, তাকে বাংলা সাংবাদিকতায় গণজবানের প্রবর্তক বলা হয়। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সাহায্যদানের জন্যই এই গণভাষার প্রয়োজন ছিল। পাকিস্তান আমলে এই গণভাষার সাংবাদিকতা সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত) সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।

এই সাংবাদিকতার ধারাটি এখনো স্বাধীন বাংলাদেশেও বহমান রয়েছে। দেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্র শিল্পে তথা সংবাদ মাধ্যমেরও চরিত্র ও চেহারায় পরিবর্তন হয়েছে। আগে সংবাদ মাধ্যমের মালিকানা ছিল মূলত রাজনৈতিক নেতা ও দলের হাতে। এখন প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া দুই-ই বেশির ভাগ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের হাতে। তাতে সাংবাদিকতায় আগের আইডিয়ালিজমের চেয়ে কমার্শিয়ালিজমের প্রভাব বেড়েছে বেশি। দলীয় আনুগত্যের প্রভাব থেকেও সাংবাদিকতা অনেকটা মুক্ত হয়েছে। তবে অন্যান্য ধনতান্ত্রিক উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের সাংবাদিকতাতেও নানা দূষিত ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে। তা নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা প্রয়োজন। তবু বলতে হবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার দরজা অনেকটাই খুলে গেছে।

বাংলাদেশের গত ৪০ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বার বার সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারী শাসনের দৌরাত্দ্য এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও স্বাধীন পার্লামেন্টের অনুপস্থিতির ফলে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের কথা বলা ও আন্দোলনে সাহায্যদানের ক্ষেত্রে যে শূন্যতা সৃষ্টি হতে যাচ্ছিল তা পূর্ণ করেছে সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যম। তারা পার্লামেন্টের অনুপস্থিতিতে জনগণের পার্লামেন্টের ভূমিকাও পালন করেছে। সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে এই মাধ্যম।

বাংলাদেশে জঙ্গি মৌলবাদের উত্থান এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রতিরোধে ছাপমারা কিছু মিডিয়া ছাড়া অধিকাংশ প্রিন্ট ও ইলেক্ট্র্রনিক মিডিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। সংবাদপত্রে বিভিন্ন মতের মানুষের মতামত প্রকাশ, টেলিভিশনগুলোর টকশোগুলো যতই সমালোচিত হোক, তা একদল একমতের আধিপত্য বিস্তার এবং স্বৈরাচারী লৌহমানবদের আবির্ভাব ঠেকিয়ে রেখেছে। কিবরিয়া হত্যা, সাগর-রুনি হত্যাসহ ইত্যাদি হত্যাকাণ্ড এবং সাম্প্রতিক বড় বড় দুর্নীতির ঘটনাগুলো তদন্তের নামে ধামাচাপা পড়ত এবং এতদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে তলিয়ে যেত, যদি দেশের গণমাধ্যম এবং গণমাধ্যমের সাহসী কর্মীরা তা জাগিয়ে না রাখতেন।

গণচেতনার এবং গণআন্দোলনের বিকাশ এবং গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দানে গণমাধ্যম কত বড় শক্তিশালী হাতিয়ার তার প্রমাণ পাওয়া গেছে ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে প্রজন্ম চত্বরের বিশাল যুব জনতার অভ্যুত্থানে অধিকাংশ গণমাধ্যমের ভূমিকায়। বাংলাদেশে গণতন্ত্র অনেক দুস্তর বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে এগুচ্ছে। গণতন্ত্র হত্যার পৌনঃপুনিক ষড়যন্ত্রও এখানে কম শক্তিশালী নয়। এই ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোও মাঝে মধ্যে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়। কিন্তু এই দুঃসময়েও সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা ও তথা গণমাধ্যমগুলোই নিজেদের অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি পতন-স্খলন সত্ত্বেও হয়ে দাঁড়ায় গণতন্ত্র ও গণঅধিকার রক্ষার অতন্দ্র মশাল। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন সর্বতোভাবে আদর্শনিষ্ঠ নয় কিন্তু তার একটাই রক্ষাকবচ_ সে জননিষ্ঠ।

লেখক : সাংবাদিক কলামিস্ট