অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও কিছু গোড়ার কথা

শুক্রবার, ২২/০৩/২০১৩ @ ৬:০১ অপরাহ্ণ

মাহমুদ মেনন::

BD-newsসাংবাদিকতা। কথাটি প্রথম যেদিন শুনি সেদিন তথ্য প্রযুক্তিতে দৌড় ছিলো ইন্টারনেট ব্রাউজিং, ইমেইল চেক করা ও পাঠানো আর কম্পিউটারে লিখতে পড়তে পারা। বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় পড়তে গিয়ে ইলেক্ট্রনিক জার্নালিজম কোর্সটিও খুব আগ্রহভরে পড়েছিলাম। কিন্তু ১৯৯৪ ব্যাচে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার শিক্ষায় অনলাইন জার্নালিজম যুক্ত হয়নি।

দিনটি মনে আছে ২১ আগস্ট ২০০৪। সাংবাদিকতার একটি কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলাম আমরা তিনজন। জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল, মাসরুর জামান রনি ও আমি। দুপুর নাগাদ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শেষ করে তিনজনই ধানমন্ডি এলাকায় একটি ফাস্টফুড শপে বসেছি। আলোচনা হচ্ছিলো… একটি অনলাইন নিউজ এজেন্সি হচ্ছে তা নিয়ে। জুয়েল ভাই এরই মধ্যে প্রক্রিয়াটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমি ও রনি ভাই সেটিতে চাইলে কাজ করতে পারি। অনলাইন সাংবাদিকতার কথা সেই প্রথম শোনা। কি হবে? কেমন হবে? তা নিয়ে আলোচনা এগুচ্ছিলো। এমন সময় জুয়েল ভাইয়ের মোবাইল ফোনটি বেজে উঠলো। ফোন ধরে তিনি কিছু একটা শুনে বললেন, সর্বনাশ! এরপর ফোনে দ্রুত কিছু পরামর্শ দিলেন। বুঝে নিলাম বড় কোনো একটি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। ফোন রেখে জানালেন, কলটি এসেছিলো ফরিদ আহমেদ সাজুর কাছ থেকে। সে জানিয়েছে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা হয়েছে। ব্যাপক হতাহতের আশঙ্কা। পরে কথা হবে বলে দ্রুত খাবার রেখেই বের হয়ে গেলেন জুয়েল ভাই। তিনি তখন বার্তাসংস্থা ইউএনবিতে কর্মরত। দ্রুত ছুটে গেলেন অফিসের উদ্দেশে।
এরপর বোমা হামলার ডামাডোলে কিছুদিন কেটে গেলেও ওইদিনের সংক্ষিপ্ত আলোচনাটি পরিনতি পেলো সেপ্টেম্বরে এবং উপরে উল্লেখিত আমরা চারজনই যোগ দিলাম দেশের প্রথম অনলাইন সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ২৪.কম-এ। যার স্বপ্নদ্রষ্টা, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক আলমগীর হোসেন।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে যার পরিচিতি সবচেয়ে আধুনিকমনস্ক, টেক হেভি নেটিজেন হিসেবে।

২০০৪ সালের সেই সেপ্টেম্বরেই যাত্রা শুরু করে বিডিনিউজ২৪.কম। আলমগীর হোসেনের যেন এক যুদ্ধজয়ের সংকল্প। আর তার সঙ্গে সম্পাদক হিসেবে যোগ দিলেন, সে সময়ের ডাকসাইটে রিপোর্টার রাশেদ চৌধুরী (বর্তমানে ব্রিটেনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার), বার্তা সম্পাদক ছিলেন এনামুল হক চৌধুরী, বাসস, রয়টার্সসহ বিভিন্ন সংবাদ সংস্থায় যার ছিলো দীর্ঘ অভিজ্ঞতা (বর্তমানে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে প্রেস মিনিস্টার), ম্যানেজিং এডিটর ছিলেন সোহেল মনজুর, অ্যাডভাইজরি এডিটর ছিলেন দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জয়নাল আবেদীন, কপি এডিটর নজরুল ইসলাম, চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব নিলেন সে সময়ের করিৎকর্মা ও যোগ্য রিপোর্টারদের অন্যতম জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল। বেসরকারি সংস্থায় যুক্ত থাকায় সে সময় বিডিনিউজের সঙ্গে আমার ও মাসরুর জামান রনির সম্পৃক্ততা ছিলো খণ্ডকালীন। কপি এডিটর হিসেবে আমরাও মানসিকভাবে ছিলাম পুরোপুরি সম্পৃক্ত।

রিপোর্টিং টিমে ছিলেন তরুণ প্রজন্মের নামকরা সব রিপোর্টার- তরুণ সরকার, বিপ্লব রহমান, আবু সুফিয়ান, ফরিদ আহমেদ, আনোয়ার হক, কামরান রেজা চৌধুরী, সাজ্জাদুর রহমান, সোহেল রহমান, এস এম সালাউদ্দিন, আনিসুর রহমান, মোহসিনুল করিম, আশুতোষ সরকার, কৈলাশ সরকার, গনি আদম, নজরানা চৌধুরী, মোবাশ্বের হাসান সিজার, আতাউল গনি সুমন, ড্যানি, বাবলু, রাসেল এমন আরও অনেকে। বার্তাকক্ষে ছিলেন এনাম আহমেদ, মাকসুদ, দেবাশীষ রায়, উৎপল সরকার, শাহেদ জাহিদী, ইউসুফ, আবদুল হালিম সুমন, শিপন, সাদেক, রুখসানা পারভীন রুমা, সুলতানা জাহান শিমুসহ অনেকে। ফটো সেকশনে শফিকুল আলম, ফিরোজ আহমেদ, মনির, বিন্দু। এদের সকলেই এখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতায় নাম কুড়িয়েছেন। কেউ কেউ এখনো কাজ করছেন বিডিনিউজ২৪.কম-এ।

খবর দ্রুত তৈরি করাই শেষ কথা নয় তা অনলাইনে প্রকাশ করাও গুরুত্বপূর্ণ। দেশে প্রথম একাজটি দক্ষতার সঙ্গে করেছে বিডিনিউজের ওয়েব এডিটররা। আবিদুর রহমান রাসেলের নেতৃত্বে ছিলেন সাফি, আহসানুল আলম, আফরোজা মারিয়া, লিটা, বিথি, মমতাজসহ একদল ওয়েব এডিটর।

কো-অর্ডিনেটিং এডিটর নাহিদ সুলতানার সঙ্গে ছিলেন জেনারেল সেকশনের কয়েকজন। অ্যাকাউন্ট্যান্ট সালেককে কখনোই হিসাবের লোক মনে হতো না। দ্রুত সংবাদ লেখা দেওয়া নিয়ে তারও ছিলো অনেক ধরনের এক্সাইটমেন্ট।

রেফারেন্স সেকশনে শিউলি, হ্যাপী রাংসা ছিলেন।

দৃষ্টি নন্দন এ সাইটের ডিজাইনার ছিলেন নামী চিত্রশিল্পী নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা। ওয়েব সাইট ভেভেলপ করার দায়িত্বে ছিলেন আহমেদ ইয়াসির রিয়াদ।

হেড অব ক্রিয়েটিভ ছিলেন আকিফুর রহমান মুন্না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, এই ছোট্ট্ অথচ অত্যন্ত কার্যকর একটি কর্মীদল দিয়ে অসাধ্য সাধন করেন এডিটর ইন চিফ আলমগীর হোসেন। মাত্র এক বছরেই বিডিনিউজ দেশে বিদেশে পরিচিতি পায়। এক্সক্লুসিভ, স্পেশাল রিপোর্ট প্রকাশের মধ্য দিয়ে অর্জন করে আকাশসমান জনপ্রিয়তা। দ্রুত ও সঠিক খবর প্রকাশের মাধ্যমে সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর জন্য দ্রুত খবর পাওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে ওঠে বিডিনিউজ২৪.কম।

অনলাইন জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করলেও এমন একটি সংবাদ মাধ্যম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ ছিলো একটি দুরূহ কাজ। তখনও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো অন লাইনে বিজ্ঞাপন দিতে নারাজ ছিলো। ফলে নিজের দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে দেশে ও দেশের বাইরে বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমে কাজ করে কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে প্রতিষ্ঠা করা বিডিনিউজ বেশি দিন চালিয়ে নেওয়া আলমগীর হোসেনের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটি অন্যের মালিকানায় ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তখন থেকেই বিডিনিউজ২৪.কম নতুন মালিকানায় চলছে। এটি ২০০৬ এর সেপ্টেম্বরের ঘটনা।

এর চার বছর পর আলমগীর হোসেন ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু করেন নতুন অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম। মাত্র ছয় মাসেই দেশে অনলাইন সাংবাদিকতায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসে বাংলানিউজ। আলমগীর হোসেনের যোগ্য নেতৃত্বে বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষাভাষীসহ অনেকের কাছেই একটি প্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল হয়ে উঠেছে বাংলানিউজ।

তবে বাংলানিউজের অগ্রযাত্রার পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম গড়ে উঠেছে। ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সংবাদ পরিবেশনার এই ক্ষেত্রটি। বিশ্বজুড়ে এটি এখন নিউ মিডিয়া হিসেবে পরিচিত। সংবাদপত্র এরই মধ্যে সনাতনী সংবাদ মাধ্যমের তকমা পেয়েছে। জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে প্রিন্ট মিডিয়ার দৈনিক ও পাক্ষিকগুলো তাদের অনলাইন ভার্সন চালু করছে। নিকট ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও অনলাইন সংবাদপত্রই হবে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সবচেয়ে পঠিত।

আর এই সাংবাদিকতার জনক হিসেবে বিডিনিউজ ও বাংলানিউজের প্রতিষ্ঠাতা আলমগীর হোসেনের নাম উচ্চারিত হবে কৃতজ্ঞচিত্তে।

[পাদটিকা: বিডিনিউজ২৪.কম মঙ্গলবার তার পাঁচ বছর পূর্তি উদযাপন করায় এ লেখাটির অবতারণা। বাংলাদেশ নিউজ টোয়েন্টিফোর আওয়ার্স লিমিটেড নামে যে প্রতিষ্ঠানটি ২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করেছিলো সেটিই ফ্রেন্ডলি টেকওভার করে বিডিনিউজের বর্তমান ম্যানেজমেন্ট। এ অবস্থায় বিডিনিউজ তার প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর উদযাপন করলে বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার ইতিহাসের প্রথম দুটি বছরকে অস্বীকার করা হবে। অগ্রগামী সাংবাদিকতার চর্চায় বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে ওই দুটি বছর।]

পুনশ্চঃ বিডিনিউজ২৪.কম এর প্রিয় বন্ধুরা আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইছি। প্রাথমিক রিপোর্টে সকলের নাম উল্লেখ করতে না পারা আমার ব্যর্থতা। পরে কয়েক জনের নাম যোগ করতে পেরেছি আবিদুর রহমান রাসেলের সহযোগিতায়। তারপরেও অনেকের নাম বাদ পড়েছে। আশাকরি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

লেখক: মাহমুদ মেনন, হেড অব নিউজ
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম,
বাংলানিউজের সেৌজন্যে।

সর্বশেষ