কঠিনেরে ভালোবাসিলাম

মঙ্গলবার, ১১/১১/২০১৪ @ ২:২৯ অপরাহ্ণ

:: ইয়াকুব নবী ইমন ::

emonসাংবাদিকতা একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। বর্তমান সময়ে এসে অনেকে এই পেশাকে প্রফেশনালি নিলেও আমি যখন সাংবাদিকতা শুরু করি সেই ১৯৯৯ সালে ছাত্রজীবনে তখন অনেকটা শখের বসেই শুরু করি। আমার আগের একাধিক লেখায় বলেছিলাম-দেশের সেবা আর দশের সেবা করার মানসিকতা থেকেই এই সাংবাদিকতা পেশায় আসা। আদতে তখন আমরা এটিকে সাংবাদিকতা বলতাম না। কেউ যদি জিজ্ঞেস করতো, কি করছেন এখন? কোন চাকরী-বাকরী করছেন নাকি?

তখন প্রশ্নকর্তাকে ইনিয়ে বিনিয়ে উত্তর দিতাম এই পত্র-পত্রিকায় মাঝে মধ্যে লেখালেখি করি আর কি। কিন্তু এর পরও বলতাম না সাংবাদিকতা করি। কারণ সাংবাদিক হওয়া কি এতো সোজা। এই পেশার পরিচয় দিতে নিজের কাছেই ভয় লাগতো। কারণ এই পেশাটিকে ও পেশার লোকদেরকে আমি অনেক শ্রদ্ধা আর সম্মান করতাম। আমি সাংবাদিক পরিচয় দিলে পাচে যদি কেউ কোন কিছুর ভূল ধরে বা আমার যোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন করে তাহলে বেকায়দায় পড়তে পারি এই ভয়ে, সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতাম না।

প্রিয় পাঠক, আমি বলছি সেই ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৪-০৫ সালের কথা। তখন এতো সাংবাদিক আর পত্রিকা ছিল না নোয়াখালীতে। আমি চৌমুহনী কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় নোয়াখালী শহরের পলাশ চৌধুরী সম্পাদিত দৈনিক আজকের উপমা পত্রিকায় বেগমগঞ্জের দূর্গাপুর ইউনিয়নের লক্ষীনারায়পুর গ্রামের একটি চুরির ঘটনা আমি নিউজ করি। নিউজটি আমার নামেই ছিল। দৈনিক আজকের উপমা চৌমুহনী শহরে কয়েকশ কপি বিক্রি হতো। পত্রিকাটি মাঠে যাওয়ার পর চোরের দল আমাকে খুঁজতে থাকে। যেহেতু আমি নতুন কেউ আমাকে চেনেনা তাই আমাকে ধরা তাদের জন্য কষ্টকর হলো।

আমি চৌমুহনীর একটি হোটেলে খেতে বসেছি। পাশেই দেখি ওই চোরের দল আমাকে শায়েস্তা করার জন্য তাদের মধ্যে আলাপ করছে। আমি সেখান থেকে সটকে পড়লাম আর ভয়ে ভয়ে বাড়িতে গেলাম। তারা আমাকে ও পত্রিকার সম্পাদককে নানাভাবে হুমকি দিতে থাকে। পরে সম্পাদক নিউজের প্রতিবাদ চাপিয়ে তাদের শান্ত করে। আমার সাংবাদিকতা জীবনে সেটিই ছিল প্রথম হুমকি। আমার নতুন অভিজ্ঞতা হলো। সংবাদ লিখতে গেলে দেখে শুনে লিখি। কিন্তু আমি এখন যেমন প্রতিবাদী, হক কথা বলার চেষ্টা করি, তখনও সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকার চেষ্টা করতাম।

এই পেশায় আমার উত্থানটাও অনেকটা হঠাৎ করেই। ক্রাইম রিপোর্ট লিখতে গিয়ে। এই আমি এখন যেমন যে কোন সংবাদ যে কারো বিরুদ্ধে, সেটা হোক কোন বড় সরকারী কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসনের বা সিভিল প্রশাসনের এমন কি কোন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে লিখে দেই তখনও তাই করতাম। আমার একটাই বিশ্বাস ছিল যে সৎ সাহস নিয়ে থাকলে কেউ ঠেকাতে পারবেনা। গুলি করলে সেটা ফিরে যাবে এমন বিশ্বাস আমার মনে জন্মেছিল।

আমি বিএনপির ক্ষমতা দেখেছি-দেখেছি আওয়ামী লীগের ক্ষমতাও। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে যেমন তাদের বিরুদ্ধে লিখেছি এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে তাদের বিরুদ্ধেও লিখছি। লিখছি বলতে, গায়ে পড়ে লিখছি না। সত্য ও ন্যায়ের পথে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার চেষ্টায় লিখি। কেন জানি ছোটকাল থেকেই আমার সামনে কোন অন্যায় হলে সেটা আমার সহ্য হতো না। অন্যায়কারী যত বড়ই হোক আমি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করি। হয়তো এই প্রতিবাদী চেতনাটিই আমাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কতটুকু যেতে পারবো আল্লাহ ভালো জানেন।

সাংবাদিকতা করতে গিয়ে অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়েছি। অনেক হুমকি ধমকি সহ্য করেছি। কয়েকবার এলাকা ছেড়েও যেতে হয়েছে। কিন্তু পিছ পা হইনি। হইবো কি করে- আমি যে জেনে শুনে বিষ পান করেছি। কঠিনেরে ভালোবেসেছি।

এ জীবনে বহুবার হাটে হাড়ি ভেঙ্গেছি-বাড়িতেও ঠিকই গেছি। কিন্তু যারা আমার সাথে লড়াই করেছে, আমাকে ষড়যন্ত্রের জালে ফেলানোর চেষ্টা করেছে, আল্লাহর ইশারায় তারাই সমাজের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। তবু এখনো মাঝে মাঝে ভয় হয়। কারণ আমার চারদিকে শত্রু। এই শত্রুতাতো আমার সাথে কারো ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়, নয় সম্পত্তির শত্রুতা। এটা আমার পেশাগত শত্রুতা। সমাজ পরিবর্তন করতে গিয়ে, সমাজের অসহায় নির্যাতিত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে হয়তো বা শত্রু হয়েছি সবলদের। যারা দিন দিন ছুষে খাচ্ছে আমাদের সমাজকে।

প্রিয় পাঠক- দেশের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে সবসময় অস্ত্র থাকে। তারা বিপদে পড়লে সেটি ব্যবহার করে। আর সন্ত্রাসীদের হাতে থাকে অবৈধ অস্ত্র। এই বৈধ অবৈধ অস্ত্রধারী আর সমাজের উচুতলার মানুষদের এক নাম্বার শত্রু কিন্তু আমরা সাংবাদিকরা। আমরা লিখি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে, প্রশাসনের বিরুদ্ধে এবং উপর তলার মানুষদের বিরুদ্ধে। কারণ সন্ত্রাসীরা থাকে উপরতলার মানুষদের শেল্টারে। কারণে অকারণে আমরা চক্ষুশুল হই প্রশাসন ও ক্ষমতাশালীদের। ফলে আমাদের অবস্থা কেমন হয় বুঝুন। আমরা না পারি সইতে আর না পারি কাউকে বলতে। এরপরও কি বসে রয়েছি আমরা। না বসে থাকছি না, বসে থাকলে চলবেনা। এই দেশ, এই সমাজ আমার। আমরাই নতুন করে গড়ে তুলবো সুন্দর আগামী।

চলবে…

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক জাতীয় নিশান, নোয়াখালী।

সর্বশেষ