অপসাংবাদিকতার শেষ কোথায়?

মঙ্গলবার, ১১/১১/২০১৪ @ ২:২৬ অপরাহ্ণ

:: মোঃ কামরুজ্জামান ::

Kamaruzzamanদীর্ঘদিন ধরে একটি অব্যক্ত যন্ত্রনায় ভূগছিলাম। নিজের পেশা সম্পর্কে কিছু পাঠকদের উদ্দেশ্যে লিখবো বলে, কিন্তু আমি লিখলেও আমার সম্পাদক, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক অথবা বার্তা সম্পাদক বিষয়টি ছাপার মতো যোগ্য মনে করেন কি না? সাংবাদিকতায় আমার যোগ্যতা ও জ্ঞান একেবারেই কম। এ পেশায় বর্তমানে বেশ শিক্ষিত, যোগ্য ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ছেলে ও মেয়েরা কাজ করছে। মফস্বল এলাকাতেও অনেক মেয়েরা সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও কৃতিত্বের সাথেই পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নিয়েছে।

তবে আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি আমরা যারা জেলা ও উপজেলাতে অর্থাৎ মফস্বল এলাকাতে শুধু পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে গ্রহন করেছি, যাদের পারিবারিক স্বচ্ছলতা বা পাশাপাশি অন্য কোন পেশা নেই। পত্রিকার সাধারন পাঠক বা আমজনতা কি জানেন আমরা কেমন আছি, বা আমরা কোথায় কিভাবে মুল্যায়ীত হই? আমার এই লেখাটি একেবারেই পাঠকদের জন্য। এটি ছাপা হলে পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাবো।

প্রথম অবস্থায় ফরিদগঞ্জের সাংবাদিক এম কে মানিক পাঠানের সহযোগিতা নিয়ে শখের বশত: চাঁদপুরের প্রবীণ ও বরেন্য সাংবাদিক গোলাম কিবরিয়া জীবন সাহেবের সাপ্তাহিক চাঁদপুর পত্রিকায়” সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করি। তারপর স্থানীয় পত্রিকার মধ্যে পর্যায়ক্রমে চাঁদপুর দর্পন, চাঁদপুর কন্ঠ, ইলশেপাড়, আমার চাঁদপুর ও বর্তমানে চাঁদপুর বার্তায় কর্মরত আছি। জাতীয় পত্রিকা বা কোন টিভি চ্যানেলের একজন প্রতিনিধি হওয়ার জন্য কি পরিমান কাঠখড় পোড়াতে হয় মফস্বল এলাকার সংবাদদাতা বা প্রতিনিধি মাত্রই জানেন। প্রচুর পরিমাণ অর্থ ব্যয় বা বড় মাপের কোন ব্যক্তির সুপারিশ না থাকলে প্রতিযোগিতায় অনেকের পিছনে থাকতে হয়। মফস্বল অঞ্চলের সাংবাদিকদের নিয়োগ যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে খুব কমই হয়। আমার বেলায়ও তাই।

এ্যাপোলো গ্রুপের স্বত্বাধিকারী, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী, চাঁদপুর জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি, বর্তমানে চাঁদপুর-৪ ফরিদগঞ্জ আসনের সাংসদ ড. শামছুল হক ভূইয়া সাহেবের প্রত্যক্ষ সুপারিশে জাতীয় পত্রিকা দৈনিক ভোরের ডাকের চাঁদপুর জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক জনকন্ঠের সাবেক চীফ ফটোগ্রাফার জয় সাহেবের সহযোগিতায় ফোকাস বাংলা’র জেলা প্রতিনিধি, এন সি সি গ্রুপের চেয়ারম্যান, এন সি সি ব্যাংকের পরিচালক সাবেক সাংসদ লায়ন হারুনুর রশিদ সাহেবের সহযোগিতায় দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি, ডেবিষ্টার এ্যসোসিয়েটের চেয়ারম্যান, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক আলহাজ্ব এম এ হান্নান সাহেবের সহযোগিতায় আরটিভি’র ফরিদগঞ্জ প্রতিনিধি হয়েছিলাম।

আর একজনের কথা বিন¤্র শ্রদ্ধার সাথে আমি স্বরণ করছি। ফরিদগঞ্জ বললে ভুল হবে, চাঁদপুর জেলার গর্ব ছিলেন তিনি। সাংবাদিক, বার্তা সম্পাদক আহাম্মেদ ফারুক হাসান । প্রয়াত আহাম্মেদ ফারুক হাসানের মাত্র একটি ফোনের জন্যই দৈনিক আজকের কাগজ পত্রিকার ফরিদগঞ্জ প্রতিনিধি হতে সামান্যতম সমস্যাও হয়নি।

উল্লেখিত সকলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কিন্তু তারপরও বলছি, জাতীয় পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলে যেহেতু আমি আমার যোগ্যতা যাচাই বাছাই ছাড়া শুধু উল্লেখিত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতা নিয়ে নিয়োগ পেয়েছি এবং এ পর্যন্ত যতদুর জেনেছি ও শুনেছি আমার সহকর্মীদের দু একজন ব্যতীত প্রায় সকলেই কোন কিছুর বিনিময়ে বা সুপারিশেই নিয়োগ পেয়েছেন। মাঝে মধ্যে শুনতে পাই একজনকে বাদ দিয়ে অন্যজনকে স্থলাভিষিক্ত করার জন্য কয়েক লক্ষ টাকা এবং প্রচুর কাঠখড় পর্যন্ত পোড়াতে হয়।

তাহলে দোষ কোথায় ? যদি কোন সরকারী কর্মকর্তা বলেন, বহু টাকার বিনিময়ে এ পদ অথবা এই উপজেলায় বদলী হয়ে এসেছি, জনগনের টাকায় বেতন নেই ঠিকই কিন্তু ঘুষ না নিলে যা দিয়ে এসেছি তার কয়েকগুন কি করে উঠাবো! প্লিজ একটু সহযোগিতা করুন।

আবার কোন জনপ্রতিনিধি যদি বলেন, নির্বাচনে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে নির্বাচিত হয়েছি, বিনে পয়সায় সমাজসেবা করলে গাড়ী, বাড়ী কেনা বা পরিবার পরিজন নিয়ে বিদেশ ভ্রমন করবো কেমন করে? সব দোষ নন্দঘোষের। বুঝতে পারছেন? আমি কি বলছি? ভাবছেন এতো নির্লজ্ব হলাম কি করে? নিজের সমালোচনা করতে একটুও খারাপ লাগছেনা?

আরো মজার ব্যাপার স্থানীয় পত্রিকার সংবাদদাতা বা বিভিন্ন পর্যায়ের সাংবাদিকদের বেলায়। জানেন! গত ৮ ডিসেম্বর শনিবারের চাঁদপুর বার্তায় “অপসাংবাদিকতার দৌরাত্মে নাকাল সাধারন মানুষ” এ শিরোনামের সংবাদটি মনোযোগ এবং গুরুত্বের সাথে পাঠকগন পড়তে দেখেছি। শুনেছি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে কিছু উক্তি।

উল্লেখিত শিরোনামের সংবাদের ভিতরে আমাদের কিছু সাংবাদিকের বিভিন্ন অপকর্ম বা অসদুপায়ের বিষয়গুলি স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে। আমি সংবাদটির জন্য আমার শ্রদ্ধেয় ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শহিদ পাটওয়ারী সাহেবকে ধন্যবাদ জানাই। এ বিষয়টির রেষ টেনেছি বলে আমার ধৃষ্টতার জন্য ক্ষমা চাইছি।

পাঠকবৃন্দ জানেন কি ? স্থানীয় পত্রিকায় এক উপজেলায় সংবাদ সংগ্রহের সুবিধার্তে একটি পত্রিকার জন্য ৫/৬ বা ৭ জনও প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু আমার ধারনা ২% সংবাদকর্মীর শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদও পত্রিকা অফিসে দেওয়া হয় নাই, অথবা কর্তৃপক্ষ কখনও জানতেও চাননি কি পাস করেছে। যেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতার বালাই নেই সেখানে অভিজ্ঞ সংবাদকর্মীর বেলায় শিথিলযোগ্য শব্দ ব্যবহার একেবারেই বেমানান। তদুপরি একজন স্থানীয় প্রতিনিধি একাধিক পত্রিকায় আনঅফিসিয়ালি কর্মরত থাকলে প্রতিনিধির সংখ্যা আরো বেড়ে যায়।

অবশ্য সৌখিন সাংবাদিক বা প্রভাবশালী সাংবাদিকদের টানা বছরের পর বছর সংবাদ নিজে না তৈরী করলেও তৈরী করে দেওয়ার মত বা সংবাদ পাঠানোর মত অধস্তন সংবাদকর্মীর অভাব হয় না। আরো সুবিধা পাঠকরা জানতেই পারেনা যার নামে সংবাদ ছাপা হলো সে “প্রতিবন্ধি সাংবাদিক” অর্থাৎ স্বহস্তে সংবাদ না লিখেও তিনি আবার সাংবাদিক বটে। আমি প্রমান দিয়ে বলতে পারবো সাংবাদিকতার কাজে এক বছরে এক ঘন্টাও ব্যয় করেনি অথচ পাঠকতো বটেই পত্রিকা কর্তৃপক্ষের নিকটও সে একটিভ সাংবাদিক। দু দিকেই সুবিধা, নাম হলো টাকাও উপার্জন হলো। অর্থাৎ কলা বেচা আর রথ দেখার মত অবস্থা। আবার যে সংবাদকর্মী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে প্রমাণাদি সহকারে সংবাদ পাঠালো তার সংবাদ না ছাপানোর কারনে সে ইনএ্যাকটিভ বা অযোগ্য সাংবাদিক বলে স্থানীয়ভাবে চিহ্নিত হলো।

পাঠকবৃন্দ ভাবুন, এর জন্য কে দায়ী? পত্রিকা কর্তৃপক্ষ একবারও কি জানতে চেয়েছে যার নামে সংবাদ ছাপা হচ্ছে সে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল, নাকি সংবাদের বিষয়ে সে কিছু জানে ?

ডামি সাংবাদিকতার কারনে পাঠক শ্রেনী হচ্ছে বিভ্রান্ত, ভূল তথ্যের কারনে এক পক্ষ সুবিধা নিলেও অন্য পক্ষ মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও পত্রিকা কর্তৃপক্ষ অনেক সময়ই হয় বিতর্কিত। সর্বোপরি পত্রিকা ও সকল সাংবাদিক পাঠকশ্রেনীর কাছে গ্রহনযোগ্যতা হারায়। তাই অপসাংবাদিকতার সুফল দু চারজন পেলেও কুফলের প্রভাব গিয়ে পড়ে পুরো জাতির উপর।

লেখক: সংবাদকর্মী।

সর্বশেষ