মফস্বলে নারী সাংবাদিকতার পথিকৃত

রবিবার, ০৯/১১/২০১৪ @ ২:৩৯ অপরাহ্ণ

:: এম. ইউছুপ রেজা ::

FARZANAসমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন যাঁরা নিজেদের কথা কখনো ভাবেন না। সবসময় সমাজের জন্য, সমাজের মানুষদের নিয়ে চিন্তা করেন। অন্যের জন্য ভাল কিছু করার মাঝে তৃপ্তি পান তাঁরা। একটা প্রবাদ আছে, এমন জীবন তুমি করিবে গঠন, মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভূবন। আবার ইচ্ছে করলেও কিন্তু সে জীবন সবাই গঠন করতে পারে না। এটি বিধাতা কর্তৃক প্রদত্ত। বিধাতা যাকে ইচ্ছা সম্মান দেন, আবার কেড়ে নেন। কর্মের কারণে মানুষ চিরজীবন বেঁচে থাকে। তেমনই একজন গুণধর মানুষকে নিয়ে লেখার অবতারণা। যিনি মফস্বলে নারী সাংবাদিকতার পথিকৃত।

কাজী আয়েশা ফারজানা। পিতা-কাজী মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও মাতা মরহুমা নুরুন নাহার বেগম। কর্ণফুলীর তীরবর্তী চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পশ্চিম কধুরখীলে প্রখ্যাত সুফী সাধক হযরত আল্লামা কাজী আব্দুল মজিদ শাহ আলকাদেরী (রা.) এর বংশধর হিসেবে কাজী বাড়িতে ১৯৮২ সালে ২৫ ডিসেম্বর জন্ম। এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক সম্পন্ন করেন। পড়ালেখার পাশাপাশি লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন তিনি। ১৯৯৯ সালের প্রথম দিকে শখের বশে স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চের মাধ্যমে সাংবাদিকতায় হাতে কড়ি হয়। নারী হয়ে নগরের সাংবাদিকতায় নানা বিড়ম্বনা ও চট্টগ্রাম নগরের পার্শ্ববর্তী মফস্বল বোয়ালখালী উপজেলার মানুষ এবং নিজ জন্মস্থানের টানে গ্রামেই সাংবাদিকতা শুরু করেন। এরপর থেকে জাতীয় দৈনিক যুগান্তর, আমার দেশ, আঞ্চলিক দৈনিক পূর্বকোণ, সুপ্রভাত বাংলাদেশে দীর্ঘদিন কর্মরত থেকে দেশ ও এলাকার উন্নয়নে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যান।

ওই সময়ের সন্ত্রাসের জনপদ বোয়ালখালীতে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতে নানা প্রতিকুলতা প্রতিবন্ধকতাসহ অপবাদের শিকার হতে হয়েছে তাঁকে। দুর্দান্ত সাহসিতকার মাধ্যমে এইসব প্রতিকুলতাকে অতিক্রম করে যান এই নারী সাংবাদিক। ২০০৬ সালে বন্দর নগরীর দৈনিক ডেসটিনিতে চট্টগ্রাম অফিসে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব পাওয়ার পর যোগদান করেন তিনি। প্রায় দুইবছর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালে সংসার জীবনে প্রবেশ করেন তিনি। কিন্তু সাংবাদিকতাকে মেনে নিতে পারেনি স্বামী ও তাঁর পরিবার। এতে ভাটা পরে এই মহান ব্রতে। তবুও দমে যাননি তিনি।

২০০৯ সালে তিনি ‘সময়ের প্রতীক’ নামের একটি পত্রিকা নিজ সম্পাদনায় প্রকাশ করেন। আর্থিক অস্বচ্ছলতা ও নানা অসহযোগিতা মধ্যে দিয়ে নিয়মিত প্রকাশিত হয়। এর পাশাপাশি অনলাইন নিউজ র্পোটালে কাজ করছেন আজও। এ ছাড়া সমাজের অবহেলিত ও সুবিধা বঞ্চিত নারীদের কল্যাণে ‘তরী’ নারী উন্নয়ন সমিতি নামে একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠা করে সমাজের তৃণমূলের নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলার কাজ করে চলেছেন। তিনি বোয়ালখালী প্রেসক্লাব, সাহিত্য পরিষদসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

সমাজের কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, গ্রামের নিরীহ মানুষদের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অবহেলা আর স্বীয় স্বার্থ উন্নয়ন করার মানসিকতা দেখে তিনি নিজেই উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ও পৌর মেয়র পদে নির্বাচনে লড়েন। তিনি বিজয়ী হতে না পারলেও বিপুল সংখ্যাক ভোট পেয়ে প্রতিটি মানুষের মনে ও দুর্নীতিবাজদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছেন।

সাংবাদিকতা করতে গিয়ে তিনি একাধিকবার হামলা ও নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৯৯ সালের দিকে বোয়ালখালীর কধুরখীল ইউনিয়নের জনৈক চেয়ারম্যানের দূর্নীতির বিরুদ্ধে সংবাদ তুলে ধরলে ঐ চেয়ারম্যানের রোষানলে পড়েন তিনি। ফলে নানা হয়রানি, কুৎসা রটানোর জন্য লিফলেট ও স্থানীয় টাউটদের দিয়ে তাকে হুমকি-ধমকি প্রদান করা হয় এবং তার বসতবাড়িতে হামলা চালানো হয়।

২০০২ সালে এমদাদ বাহিনীর প্রধান, জেলার শীর্ষ সন্ত্রাসী এমদাদকে তৎকালীন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতির নির্দেশে ছেড়ে দেয়ার সংবাদ ঢাকার একটি দৈনিকে প্রকাশিত হলে তাকে চরমভাবে নাজেহাল হতে হয়। এ সংবাদ প্রকাশের প্রতিবাদে পত্রিকায় আগুন দেয়া, মিছিলে অশ্লীল ভাষায় শ্লোগান দেয়াসহ বিভিন্নভাবে হয়রানীর ও হুমকির শিকার হতে হয়। এরপর পরই শুরু হয় অপারেশন ক্লিন হার্ট। সেনা হেফাজতে উপজেলার চরণদ্বীপে এক কিশোরের মৃত্যুর খবর প্রকাশ করলে সেনাবাহিনী তাকে হয়রানী ও আটকের চেষ্ঠা করে। ফলে তাকে দীর্ঘদিন আতœগোপনে থাকতে হয়।

২০০৩ সালে বোয়ালখালীর চাঞ্চল্যকর গৃহবধু রনি হত্যাসহ ধারাবাহিক দুর্নীতি, অপকর্ম, খুন, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, চাঁদাবাজির সংবাদ প্রকাশ করায় স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা এবং সন্ত্রাসীরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। এর ফলে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় সন্ত্রাসীরা দফায় দফায় হত্যার চেষ্ঠা চালায় তাকে। বাড়িতে গুলি বষর্ণ করা হয়। এলাকাবাসীর সহায়তায় প্রাণে রক্ষা পান তিনি। প্রাণ বাঁচাতে থানার আশ্রয়ে নিতে হয় তাকে। এরপরও পালিয়ে বেড়াতে হয় দীর্ঘদিন। এঘটনা নিয়ে স্থানীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এত কিছুর পরও তিনি তার দায়িত্ব থেকে এক চুলও নড়েননি।

২০০৪ সালের ১৭ মে বিএনপির গ্র“পিং এবং দলীয় নেতার চাঁদাবাজির দাবিতে স্থানীয় চুরাখালী ব্রিজের কাজ বন্ধ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করলে প্রকাশ্য লাঞ্চনার শিকার হতে হয়। থানায় নিয়ে পুলিশি নির্যাতন করা হয়। তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাদের সহযোগিতায় তাকে লাঞ্চিত করা হয়।

এ দেশের সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কলম ধরায় বারবার যে লাঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে তা অবর্ণনীয়। এই সমাজের নষ্ট কীটগুলো কর্তৃক প্রতিনিয়ত হুমকি-ধমকি, অপবাদ অব্যাহত ছিল। উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে রয়েছে এই নারী সাংবাদিকের অবদানের চিহৃ। বোয়ালখালীর গণমানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন তিনি। তাঁর লেখনির মাধ্যমে কিছুটা পরিবর্তন সাধন হলেও সমাজের মানুষের মানসিকতার আরো উন্নয়ন ঘটানো দরকার।

তারপরও নতুন প্রজন্মের কথা ভেবে কাজ করে গেছেন জীবন বাজি রেখে। করে যাবেন আজীবন এমনটাই মন্তব্য করেন সাহসী নারী সাংবাদিক কাজী আয়েশা ফারজানা। যার লেখনির ফলে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আজও আলো ছড়াচ্ছে। নির্যাতনের শিকার মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর ফলে তাদের মুখে হাসি ফুটেছে। এছাড়া অসহায় দু:স্থ, অধিকার বঞ্চিতদের অধিকার আদায়ের জন্য এখনো সংগ্রাম করে চলেছেন তিনি। হয়ত নিজের জন্য তেমন কিছুই করতে পারেননি। তাঁর একটাই স্বপ্ন মানুষের জন্য কাজ করা। সেটা যে অবস্থান থেকেই হোক।

মফস্বলে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে বহু ঘাত-প্রতিঘাতের ঘটনার মধ্যে কয়েকটি ঘটনা পাঠকদের জন্য তুলে ধরলাম। বিশাল চিত্ত নিয়ে এই নারী সাংবাদিক এগিয়ে চলেছেন। একসময়ে এতদঞ্চলে দূর্নীতিবাজ ও অপরাধীদের মুর্তিমান আতঙ্কের এক নাম ছিল কাজী আয়েশা ফারজানা। এই এলাকার বহু ঘটনার কালের স্বাক্ষী হয়ে আছেন তিনি। সময়ের স্রোতে যেন এই নারী সাংবাদিক হারিয়ে না যান। তাঁর এ ত্যাগ ও সাহসীকতাকে জানাই অভিবাদন।

লেখক: সংবাদকর্মী, বোয়ালখালী|

সর্বশেষ