মফস্বল : প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন

বৃহস্পতিবার, ০৬/১১/২০১৪ @ ১১:০৭ অপরাহ্ণ

:: এম. ইউছুপ রেজা ::

Yousuf Rezaবেতনভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার জন্য আন্দোলন করে আসছেন রাজধানীর গণমাধ্যম কর্মীরা। এসব আন্দোলনে সাংবাদিক নেতারাও পাশে থাকছেন, দিচ্ছেন বক্তৃতা, বিবৃতি। এসব আন্দোলন প্রসঙ্গে আমরা যারা মফস্বল এলাকায় কাজ করি তাদের ভালো-মন্দ কিছুই বলার নেই। কিন্তু দু:খ লাগে, মফস্বলে কর্মরত সংবাদকর্মীদের সম্মানী প্রসঙ্গে যখন কোন সাংবাদিক নেতা কিছুই বলেন না। প্রধান অফিসে যারা কাজ করেন তাদের আলাদা আলাদা বিট থাকে। ফলে তারা তাদের বিটের কাজ শেষ করলেই হয়ে যায়। কিন্তু যারা মফস্বলে কাজ করেন তাদের অবস্থা এমন যে, ‘জুতো সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ’ এর মতো অবস্থা। অর্থাৎ সব নিউজ তাদের করতে হয়। আর এটা করতে গিয়ে প্রতিদিন তাদেরকে ছুঁটতে হয় বিভিন্ন স্থানে।

আর এ ছোটাছুটির পেছনে কত টাকা যে তাদের খরচ হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরও তারা সেটা করেন শুধু সম্মান পাওয়ার আশায়। কারণ সাংবাদিকতা মহান পেশা। এ পেশায় রয়েছে সম্মান। কিন্তু বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে সে পরিস্থিতি এখন আর নেই। এখন প্রতি পদে পদে জীবন ঝুঁকি নিয়ে পথ চলতে হয় মফস্বলের সংবাদকর্মী তথা সাংবাদিকদের। কারো পক্ষে শত নিউজ করেও ধন্যবাদ পাওয়া যাবে না। কিন্তু একটি নিউজ বিপক্ষে গেলেই যেন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে অবস্থা!

অনেক সময় দেখা যায় অফিস থেকে অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হয় সংশ্লি¬ষ্ট সংবাদকর্মীকে নির্ধারিত বিষয়ে নিউজ করার জন্য। কিন্তু দেখা গেল সে আদেশ পালন করতে গিয়ে যাদের বিপক্ষে নিউজটি করা হলো তাদের রোষানলে পড়েন ঐ সংবাদকর্মী। তারপর প্রতিনিয়ত তাকে একটি অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। কিন্তু এতকিছুর পেছনে কারণ কি? কেন তিনি জীবন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করবেন। একটা কথা আছে ‘পেটে খেলে পিঠে সয়’। কিন্তু পেটে না থাকলে পিঠে কেমনে সইবে।

অন্যান্য দশজনের মতো মফস্বলের একজন সংবাদকর্মীও সকালে ঘর থেকে বের হন। বের হওয়ার সময় বউ বলে এটা আনতে হবে, ওটা আনতে হবে। কিন্তু তিনি যে পেশায় আছেন তাতে অফিস থেকে কোনো বেতন/সম্মানী দেয়া হয় না! আবার অনেক সময় দেখা যায় কোনো নিউজ পাঠাতে দেরী হলে কৈফিয়ত চায় অফিস, নিউজ পাঠাতে কেন দেরী হল? কিন্তু ঐ সংবাদকর্মীকে যে মাসের পর মাস কোনো বেতন বা সম্মানী দেয়া হয় না সে কৈফিয়ত চাওয়ার এখতিয়ার কারো নেই।

আর এ সুযোগে মফস্বল এলাকায় হলুদ সাংবাদিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে দিনের পর দিন। সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে বেতন দেয়া হয় না বলে সাংবাদিকতাকে টাকা আয়ের হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছেন অনেকেই। তারা বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানকে নিউজ করার ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং উপজেলা/থানা প্রশাসনের সাথে আঁতাত করে অবৈধ টাকা আয়ের বিভিন্ন বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ছে। আর কেউ সৎভাবে এ পেশায় থাকতে চাইলেও অবৈধ আঁতাত করতে না পারায় সম্ভব হচ্ছে না।

অপরদিকে মফস্বলের সংবাদকর্মীর নিউজ দিয়ে কর্তৃপক্ষ লাভবান হচ্ছে প্রতিনিয়িত এবং মফস্বল সংবাদকর্মীর কারণে তাদের গণমাধ্যম আজ সারাদেশে ব্যাপক পরিচিত। অথচ মফস্বলের ঐসব সংবাদকর্মীদের কোনো বেতন/সম্মানী দেয়া হয়না। ফলে প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক যে কর্তৃপক্ষ কি ইচ্ছে করে মফস্বল সংবাদকর্মীদের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন? নাকি এলাকায় চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি ও ধান্ধাবাজি করার জন্য অঘোষিত লাইসেন্স দিচ্ছেন? যদি তা না হয় তাহলে যাকে দিয়ে কাজ করাবেন তাকে কেন তার কাজের পারিশ্রমিক দেবেন না? যদি কর্তৃপক্ষ বলে আমাদের মফস্বল প্রতিনিধি দরকার নেই। তাহলে এটা হবে স্রেফ মুখের কথা। কারণ মফস্বল প্রতিনিধি বাদ দিয়ে কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

অপরদিকে দেখা যায় কিছু কিছু পত্রিকা, টিভি চ্যানেল ও অনলাইন রয়েছে যাদের মফস্বল এলাকায় কোনো প্রতিনিধি নেই। বড় ধরণের কোনো ঘটনা ঘটলে তখন স্থানীয় সংবাদকর্মীদের কাছে ঐ নিউজ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চায়। পরদিন দেখা যায় প্রতিনিধি না থাকার পরও বিশাল নিউজ ছাপানো হয়েছে বা প্রচার করা হয়েছে এসব গণমাধ্যমগুলোতে। আবার মফস্বলের অনেকেই আছেন, যারা নিজের কর্ম প্রতিষ্ঠানে সংবাদ পাঠানোর আগে বিভিন্ন পত্রিকা, চ্যানেল ও অনলাইন নিউজের সাংবাদিকদের দিয়ে দেয়। সময়ের প্রয়োজনে এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে মফস্বল সংবাদকর্মীদের। শপথ নিতে হবে, যে সমস্ত গণমাধ্যমের মফস্বলে প্রতিনিধি নেই তাদের কোনো ভাবেই নিউজ দেয়া যাবে না। এরা যদি প্রয়োজন মনে করে তাহলে অবশ্যই প্রতিনিধি নিয়োগ দেবে।

এবার আসল কথায় ফিরে আসি, যেটা দিয়ে শুরু করেছিলাম। মফস্বল প্রতিনিধিদের বেতন/সম্মানী। মফস্বল সংবাদকর্মীদের অধিকার আদায়ের জন্য সাংবাদিক সংগঠন বা সাংবাদিক নেতারা কোনো সময় কথা বলেছেন বলে মনে হয় না। সাংবাদিক নেতা তথা সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নীরবতার কারণে আজকে মফস্বল সংবাদকর্মীদের বেহাল দশা। ঢাকা ও চট্টগ্রামের সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলো এ সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসলে অবস্থার পরিবর্তন হবে।

পরিশেষে মফস্বল এলাকায় কর্মরত সংবাদকর্মীদের বলতে চাই, অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, অধিকার আদায় করে নিতে হয়। আর মফস্বল সংবাদকর্মীদের অধিকার আদায়ে কঠোর আন্দোলনে নামা সময়ের দাবী। হয় কর্তৃপক্ষ মফস্বল প্রতিনিধিদের সম্মানী দিয়ে রাখবে, নচেৎ রাখবে না। আর যদি কর্তৃপক্ষ সম্মানী দিতে না পারে তাহলে তারা তাদের গণমাধ্যম বন্ধ করে দেবে। কারণ এরা সবসময় অন্যের অপরাধ খুঁজে বেড়াবে আর নিজেরা মহাঅপরাধ করবে, তাতো হতে পারে না। তবে এখন আশার কথা কিছু কিছু গণমাধ্যম রয়েছে যারা মফস্বল প্রতিনিধিদের বেতন এবং অন্যান্য সুবিধা দিচ্ছেন।

তবে বর্তমান সময়ে তা অপ্রতুল। আবার কিছু গণমাধ্যম আছে যারা প্রতিনিধিদের বিজ্ঞাপনের টার্গেট দেয়। যা একজন সংবাদকর্মীর জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ব্যাপার। কারণ কোন জায়গায় একজন সংবাদকর্মী গেলে যে কোন কর্তৃপক্ষ অন্তন ন্যুনতম সম্মান দেখায়। কিন্তু যখন কোনো সংবাদকর্মী বিজ্ঞাপন কালেকশনের জন্য যায় তখন দেখা যায়, সংশ্লি¬ষ্ট ব্যক্তি অফিসে কিংবা বাসায় থাকার পরও বলেন, তিনি এখন নেই, পরে আসেন। তাই সময়ের প্রয়োজনে মফস্বল সংবাদকর্মীদের অধিকার আদায়ে সোচ্ছার হতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন সাংবাদিক নেতা তথা সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সার্বিক সহযোগিতা।

লেখক : সংবাদকর্মী, বোয়ালখালী
[email protected]

সর্বশেষ