পাকিস্তানি মিডিয়ার ট্রাজেডি

মঙ্গলবার, ১৯/০৩/২০১৩ @ ১২:৫৪ অপরাহ্ণ

হামিদ মীর::

hamid mirসাংবাদিকতা ও লেখালেখি তার বংশের জন্য কাল হয়েছিল। নিজের সন্তানদের রক্ষায় তিনি সাংবাদিকতা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক হলো, নিজের মুখ বন্ধ রেখেও তিনি নিজের সন্তানদের বাঁচাতে পারলেন না। তার দুই ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। কয়েকদিন আগে দুই ছেলের লাশ বহনকারী ওই হতভাগা পিতা আমার কাছে একটি চিঠি লিখেছেন। ওই চিঠির কিছু অংশ পড়ে নিন-

জনাব হামিদ মীর! সালাম নেবেন। আমার জানা নেই এই চিঠির শিরোনাম কী দেব। আমি আমার তিন ছেলের মধ্যে দু’ছেলের শহীদ হওয়ার শোকগাঁথা লিখছি। মীর সাহেব, আমি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কয়েক পুরুষ ধরে আমাদের পরিবার মজুরি করছে। আমার শৈশব কেটেছে ছাগল-ভেড়া চড়িয়ে। আমি কিছু দ্বীনি শিক্ষার পর প্রাইমারি থেকে এমএ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি প্রাইভেটে। আমাকে পড়িয়েছেন এমন কোনো শিক্ষকও নেই, আমার কোনো ক্লাসমেটও নেই। আমি সমত্মানদের তাদের বাপ-দাদার ভিটা ছাড়িয়ে শহরে নিয়ে এসেছিলাম তাদের শিক্ষার জন্য। ছেলেদের উচ্চশিক্ষিত করা ছিল আমার স্বপ্ন। আমার স্ত্রী নিরক্ষর, কিন্তু তিনি সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে আমার চেয়েও বেশি আন্তরিক। আমার বড় ছেলে শহীদ সিরাজ আহমদ। তার ছোট শহীদ মনজুর আহমদ। উভয়েই বিবাহিত। বড় ছেলের দুই এবং ছোট ছেলের এক সন্তানও রয়েছে। সিরাজ বিএসসি সম্পন্ন করার পর বেলুচিস্তান ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু দারিদ্রের কারণে পড়াশোনা চালাতে পারেনি। তবে সে হাল ছাড়েনি। চাকরির পাশাপাশি প্রাইভেটে মাস্টার্স করেছে। সে তার ছোট ভাইবোনদেরও পড়াতো। আর ছোট ছেলে এবারই বেলুচিস্তান ইউনিভার্সিটি থেকে ফিজিক্সে এমএ সম্পন্ন করেছে। সে বিসিএস’র প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

২৪ অক্টোবর রাতে সিরাজ ও মনজুর ঈদের কেনাকাটার জন্য ঘর থেকে বের হয়। কিছুক্ষণ পরই গুলির শব্দ শুনতে পেলাম। আমি সঙ্গে সঙ্গে বড় ছেলের মোবাইলে ফোন দিলাম। কিন্তু রিসিভ হলো না। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে দেখতে পেলাম বড় ছেলে সিরাজ ঘটনাস্থলেই শহীদ হয়ে গেছে। মনজুরকে তাৎক্ষণিক স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু সেখানে সার্জন ছিল না। সেখান থেকে সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থান পরদিন সেও আমাদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে দুনিয়া থেকে চলে গেল।

হামিদ মীর সাহেব! আমি জীবনভর আমার ছেলেদের রাজনীতি থেকে দূরে রেখেছি। সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য অনেক কষ্ট করেছি। আমার মাতৃভাষায় কবিতা ও উপন্যাস লিখতাম। সংবাদপত্রে কলামও লিখতাম। বেলুচিস্তানের নাজুক পরিস্থিতির কথা ভেবে গত চার বছর ধরে আমি কবিতা, উপন্যাস ও কলাম লেখা বন্ধ রেখেছি। যাতে আমার কোনো লেখায় কেউ কষ্ট না পায়। গত দেড় মাস যাবত স্থানীয় খাজদার প্রেস ক্লাব বন্ধ রেখে সংবাদ পাঠানোও বাদ দিয়েছি। তারপরও আমার দুই ছেলেকে কোন অপরাধে শহীদ করা হলো? আমি কোনো দোষ করে থাকলে এর শাস্তি আমার ছেলেদের কেন পেতে হবে? আমি জানি আমার দোষ শুধু এতটুকু, দরিদ্র হওয়ার পরও আমি আমার ছেলেদের উচ্চশিক্ষিত করেছিলাম। প্রাদেশিক বা স্থানীয় প্রশাসনের কেউ আজ পর্যন্ত আমাকে সহমর্মিতামূলক কোনো কথা বলেনি। জানি না, আমার ছেলেদের হত্যাকারীরা প্রশাসনের চেয়ে শক্তিশালী কিনা। এটাও জানি না, আমার ছেলেদের কোন অপরাধে হত্যা করা হলো। তবে আমি ওই হত্যাকারীদের আজ থেকে কেয়ামত পর্যন্ত ক্ষমা করে দিয়েছি। কেননা আমার জন্য এটাই যথেষ্ট আমার দুই ছেলে শহীদ হিসেবে কেয়ামতের দিন স্রষ্টার সামনে হাজির হবে।
-নাদিম গিরিনগারি
সভাপতি, খাজদার প্রেস ক্লাব

একজন দুঃখী ও শোকার্ত পিতার পত্র আপনারা পড়লেন। নাদিম গিরিনগারি বেলুচিস্তানের দ্বিতীয় বড় শহরের প্রেস ক্লাবের সভাপতি ছিলেন। তার ছেলেদের হত্যার আগে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২ খাজদার প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হক বালুচকেও অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা শহীদ করে। এরপর প্রেস ক্লাবে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়। সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকেন। খাজদারের সাংবাদিকরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারবিরোধী জঙ্গিদের হুমকি-ধমকির শিকার। আবার কিছুদিন ধরে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় চলা একটি জঙ্গি গ্রুপও প্রকাশ্যভাবে সাংবাদিকদের ধমক দিচ্ছে। সরকারবিরোধী জঙ্গিদের হুমকির বিষয়টি তো মেনে নেয়া যায়, কিন্তু সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠান যখন আইন ভঙ্গকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয় তখন তা বড়ই আশঙ্কাজনক। নাদিম গিরিনগানি ও তার সহকর্মী সাংবাদিকদের ওপর সরকার এবং বিরোধী উভয় গ্রুপের শ্যেনদৃষ্টি ছিল। এর ফলে তারা পেশাগত দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু এরপরও তিনি তার দুই ছেলেকে বাঁচাতে পারলেন না।

এটা শুধু বেলুচিস্তানের সাংবাদিকদের ট্রাজেডি নয়, গোটা পাকিস্তানের সাংবাদিকতার ট্রাজেডি। বাহ্যত পাকিস্তানের মিডিয়াকে খুব শক্তিশালী বলে মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, খাজদার প্রেস ক্লাবে তালা ঝুলছে। এর সাধারণ সম্পাদক খুন হয়েছেন। সভাপতি তার দুই ছেলের খুনিদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। কারণ পাকিস্তানের সরকার তাদের ন্যায়বিচার দেয়ার মতো পর্যায়ে নেই।

এই মুহূর্তে বিগত দশ বছরে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে ৮৬ সাংবাদিক খুনের ফিরিস্তি আমার সামনে রয়েছে। ওই ৮৬ সাংবাদিকের হত্যাকারীদের মধ্যে মাত্র একজনের হত্যাকারী গ্রেফতার হয়েছে। যে সাংবাদিকের হত্যাকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে তিনি একজন বিদেশি সাংবাদিক। এছাড়া বাকি ৮৫ সাংবাদিকের হত্যাকারীদের আজ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়নি। সাংবাদিকদের জন্য পাকিস্তানের বেলুচিস্তান, খায়বার ও ফাটা এলাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

ইন্টারমিডিয়ার এক গবেষণায় অনুযায়ী চলতি বছরের এপ্রিল মাঝে ‘ফাটা’ এলাকার ৭৪ ভাগ সাংবাদিককে বিভিন্ন হুমকি দেয়া হয়েছে। গত ১২ মাসে ওই এলাকার ২৫ ভাগ সাংবাদিকের ওপর সরাসরি হামলা চালানো হয়েছে। তবে তাদের বেশিরভাগই চুপ হয়ে আছেন। বিগত দশ বছরে করাচিতে এক ডজনের বেশি সাংবাদিক খুন হয়েছেন। জিও নিউজের প্রতিবেদক ওলি খান বাবরের হত্যাকারী গ্রেফতার হয়েছেন, তবে সরকারের চেয়ে শক্তিশালী কোনো গ্রুপ এই হত্যার সাক্ষীদের করাচিতে হত্যা করেছে। বিগত দশ বছরে লাহোর ও ইসলামাবাদে চারজন করে সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু কারো হত্যাকারীকে গ্রেফতার করা যায়নি।

পাকিস্তানে সাংবাদিকতা পেশা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পেশার লোকদের সম্মান, খ্যাতি, অর্থ সবই মিলে কিন্তু সবসময় হুমকি ও ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়। আজ পাকিস্তানের মিডিয়ায় বাহ্যত যে স্বাধীনতা দেখা যাচ্ছে তা কেউ প্লেটে করে আমাদের সামনে রেখে দেননি। বরং আমাদের সহকর্মীরা নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে তা আমাদের জন্য রেখে গেছেন। তবে কিছু কালো বিড়াল এই স্বাধীনতার অপব্যবহারও করে। তাই স্বাধীন মিডিয়ার প্রতি দায়িত্বশীল আচরণই মিডিয়াকে আরো শক্তিশালী করতে পারে। মিডিয়া ওই সময় শক্তি ও প্রভাবশালী হবে যখন শুধু পরের জন্য নয়, নিজের জন্যও ন্যায়বিচার অর্জন করতে পারবে।আর তখনই খাজদার প্রেস ক্লাবের তালা খুলে যাবে এবং নাদিম গিরিনগানির মুখ ও কলম পুনর্বার চালু হয়ে যাবে।

দৈনিক জং-এর সৌজন্যে। উর্দু থেকে অনুবাদ: জহির উদ্দিন বাবর

হামিদ মীর: পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক; প্রধান নির্বাহী, জিও টিভি