তথ্য ব্যবসা কতটা সাংবাদিকতা

মঙ্গলবার, মার্চ ১৯, ২০১৩

চিন্ময় মুৎসুদ্দী::
chinmoy-প্রথম দৃশ্য ১৯৬৯: চায়ের দোকানে বসে একজন খবর পড়ছেন আর শুনছেন অন্যরা। প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই।

দ্বিতীয় দৃশ্য ১৯৮৭: পত্রিকার খবরে উদ্দীপ্ত পাঠক। তারা স্বৈরাচারের পতন চান।

তৃতীয় দৃশ্য: ১৯৯৭: সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি খবর নিয়ে দুই ব্যক্তির বাদানুবাদ, একজন বলছেন খবরটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে তাই অবশ্যই সত্য। অন্যজন বলছেন তিনি বিষয়টি জানেন, সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরটি সঠিক নয়।

চতুর্থ দৃশ্য ২০১২: একটি জটলায় অধিকাংশ পাঠক বলছেন “পত্রিকায় ওরকম লেখে। সাংবাদিকদের পয়সা দিলে নিজের মতো করে লেখানো যায়। টিভিও তাই” -জটলার মন্তব্য।

চতুর্থ দৃশ্যের ঢালাও মন্তব্য গ্রহণযোগ্য না হলেও চারটি দৃশ্যের বিশ্লেষণ করলে বুঝতে হবে মিডিয়ার বিম্বাসযোগ্যতায় ক্রমশ চিড় ধরছে।

পাঠক-দর্শক খবরের জন্য আগ্রহী কিন্তু খবরগুলো ঐ ১৯৬৯ বা ১৯৮৭’র মতো একবাক্যে তারা গ্রহণ করছেন না। সংকটটা কোথায়?

অনেকেই বলছেন এখন তথ্য ব্যবসার যুগ। সাংবদিকতা ম্রিয়মান। বিষয়টা সাংবাদিকদের অনেকে বুঝতে পারলেও কিছুই তারা করতে পারছেন না। একদিকে সাংবাদিকদের ইউনিয়ন দ্বিধাবিভক্ত, অন্যদিকে বৃহৎ পুঁজির দাপটে অনেকেই কেবল সুযোগ সন্ধানী। ইউনিয়ন নেতাদেরও কেউ কেউ আপোষ করছেন। ফলে একটা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। নতুন পত্রিকা বেরুচ্ছে, নতুন টিভি কেন্দ্র চালু হচ্ছে কিন্তু সাংবাদিকতার মানসে নয়-শুধু মুনাফার লক্ষে। মুনাফা আর্থিক এবং ব্যবসায়িক, ও প্রভাব বিস্তার। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে ব্যবসায়িক সুবিধা গ্রহণ বা নিজের সুবিধা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করা এখন মিডিয়া মালিকের প্রধান উদ্দেশ্য। এটাকে তাই বলা হচ্ছে তথ্য ব্যবসা। এতে পাঠকও বিভ্রান্ত হচ্ছেন।

সাংবাদিকতা আর তথ্য ব্যবসার মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়? সাংবাদিকতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে মিডিয়া বিশেষজ্ঞ ও সমাজ বিজ্ঞানীরা অনেক কথাই বলেছেন। কেউ মনে করেন এটি সমাজের আয়না, যা দেখে মানুষ সচেতন হবেন। অনেকের কাছে এটি পাঠকের জন্য বার্তা, এই বার্তা সমাজকে কলুষমুক্ত রাখতে উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা সংবাদপত্রের আদিযুগে এমনটাই ছিল সংবাদপত্র। যদিও তখন কিছু পত্রিকা ভারতে কোম্পানী শাসনের পক্ষে ওকালতি করে।

এখন নতুন করে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে গণমাধ্যম কতটা মাধ্যম আর কতটা সামাজিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া (প্রসেস)। প্রতিদিন যে তথ্য প্রকাশিত হয় সেগুলো কি কেবলই বার্তা, এই বার্তার দায় কার? অনেকেই মনে করছেন গণমাধ্যম খোলা ময়দানের মতো মাধ্যম নয়, বা আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে বিলেতের হাইডপার্ক স্পিকার্স কর্ণার কিংবা আমাদের মুক্তাঙ্গন নয়। এর কর্তৃপক্ষকে গেইটকিপারের দায়িত্ব নিতে হয়। অবশ্য হাইডপার্ক স্পিকার্স কর্ণারেও যেকোনো বিষয়ে কথা বলা গেলেও অশ্লীল (অবসিন) ভাষা ব্যবহার করা নিষেধ।

মিডিয়ায় এখন নিজেদের কাজ নিয়ে নিজেদেরই খুশি থাকতে হচ্ছে। নতুন আসা একটি টিভি চ্যানেল খবরের ক্ষেত্রে সবাইকে টেক্কা দিয়ে নাকি শীর্ষস্থানে উঠে গেছে। টিআরপি বেশি, সর্বোচ্চ। অনেকে অবশ্য এই টিআরপিকেও তেমন গুরুত্ব দিতে চান না, এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু এ নিয়ে কোথাও আলোচনা হতে শুনলাম না। এমনকি প্রেস ক্লাবেও এনিয়ে কোনো তর্ক বিতর্ক শোনা গেল না। তাহলে কী বুঝবো। যে রিপোর্ট নিয়ে দর্শকের কোনো আগ্রহ নেই, মাতামাতি নেই, সাংবাদিকরাও ওয়াকেবহাল নন তাহলে সেটি কোথায় প্রভাব ফেলল? কিসের ভিত্তিতে এই টিআরপি?

টেকনলজি’র নতুন নতুন দিক উন্মোচনের প্রেক্ষাপটে অনেক যান্ত্রিক সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করতে পারছে মিডিয়া ভবনগুলো। ছবিসহ তাৎক্ষণিক খবর, লাইভ টেলিকাস্ট, লাইভ বিষেশজ্ঞ মতামত, দর্শকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এখন নিয়মিত ব্যাপার। প্রিন্ট মিডিয়া এই তাৎক্ষণিকতা বজায় রাখছে অনলাইন সংস্করণের মাধ্যমে। কিন্তু খবর প্রচার ও প্রকাশের এই কারিগরি অগ্রগতির আউটপুট খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে পারছে না। টিভিতে এবং সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণের সাংবাদিকদের অনেকেই প্রকাশ্যে বলেছেন অনেক সময় এক চ্যানেল অন্য চ্যানেলে প্রচারিত ব্রেকিং নিউজ কোনোরকম যাচাই বাছাই না করেই দুচারটি শব্দ অদল বদল করে প্রচার করে থাকে।

মিডিয়া যে মালিকের ব্যক্তিগত সংকটেও সুবিধা দেয় তার প্রমান ডেস্টিনি গ্রুপের বৈশাখী টিভি ও দৈনিক ডেস্টিনি। দুর্নীতির অভিযোগে এই গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানের হিসাব জব্দ করা হলেও মিডিয়া দুটির হিসাব জব্দ করা হয়নি। এই দুটি প্রতিষ্ঠানে ডেস্টিনির স্বার্থ রক্ষা করে নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ ও প্রচার অব্যাহত রয়েছে। ডেস্টিনির বিপক্ষে অন্য সংবাদপত্রে যে অভিযোগগুলো দেখা যায় সেগুলো এ দুটি প্রতিষ্ঠানে থাকে না। সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী দুপক্ষের বক্তব্য প্রকাশের রেওয়াজটি এখানে অনুপস্থিত। ব্যক্তিগত সুবিধাপ্রাপ্তির প্রত্যাশায় অনেকেই এখন মিডিয়ায় পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহী। রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্ক থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা অবৈধ উপায়ে সরিয়ে নিয়ে “মানি লন্ডারিং” অপরাধ করে হলমার্ক গ্রুপ এখন মিডিয়া চালু করে তাদের পক্ষে একপেশে প্রচার শুরু করলে অবাক হবো না।

টেকনলজির অগ্রগতির ফলে দুনিয়ার যেকোনো স্থানের ঘটনার খবর সঙ্গে সঙ্গে জানা ও দেখা সম্ভব এখন। টিভি আর অনলাইন সাংবাদিকতা এই সুযোগ করে দিচ্ছে পাঠক দর্শককে। এনিয়ে প্রতিযোগিতাও চরমে, কার আগে কে কোন ঘটনার খবর দিতে পারে! এর সবকিছুই কি তাৎক্ষণিক জানার প্রয়োজন আছে? এমন প্রশ্নও অনেকের। এই প্রতিযোগিতার কারণে সাংবাদিকতার নীতিমালা মানা হচ্ছে না। “অমুকে দিয়েছে বলে আমিও দিয়ে দিচ্ছি।” কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে না। বাংলাদেশের অনেক ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ পত্রিকার মতো অনলাইনেও এখন অনেক সংবাদ সাইট রয়েছে যা মোটেও নির্ভরযোগ্য নয়। সামাজিক সাইটগুলোতেও অনেক সময় সত্য নয় এমন ব্যক্তিকেন্দ্রিক তথ্য আপলোড করা হয়। এখানে গেইটকিপিং নেই। এটিকে সিটিজেন সাংবাদিকতা নামে অভিহিত করা হচ্ছে। এর একটা ইতিবাচক দিক রয়েছে। মিশরের তাহরির স্কোয়ারের বিদ্রোহের সূত্রপাত এই সিটিজেন সাংবাদিকতার মাধ্যমে। কিন্তু ক্রমশ “তারুণ্যের তরল আধুনিকতা, তারুণ্যের পাতলা সম্পর্ক” এই সাইটগুলোর প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠায় এখানে সাংবাদিকতা পথ হারিয়ে ফেলছে।

৩০/৪০ বছর আগে বিটিভি বিশেষ বিশেষ কিছু অনুষ্ঠান বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র, পরে তালিবাবাদ ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রচার করেছে। চাঁদে প্রথম মানুষ, বিশ্বকাপ ফুটবল, অলিম্পিক, প্রিন্স চার্লস ও প্রিন্সেস ডায়নার বিয়ে ইত্যাদি ঘটনা সরাসরি দেখানো হয়েছে। বছরে হয়ত দুই তিনবার। বর্তমানে সরাসরি অনুষ্ঠানের আধিক্য এর গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে। আকর্ষণও হারাচ্ছে। সরাসরি কেন করতে হবে, তাৎক্ষণিক দেখানো কতটা প্রয়োজন তা ভাবা হচ্ছে না, অন্য কেউ করে ফেলবেন এই আশংকাতেই অনেকে এভাবে অনুষ্ঠান প্রচার করছেন। এতে অনুষ্ঠানের মানও ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

সাংবাদিকতা ও তথ্য ব্যবসার একটি সরল সোজা পার্থক্য হল: তথ্য ব্যবসায় তেমন দায়িত্ব নেই, কিন্তু সাংবাদিকতায় দায়িত্ব রয়েছে। অর্থাৎ সাংবাদিকতায় অবজেক্টিভিটি থাকবে, তথ্য ব্যবসায় যা অপরিহার্য নয়। এভাবেও বলা যায় যে-খবর মানুষ বেশি পড়বে বলে মনে হয় তা প্রকাশ করাই তথ্য ব্যবসা। আর খবর প্রকাশের পর এর কী প্রভাব সমাজের ওপর পড়বে সেটি ভেবে সংবাদ প্রকাশ করা হল সাংবাদিকতা। যৌন লাঞ্ছনার শিকার কোনো নারীর নাম প্রকাশ না করে সংবাদ প্রকাশ করা সাংবাদিকতার নীতি। তথ্য ব্যবসায়ীরা এই নীতিমালার ধার ধারেন না। তথ্য ব্যবসা মূখ্য উদ্দেশ্য হলে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে যায়। এখন হচ্ছেও তাই। এক পত্রিকা বা এক চ্যানেলের খবরে পাঠক-দর্শক নিশ্চিন্ত হন না, কয়েকটি মিডিয়ার খবর মিলিয়ে দেখতে চান।

প্রশ্ন হল সামাজিক দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্য ছাড়া তথ্য ব্যবসাকে কী সাংবাদিকতা বলে আখ্যা দেয়া যায়?

সংবাদপ্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়িত্ব বা দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গটি বিংশ শতাব্দীতে সারা বিশ্বে গুরুত্ব পেতে শুরু করে। রয়েল কমিশন অন দ্য প্রেস (১৯৪৯- গ্রেট বৃটেন) এবং আ ফ্রি এন্ড রেসপন্সিবল প্রেস (১৯৪৭-ইউএসএ) রিপোর্ট দুটি নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে জনগনের সামনে তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের উদ্বুদ্ধ করে। এই সময় সাংবাদিকতা পেশাকে আদর্শবাদের আলোকে দেখতে শুরু করেন সাংবাদিকরা। তবে ভারতে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আদর্শবাদি সাংবাদিকতার সূত্রপাত ঘটে উনবিংশ শতাব্দীতেই।

একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে টেকনলজি ও পুঁজির ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে । সামাজিক দায়িত্বের প্রসঙ্গটি ক্রমশ: চাপা পড়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞাপনদাতার ভাষা হয়ে উঠছে সাংবাদিকের রিপোর্টের ভাষা। এই প্রক্রিয়ায় প্রতারিত হচ্ছেন পাঠক-দর্শকরা। স্পনসরের যাঁতাকলে সংবাদ হয়ে উঠছে পুঁজি যোগানদাতার নানান কার্যক্রমের বিবরণ। হাউজিং, প্রসাধনসহ কনজিউমার প্রডাক্টস, এবং রাজনীতি জনস্বার্থের বিপক্ষেই বেশি উপস্থাপন করা হচ্ছে মিডিয়ায় । এই প্রক্রিয়াটাই মূলত তথ্য ব্যবসা, সাংবাদিকতা নয়। সে কারণেই মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা আজ কাঠগড়ায়। তবে এখনো একটি ধারা ওয়াচডগ’র ভূমিকা ধরে রেখেছে। একারণেই এখনও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, রাজনৈতিক প্রতারণা, ব্যাঙ্ক লুট ইত্যাদি মিডিয়ায় খবর হয়ে আসছে। কিন্তু ধারাটি ক্রমশ: দুর্বল হয়ে পড়ছে। শংকা এজন্যই। যারা এখনো কেবল তথ্য ব্যবসার জোয়ারে পুরোটা ভেসে যাননি, তাদের টিকে থাকার ওপরই নির্ভর করছে সাংবাদিকতার মর্যাদা, সামাজিক দায়িত্ব পালনের অগ্রাধিকার।

চিন্ময় মুৎসুদ্দী: সাংবাদিক ও লেখক।