গোয়েন্দা সংস্থা ও সাংবাদিকতা

মঙ্গলবার, ১৯/০৩/২০১৩ @ ১২:৪৪ অপরাহ্ণ

হামিদ মীর::

hamid mirমারিয়ানা বাবর পাকিস্তানের প্রখ্যাত ও সাহসী একজন সাংবাদিক। নারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি তার সাংবাদিকতা জীবনে এমন এমন কাজ করেছেন যা পুরুষ সাংবাদিকদের পক্ষেও করা কঠিন। মারিয়ানা বাবরের কোনো মতের সঙ্গে ভিন্নতা পোষণ করা যেতে পারে, কিন্তু তার পেশাদারিত্ব সব সন্দেহ ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে। তিনি গত ৩২ বছর ধরে সাংবাদিকতার ময়দানে বিচরণ করছেন। আমি তাকে সবসময় সিনিয়র হিসেবে মানি এবং তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। মারিয়ানা পাকিস্তানের প্রখ্যাত রাজনীতিক মরহুম মেজর জেনারেল নসিরুল্লাহর প্রিয়ভাজন ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া ছিলেন। একজন সাংবাদিক হিসেবে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর সঙ্গেও তার ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তিনি মেজর জেনারেল নসিরুল্লাহ অথবা বেনজির ভুট্টোর সঙ্গে সম্পর্ককে কখনো সাংবাদিকতায় কোনো প্রভাব ফেলতে দেননি।

আমার মনে পড়ে, বেনজির ভুট্টোর দ্বিতীয় শাসনামলে একবার আমি এবং মারিয়ানা তার সফরসঙ্গী হিসেবে ফ্রান্সে যাই। একদিন দেখলাম, মারিয়ানা বাবরকে নিয়ে বেনজির ভুট্টো শপিং করতে যাচ্ছেন। এত ঘনিষ্ট সম্পর্ক সত্ত্বেও পাকিস্তানে ফিরে ওই মারিয়ানা সরকারের বিরুদ্ধে লিখেছেন। একদিন বেনজির ভুট্টো একটু চাপের সুরে নসিরুল্লাহ বাবরকে বললেন, আপনি মারিয়ানাকে একটু বুঝান। তিনি কখনো কখনো তার কলম দিয়ে তলোয়ারের কাজ করেন। এতে আমরা ক্ষত-বিক্ষত হই। নসিরুল্লাহ বাবর তখন একটু মুচকি হেসে বললেন, ‘এটা সরকার এবং একজন সাংবাদিকের বিষয়। আমার মত হলো, আপনি তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মারিয়ানার সঙ্গে কথা বলুন। এ ব্যাপারে আমার নাক গলানোর সুযোগ নেই।’ এ কথা শুনে বেনজির ভুট্টো চুপ হয়ে গেলেন।

নওয়াজ শরিফ ক্ষমতায় আসার পর তাকে পিপলস পার্টির সমর্থক বলে ধারণা করা হতো। পরে যখন পারভেজ মোশাররফের যুগ এলো তখন মারিয়ানাকে ভিনদেশী এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। কারণ তিনি ভারতীয় একটি পত্রিকায় লেখালেখির পাশাপাশি বিবিসির হয়ে কাজ করতেন। মারিয়ানা খুবই পরিশ্রমী একজন সংবাদকর্মী। কারো কারো ধারণা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত শ্রম দেন তিনি। কারণ অনেক বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি কারো কাছে হাত পাতেননি। হালাল রোজগারে তিনি সন্তানদের ভরণ-পোষণ এবং উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন।

এককথায়, মারিয়ানা একটি খোলা বই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আমাদের গোয়েন্দা সংস্থার গোপন ফাইলে মারিয়ানা একজন সন্দেহভাজন। গত ৩ ডিসেম্বরের দৈনিক জং এবং দ্য নিউজে মারিয়ানা বাবর লিখেছেন, ইতিমধ্যে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা সাংবাদিকদের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছেন এবং রাওয়ালডিন্ডিতে তার বাসায় গোয়েন্দারা কয়েক দফা হানা দিয়েছে।

মারিয়ানা বাবর লিখেছেন, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার দুই কর্মকর্তা তার বাসায় এসে নিজেদের পরিচয় দেন এবং জানান তাদের কিছু সাংবাদিকের তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে একটি ফরম ছিল। এখানে দীর্ঘ প্রশ্নোত্তরের ফিরিস্তি দেয়া। গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা কিছু প্রশ্ন করতে চাইলে মারিয়া অনুমতি দিলেন। কিন্তু প্রশ্ন শুরু হওয়ার পর মারিয়ানা অত্যন্ত বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন হলেন। কারণ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করছে-আপনার ধর্ম কী? আপনি মুসলমান হলে শিয়া নাকি সুন্নি? আপনি কখনো কোনো অন্যায় কাজে জড়িত ছিলেন? এ ধরনের প্রশ্ন শোনার পর মারিয়ানা তাদের কাছ থেকে ফরম নিলেন এবং তাতে লিখলেন, পাকিস্তানের আইন অনুযায়ী তিনি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার লোকদের কাছে তার ব্যক্তিগত তথ্যাদি দিতে বাধ্য নন।

আরেকজন নারী সাংবাদিকও জানিয়েছেন, তার ঘরেও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা হানা দেয়। ঘটনাক্রমে তিনি তখন বাসায় ছিলেন না। কয়েকদিন পর আবারো গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা এলেন, তবে এবারো তাকে পেলেন না। তার বাসার কেয়ারটেকার তাদেরকে জানালেন, তিনি বাড়িতে নেই। এতে গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা রেগে গিয়ে ধমক দিয়ে বাসার কেয়ারটেকারকে বললেন, তোমার মালিক কোথায় আছে বলো, অন্যথায় তোমাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাব।

প্রশ্ন হলো, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার লোকদের সাংবাদিকদের যন্ত্রণা দেবার কী এমন প্রয়োজন দেখা দিল? মারিয়ানা সম্পর্কে কিছু জানার থাকলে আইএসপিআর’র সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতো। আইএসপিআরে এমন কর্মকর্তা রয়েছেন যারা মারিয়ানা বাবরকে দীর্ঘদিন ধরে চিনেন। সম্ভবত এ কারণেই এই ব্যাপারে আইএসআরপিকে বিষয়টি সম্পর্কে জানানো হয়নি। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কারো জানার কিছু থাকলে আইএসপিআর’র কাছ থেকে সহযোগিতা নিতে পারতো। কারণ এই সংস্থাটির কাছে মারিয়ানা বাবরের মতো সাংবাদিকদের দুটি ফাইল সংরক্ষিত আছে-একটি গ্রিন ফাইল আরেকটি রেড ফাইল। গ্রিন ফাইলে প্রশংসাসূচক বিষয়গুলো থাকে। আর রেড ফাইলে বিভিন্ন অভিযোগ ও সন্দেহের তালিকা থাকে। হয়তো সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর এই যাচাই-বাছাই জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো কারণে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর পক্ষে যুক্তি কী? আইন-আদালত এবং আর্মি অ্যাক্ট অনুযায়ী কি গোয়েন্দারা সাংবাদিকদের পেছনে লাগতে পারে? এখন ভাববার বিষয় হলো, গোয়েন্দারা যেভাবে সাংবাদিকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে তা কি রাজনীতিবিদদের ঘরে ঘরে গিয়েও করবে?

আজকাল কিছু লোকের ধারণা হলো, মিডিয়ার লোকেরা বাইরের কোনো শক্তির ইন্ধনে দেশের সেনাদের বদনাম করার চেষ্টা করছে। সম্ভবত সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ওই লোকদের পিছু নিয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, মিডিয়ায় কিছু লোক আইন-কানুনের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল। তাদের মত হলো, আইন সবার জন্য সমান হতে হবে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত যদি অন্যায় কোনো সিদ্ধান্ত দেয় তাহলে মিডিয়া কর্মীরা এর বিরোধিতা করবেই। এটা কখনো দেশীয় সৈন্যদের বিরুদ্ধে কোনো চক্রান্ত নয়। তেমনি পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর কিছু কিছু অপরিণামদর্শী ও ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা মানে দেশদ্রোহিতা নয়। সরকারি কোনো বাহিনীর সদস্যরা অন্যায় কোনো কাজ করলে মিডিয়ায় তা ফলাও করে প্রচার করা মানে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নয়। আদালতের কোনো আদেশের ব্যাপারে পর্যালোচনা করলেই কি গোয়েন্দা হয়রানি শুরু হবে? গোপন সংস্থাগুলোর কার গোয়েন্দাগিরি করা উচিত? সাংবাদিকদের নাকি যারা সাংবাদিকদের বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়? সে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব আপনাদের।

দৈনিক জং-এর সৌজন্যে। উর্দু থেকে অনুবাদ: জহির উদ্দিন বাবর

হামিদ মীর: পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক, প্রধান নির্বাহী জিয়ো টিভি