গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা, কিছু অন্য প্রসঙ্গ

মঙ্গলবার, ১৯/০৩/২০১৩ @ ১২:৪২ অপরাহ্ণ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা::

22092012090229pmIstiak_Reza“A RESPONSIBLE press is an undoubtedly desirable goal; but press responsibility is not mandated by the constitution, and like many other virtues, it cannot be legislated,” Chief Justice Warren Burger of the US Supreme Court ruled on behalf of a unanimous court in June 1974.

যারা গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতার কথা বলেন তারা এই উক্তিটি নিয়ে ভাবতে পারেন। তবে, বাংলাদেশের গণমাধ্যম নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় বেশি করে উঠে আসছে ইলকট্রনিক মিডিয়ার কথা। বিশেষ করে ব্যাক্তি মালিকানাধীন চ্যানেলগুলোর সংবাদ আর অনুষ্ঠান।

বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক মিডিয়া নিয়ে যেকোনো আলোচনায় যে নামটি প্রথমে আসবে তার নাম একুশে টেলিভিশন। ২০০০ সালে একুশের মাধ্যমেই এদেশের মানুষ সম্প্রচার মাধ্যমে পরিবেশিত সত্যিকার সংবাদ পেতে শুরু করে। এর আগে বিটিভে সংবাদ থাকলেও তা ছিল কেবলই সরকারি সংবাদ এবং পুরোটাই ছিল সংবাদ পাঠক-পাঠিকাদের মুখস্তর মতো করে পড়ে যাওয়া। একুশে টিভিই প্রথম পেশাদারিত্বের সাথে সংবাদ উপস্থাপন করে। একুযগ পরে দেশে এখন প্রায় দু’ডজন টেলিভিশন চ্যানেল।

গণমাধ্যমে প্রতিফলিত হয় দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা। গণমাধ্যম পথ চলে গণমানুষের সাথে। গত ৪১ বছরে বাংলাদেশের গণমাধ্যম অনেক সংগ্রামের সাথে তার স্বাধীনতা টিকিয়ে রেখেছে। মার্কিনীদের মতো গণমাধ্যম নির্বাচনে প্রভাব না ফেললেও, বাংলাদেশের গণমাধ্যমও ভূমিকা রাখছে জনমত গঠনে।

দেশের রাজনীতিতে টেলিভিশনের প্রভাব কতটুকু, এ নিয়ে বাংলাদেশে কোন গবেষণা হয়েছে কিনা জানা নেই। তবে আজকের দিনে এদেশের বহু মানুষের মনে টেলিভিশনে প্রচারিত ছবি আর কথা সামাজিক অভিমত তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে। টেলিভিশন তার দর্শক-শ্রোতার জন্য একটা দর্শন তৈরি করে বিধায় রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ক্ষেত্রে ধারণা তৈরিতে প্রভাব রাখে। আজ টিভির কারণে সংবাদ আর মতামত শুধু শিক্ষিত জনগোষ্ঠির নয়, এই শ্রেণী বিভেদ ভেঙে দিয়েছে, চ্যানেলগুলো। মানুষকে নাগরিক করে তুলতে, তার ভেতর ভোগের চাহিদা তৈরিতে, বাজারের শক্তিকেও আঘাত করেছে এসব চ্যানেল। টেলিভিশনে প্রচারিত খবর আর টক-শো এখন বহু আড্ডার আলোচনার বিষয়।

শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের সময় ব্যক্তিখাতে বাংলাদেশে টেলিভিশনের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার বিকাশ হয়েছে খুবই দ্রুত। আসলে অর্থনীতি বাজারমুখি হওয়ার পর ব্যক্তিখাতে টেলিভিশনের সামনে এ ছাড়া আর পথ ছিল না। গত ১২ বছরে প্রাইভেট চ্যানেলগুলোর অবস্থান এতটাই শক্তিশালী যে, এখন সরকার নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশ টেলিভিশনকে আর কোনো আলোচনায় খুঁজে পাওয়া যায় না। অনুষ্ঠান কিংবা সংবাদ উভয় ক্ষেত্রেই বিটিভি আর নেই কোনো তালিকায়, যা এক যুগ আগেও ছিল একটি মাত্র মাধ্যম।

বিনোদন, খেলাধুলা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান আনেক থাকলেও বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলোয় সংবাদই প্রধান উপকরণ। চারটি বিশেষায়িত সংবাদ চ্যানেল থাকলেও বিনোদন চ্যানেলগুলোও খবর আর খবরভিত্তিক অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। আর খবরের জন্য মানুষের একমাত্র চাওয়া প্রাইভেট চ্যানেল। যার সামান্য সুযোগ আছে, সেও চায় বিটিভি ছেড়ে ক্যাবল টিভি দেখতে।

সংবাদের চাহিদা তৈরিও করছে প্রাইভেট চ্যানেলগুলো। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে আসছে একটির পর একটি চ্যানেল। যেখানে ঘটনা, সেখানেই তাদের ছুটে চলা, সরাসরি সংবাদ ও ঘটনা প্রচারের প্রতিযোগিতা, মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে রাখছে সংবাদে। এবং এ অবস্থা শুধু শহরে নয়, গ্রামের মানুষও এখন অনেকটা সময় ব্যয় করে সংবাদ আর সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠানে।

সংবাদ আর সমসাময়িক ঘটনা সার্বিকভাবেই এতো বেশি হওয়ার কারণ আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও। এখানে রাজনীতি এতটাই সংঘাতময় যে, মানুষ সারাক্ষণ খবর রাখতে চায় কখন হরতাল আসছে, কখন অবরোধ আসছে, কোন নেতা-নেত্রী কি বলছে? বিশেষ করে শহর অঞ্চলের মানুষকে বলা যায় high-news consumers।

শুধু রাজনীতি নয়, অপরাধ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, শিক্ষা, কৃষি সব ধরনের খবরেরই চাহিদা আছে। ভারতীয় চ্যানেলগুলোর বিশাল বাজেটের অনুষ্ঠানমালার সাথে আমাদের চ্যানোলগুলো বিনোদনমুলক চ্যানেলগুলোকে তুমুল প্রতিযোগিতা করতে হলেও সংবাদে তা নেই।

সংবাদ দেয়ার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো চ্যানেলসমূহ বিশেষ দৃষ্টি দেয় সেগুলো হলো:

# তাদের খবর বিশ্বাসযোগ্য
# নিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ট সংবাদ
# তারাই প্রথম এই খবর প্রচার করেছে। (ব্রেকিং নিউজ-এর বেলায়)
# সংবাদের বিস্তারিত বিশ্লেষণ (বিশেষ করে টক-শোতে)

সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে কিছু কিছু চ্যানেল, বিশেষ করে দুই একটি সংবাদভিত্তিক চ্যানেল আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি চলে গেছে। কিন্তু চ্যালেঞ্জও রয়েছে তাদের জন্য।

# সংবাদ এখনো অনেকখানি সমাজের সুবিধজনক অবস্থানে থাকা মানুষের খোড়াক। ক্যাবল টিভি বা স্যাটেলাইট টিভি দেখার সুযোগ এখনো অনেক সীমিত। টেরিস্ট্রিয়াল সুবিধা থাকায় সরকার নিয়ন্ত্রিত বিটিভি এখনো অনেক মানুষের ঘরে ঘরে। দরিদ্র মানুষের টিভি জগতে প্রবেশাধিকার এখনো অনেক বড় স্বপ্ন।

# প্রাইভেট বা স্বাধীন টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা অনেক। অনেক ক্ষেত্রেই তারা স্বাধীনভাবে সংবাদ ও মতামত প্রচার করছে। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে যে সরকার, বিরোধীদল বা প্রভাবশালী গোষ্ঠির নিয়ন্ত্রণ নেই সেকথা বলা যাবে না। বিজ্ঞাপনদাতাদের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেশি। সবচেয়ে বেশি চাপ গণমাধ্যমের মালিকদের নিজেদের গোষ্টীগত আর ব্যবসায়িক স্বার্থ সংরক্ষনের চাপ। আছে, সরকারি ও বিরোধীদলের চাপ, আছে সাংবাদিকদের ভেতরকার রাজনৈতিক আর স্বার্থের দ্বন্দ্ব।

যেখান থেকে শুরু করেছিলাম লেখাটি। গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা। প্রথম ভাবনা, সমাজে গণমাধ্যমের ভূমিকা কি? গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যম নাগরিকের অধিকার রক্ষা করতে ভূমিকা রাখে তথ্য জগতে তার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে। মানুষ জানতে চায়, মানুষ সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চায়। আর সেখানেই গণমাধ্যমের ভূমিকা। নীতি নির্ধারক, আইনসভাসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের সাথে মানুষের যোগাযোগ ঘটাতে ভূমিকা রাখে গণমাধ্যম। বাংলাদেশে গণমাধ্যম নানা ঐতিহাসিক ঘটনায়, মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট থেকেছে। দুর্নীতি, সহিংসতার ইস্যুকে অনেক সময় গণমাধ্যমই সবার আগে মানুষের কাছে নিয়ে এসেছে।

অনেক সময়ই বলা হয় বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করছে। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের নেতারা তা বেশি করে বলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নানা ধরনের বাধা উপেক্ষা করেই কাজ করতে হয় সাংবাদিকদের। মামলা আছে, হুমকি আছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যা আছে, তা হলো মালিকদের বাধা। বাংলাদেশে গণমাধ্যমের মালিকানার ধরন অনেক বেশি প্রশ্ন সাপেক্ষ, অনেক বেশি গণমাধ্যমের মূল চেতনার পরিপন্থী। মালিকদের ব্যবসায়িক আর রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অনেক দুর্নীতি, অনেক বড় বড় ব্যবসায়িক অনিয়ম, দুর্বত্তায়নের খবর প্রচার করতে পারেনা গণমাধ্যম। আর সাংবাদিকদের রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে এই সুযোগটা রাজনৈতিক শক্তি আর দুর্বত্তরা বেশি করে পাচ্ছে। ফলে আজ যখন কোনো সাংবাদিক হয়রানি, হুমকি বা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তখন তার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়না। প্রশ্ন আসে, যদি স্বাধীনতাই না থাকলো, তা হলে এতো এতো চ্যানেল,রেডিও, পত্রিকা, সাময়িকী, অনলাইন নিউজ সাইট হচ্ছে কেন? হচ্ছে, কারণ মিডিয়া যে কারো কারো জন্য একধরনের অস্ত্রও বটে।

এই স্বাধীনতা কি কখনে কখনো অতি স্বাধীনতায় বা দায়িত্বহীনতায় পরিণত হয়? হয় বৈ কি, যদি সেই সংবাদ প্রতিষ্ঠানে একটি লিখিত আচরণবিধি না থাকে, যদি সাংবাদিকরা সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত না হয়। তবে, এই ভয়ে সাংবাদিকতা বন্ধ করে দেয়া যায় না। কোনোভাবেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করা যাবেনা। এই স্বাধীনতা খর্ব হয়, এমন কিছু করা যাবে না। সেন্সরশিপ গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পরপন্থি, এমনকি তা আমাদের সংবিধবানের সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। গণমাধ্যম নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তার সমাধান করবেন গণমাধ্যম কর্মীরাই, নিজেরাই নিজেদের আচরণবিধি করবেন।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের প্রথম সমস্যা তার রাজনীতিকিকরণ। যেভাবে রাজনীতি ঢুকেছে এই পেশায়, এতে, বস্তুনিষ্ঠতা নানাভাবে ব্যহত হচ্ছে। অনেক সংবাদ প্রতিষ্ঠানেরই এখন দর্শক-শ্রোতার কাছে সেইভাবে গ্রহণযোগ্যতা নেই, নেই বিশ্বাসযোগ্যতা। আর গণমাধ্যমের মালিকানার ধরনও একটা বড় বাধা হয়ে দাড়িয়েছে এর স্বাধীনতার জন্য। তাদের স্বার্থের দ্বন্দ্বে কমে গেছে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বেড়েছে চাঞ্চল্য করার প্রবণতা। রাজনীতি এতোটাই প্রভাব বিস্তা করে যে অনেক বড় ঘটনাও কোনো পত্রিকা বা টেলিভিশনে আসে না। ২০০১-এর নির্বাচনের পর সারাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে ভয়াবহ আক্রমণ হয়, তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা হয়, নারী নির্যাতন হয়, তা কখনোই কোনো কাগজে বা টেলিভিশনে প্রকাশ বা প্রচারিত হয়নি। আসলে তখনকার সরকার, তখনকার রাজনৈতিক গোষ্ঠির চাপে তা প্রকাশ বা প্রচার হয়নি, বা করতে দেয়া হয়নি। এবং এমন একটি সেন্সরশিপের জন্য সাংবাদিক ইউনিয়ন থেকে কোনো প্রতিবাদও করা হয়নি।

গণমাধ্যম কর্মীদের এই রাজনৈতিক বিভাজন একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। এই বিভক্তির ফলে সরকারি বা বেসরকারি, কিংবা গোষ্ঠিগত চাপ, কিংবা হমকি, কোনো ক্ষেত্রেই কোনো ভূমিকা নিতে পারছে না সাংবাদিকরা।

আসলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য দরকার নিজের ভূমিকার প্রতি গণমাধ্যম কর্মীদের আস্থা রাখা, দলীয় কর্মীর মতো আচরণ না করা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, এমনকি সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর উচিত একটা নিজস্ব আচরণবিধি তৈরি করে সে পথে চলা।

সকলের দক্ষতা আর স্বচ্ছতা নিয়ে কটাক্ষ করে, সমালোচনা গণমাধ্যম। কিন্তু আজ বাংলাদেশর কয়টি সংবাদপত্র বা টেলিভিশন, সংবাদ সংস্থা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল কিংবা বেতার দাবি করতে পারে যে, পুরোমাত্রায় স্বচ্ছতার সাথে পরিচালিত হচ্ছে তারা? কয়টি হয়ে উঠেছে সত্যিকারের প্রতিষ্ঠান? কয়টি প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো বেতন-ভাতা দেয় সাংবাদিকদের? কয়টি প্রতিষ্ঠান পেরেছে নিজেদের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করতে? কয়টি প্রতিষ্ঠানের আছে তথ্য ও গবেষণা বিভাগ? এসব বিষয়ে গণমাধ্যমের রয়েছে সীমাহীন ব্যর্থতা।

আর এসব কারণেই কথা উঠছে গণমাধ্যমর কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের। কিন্তু তা সরকার বা কোনো গোষ্ঠী নয়, এই পর্যবেক্ষণের কাজটি করবে গণমাধ্যম নিজেই। সাথে রাখতে পারে সমাজের নানা শ্রেণী পেশার প্রতিনিধিদের। আচরণবিধি মেনে, নীতি-নৈতিকতা পথে চলে গণমাধ্যম আগামী দিনে হয়ে উঠবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন
ইমেইল: [email protected]