গণমাধ্যম : বিশ্বাসযোগ্যতা-সংকটে বিটিভি

মঙ্গলবার, মার্চ ১৯, ২০১৩

শরিফুল হাসান::
btv১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিকেল। ডিআইটি ভবনের উল্টো দিকের পল্টন ময়দানে বিশাল জনসভা চলছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহ সভায় উপস্থিত। তিনিসহ বক্তারা সবাই আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের অবসানের দাবি জানিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। সভা শেষে চারদিক আইয়ুববিরোধী স্লোগানে মুখরিত।
পল্টনে যখন এই জনসভা চলছে, ডিআইটি ভবনে তখন চলছে ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তান টেলিভিশন কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের প্রস্তুতি। সন্ধ্যা ছয়টায় কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে এলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মোনেম খান। তাঁরা উদ্বোধন করে গেলেন টেলিভিশনের। রাত আটটায় যথারীতি প্রথম সংবাদ পরিবেশিত হলো। কিন্তু সেই সংবাদের কোথাও ফাতেমার জনসভার কোনো খবর নেই।
আর এভাবেই শুরু হলো গণমানুষের কাছে এ দেশের টেলিভিশনের খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর প্রক্রিয়া। সেই যে শুরু, গত ৪৮ বছরেও সেই পরিস্থিতি বদলায়নি।
১৯৬৪ সালে যাঁর হাত দিয়ে ঢাকায় টেলিভিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই জামিল চৌধুরী তাঁর এক স্মৃতিকথায় লিখেছেন টেলিভিশনের উদ্বোধন ও ফাতেমা জিন্নাহর জনসভার সেই ঘটনা। তাঁর মতে, ‘সমালোচকেরা প্রায়ই বলেন, বর্তমান টেলিভিশন দর্শকদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ২৫ ডিসেম্বর জন্মলগ্নে আঁতুড়ঘরেই টেলিভিশন দর্শকদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। কারণ কেন্দ্রীয় তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ছিল, পাকিস্তান বেতার থেকে যে সংবাদ পাঠ করা হবে, তার বাইরে কোনো সংবাদ টেলিভিশনে পরিবেশন করা যাবে না। এত প্রতিকূলতার বিপরীতে একমাত্র পথ ছিল অনুষ্ঠানের মান উন্নয়ন।’
সেই যে শুরু, গত চার যুগ ধরেই এভাবে চলছে। এই ৪৮ বছর ধরে বিটিভির সংবাদ মানেই সরকারের গুণকীর্তন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিটিভির প্রথম মহাপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন জামিল চৌধুরী। কয়েক দিন আগে আলাপকালে তিনি পুরোনো কথাগুলোই আবার বললেন। তাঁর মতে, শাসকদের বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে, শুধু ক্ষমতাসীনদের মুখপাত্র হওয়া উচিত নয় বিটিভির। একটি ঘটনারও উদাহরণ দেন তিনি।
১৯৭৩ সালের প্রথম দিকে বাংলাদেশ বেতারে প্রতিদিন বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন বক্তব্যের নির্বাচিত কথা নিয়ে ‘বজ্রকণ্ঠ’ নামে একটা অনুষ্ঠান হতো। সে সময় একটি নীতিনির্ধারণী বৈঠকে বিটিভিতেও একই রকম অনুষ্ঠান করার জন্য সে সময়ের তথ্যসচিব নির্দেশনা দেন তাঁকে। কিন্তু জামিল চৌধুরী সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। কয়েকটি বিষয় নিয়ে কথা-চালাচালির একপর্যায়ে গণভবনে ডাক পড়ে জামিল চৌধুরীর। সেখানে গিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেন, প্রতিদিন ওই রেকর্ড বাজালে দর্শক বিরক্ত হতে পারে। বঙ্গবন্ধু সব শুনে বললেন, তাহলে ওই অনুষ্ঠান করার দরকার নেই। জামিল চৌধুরী হতাশা প্রকাশ করে বলেন, এখন এই কথা কোনো ক্ষমতাসীন নেতা শুনতে চাইবেন না।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা সব সময়ই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলে আসছেন, স্বাধীনতার পর থেকে যখন যারা ক্ষমতায় এসেছে বিটিভিকে নিজেদের প্রচারযন্ত্রে পরিণত করতে চেয়েছে। এ জন্যই একসময় বিটিভির নাম হয়ে যায় ‘সাহেব-বিবি-গোলামের বাক্স’। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর টানা ২১ বছর ৭ মার্চের ভাষণ বিটিভিতে প্রচার করা হয়নি। এমনকি ২০০৪ সালে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার খবরও বিটিভি প্রচার করেনি।
বর্তমানে বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে ১৪ বার সংবাদ পরিবেশন করে বিটিভি। কিন্তু সব খবরেই বিরোধী দল গুরুত্বহীন। এর বদলে সরকারের কোন মন্ত্রী, কোথায় কী বলছেন, কী করেছেন আর উন্নয়নের জোয়ারে দেশ ভাসার তথ্যই কেবল মিলবে বিটিভিতে। শুধু এই সরকার নয়, প্রতিটি সরকারের আমলেই একই অবস্থা।
পরিস্থিতি বদলানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে বিটিভিকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার দাবি ওঠে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার সেই প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে একটি কমিটিও করে। সাবেক সচিব আসাফ্উদ্দোলাহেক ওই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়। ওই কমিটি সে সময় সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদনও দেয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শেষ মুহূর্তে সংসদে একটি বিলও পাস হয়। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় এসে ওই বিল আর কার্যকর করেনি। আর বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও সেটি ভুলে গেছে। ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা হয়তো ভাবছেন, বেসরকারি টেলিভিশনগুলো তো সরকারবিরোধী, তারা সবার খবরই প্রকাশ করছে। তাহলে বিটিভি কেন এই দায়িত্ব নেবে? কেউ বুঝতে চান, একটি টেলিভিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ হয় তার সংবাদে।
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে স্বৈরাচার পতন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর বিটিভির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সা’দত হুসাইন। বিটিভির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলাপের একপর্যায়ে তিনি পুরোপুরি হতাশা ব্যক্ত করলেন। তাঁর মতে, এ দেশে যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, সেই সরকার বিটিভিকে নিজেদের প্রচারযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ক্ষমতাসীনেরা কর্তৃত্ব না ছাড়লে এই পরিস্থিতি বদলাবে, এমন আশা দেখেন না সাবেক এই মহাপরিচালক।
১৯৬৪ সালে ডিআইটি ভবনে চালু হওয়া বিটিভি ১৯৭৫ সালের ৬ মার্চ রামপুরার নবনির্মিত আধুনিক যন্ত্রসজ্জিত ভবনে প্রবেশ করে। আধুনিক স্টুডিও এবং যন্ত্রপাতি আছে এখানে। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম ছাড়াও ১৪টি সম্প্রচারকেন্দ্র রয়েছে বিটিভির। দেশের মোট জনসংখ্যার ৯৫ ভাগেরও বেশি লোক এখন বিটিভি দেখতে পায়। শহরের লোকজন কিংবা মধ্যবিত্ত শ্রেণী এখন বিটিভি না দেখলেও দেশের এমন অনেক এলাকা আছে, যেখানে কেবল বিটিভিই দেখা যায়। কাজেই তারা দেশের সব খবর জানতে চায়। কিন্তু তার পরও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণের কোনো চেষ্টা নেই বিটিভির।
বিটিভির উপমহাপরিচালক (বার্তা) বাহারউদ্দিন অবশ্য কিছু আশার কথা শোনালেন। এই কর্মকর্তার মতে, দীর্ঘদিন ধরেই বিটিভির সংবাদ একটা নিয়মের মধ্যে চলে আসছে। মন্ত্রীদের খবর দিয়ে আগে সবাইকে খুশি রাখার চেষ্টা করা হতো। কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে এসে উন্নয়নমূলক খবর বেশি করে দেওয়ার চেষ্টা করছে বিটিভি। তবে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর খবর তো গুরুত্ব দিয়েই প্রকাশ করতে হবে। সামনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করার কথাও বললেন তিনি। কিন্তু বিরোধী দলের সংবাদ এত গুরুত্বহীন কেন, এ প্রশ্নে বাহারউদ্দিন জানালেন, এটা আসলে দীর্ঘদিনের প্রচলন। তবে সামনে রাত আটটার খবরের পর সংবাদ পর্যালোচনামূলক একটি অনুষ্ঠান হবে। সেখানে সারা দিনের আলোচিত সব খবর থাকবে।
এই কর্মকর্তার কথায় আরও পরিষ্কার, সহসা সংবাদ পরিবেশনে কোনো পরিবর্তন আসছে না বিটিভিতে। কিন্তু সরকার ও বিটিভি কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে, যত দিন না সংবাদে বিশ্বাসযোগ্যতা আনা সম্ভব হবে, তত দিন পুরো বিটিভির ওপর মানুষের আস্থা ফিরবে না।

লেখক: শরিফুল হাসান: সাংবাদিক।