প্রসঙ্গ: একজন নুরুল আলম ও মফস্বল সাংবাদিকতা

সোমবার, ১৮/০৩/২০১৩ @ ১১:৫৭ অপরাহ্ণ

শফিক জামান.
mofossol journal২০০৮ সালের এপ্রিল কিম্বা মে মাসে স্থানীয় সাংবাদিকতায় ঝুঁকি প্রসঙ্গে একটি লেখা লিখেছিলাম ওয়াল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে-কে সামনে রেখে। লেখাটি ছাপা হয়েছিল দৈনিক যায়যায়দিন, সাপ্তাহিক জামালপুর ৭ দিন ও ম্যাস লাইন মিডিয়া সেন্টারের উদ্যোগে প্রকাশিত সংবাদ ও সাংবাদিকতা বিষয়ক একটি গ্রন্থে।
সেই একই লেখা শব্দ,লাইন,দাঁড়ি,কমাসহ হুবহু গেলো ২৮ অক্টোবর আপলোড হয়েছিল নিউজ পোর্টাল বাংলা নিউজ টুয়েন্টিফোরে। তবে আমার নামে নয় নূরুল আলম নামে আমারদেশ পত্রিকার মিরসরাই প্রতিনিধির নামে। আমার লেখাটির শিরোনাম ছিল ‘সাংবাদিকতায় ঝুঁকিঃ প্রোপট স্থানীয় সাংবাদিকতা’। শিরোনাম পাল্টে লেখাটির নতুন শিরোনাম দেয়া হয়েছে ‘মফস্বল সাংবাদিকতা: প্রোপট মিরসরাই’। নূরুল আলম আমার লেখাটিতে যে কাজটুকু করেছেন তাহলো শুরুতে একটি প্যারায় ভূমিকায় বাংলানিউজের প্রশংসা করেছেন আর আমার লেখার মাঝখানে যেখানে জামালপুরের সাংবাদিকদের নাম ছিল সেখানে মিরসরাইয়ের কিছু সাংবাদিকের নাম ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া শুরুর শব্দ থেকে শেষ শব্দ পর্যন্ত পুরো আমার লেখাটিই নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। লেখাটি দেখে হতভম্ব হয়ে যাই। পরে ফোনে বিষয়টি বাংলানিউজের আউটপুট এডিটর মাহমুদ মেনন খান মেনন ভাইকে জানাই। সাথে সাথে তিনি নূরল আলমের লেখাটি বাংলানিউজের ডিসপ্লে থেকে সরিয়ে দেন।
নিউজ পোর্টালে আমার লেখা অন্য একজনের নামে আপলোড হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারছিনা কিছুতেই। এব্যাপারে মেনন ভাইয়ের সাথে কথা বলে একটি লেখা বাংলানিউজে পাঠিয়েছিলাম। কিন্ত সেটা আপলোড হয়নি।
যাইহোক মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। দুই যুগের বেশি সময় ধরে মফস্বল শহর জামালপুরে সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত রয়েছি। কাজ করেছি দৈনিক পত্রিকা, নাঈমুল ইসলাম খানের সম্পাদনায় প্রকাশিত আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, আমার দেশ, যায়যায়দিন,বাংলাদেশ প্রতিদিন, বাংলানিউজ ছাড়াও প্রথম প্রজন্মের একুশে টিভিতে। এখন কাজ করছি বাংলাদেশ প্রতিদিন ছাড়াও এনটিভিতে। সাহিত্যে চৌর্যবৃত্তির নানা গল্প শুনেছি। সংবাদ বা ফিচারের েেত্রও চৌর্যবৃত্তি দেখেছি। দেখেছি সিন্ডিকেট বা সিসি (কপি টু কপি)সাংবাদিকতা। এখনও দেখছি মফস্বল শহরে কিভাবে লিখতে না জেনেও একেকজন সাংবাদিক হয়ে উঠছে। জায়গা করে নিচ্ছে বড়ো বড়ো মিডিয়ার জেলা প্রতিনিধির আসন। নিউজের বা স্ক্রিপ্টের ইন্ট্রোতো দূরের কথা যিনি নিজের নামটি ছাড়া একটি বাক্য ভালো করে লিখতে জানেননা তিনিও সিন্ডিকেট সাংবাদিকতার কল্যাণে বনে যাচ্ছেন জেলার বড়ো সাংবাদিক। আর এটা করছেন তারা একেবারে সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করে । যখন কম্পিউটার ছিলনা। তখন দেখেছি এই জামালপুর শহরে একেকটা গ্র“প নিজেদের মতো সিন্ডিকেট করে সাংবাদিকতা করতো। যিনি লিখতে জানেন তিনি ওই দিনের সংবাদটি লিখে ছেড়ে দিতেন আর সিন্ডিকেট সদস্য অন্য সাংবাদিকরা গোল হয়ে বসে হুবহু তা কপি করে ফ্যাক্সে বা ফোনে পাঠিয়ে দিতো যার যার অফিসে। কেউ কেউ মূল লেখার ফটোকপিতে আগের স্বারের উপর কাগজ বসিয়ে নিজের স্বারটি করে ফ্যাক্সে পাঠিয়ে দিতো অফিসে। পরদিন ওই সংবাদটি প্রতিটি পত্রিকায় দাঁড়ি,কমাসহ হুবহু একইভাবে ছাপা হতো। অন্য জেলার কথা জানিনা, আমার জেলা জামালপুরে এটা এখনও হয়। কম্পিউটার আসার পর বিষয়টি আরো সহজ হয়ে উঠেছে। ডে-ইভেন্টের সংবাদ একজন লিখেন আর সেই লেখাটি হুবহু কপি করে নীচে নিজের নামটি লিখে সিন্ডিকেট সদস্য সাংবাদিকরা পাঠিয়ে দেন যারযার অফিসে। সচেতন ভাবে একটি সংবাদের সূত্র ধরে ওইদিনের কয়েকটি পত্রিকায় চোখ বুলালেই যেকোন পাঠকের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। শুধুই তাই নয় এমন ঘটনাও ঘটেছে অনেক সিন্ডিকেট সাংবাদিক জানেনই না সেদিন কি নিউজ ছিল বা কি নিউজ তার অফিসে পাঠানো হয়েছে। সাংবাদিকের অজান্তে অনেক সংবাদ সিন্ডিকেটের কল্যাণে চলে যেতো ওইসব পত্রিকা অফিসে। পরদিন তিনি পত্রিকা পড়ে জানতে পারেন গতকাল তার নামে কি সংবাদ পাঠানো হয়েছিল। এমন ঘটনা প্রতিদিন হয়। এমনও অনেক সাংবাদিক রয়েছেন যারা কখনোই সংবাদের সাথে থাকেন না। সারাদিন অন্যসব কাজ সেরে সন্ধ্যায় তার সিন্ডিকেট অফিসে এসে ওইদিনের সংবাদটি কপি করে একবারও না পড়ে পাঠিয়ে দেন তার অফিসে। অনেক সিনিয়র এবং অভিজ্ঞ সাংবাদিক রয়েছেন যারা তাদের পত্রিকার নীতি অনুসরণ করে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট পরে বক্তব্য দেন এভাবে যে ‘ জেলা প্রশাসক কালেরকন্ঠকে বা সমকালকে জানিয়েছেন,…” । এমনও হয়েছে সংবাদটি না পড়ার কারণে সিন্ডিকেট সদস্য সাংবাদিকের অন্য একটি পত্রিকায় হুবহু ‘ জেলা প্রশাসক কালেরকন্ঠকে বা সমকালকে জানিয়েছেন,…’ চলে গেছে। এেেত্র অফিস থেকে ফোন করা হলে নানা উপায়ে বিষয়টি ম্যানেজ করে ফেলেন তারা। ভুলেও যদি অফিসের ডেস্ক বিষয়টি মিস করে প্রতিনিধির সংবাদ কপিটি হুবহু ছেড়ে দেন। হুবহু কালেরকন্ঠ বা সমকালকে জানানো হয়েছে বক্তব্য যদি অন্য একটি পত্রিকায় ছাপা হয় তাহলে কি ভয়াবহ কান্ড হতে পারে এই ভাবনাটিও নেই অনেক সিন্ডিকেট সাংবাদিকের। আমার ধারণা ভয়াবহ এমন সাংবাদিকতার চিত্র শুধু ছোট্ট মফস্বল শহর জামালপুরের নয়। অনেক জেলায়ই এমন সাংবাদিকতার চর্চা চলছে। শুধু ডে-ইভেন্ট নয় ফিচারের েেত্রও কপি টু কপি সাংবাদিকতা চলছে নিয়মিতই। মূলধারার একজন সাংবাদিক ৫/৭দিন খেটেÑখুটে একটি ফিচার লিখেন। সেটি ছাপা হওয়ার সাথে সাথে সিসি সাংবাদিকরা পত্রিকাটি সংগ্রহ করে রেখে দেন। দুচারদিন পর সেই ফিচারটিই সিসি সাংবাদিকরা হুবহু কপি করে সাথে একটি ছবি জুড়ে দিয়ে পাঠিয়ে দেন নিজের পত্রিকায়। এঅবস্থা দেখছি দীর্ঘদিন থেকে। একটি জেলায় নিজেরা লিখেন, নিয়মিত সংবাদের সাথে থাকেন আপাদমস্তক সাংবাদিক এমন সাংবাদিকের সংখ্যা সিসি সাংবাদিকের তুলনায় একবারে হাতে গোণা । ফলে সিসিদের দৌরাত্বের কাছে তারা অনেকটা অসহায় থাকেন। মফস্বল সাংবাদিকতার ভালো-মন্দ দিক নিয়ে আরেকটি লেখা লেখার ইচ্ছে আছে।
এতোদিন সংবাদ বা ফিচার কপি হতে দেখেছি, একজনের ফিচার বা সংবাদ অন্যজনের পত্রিকায় অন্যজনের নামে ছাপা হতে দেখেছি। আর এবার দেখলাম একজনের মৌলিক লেখা কয়েক বছরের ব্যাবধানে আরেকজনের নামে চলে যেতে। বিষয়টি আমাকে হতভম্ব করে দিয়েছে। আমি বুঝতে পারছিনা এই বিষয়টির প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা যাবে কিভাবে। নুরুল আলমদের মতো নির্বোধ মানুষদের প্রতি চরম ঘৃণা আর ধিক্কার প্রকাশ ছাড়া আর কি করার আছে।

লেখক: স্টাফ করসপন্ডেন্ট, এনটিভি ।
সভাপতি, জামালপুর জেলা প্রেসকাব।