সাংবাদিকতায় ঝুঁকিঃ প্রেক্ষাপট স্থানীয় সাংবাদিকতা

সোমবার, ১৮/০৩/২০১৩ @ ১১:৫৬ অপরাহ্ণ

শফিক জামান:
mofossol journalষাটের, সত্তরের এমনকি আশির দশক পর্যন্ত ঢাকার বাইরের সাংবাদিকতাকে ভাবা হতো শখের সাংবাদিকতা। এই সময়ে মফস্বল শহরের সচ্ছল পরিবারের তরুণ-যুবক, রাজনৈতিক কর্মী নিতান্ত শখ কিম্বা রাজনৈতিক আদর্শের টানে, আবার কেউ কেউ নিজ শহরে সামাজিক সম্মানের জন্য সাংবাদিকতায় আসতেন। অন্য পেশা বা কাজের পাশাপাশি সাংবাদিকতা করতেন তারা। তখনকার বাস্তবতায় স্থানীয়ভাবে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে ভাবার সুযোগও ছিলনা। ফলে সেসময় সিরিয়াস সাংবাদিকতা আর সাংবাদিকতায় ঝুঁকির মাত্রাও ছিল অপোকৃত কম। কিন্তু এরশাদ পতনের পর নব্বই পরবর্তি সময়ে এ অবস্থা পাল্টাতে থাকে। এরশাদ পতনের পর একানব্বই সালে গতানুগতিক ধারার বাইরে শুধু ঢাকায় নয় সারাদেশের একদল তরুণ এবং কমিটেড সংবাদকর্মী নিয়ে বের হয় আজকের কাগজ। এরই ধারাবাহিকতায় ভোরের কাগজ, প্রথম আলো অন্যদিকে জনকণ্ঠসহ অন্যান্য কাগজের সংবাদ চাহিদা, সংবাদ পরিবেশনা এবং মফস্বল শহরে পত্রিকার সার্কুলেশন বৃদ্ধি সব মিলিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকতার চিত্রটা পাল্টে যেতে থাকে। তখনো স্থানীয়ভাবে এটি পেশা হিসেবে না দাঁড়ালেও অনেকে মনে করেন মফস্বলে সিরিয়াস সাংবাদিকতার শুরু এই সময়েই। এই সময়েই সংবাদ ত্রে হিসেবে মফস্বলের গুরুত্ব¡ যেমন বাড়ে তেমনী বেড়ে যায় ঝুঁকিও। ডিকারেশন প্রাপ্তি সহজ হওয়ায় বের হয় অনেক স্থানীয় সাপ্তাহিক এবং দৈনিক পত্রিকা। আর নব্বই পরবতী সিরিয়াস সাংবাদিকতার এই সময়ে হুমকী-নির্যাতনের মাত্রাও যায় অনেক বেড়ে।
একানব্বই সালে গণতান্ত্রিক সরকারের শুরুতেই জামালপুরে নির্যাতনের শিকার হন ইত্তেফাক সংবাদদাতা মোশাররফ হুসেন। টেস্ট রিলিফ প্রকল্পের অনিয়ম বিষয়ে ইত্তেফাকে সংবাদ ছাপা হলে ুব্ধ হন তৎকালীন সরকারের একজন উপমন্ত্রী। ুব্ধ উপমন্ত্রীর ইশারায় প্রকাশ্য রাস্তায় আলমগীর নামে এক ছাত্রদল ক্যাডার তাকে পিটিয়ে আহত করে। একই বিষয়ে সংবাদ ছাপা হওয়ায় নানা ভাবে হুমকীর শিকার হন তখনকার আজকের কাগজ প্রতিনিধি শফিক জামান। ৩ টি গণতান্ত্রিক সরকার আমলে জামালপুর জেলায় শারিরীক নির্যাতনের শিকার হন দৈনিক বাংলার প্রতিনিধি লাবলু আনসার, সাপ্তাহিক পল্লীকন্ঠ ও দৈনিক পল্লীকন্ঠ প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক নূরুল হক জঙ্গী, দৈনিক ইনকিলাব প্রতিনিধি নূরুল আলম সিদ্দিকী, জনকণ্ঠের ইসলামপুর প্রতিনিধি আনোয়ার হোসেন মিন্টু এবং সর্বশেষ দৈনিক খবরপত্রের প্রতিনিধি আনোয়ার হোসেন। আর এ সময়ে নানাভাবে হুমকি, মামলা-মোকদ্দমার শিকার হন অনেক স্থানীয় সাংবাদিক। এর আগে এরশাদ শাসনামলের শেষ দিকে পরীা হলে অবাধ নকলের ছবি তুলতে গিয়ে পুলিশের নির্ম্মম নির্যাতনের শিকার হন তখনকার নিউ নেশন প্রতিনিধি মেহের উল্লাহ, শুধু নির্যাতন নয় পুলিশ তাকে গ্রেফতারও করে। বিগত ৩ টি সরকার আমলে ফেনীর টিপু সুলতান, ফরিদপুরের প্রবীর সিকদার ছাড়াও দেশব্যাপী অসংখ্য সাংবাদিক নির্ম্মম নির্যাতনের শিকার হন। আর দণিাঞ্চল তো সাংবাদিকদের জন্য মৃত্যু উপত্যাকায় পরিণত হয়েছে।
পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। আর সেই ঝুঁকিটা এখন ঢাকার বাইরে জেলা ও উপজেলা শহরে ভয়াবহ মাত্রায় বেশী। উপরোক্ত সাংবাদিক নির্যাতনের চিত্র থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে। ঢাকার মতো বড়ো শহরে কাজ করার সুবিধা হলো এই, একটি পত্রিকা বা মিডিয়ায় এক সাথে অনেক সাংবাদিক কাজ করেন। একেক জন সাংবাদিক একেকটি বিট কভার করেন, যার যার মতো। ফলে নিজস্ব বিটে কাজ করার সময় তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে সবকিছুতে অবলম্বন করেন নিজস্ব কৌশল। এ ছাড়া ছাপা হবার পর রিপোর্টের দায়ও চলে যায় সম্পাদক বা পত্রিকার উপর। এ েেত্র ুব্ধ শক্তির পে নির্দিষ্ট সাংবাদিককে খুঁজে বের করা একটু কঠিনই হয়। ঢাকায় সাংবাদিকের উপর হুমকী-নির্যাতনের বিষয়টি ফেস করা হয় অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে। রাজধানীর কেন্দ্রে অধিকাংশ মিডিয়া হাউসের প্রভাব বিস্তৃত থাকে সরকার, রাজনীতি থেকে শুরু করে অনেক কিছুতে। ফলে ঢাকার সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি মফস্বলের তুলনায় অনেকটা কম।
আর ঢাকার বাইরের জেলা-উপজেলায় কর্মরত সাংবাদিকদের প্রতিটা মূহুর্ত কাটে ঝুঁকির মধ্যে এবং এেেত্র তারা কতোটা অসহায় তা বুঝা যায় যখন একজন স্থানীয় সাংবাদিক হুমকী-ধমকী, নির্যাতন, মামলা-মোকদ্দমার কবলে পড়েন। প্রকাশিত সংবাদের দায় পত্রিকার হলেও স্থানীয় সংবাদের েেত্র হুমকী-ধমকী, নির্যাতন সবকিছু সামলাতে হয় একা সাংবাদিককেই। মামলায় সম্পাদককে আসামী করা হলেও অধিকাংশ েেত্র মামলার খরচটুকুও চালাতে হয় ওই সাংবাদিককেই। প্রথমেই বলা হয়েছে ঢাকায় একসাথে অনেক সাংবাদিক কাজ করেন এবং একজন সাংবাদিক নির্দ্দিষ্ট বিটে করেন তা। কিন্ত স্থানীয় সাংবাদিকদের কর্মত্রে ওপেন, পুরো জেলা বা উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাকে চোখ রাখতে হয় সর্বত্র সবকিছুর উপর। নিভূত গ্রাম থেকে জেলা শহরের সমস্ত কর্মকাণ্ডের উপর। নানা কষ্ট, বাধা-বিপত্তি এড়িয়ে সংবাদ সংগ্রহ করে তা পাঠাতে হয় নিজ পত্রিকা অফিসে আর ছাপা হবার পর সংবাদ সংশ্লিষ্ট শক্তির প্রতিক্রিয়া নিয়ে মানসিকভাবে তটস্ত থাকতে হয় তাকে। ঢাকার একটি পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের একজন প্রতিনিধিই কাজ করেন একটি জেলায়। ফলে ওই জেলার কোন শক্তির বিরুদ্ধে যায় এমন খবর পত্রিকায় ছাপা হলে বা টিভিতে প্রচারিত হলে চিহ্নিত করা হয় স্থানীয় সাংবাদিককেই। আর সেই সাংবাদিক একা। অনেক েেত্র অসহায়ও। ফলে হুমকী, নির্যাতন নেমে আসে তার উপর। এভাবে প্রতিদিনই একজন স্থানীয় সাংবাদিককে থাকতে হয় ঝুঁকির মধ্যে।
মাসে দু-চারবার হুমকী-ধমকীর শিকার হননি যেকোন জেলা শহরে এমন সাংবাদিক খুঁজে পাওয়া কষ্টকর হবে। সন্ত্রাস-অপরাধ, রাজনীতি-দুর্নীতি এসব কিছুর সংবাদে তিগ্রস্ত হন যারা তাদের সকলেই যেকোন জেলা শহরের শক্তিধর ব্যক্তি। অনেক কিছুই হতে পারে তাদের হাতের ইশারায়। হয়ও। জাতীয় মিডিয়ার স্থানীয় সাংবাদিক তো বটেই, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল থাকায় স্থানীয় পত্রিকার সম্পাদক-সাংবাদিকদেরও প্রতিনিয়ত থাকতে হয় ঝুঁকির মধ্যে।
যেসব স্থানীয় সাংবাদিক এ’যাবত কাল নির্যাতিত হয়েছেন, দেখা যাবে প্রায় সবগুলোতেই রয়েছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, গডফাদারের হাত। সন্ত্রাস, অপরাধ, দর্নীতি আর রাজনীতির সংবাদ ছাপা হলে হুমকী-ধমকী ছাড়াও রাজনৈতিক নেতারা ওই সাংবাদিকের পিছনে লেলিয়ে দেন পোষা সন্ত্রাসী কে।
আর একটি বিষয় লণীয় হলো, গণতান্ত্রিক সরকার ব্যাবস্থার বিগত ১৫ বছরে জামালপুর জেলায় দুটি রাজনৈতিক দলেরই মতাশালী রাজনৈতিক নেতাদের একটি কমন প্রবণতাই ছিল স্থানীয় সাংবাদিক, সংবাদপত্র আর প্রেসকাব নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা। অবাধ ডিকারেশনের সুযোগে এসময় কালে অনেক রাজনৈতিক নেতা স্থানীয় পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদক বনে যান। আর সেসব পত্রিকায় সাংবাদিকের নূন্যতম অভিজ্ঞতাহীন দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়োগ দেন। নিয়োগপ্রাপ্ত দলীয় কর্মীরা প্রেসকাবের সদস্য হয়ে প্রেসকাবের নির্বাচনে তাদের অনুগত প্যানেলকে জয়ী করে আনেন। ওই রাজনৈতিক নেতারা চেষ্টা করেন প্রেসকাব আর সাংবাদিক নিয়ন্ত্রণই শুধু না, কোন কোন ক্ষেত্রে সংবাদ নিয়ন্ত্রনেরও। আর এভাবে প্রকৃত পেশাজীবী সাংবাদিকরা অসহায় এবং দ্বিধাবিভক্ত হয়ে সাংঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। সাংবাদিকদের ুদ্র স্বার্থ আর প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণ চেষ্টার কারণে স্থানীয় সাংবাদিকতায় ঝুঁকি আরো বাড়ছে ক্রমশ:। শুধু জামালপুর নয় ধারণা করা যায় সারাদেশে অনেক জেলার চিত্রই কম-বেশি এমনই।
প্রাসঙ্গিকভাবে আর একটি বিষয় বলতেই হয়। শুরুতেই বলা হয়েছে সিরিয়াস স্থানীয় সাংবাদিকতার শুরু নব্বই পরবর্তী সময়ে । এখন আর কোন দিক থেকেই স্থানীয় সাংবাদিকতাকে শখ বলার সুযোগ নেই। পত্রিকা-মিডিয়ার চাহিদা অনুযায়ীই একজন স্থানীয় সাংবাদিককে এখন সংবাদের পিছনে ছুটতে হয় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। এ অবস্থায় একজন সার্বক্ষনিক স্থানীয় সাংবাদিকের পক্ষে জীবীকার প্রয়োজনে অন্যকিছু করা সম্ভব নয়। এ সময়ে
অনেক সাংবাদিকের একমাত্র পেশা সাংবাদিকতা হলেও উল্লেখ করা যায় এমন দুএকটি পত্রিকা-মিডিয়া ছাড়া অধিকাংশ পত্রিকা-মিডিয়া থেকে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়না তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিদের। ফলে আর্থিক কষ্ট অনেক স্থানীয় সাংবাদিকের মানসিক দৃড়তাকে নষ্ট করে। এ বিষয়টিও পরোক্ষে সাংবাদিকের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠে। তা ছাড়া প্রয়োজনীয় বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধাা পেলে ঝুঁকি আর শত বাধা-বিপত্তির মাঝেও একজন স্থানীয় সাংবাদিকের পেশাদারিত্ব যেমন বাড়বে তেমনী বাড়তে পারে ওই পত্রিকা-মিডিয়ার ক্রেডিবিলিটিও। আশা করা যায় এবিষয়ের সাথে একমত হবেন অধিকাংশ স্থানীয় সাংবাদিকই।#

লেখক: স্টাফ করসপন্ডেন্ট, এনটিভি
সভাপতি, জামালপুর জেলা প্রেসকাব।