স্মরণে তুমি মননে তুমি

বৃহস্পতিবার, ২১/০৮/২০১৪ @ ৯:১২ পূর্বাহ্ণ

:: গোলাম ফারুক দুলালঃ ::

Shamsur Rahmanছেলেবেলায় স্কুলে যাওয়ার পথে নঈম মিঞার দোকানের সামনে দাঁড়াতেন তিনি। তুলি দিয়ে কাচের ওপর ছবি আঁকতেন নঈম মিঞা। সেগুলো বিক্রি করতেন। নঈম মিঞার কাছে ছবি আঁকার পাঠ শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু একদিন নঈম মিঞা ছোট বালকটিকে ধমক দিয়ে বিদায় করে দিলেন।

কারণ তাঁর জীবনের প্রথম শিল্পের ওস্তাদ নঈম মিঞা চাননি শিল্পের নেশায় এই শিশুর জীবনও তার মতো খুকখুক কাশির ও ধুকধুকে কষ্টের হয়ে উঠুক। নঈম মিঞার মতো পরবর্তী জীবনে তাঁর বাবাও চাননি তাঁর ছেলে কবি হোক। কবিতা লিখলে জীবনে বিত্তবৈভবে সফল হওয়া যায় না, তাই অভিভাবকরা কেউ কবি হতে তাঁকে উৎসাহিত করেননি।

কিন্তু নঈম মিঞা এবং অভিভাবকদের কাছ থেকে উৎসাহ না পাওয়ায় তাঁর সৃষ্টিশীল মন থেমে থাকে নি। সকল বাধাকে অতিক্রম করে তিনি হয়েছেন বাংলাদেশের অন্যতম কবি। আর বাংলাদেশের অন্যতম এই কবি হচ্ছেন শামসুর রাহমান। শুধু অন্যতমই নন, বরং তিনি এদেশের অনন্য, প্রধান কবি।

ঢাকা শহরের মাহুতটুলির এক সরু গলির ভিতর নানার কোঠাবাড়িতে শামসুর রাহমানের জন্ম। তাঁর ডাক নাম বাচ্চু। সাহিত্যচর্চার বালাই নেই এমন এক পরিবারে বেড়ে উঠেছেন তিনি। পরিবারের কারো সঙ্গীত, চিত্রকলা ও সাহিত্য সম্পর্কে তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। তবে পুরনো ঢাকার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ কাওয়ালি ও মেরাসিনের গানের সাথে পরিচয় হয়েছিল অতি শৈশবেই। পরিবারের সব লোকজন উপলক্ষ পেলেই কাওয়ালির আয়োজন করত।

তাঁর ছেলেবেলায় পুরনো ঢাকার মাহুতটুলিতে দালানকোঠা ও যন্ত্রচালিত গাড়ি ছিল না বললেই চলে। মাটির ঘর, ঘোড়ার গাড়ি, সহিস, বিভিন্ন দোকান, আরমানিটোলা স্কুলের পেছনের শিউলিতলা, জন্মাষ্টমীর উৎসব, মহরমের মিছিল ও তাজিয়া, দেবদেবীর ছবি, কাননবালার ছবি শৈশবে দেখা পুরানো ঢাকার এসব স্মৃতি কবির মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। ঢাকায় তখনও বিদ্যুৎ ছিল না। মহল্লার মোড়ে ও গলিতে সন্ধ্যায় বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে যেত বাতিঅলা। শৈশবে দেখা এই বাতিঅলাকে নিয়েই পরিণত বয়সে কবি লিখেছেন ‘শৈশবের বাতিঅলা আমাকে’ নামের কবিতাটি।

শামসুর রাহমানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ পোগজ স্কুলে। ১৯৩৬ সালে এ স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি। এ স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় ছোট বোন নেহারের মৃত্যুতে একটি কবিতা লেখেন তিনি। তাঁর লেখা জীবনের প্রথম এই কবিতা শুনে তাঁর মা কেঁদেছিলেন খুব।

১৯৪৭ সালে আইএ পাশ করার পর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। স্নাতক সম্মান পড়া শেষ বছর পর্যন্ত চালিয়ে গেলেও পরীক্ষায় অবতীর্ণ হননি। ১৯৫৩ সালে পাস কোর্সে স্নাতক পাশ করেন। মাস্টার্স ভর্তি হয়ে প্রথম পর্ব কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন, কিন্তু শেষ পর্বের পরীক্ষায় আর বসা হয়নি তাঁর। ১৯৫৫ সালের ৮ জুলাই লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখেই আত্মীয়া জোহরা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন অধুনালুপ্ত মর্নিং নিউজ-এর সহ-সম্পাদক হিসেবে। ১৯৫৮ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন রেডিও পাকিস্তান-এর ঢাকা কেন্দ্রে। ১৯৬৪ সালে পত্রিকা জগতে নতুন আসা সরকার নিয়ন্ত্রিত বাংলা পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান-এ (অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক বাংলা’) যোগ দেন সহকারী সম্পাদক হিসেবে। দীর্ঘ ১৩ বছর কাজ করার পর ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি দৈনিক বাংলা এবং এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। এসময় একটি ‘মোনাজাত’ নামের কবিতা লেখার জন্য সরকারের রোষানলে পড়েন।

১৯৮৭ সালে স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে দৈনিক বাংলার প্রধান সম্পাদকের পদে ইস্তফা দেন কবি। এ সিদ্ধান্ত ছিল শামসুর রাহমানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কেননা ঢাকায় থাকার মতো তখনো কোনো নিবাস ছিল না কবির, অর্থ উপার্জনের ছিল না কোনো বিকল্প রাস্তা। তাছাড়া তখন কবির ফুসফুসেও দেখা দিয়েছে সমস্যা। সব মিলিয়ে প্রচণ্ড দুঃসময় কবির ব্যক্তিগত জীবনে।

১৯৮৭ থেকে পরবর্তী চার বছরের প্রথম বছরে ‘শৃঙ্খল মুক্তির কবিতা’, দ্বিতীয় বছরে ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা’, তৃতীয় বছরে ‘সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কবিতা’ এবং চতুর্থ বছরে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কবিতা’ লেখেন তিনি। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের অবসান ও গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা প্রত্যক্ষ করে ১৯৯১ সালে লেখেন ‘গণতন্ত্রের পক্ষে কবিতা’।
সাংবাদিকতার বাইরে তিনি প্রথম সম্পাদনা করেন লিটল ম্যাগাজিন ‘কবিকণ্ঠ’। তিনি ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমীর সভাপতি নিযুক্ত হন।

শামসুর রাহমান সাংবাদিকতার খাতিরে বিভিন্ন সময়ে বেশকিছু ছদ্মনাম গ্রহণ করেছেন। পত্রিকায় সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় লিখতে গিয়ে এসব ছন্দনাম নিয়েছেন তিনি। নামগুলো হচ্ছে: সিন্দবাদ, চক্ষুষ্মান, লিপিকার, নেপথ্যে, জনান্তিকে, মৈনাক।

সক্রিয় রাজনীতি থেকে বরাবরই দূরে থাকতে চেয়েছেন শামসুর রাহমান। কিন্তু বারবারই তাঁকে আমূল নাড়িয়ে গেছে বাঙালির শোষণ-পীড়ন ও বঞ্চনার বিভিন্ন বিষয়। রাজনীতির দানব বাঙালির উপর যতবার হামলে পড়েছে ততবার তিনি অস্থির হয়ে উঠেছেন। জনগণের পক্ষে সাড়া দিয়েছেন। তাঁর এ সাড়া এসেছে অধিকাংশ সময়ই কবিতার মাধ্যমে এবং কখনো কখনো আবার সরাসরি।

ন্যায়, যুক্তি ও প্রগতির পক্ষের সাহসী যোদ্ধা শামসুর রাহমান তৎকালীন স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে বিদ্রুপ করে ১৯৫৮ সালে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকায় লেখেন ‘হাতির শুঁড়’ নামক কবিতা। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যখন কারাগারে তখন তাঁকে উদ্দেশ্য করে লেখেন অসাধারণ কবিতা ‘টেলেমেকাস’ (১৯৬৬ বা ১৯৬৭ সালে)। গ্রীক পুরানের বীর ইউলিসিসের পুত্র টেলেমেকাস। পিতা দীর্ঘদিন রাজ্য ইথাকায় অনুপস্থিত। পিতার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় পুত্র টেলেমেকাসের আর্তি জড়িত সে কবিতাটি আছে নিরালোকে দিব্যরথ গ্রন্থে।

১৯৬৭ সালের ২২ জুন পাকিস্তানের তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেন। শামসুর রাহমান তখন সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান-এ কর্মরত ছিলেন। পেশাগত অনিশ্চয়তার তোয়াক্কা না করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের পক্ষে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন দৈনিক পাকিস্তান-এর হাসান হাফিজুর রহমান, আহমেদ হুমায়ুন, ফজল শাহাবুদ্দীন ও শামসুর রাহমান। ১৯৬৮ সালের দিকে পাকিস্তানের সব ভাষার জন্য অভিন্ন রোমান হরফ চালু করার প্রস্তাব করেন আইয়ুব খান। আগস্টে ৪১ জন কবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী এর বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন। কবিও তাঁদের একজন ছিলেন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি লেখেন মর্মস্পর্শী কবিতা ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি গুলিস্তানে একটি মিছিলের সামনে একটি লাঠিতে শহীদ আসাদের রক্তাক্ত শার্ট দিয়ে বানানো পতাকা দেখে মানসিকভাবে মারাত্মক আলোড়িত হন শামসুর রাহমান। সন্ধ্যায় একটানে লিখে ফেলেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি।

১৯৭০ সালের ২৮ নভেম্বর ঘূর্ণিদুর্গত দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় ও মৃত্যুতে কাতর কবি লেখেন ‘আসুন আমরা আজ ও একজন জেলে’ নামক কবিতা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবার নিয়ে চলে যান নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে। এপ্রিলের প্রথম দিকে তিনি লেখেন যুদ্ধের ধ্বংসলীলায় আক্রান্ত ও বেদনামথিত কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’।

শামসুর রাহমানের গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। বিভিন্ন ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে। ১৯৭৫ সালে কলকাতা থেকে কবীর চৌধুরীর অনুবাদে প্রকাশিত হয় শামসুর রাহমান: সিলেকটেড পোয়েমস। কবিতার বাইরেও বিভিন্ন সময়ে তাঁর রচিত শিশুসাহিত্য, অনুবাদ, গল্প, উপন্যাস, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক গদ্য নিয়ে বহু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বেশকিছু জনপ্রিয় গানের গীতিকারও তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০), রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩), বিধ্বস্ত নীলিমা (১৯৬৭), নিরালোকে দিব্যরথ (১৯৬৮), নিজ বাসভূমে (১৯৭০), বন্দি শিবির থেকে (১৯৭২), ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা (১৯৭৪), আমি অনাহারী (১৯৭৬), শূন্যতায় তুমি শোকসভা (১৯৭৭), বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে (১৯৭৭), প্রেমের কবিতা (১৯৮১), ইকারুসের আকাশ (১৯৮২), অদ্ভুদ উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ (১৯৮২), বুক তার বাংলাদেশের হৃদয় (১৯৮৮), হরিণের হাড় (১৯৯৩), তুমিই নিঃশ্বাস, তুমিই হৃদস্পন্দন (১৯৯৬), হেমন্ত সন্ধ্যায় কিছুকাল (১৯৯৭)। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা, শামসুর রাহমানের নির্বাচিত কবিতা ও শামসুর রাহমানের রাজনৈতিক কবিতা।

শামসুর রাহমান অসংখ্য পুরস্কার, পদক ও সম্মাননা লাভ করেছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানই তাঁকে সম্মানিত করতে পেরে নিজেরা সম্মানিত বোধ করেছে। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে: ‘আদমজী পুরস্কার’ (১৯৬৩), ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’ (১৯৬৯), ‘একুশে পদক’ (১৯৭৭), ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ (১৯৯১), সাংবাদিকতায় ‘জাপানের মিত্সুবিশি পদক’ (১৯৯২), ভারতের ‘আনন্দ পুরস্কার’ (১৯৯৪)। এছাড়া ভারতের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধি প্রদান করেছে। কবি ও সাংবাদিক হিসেবে সম্মানিত হয়ে তিনি ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া), বার্মা (মায়ানমার), পশ্চিম জার্মানি (সাবেক), যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ভারত সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন।

শামসুর রাহমান ২০০৬ সালের (১৭ আগষ্ট) ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন.।

তথ্যসূত্র: সংগৃহীত।

সর্বশেষ