দায়িত্ব পালনে ঝুঁকিতে সাংবাদিকরা

রবিবার, মার্চ ১০, ২০১৩

হাসিবুল হাসান:
journalist nirjatonপেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নাজেহাল হচ্ছেন সাংবাদিকরা। সংবাদকর্মীদের ওপর নির্যাতন এখন পুলিশ ও রাজনৈতিক কর্মীদের নিত্যকর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশসহ আন্দোলনকারী ও আন্দোলন বিরোধীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। সাংবাদিকদের প্রতি পুলিশের আগ্রাসী আচরণ দিনে দিনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে সংবাদকর্মীদের পেশাগত দায়িত্ব পালন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি, তাদের হাতে লাঞ্ছিত বা রাজনৈতিক দলের কর্মীদের হামলা; কোথাও নিরাপদে নেই সংবাদকর্মীরা। রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি কাভার করতে গিয়ে পুলিশের গুলি ও হামলার শিকার হচ্ছেন তারা। একই সঙ্গে আন্দোলকারী ও আন্দোলন বিরোধীদেরও হামলার শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকরা।

দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের কাছে পরিচয়পত্র, ক্যামেরা, চ্যানেলের মাইক্রোফোন থাকার পরও পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি ছুড়ছে। পুলিশের এই ভূমিকায় সাংবাদিকরা অনেকেই দায়িত্ব পালন করছেন বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট আর হেলমেট পরে।

গত ১৫ দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সহিংসতায় অর্ধশতাধিক সংবাদকর্মী আহত হয়েছেন। এর মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ১৮ জন। পুলিশের হামলা, লাঠিপেটা, জামায়াত-শিবির ও ছাত্রলীগের হামলায় সারা দেশে আহত হয়েছে কমপক্ষে ৪৬ জন সাংবাদিক। গুলিবিদ্ধ পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর, তারা বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন আছেন।

এছাড়া পুলিশের হাতে সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ। দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের কারণ ছাড়াই পেটানো কিংবা তাদের অকারণে ধরে আটকে রাখা যেন পুলিশের নিত্যকর্ম হয়ে দাঁড়িযেছে।

গত শুক্রবার শাহবাগ চত্বরে নারী জাগরণ সমাবেশের সংবাদ কাভার করার সময় নতুন বার্তা ডটকমের দুই সাংবাদিক কাজী মুস্তাফিজ ও ইমদাদুল হককে বিনা কারণে ধরে নিয়ে যায় গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের কেন ধরে নেয়া হয়েছে তাও তাদের জানানো হয়নি। এমনকি নিয়মানুযায়ী আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের কোর্টে হাজির করার ‍কথা থাকলেও তাদের ক্ষেত্রে এ আইনটিও মানেনি পুলিশ।২৪ ঘণ্টা পরে ইমদাদুল হককে ছেড়ে দেয়া হলেও কাজী মুস্তাফিজকে ‘ভুয়া’ মামলায় আটক দেখিয়ে কোর্টে হাজির করে।

সম্প্রতি সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের গুলি ছোড়ার প্রবণতা আরো বেড়েছে। দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের কাছে পরিচয়পত্র ঝুলানো থাকা, ফটোসাংবাদিকদের হাতে ক্যামেরা এবং স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর ক্যামেরাম্যানদের হাতে ক্যামেরা থাকার পরও পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি ছুড়ছে।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে ইসলামী ও সমমনা ১২ দলের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের হাতে সমানভাবে নির্যাতিত হন গণমাধ্যমকর্মীরা। ওইদিন আহত মোট ১১ সাংবাদিকের মধ্যে আন্দোলনকারীদের হাতে আহত হন পাঁচজন। অন্যদিকে পুলিশের ছোড়া গুলিতে আহত হন ছয় জন।

গুরুতর আহতদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এটিএন বাংলার ক্যামেরাম্যান লিটন, জনকণ্ঠের শেখ মামুন, গাজী টিভি’র মাসুদুর রহমান, একাত্তর টিভি’র আরিফুজ্জামান, মাছরাঙা টিভি’র আবদুল্লাহ তুহিন ও আমার দেশ পত্রিকার মীর আহমেদ মীরুকে।

একই ‍দিন দুপুর বেলা পুলিশের একটি টহল গাড়ি থেকে বিনা কারণে সেগুনবাগিচার ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয় লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন সাংবাদিক আমিনুল হক ভূঁইয়া। ওই গুলিবর্ষণের ঘটনায় সাংবাদিকরা প্রতিবাদ সমাবেশ করে দায়ী পুলিশ কর্মকতার অপসারণ দাবি করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ।

নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন পাঁচ সাংবাদিক। তাদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে নিউ এজ পত্রিকার ফটোসাংবাদিক আলী হোসেন মিন্টু, নয়া দিগন্ত পত্রিকার ফটোসাংবাদিক পিকুল ও দৈনিক ইত্তেফাকের ফটোসাংবাদিক সাইফুল ইসলামকে। বরিশালে পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন দিগন্ত টিভি’র সাংবাদিক নুরুজ্জামান ও দেশ টিভি’র এক সংবাদকর্মী।

এছাড়া রাজধানীর বাইরেও প্রতিদিন ঘটছে একই ঘটনা রাজশাহীতে হাতে ও পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আছেন বাংলাভিশনের সাংবাদিক আবু সাঈদ। মাথায় রাবার বুলেট লেগে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন চ্যানেল-২৪ এর সাংবাদিক রাসেল মাহমুদ এবং স্থানীয় একটি দৈনিকের সাংবাদিক আবদুস সামাদ খান। আন্দোলনকারী ও পুলিশের পিটুনিতে রংপুরে আহত হয়েছেন আট সাংবাদিক। তাদের মধ্যে আছেন- চ্যানেল আই’র শাহনেওয়াজ জনি, দৈনিক করতোয়ার ফটোসাংবাদিক আলী হায়দার রনি, সময় টিভি’র আরিফিন আহমেদ ও মোহনা টিভি’র শফিক আহমেদ।

সিরাজগঞ্জে হামলার শিকার হয়েছেন সমকালের জেলা প্রতিনিধি আমিরুল ইসলাম, যুগান্তরের সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা, স্থানীয় একটি দৈনিকের সাংবাদিক রিয়াজুল ইসলাম ও সাংবাদিক সাবিরুল ইসলাম। কুমিল্লায় আহত হয়েছেন সময় টিভি’র সাংবাদিক বাহার। পাবনায় আহত হয়েছেন দৈনিক সংগ্রামের সাংবাদিক আলাউদ্দিন, হামলা করে মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয় দৈনিক মানবজমিনের সাংবাদিক রাজিউর রহমান রুমির। বগুড়াতে পুলিশের টিয়ারশেল ও হামলায় আহত হয়েছেন স্থানীয় দৈনিকের সাংবাদিক সাজ্জাদ হোসেন, এসএম সিরাজ ও দৈনিক করতোয়ার সফিকুল ইসলাম সফিক। চাঁপাই নবাবগঞ্জে আহত হয়েছেন ইনডিপেনডেন্ট টিভি’র সাংবাদিক ফয়সাল মাহমুদ। চট্টগ্রামে আহত হয়েছেন দৈনিক ইনকিলাবের সাংবাদিক কুতুবউদ্দিন ও রাজেস চক্রবর্তী।
সেৌজন্যে : নতুন বার্তা