উদাসীন এক খোকা ভাই

শনিবার, মার্চ ৯, ২০১৩

গোলাম সারওয়ার:

শ্বেতশুভ্র কাফনের কাপড়ে যত্নে জড়ানো ছোটখাটো মানুষটির নিথর দেহটি কফিনে যেন ঘুমিয়ে আছে। চারপাশে অশ্রুভেজা অনেক ম্লান মুখ। তার শোকবিধুর বন্ধু-স্বজনের জটলা। এখান থেকেই শেষ যাত্রা হলো এমন একজন প্রায় নিভৃতচারী মানুষের যিনি মেধা, মনন, পেশাগত সৌকর্য ও আন্তরিকতায় আকাশছোঁয়ার স্পর্ধা রেখেছেন। তিনি আহমদ জামান চৌধুরী, আজাচৌ, আমাদের প্রিয় খোকা ভাই। একদা কোটি পাঠকের মন কেড়ে নেওয়া সাপ্তাহিক চিত্রালীর সম্পাদক। যার কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও গীত রচনার ইন্দ্রজালে অগণিত ছবি দর্শকচিত্ত জয় করেছিল সুদীর্ঘকাল। তার জানাজায় অংশ নিতে ছুটে গিয়েছিলাম জাতীয় প্রেস ক্লাবে। জানাজা শেষ। ছুটে গেলাম খোকা ভাইয়ের প্রিয় এফডিসিতে। সেখানে কফিনে ঘুমিয়ে আছেন খোকা ভাই। বাচসাসের ব্যানারে শোকগাথা। আলমগীর পিকচার্সের কর্ণধার একেএম জাহাঙ্গীর খান, আমার প্রিয় শিল্পী এটিএম শামসুজ্জামান, গাজী ভাই_ গাজী মাজহারুল আনোয়ার, পরিচালক খোকন, বাচ্চু ভাই, দিলু ভাই, খোকা ভাইয়ের গুণমুগ্ধ অনেক কুশীলব, তার স্নেহভাজন সতীর্থ_ সকলেই প্রায় বাকরুদ্ধ। জাহাঙ্গীর ভাই অশ্রুভেজা কণ্ঠে বললেন, আলমগীর পিকচার্সের সব ভালো ছবির পেছনে ছিল খোকা ভাইয়ের অশেষ প্রেরণা। সেগুনবাগিচায় আলমগীর পিকচার্সের অফিসে খোকা ভাই, আলমগীর কবির, আমজাদ হোসেন, ফজলে লোহানীর দিনরাতের আড্ডার দিনগুলো এখন স্বপ্নের মতোই মনে হয়।
kokaআমার অখণ্ড বিশ্বাস, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বিশাল বিকাশে আহমদ জামান চৌধুরী, চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার আজাচৌর অশেষ, অসীম অবদান কিংবদন্তিকেও হার মানায়।
সত্তরের দশকে ইত্তেফাক গ্রুপের বিনোদন সাপ্তাহিক পূর্বাণীর নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই খোকা ভাইয়ের সঙ্গে আমার হৃদ্যতা। ১৯৯৯ সালে যুগান্তর বেরোনোর সময় অনিয়মিত প্রকাশনার চিত্রালী তার কৌলীন্য অনেকাংশেই হারিয়ে ফেলেছে। তার সঙ্গে যখনই দেখা হতো তখনই হাসিখুশি মানুষটির মুখে স্পষ্ট দেখতাম বিষণ্নতার ছায়া, দুশ্চিন্তার ছাপ। বছর দুয়েক পর সহকারী সম্পাদক হিসেবে তাকে যুগান্তরে নিয়ে এলাম। দীর্ঘদিন থাকলেন না। হঠাৎ করে যেন হারিয়ে গেলেন। এই হচ্ছে আহমদ জামান চৌধুরী। যিনি হঠাৎ অবলীলায় যে কোনো বন্দরে নোঙর ফেলেন, সবার অজান্তে নোঙর তুলে আবার নিরুদ্দেশ যাত্রা। সারাজীবনই তিনি যেন চেনা-অচেনা পথের ধাঁধায় ঘুরলেন। পথই তার জন্য বারবার বন্ধনহীন গ্রন্থি রচনা করেছে।
স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করলেও তিনি তার স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পেলেন সাংবাদিকতায়, চলচ্চিত্রে। ‘আজাচৌ’র ‘বিষয় বিবেচনা’ কলামটি ছিল চিত্রালীর বহুল পঠিত। বিচিত্র সব বিষয় তার আশ্চর্য ভাষার বাহনে, চমৎকার বিশ্লেষণে পাঠককে অভিভূত করত। চলচ্চিত্র সাংবাদিকতায় তিনি উঁচুমানের একটি নান্দনিক আবহ সৃষ্টি করেছেন। কখনও চলচ্চিত্রে সাধারণ দর্শকের বিনোদনের কথা ভেবে আপসও করেছেন। খোকা ভাইয়ের এই আপসকামী মনোভাব যে পছন্দ হতো না, তা বললে তিনি নিশ্চুপ থাকতেন। বুঝতে কষ্ট হতো না, প্রযোজক-পরিচালকের মুখ চেয়ে তাকে আপসের পথ পরিহার করা সম্ভব ছিল না। তাকে ঘিরে নানা চমকপ্রদ ঘটনা আমার স্মৃতিকে সমৃদ্ধ করেছিল। ঢাকা ক্লাবে নায়ক রাজ্জাকের সঙ্গে তার একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে তা দুঃখজনক পরিস্থিতিতে পেঁৗছলে বাচসাস রাজ্জাকের কোনো খবর, ছবি এমনকি তার অভিনীত কোনো ছবি না ছাপার সিদ্ধান্ত নেয়। আমি তখন বাচসাসের সাধারণ সম্পাদক। সভাপতি চিত্রালী সম্পাদক এসএম পারভেজ। চিত্রালী অফিসে বাচসাসের জরুরি বৈঠকে হঠাৎ রাজ্জাক মেকআপ নেওয়া অবস্থায় এফডিসি থেকে ছুটে এলেন। খোকা ভাইয়ের কাছে দুঃখ প্রকাশ করলেন। গভীর আন্তরিকতায় খোকা ভাই রাজ্জাককে জড়িয়ে ধরলেন। এ যেন দুই পরম বন্ধুর মহামিলন। ষাট-সত্তরের দশকে চলচ্চিত্র শিল্প ছিল যেন একটি একান্নবর্তী পরিবার। প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী, কলাকুশলী, সাংবাদিক ছিলেন সেই পরিবারের সদস্য। খোকা ভাই ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে প্রিয়জন। নাম বললাম না, নামিদামি অনেক শিল্পীর পারিবারিক সমস্যা মেটাতে খোকা ভাই গভীর রাতে গুলশান-বনানীতে ছুটে গিয়েছেন।
মনে পড়ে তার গল্প, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও গীত রচনায় সমৃদ্ধ ছবি ‘যাদুর বাঁশির’ কক্সবাজারের লোকেশনের কয়েকটি দিনের অন্তরঙ্গ স্মৃতি। একই মোটেলে গভীর সানি্নধ্যে ছিলাম আমরা। চলচ্চিত্র সাংবাদিকতা, সাহিত্য নানা বিষয়ে তার অশেষ আগ্রহ ও পারঙ্গমতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। আমার এই মুগ্ধতার সঙ্গে মিশে ছিল কিছুটা দুঃখবোধও। এমন একজন প্রতিভাবান মানুষ কোনো কিছুতেই গভীরভাবে মনোনিবেশ করলেন না। নিজেকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করলেন না, বিকশিত হলেন না। জীবন সম্পর্কে তার এই নিস্পৃহতার রহস্য কেউ আমরা জানতে পারলাম না। তার হৃদয়ের গভীরে কি কোনো অভিমান লুকিয়ে ছিল?
এমন এক প্রতিভাবান মানুষ অনেকটা যাযাবরের মতোই দিন কাটিয়ে গেলেন। যার চিত্রনাট্যে প্রেম-ভালোবাসাই মুখ্য, মিলনেই যার পরিণতি তারই জীবনে কেউ প্রেম-পরিণয়ের দীপশিখাটি জ্বালাল না। পথ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলেন। হাসপাতালে না গিয়ে গভীর যন্ত্রণায় কাতর হলেন। যখন হাসপাতালে নেওয়া হলো তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। উদাসীন খোকা ভাই আকাশের লক্ষ তারার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন। তিনি জানতেন, জীবনেরে কে রাখিতে পারে…
গোলাম সারওয়ার :সম্পাদক, সমকাল