জাফর ভাই : খণ্ড কিছু স্মৃতিকথা

শনিবার, মার্চ ৯, ২০১৩

সাখাওয়াত হোসেন মজনু

আমাদের জাফর ভাই। কাজী জাফরুল ইসলাম। পরিচয়টা কখন সেটা অস্পষ্ট অনেকটা। তবে সখ্য সম্পর্ক ১৯৮৭ থেকে। প্রাণের সাথে প্রাণ মিলিয়ে চলা শুরু হয়েছে ১৯৯০ থেকে। মোমিন রোডে ডা. কামাল এ খানের চেম্বার। অন্যদিকে নুর আহমদ সড়কের মেট্রোপোলে চট্টগ্রাম কলেজ প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী পরিষদের কার্যালয়। এই দু’টি স্থানে আমাদের চুটিয়ে আড্ডা জমতো।

ডা. কামাল এ খান এবং সাংবাদিক জাফরুল ইসলাম বাম রাজনৈতিক আদর্শের মানুষ। মেট্রোপোল এবং মোমিন রোডের আড্ডায় স্পষ্ট হতো তাঁরা কি বলতে চাইতেন। বয়সের ব্যবধান ছিলো আমাদের মাঝে। তারপরও তাঁরা আমাকে আড্ডায় রাখতেন। কারণ ছিলো আমরা তিনজনই চট্টগ্রাম কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। আর আমি সে সময় চট্টগ্রাম কলেজ প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। সভাপতি ছিলেন প্রফেসর মোহাম্মদ খালেদ। এই প্রতিষ্ঠানটিকে দাঁড় করানোর জন্য আমরা তখন কঠোর শ্রম দিয়ে যাচ্ছিলাম। ঠিক সে সময় এরশাদ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছে। আমি তখন রাজনীতির সাথে তেমন যোগাযোগ রাখছিলাম না। যেহেতু আমার অবস্থান বিকাশ এবং রাজনৈতিক পথ চলা বৃহত্তর আগ্রাবাদ এলাকায় সেজন্য এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে পুরানো সতীর্থরা আহ্বান জানালেন। আর না করিনি। অল্প ক’দিন পরই সংবাদ এলো পুলিশ খুঁজছে। আগ্রাবাদ বাদামতলী এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের একটি অফিস ছিলো। আন্দোলনকারী ছাত্ররা সেখানে পুলিশের সব ক’টি মটর সাইকেল পুড়িয়ে দিয়েছে। পুলিশের খাতায় নাম উঠলো এইভাবে সাখাওয়াত হোসেন মজনু আগ্রাবাদ আন্দোলনের অন্যতম নায়ক। সংবাদ পাওয়ার পর মনে মনে হাসলাম। পুলিশ একটু বেশি বেশি বলে ফেলেছে। তখন আত্মগোপন অবস্থায়। আগ্রাবাদের আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চু (এখন আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য) আমাকে নিয়ে আশ্রয় নিলেন কলেজিয়েট স্কুলের পশ্চিম পাশের বিশাল এক বাড়িতে। ভদ্রলোক কাস্টমসে চাকরি করতেন। সম্ভবত: বর সাহেব (নামটি ভুলও হতে পারে) সে বাসায় রাজার মতোই আমরা দু’জন দু’রাত দু’দিন ছিলাম। আলতাফ হোসেন বাচ্চু এবং আমি তখন পুলিশের জন্য কাঙিক্ষত ছিলাম।

jaforআন্দোলন তখন তীব্র থেকে তীব্র। পুলিশের অবস্থা তেমন সুখের ছিল না। আমাদের পেছনে ঘুরে নষ্ট করার মতো সময় তখন তাদের ছিলো না। ফলে আন্দোলনের পক্ষে কিছু কাজ করতে পেরেছিলাম। ডা. কামাল এ খান এবং জাফর ভাই পুরো ঘটনা জানলেন। আমাকে পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তাঁরা দু’জন ভূমিকা রাখলেন। আমার স্থান হলো ডা. কামাল খানের চেম্বার। এখানে পুলিশ ঢুকতো না। এরশাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত জাফর ভাই প্রায় প্রতিদিনই আমার সাথে দেখা করতেন। তখন তিনি খেলাঘর করতেন। খেলাঘরের শক্ত একটি অবস্থান ছিলো আগ্রাবাদ ঢেবার পাড়ে। সে সময় তিনি সেখানে প্রায়ই যেতেন এবং আমাদের গোপন শেল্টারে গিয়ে দেখা করতেন। যদিও আমি খেলাঘরের সাথে জড়িত ছিলাম না। ঢেবার উত্তর পাড়ে ছিলেন কাজী গোলাম সারওয়ার মজনু, ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফাসহ আরো ক’জন আন্দোলনে জড়িত নেতাকর্মী। সেখানে আমাদের গোপন যোগাযোগ কেন্দ্র ছিলো। ফলে তথ্যের আদান প্রদান এবং যোগাযোগ ছিলো সহজ। এই জাফর ভাই নিজে এসে অথবা তাঁর খেলাঘরের কর্মীদের মাধ্যমে নিয়মিত খবর নিতেন। আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় পাইন ভিউ, পাম ভিউ বিল্ডিং দু’টির পর পশ্চিম পাশে রব মিয়ার পানের দোকান ছিলো (এবং এখনো আছে) সেখানে তিনি আসতেন, বসতেন, খবর নিতেন। পেশায় জাফর ভাই ছিলেন সাংবাদিক। সে সুবাদে আগ্রাবাদ এলেই আমাদের সংবাদের জন্য এই স্থানগুলোতে একবার ঘুরে যেতেন।

: মনে নেই কখন গিয়েছিলাম। জাফর ভাই আমাকে ধরলেন কুমিরা যাবেন। কোন বাসে বা টেক্সিতে নয়। মটর সাইকেলে যাবেন। আমি তখন ভেসপা মটর সাইকেল চালাই। যাত্রা শুরু হলো নুর আহমদ সড়কস্থ মেট্রোপোল থেকে। পেছনে বসেছেন জাফর ভাই। হালকা পাতলা মানুষ। মজার মজার কথা বলেন। পক্ষে দু’জায়গায় নামলেন। দু’জায়গায় নেমে দু’টি প্যাকেট নিলেন। প্যাকেটে কি ছিলো জানি না। কুমিরা, সীতাকুণ্ড ঘুরে অবশেষে গ্রামের মেঠোপথ ঘুরে বলেন একটি বাড়ির সামনে। প্যাকেটগুলো নিয়ে তিনি একটি বাড়িতে ঢুকলেন। আমি বাইরে মটর সাইকেলে বসে অপেক্ষায় রয়েছি। প্রায় ৮-১০ মিনিট পর তিনি বাইরে এলেন। তাঁকে দেখে মটর সাইকেলে স্টার্ট দিতে যাবো এমন সময় ছোট্ট একটি ছেলে এসে বললো, কাকু আপনাকে ডাকছে। তিনি ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে ছেলেটি বললো, আপনাদের দু’জনকেই। জাফর ভাই বিস্মিত কক্তে বললেন, ওনাকেও! বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। আমি তখনো বসেই ছিলাম। জাফর ভাই দু’চার কদম এগিয়ে থেমে গেলেন। কি চিন্তা করে আমার দিকে ফিরে তাকালেন। ছেলেটি আমাকে ডেকে বললো, কাকু আপনিও আসেন। জাফর ভাই কেন এবং কি ভাবছেন? তিনি কেন আমাকে বাড়ির ভেতরে যাওয়ার কথা বলছেন না। এসব চিন্তা করছিলাম। হঠাৎ একটি ভারী কক্তের ডাক শুনলাম। জাফর ছোট ভাইটিকে নিয়ে এলো। জাফর ভাই মাথা ঘুরিয়ে ডাকলেন আসুন।

একটি ঘরে প্রবেশ করলাম। ঘরে ঢুকার আগে ৮-১০টি কাঁচা ঘরের আঁকা বাঁকা পথ ঘুরে যেতে হয়েছে। বসার অল্প ক’মিনিট পরে একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক আসলেন সামনে। শ্রদ্ধা করার মতো চেহারা। জাফর ভাই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। সালাম দিলাম। তিনি জাফর ভাইকে বসার অনুরোধ করলেন। বসলাম পুরানো একটি চেয়ারে। দেখলাম জাফর ভাইয়ের বহন করা দু’টি প্যাকেট চৌকির এক মাথায় রাখা আছে। এবার বুঝলাম এগুলো বই। সামান্য দু’চার কথায় স্পষ্ট হলো এগুলো বাম রাজনীতির নিষিদ্ধ বই। যে মানুষটির বাসায় গেলাম তিনি দেবেন সিকদার। পরিচয় পাওয়ার পর সোজা দাঁড়িয়ে গেলাম। বামরাজনীতির অগ্নি পুরুষ আমার সামনে। বিশ্বাসই হচ্ছিলো না। রাজনীতি করার সময় তাঁর নাম শুনেছি। কিংবদন্তি একজন কমিউনিস্ট নেতা ও সাধক। ত্যাগী মানুষ। দেখা হলো, দু’চারটি কথা। চলে এলাম বাইরে। জাফর ভাইকে বললাম, আগে চলেননি কেন? সবকথা কি বলা যায় বলেই তিনি বললেন, এখানে এসেছেন একথা কাউকে না বলাই ভালো হবে। বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে, এই মানুষটির জন্য সমাজ এখনো উদার হতে পারেনি। এই বয়সেও তিনি ঘরে বাইরে নিরাপদ ছিলেন না। সেদিন জাফর ভাই আমাকে নিয়ে সীতাকুণ্ডের ডা. এখলাসসহ আরো ক’জন মানুষের সাথে দেখা করলেন। ছোট ছোট খামের আদান প্রদান করলেন। পরে বুঝতে পারলাম তিনি দল না করলেও রাজনীতি এবং বিশেষ ধারার রাজনীতিকদের সাথে সখ্য সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।

: চট্টগ্রাম কলেজের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের প্রথম পুনর্মিলনীর সময় এবং পরে তিনি আমাকে নিয়ে মাঝে মধ্যে ঘুরতে যেতেন তালেব মিয়ার ক্যান্টিনে। ঘুরে ঘুরে দেখাতেন প্রথম শহীদ মিনারের স্থানটি। স্মৃতি কথা বলতেন কেমন করে তিনি তাঁর ক’জন সহযোগী রাজনৈতিক কর্মী নিয়ে রাতের অন্ধকারে শহীদ মিনার তৈরি করেছিলেন। পরে অবশ্য তিনি চট্টগ্রাম কলেজ প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের স্মরণিকা ‘আজিকে আকাশ তলে’ বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও তথ্য দিয়ে শহীদ মিনার স্থাপনের স্মৃতি কথাগুলো লিখেছিলেন। এ লেখার পর চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র সংসদের তাঁর সময়ে ভি পি মাহবুব উল আলম তারা কিছুটা দ্বিমত করেছিলেন। পরে অবশ্য গবেষক আহমদ মমতাজ চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ মিনার প্রসঙ্গে সমস্ত বিভ্রান্তি দূর করে দৈনিক আজাদী’তে লিখেছিলেন। আমার কথার কিছু তথ্যের সংশোধনও হয়েছে এতে করে। সৌভাগ্যের বিষয় ছিলো যে, জাফর ভাই এবং তারা ভাই দু’জনের জীবিত অবস্থায় শহীদ মিনার প্রসঙ্গের সকল বিভ্রান্তি দূর হয়েছে। এখন ইতিহাস বলে চট্টগ্রাম কলেজেই প্রথম শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো চট্টগ্রামে এবং চট্টগ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই। মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের তখনকার সময়ের ছাত্র জাফরুল ইসলাম চৌধুরী। এজন্য তাঁকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে।

: একদিন সকালে আমার বাসায় এলেন কবি ওহীদুল আলম। হাতে ছিলো একটি ব্যাগের মতো কিছু একটা। তিনি আমার বাসায় আসবেন এটা আমার জানা ছিল না। বসলেন এবং আমাকে ব্যাগটি হাতে তুলে দিয়ে বললেন, হীরার মতো দামি কাগজগুলো সংরক্ষণ করে রাখবে। খুলে দেখি আলহাজ্ব বাদশা মিয়া চৌধুরী’র জীবন তথ্যের কিছু পাণ্ডুলিপি। সেলাই করেছেন শাড়ির আঁচলের ছেঁড়া অংশ দিয়ে। বললাম, শাড়ির আঁচল দিয়ে সেলাই কেন? জবাবে বললেন, আমার প্রয়াত স্ত্রীর স্মৃতিও তোমাকে দিয়ে গেলাম। যত্ন করে রেখো। তিনি তাঁর স্ত্রীর শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে পাণ্ডুলিপিটি বেঁধে রেখেছেন। আমাদের কথা যখন চলছিলো কলিং বেল বেজে উঠলো। আমার ছোট ভাই শাহাদাৎ হোসেন তুষার (বর্তমানে সে ফ্লাইট ল্যাফটেনেন্ট) এসে বললো, দাদা একজন ভদ্রলোক এসেছেন। বাইরে গিয়ে দেখি জাফর ভাই। হাসতে হাসতে বললেন, ফোন না করেই এসেছি। বইগুলোতো অনেকদিন ফেরত দেয়া হয়নি। ভেতরে ঢুকেই বললেন, মজনু- আমারতো সৌভাগ্য কবির দর্শন পেলাম। তাঁরা দু’জন একে অপরকে শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করলেন। জাফর ভাই মাঝে মধ্যে আমার বাসায় আসতেন বসতেন এবং বই নিয়ে ঘাটাঘাটি করতেন। পছন্দ হলে নিয়ে যেতেন। আবার ফিরিয়ে দিতেন। স্বামী বিবেকানন্দের পুরো সেট আমার কাছে ছিলো বলেই জাফর ভাই দু’খণ্ড করে নিয়ে পড়ে পুরো সেট শেষ করেছেন। প্রসঙ্গ উঠতেই তাঁরা দু’জন স্বামী বিবেকানন্দের জীবন কর্ম নিয়ে আলোচনায় জড়িয়ে পড়লেন। এরিমধ্যে জোহরের আজান হলো। চমকে উঠলেন তাঁরা। আমার স্ত্রী আমাকে ইশারা দিলেন তাঁদের আটকে রাখতে। কৌশলে তাঁদের আটকে রেখেছি। স্যার কবি ওহীদুল আলম নামাজ পড়লেন। নামাজ শেষ হওয়ার আগেই ডাইনিং টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে। দু’জনই বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, মর্জিনা- কখন তুমি এতো কিছু করলে! খাবার শেষে কিছু সময় বিশ্রাম। বিকেলের চা পর্ব সেরে ওহীদুল আলম আমাদের নিয়ে গেলেন তাঁর শ্বশুর বাড়ি পাঠানটুলীর বিখ্যাত খান বাড়িতে। বিখ্যাত লোকমান খান শেরওয়ানীর বাড়িতে। এই লোকমান খান শেরওয়ানী ছিলেন নেতাজী সুভাষ বোসের অনুসারী। কবি. সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং রাজনীতিবিদ ছিলেন লোকমান খান শেরওয়ানী। তাঁর স্ত্রী ছিলেন বিপ্লবী প্রীতিলতার বান্ধবী শিশির কনাগুহ। পরবর্তীতে লোকমান শেরওয়ানীকে বিয়ে করে নাম বদলে রাখেন শবনম খানম শেরওয়ানী। তিনি পাঠানটুলী খান সাহেব স্কুলের শিক্ষিকা এবং দৈনিক আজাদী প্রতিষ্ঠার পর সেই পত্রিকায় মহিলাদের নিয়ে লিখতেন এবং খণ্ডকালীন চাকরি করতেন। এই খান বাড়িতে জন্মেছিলেন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব খান সাহেব আমানত খান। সেখান থেকে কবি ওহীদুল আলম আমাদের নিয়ে এলেন চট্টেশ্বরী গায়েবী মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে। সেখানে তিনি আমাদের নিয়ে কবর জিয়ারত করলেন। পরে এলেন কাপুড়িয়া পাড়ায় ওহি আহমদ ওলী ইসলামাবাদীর বাড়িতে। আমার বাসার নিকট দূরত্বে এমন একজন বিপ্লবী ও সাংবাদিকের বাড়ি আমি জানতাম না। তখন কবি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া …. । জাফর ভাই বললেন, আমার সৌভাগ্য আমি ওলী আহমদ ওলী ইসলামাবাদীর বাড়িতে আসতে পেরেছি। তাঁর ছেলে সানাউল্লাহ আমাদের আদর আপ্যায়ন করলেন। এই সানাউল্লাহ সাহেবের সাথে আমার নানা বিষয়ে কথা হয়েছে চেনা জানা ছিলো আগে থেকেই কিন্তু কখনো তিনি বলেননি যে তিনি ওলী আহমদ ওলী ইসলামাবাদীর ছেলে। পরবর্তী সময় দেখেছি জাফর ভাই ওলী আহমদ ওলী ইসলামাবাদীর বাসায় তাঁর ছেলে সানাউল্লাহ’র সাথে আড্ডা মারতে আসতেন। প্রায় প্রতি আড্ডায় আমি উপস্থিত থেকেছি। অসংখ্যবার জাফর ভাই আমাকে নিয়ে শরীফ রাজার হালিশহরের বাড়ি গিয়েছিলাম।

জাফর ভাই নানা গবেষণার কাজে শহর চট্টগ্রামের বিভিন্ন অলি গলিতে ঘুরতেন। বেপারীপাড়ার লেইঙ্গা মাস্টার, মৌলভী আবদুল হাই সাহেবের ছেলে মাওলানা আবু দাউদ, ছোটপুলের আবদুল মালেক মাস্টার, দেওয়ান সালামত ওস্তাদসহ এসব মানুষগুলোর বাড়িতে যেতেন। এসব মনীষীদের উপর আমার কাজ ছিলো বলেই তিনি কৌতূহলভরে সেসব স্থানে যেতেন। বিশেষ করে আগ্রাবাদ নওজোয়ান ক্লাবের ক্যাপ্টেন মফজ্জল এর বাড়িতে গিয়ে জেনেছেন কেমন করে খেলার মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ পাড়াগুলোর মধ্যে সম্প্রীতি সৃষ্টি করা গেছে। তাছাড়া ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বৃহত্তর আগ্রাবাদের বেপারীপাড়া, মুহুরী পাড়া, হাজী পাড়া, পানওয়ালা পাড়া, চাইয়া পাড়া, আনন্দিপুর, বড়পুল, ছোটপুল, আবিদর পাড়া, বলির পাড়া এলাকাগুলোতে মুক্তিযোদ্ধারা কেমন করে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠিত করেছেন সে তথ্যগুলো জানতে মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত অনেকের সাথে। বিশেষ করে জালাল উদ্দিন, আলাউদ্দিন, আবু সাঈদ সরদার প্রমুখদের সাথে। প্রতিটি স্থান এবং অবস্থানের সাথে মুক্তিযুদ্ধের উপর কাজ করার ফলে আমার যোগাযোগ ছিলো তাই তিনি আমাকে সাথে নিয়ে হেঁটেছেন অনেক সময়। প্রসঙ্গ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশি কথা হয়েছে ডা. মাহফুজ ভাই ও সাবের ভাইয়ের সাথে।

: একবার তিনি আমাকে বললেন, মজনু বলেন যাই আসমা খাতুনের বাড়িতে। গেলাম সেখানে। ধনিয়ালা পাড়ায় বিখ্যাত আসমা খাতুনের বাড়িতে। সেখানে বসলাম তাঁর ছেলে ড. শিহাবুল হুদার বাসায়। সেখানে গিয়ে জানলাম তিনি ‘দি সেইন্টস্‌’ নামে একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছেন। পাণ্ডুলিপির কিছু অংশ আমরা হাতড়িয়ে দেখলাম। আসমা খাতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা, পলোগ্রাউন্ডের তথ্যাবলী, নূর আহমদ চেয়ারম্যান ও শিক্ষিকা আসমা খাতুনের সম্পর্ক, কেমন করে আসমা খাতুন, মৌলভী আবদুল হাই, চট্টগ্রাম কলেজের মুসলমান অধ্যক্ষ শামসুল ওলামা কামাল উদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী সৈয়দা আম্বিয়া খাতুনের চট্টগ্রামের মুসলমান সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে পথ চলা। চট্টগ্রামবাসী যখন ১৯২৬-২৮ পর্যন্ত চট্টগ্রাম পৌর এলাকায় চেয়ারম্যান নূর আহমদ বাধ্যতামূলক মেয়েদের শিক্ষা চালু করেছিলেন তখন এই নগরবাসী তাঁকে কাফের ঘোষণা করেছিলেন। এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন উল্লেখিত মনীষীবর্গ। তাঁরা নূর আহমদ চেয়ারম্যানের পক্ষ নিয়ে নারী শিক্ষার পক্ষে কাজ করেছিলেন। পরে ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে কাজী নজরুল আসেন চট্টগ্রামে। মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি- চট্টগ্রামে নজরুল এলেন। সেখান থেকে কাট্টলী ইউনিয়ন ক্লাব নাজির বাড়িতে নজরুলকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। সেখানে বিখ্যাত মাওলানা তমিজুর রহমান নজরুলকে একটি মানপত্র প্রদান করেন। তখন নজরুলকে-ও মুসলমানদের কেউ কেউ কাফের বলছিলেন। ঐ মানপত্রে নজরুলের পদতলে তোহফা- উচ্চারণের পর নজরুল বাংলায় মিলাদ পড়া শুরু করলেন। তখন উপস্থিত শ্রোতা দর্শকরা নজরুলকে প্রকৃত মুসলমান বলে ঘোষণা দিলেন এবং একই সাথে চট্টগ্রাম পৌরসভার চেয়ারম্যান নূর আহমদকেও বললেন প্রকৃত মুসলমান। উল্লেখ্য যে ১৯২১ থেকে ১৯৫৪ এই ৩০ বছর তিনি চট্টগ্রাম পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিলো বিএ (অনার্স) এম.এ. বি.এল। আসমা খাতুনের বাড়িতে গিয়ে এমন অনেক কথা জানতে পারি জাফর ভাইকে সঙ্গে নিয়ে।

: অনেক স্মৃতি কথা আছে সাংবাদিক জাফরুল ইসলাম চৌধুরী নিয়ে। সাংবাদিকতা থেকে অব্যাহতি নিয়ে তিনি চলে যান আমেরিকায়। সেখান থেকে প্রায়ই ফোন করতেন। নিজের লেখালেখি, গবেষণা নিয়ে ফোনে আলাপ হতো। অসুস্থতার কথা বলতেন। শেষবার দেশে ফিরছেন একথা মৃত্যুর প্রায় সপ্তাহ খানেক আগে ফোনে জানালেন। আমার কিছু কাজের সংবাদ নিলেন, স্বাধীনতার প্রথম কবিতার কথা বললেন। বললেন, দেশে এসে সংবাদপত্রের উপর লেখা গবেষণা পত্রটি ছাপাবেন কিন্তু মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সবই শেষ. . .।