কাজী জাফরুল ইসলাম ও তাঁর সাংবাদিকতা বিষয়ক গ্রন্থ

শনিবার, মার্চ ৯, ২০১৩

রাশেদ রউফ

Rashed Roufকাজী জাফরুল ইসলাম- জন্ম ৩০ নভেম্বর ১৯৩৯। চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাইয় উপজেলার উত্তর হাইতকান্দি গ্রামে। মৃত্যু ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। এই ৭৪ বছরে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন খ্যাতিমান সাংবাদিক হিসেবে, পরিশ্রমী গবেষক হিসেবে ও নিষ্ঠাবান সংগঠক হিসেবে। সাংবাদিকতার নানা ধাপে তাঁর কৃতিত্ব ও প্রয়াস তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বরূপে অধিষ্ঠিত করেছে। বোধে, অনুভবে ও পারঙ্গমতায় তিনি ছিলেন সৎ, সাহসী ও নীতিনিষ্ঠ।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন সমাজ-কর্মে। সাহস এর ভাষা আন্দোলনই তাঁর মনে জ্বালিয়ে দেয় আলোর বহ্নি শিখা। সংশ্লিষ্ট হন আন্দোলনে। অংশ নেন ছাত্র-রাজনীতিতে। ১৯৫৮ সালে বিএ পরীক্ষার প্রস্তবিকালে নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হন এবং বহিরাগত পরীক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়ে ১৯৬২ সালের শুরুতে জেল থেকে মুক্তি লাভ করেন। ১৯৩২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চট্টগ্রাম কলেজে চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ আন্দোলন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি পালন করেন সক্রিয় ভূমিকা। তিনি চট্টগ্রাম জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। শিশু সংগঠক হিসেবেও তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এতো সব কর্মকান্ড ও পরিচিতির মধ্যেও আমরা তাঁকে জানি সাংবাদিকার একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে। সৎ সাংবাদিকতায় নিবেদিত এই মানুষটি তাঁর কর্মে ও লেখালেখিতে ‘সাংবাদিকতা’ পেশার মান উন্নয়নে ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পালন করেন অবিস্মরণীয় ভূমিকা। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা বিষয়ে প্রচুর লেখালেখি করেছেন এবং প্রকাশ করেছেন একাধিক গ্রন্থ।

জনসংযোগ ও সাংবাদিকতাঃ ‘জনসংযোগ ও সাংবাদিকতা’ কাজী জাফরুল ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সারে। শিক্ষা, অধ্যয়ন, প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি এই বইটি প্রণয়ন করেছেন। জনসংযোগ, জনসংযোগের সূচনা, ব্যাপ্তি ও প্রয়োজনীয়তা, প্রচার মাধ্যম, সাংবাদিকতা, সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতা অর্জন, ছলচাতুরি, বাড়াবাড়ি, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ও অনধিকার চর্চা প্রভৃতি বিষয়ে লেখক সুন্দরভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। এই গ্রন্থ সম্পর্কে তাঁর নিজের ভাষ্য হচ্ছে: ‘আমাদের দেশে এই শাস্ত্রের তত্ত্ব ও প্রয়োগ সম্পর্কিত কোনো বই পুস্তক নেই এবং বিদেশি বই-পুস্তকও অপ্রতুল এবং দুষ্প্রাপ্য বিধায় বইটি প্রাথমিক পুস্তিকা হিসেবে শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ দান ও গ্রহণে জনসংযোগ কর্মীদের কর্তব্য নির্ধারণে সাহায্য করবে নিঃসন্দেহেঃ। গণ যোগাযোগ আজকের দিনে বিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। সেহিসেবে বইটি সেই সময়ে পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

সাংবাদিকতা একটি বিজ্ঞানঃ কাজী জাফরুল ইসলাম সাংবাদিকতার একটি বিজ্ঞান, সামজ বিজ্ঞান- এই তত্ত্বের একজন নির্ভীক যোদ্ধা। নানা সময়ে লেখালেখি করে এই তত্ত্বের প্রচারে পালন করেন অগ্রণী ভূমিকা। পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ২০১১ সালে এটি প্রকাশিত হয় গ্রন্থাকারে। শৈলী থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থে সাংবাদিকতা সে একটি বিজ্ঞান, বিশেষত সমাজবিজ্ঞানী সে বিষয়ে তাত্বিক যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। এ ছাড়া গ্রন্থটিতে অন্য যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সেগুলোঃ সংবাদপত্রের সুষ্ঠু প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ, জাতীয় সংবাদপত্র শিল্পনীতি অপরিহার্য, মুক্তিযুদ্ধে সংবাদপত্রঃ প্রেক্ষিত চট্টগ্রাম, সংবাদপত্র কর্মচারী বেতন বোর্ড রোয়েদাদ কি বাস্তবায়নের ব্যবস্থাবিহীন আইন, বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের ভূমিকা, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাকের কৃতী সাংবাদিক ও গুণী সংবর্ধনার প্রসঙ্গে এবং সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের মূল সমস্যা কী?

সাংবাদিকতা যে সমাজ বিজ্ঞান, সে বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক বলেছেন: ‘সংবাদপত্র শুধুমাত্র তত্ত্ব ও তথ্যের ভিত্তিতে সমাজবিজ্ঞান সমূহের সমস্যা ও সমাধান তুলে ধরে, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে সমস্যাদি সমাধানের পথ দেখিয়ে, কর্মসূচি অথবা সমাজ পরিচালনা পদ্ধতি, রাষ্ট্র পরিচালনা নীতি বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার পক্ষে জনমত গড়ে তুলে ক্ষান্ত হয় না, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান সম্পর্কে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত জনমনে সে বিভ্রান্তি ও সংশয় আছে, কুসংস্কার আছে। তত্ত্ব ও তথ্য দিয়ে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে তাও বিচুরিত করে।’

কাজী জাফরুল ইসলাম বাংলাদেশে জাতীয় সংবাদপত্র শিল্পনীতির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার ছিলেন। সংবাদপত্র শিল্পের বিকাশে এই নীতি অপরিহার্য বলে তিনি মনে করতেন। এ বিষয়ে যুক্তি, তত্ত্ব ও তথ্যসমেত চমৎকার লেখা সংযোজন হয়েছে এ গ্রন্থে। সব মিলিয়ে ‘সাংবাদিকতা একটি বিজ্ঞান’ গ্রন্থটি উল্লেখযোগ্য ও প্রয়োজনীয় বই।

ব্রিটিশ যুগে বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও সাময়িকী (১৮৪৭-১৯৪৭): ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশের ১০০ বছরের সংবাদপত্র ও সাময়িকীর একটি অবিস্মরণীয় দলিল হলো কাজী জাফরুল ইসলাম প্রণীত গ্রন্থ ‘ব্রিটিশ যুগে বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও সাময়িকী’। ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে রংপুরের কুন্ডী পাগলা থেকে প্রকাশিত ‘রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ’ থেকে শুরু করে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে বগুড়া থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক প্রজাবাহিনী’ পর্যন্ত মোট ৪১৫টি সংবাদপত্র ও সাময়িকীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অনুপম থেকে প্রকাশিত এ গ্রন্থে সংবাদত্রের বা সাময়িকীর সম্পাদক, প্রকাশকাল, প্রকাশস্থান প্রভৃতি তুলে ধরা হয়েছে। এই গ্রন্থ প্রণয়ণে বেদারনাথ মজুমদার, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় থেকে শুরু করে ড. মুনতাসীর মামুন পর্র্যন্ত বহু লেখকের ১৩১টি প্রবন্ধের সহায়তা নিয়েছেন কাজী জাফরুল ইসলাম। ১০০ বছরের সংবাদপত্র ও সাময়িকীর কথা বলতে গিয়ে লেখ তুলে ধরেছেন সমকালীন রাজনীতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনের কথাও। গ্রন্থটি সংবাদপত্র বিষযে গবেষণারত ব্যক্তি বা গবেষকদের কাজে আসতে নিঃসন্দেহে।

বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন: কাজী কাজফরুল ইসলাম চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতিও। সংবাদপত্র ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে নিজের সম্পৃক্ততা ও অভিজ্ঞতার আলোকে রচনা করেন তাঁর আরেক প্রয়োজনীয় গ্রন্থঃ ‘বাংলাদেশে সংবাদপত্র ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন’।

ভারতীয় প্রেস কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ভারতে প্রথম সংবাদপত্র বেতন বোডৃ গঠন করা হয় ১৯৪৫ সালে। পাকিস্তান সংবাদপত্র বেতন বোর্ড গঠ করে ১৯৫৫ সালে। পাকিস্তান গঠন করা হয় ১৯৬০ সালে। দু দেশের বেতন বোর্ড সাংবাদিকদের ন্যূনতম মর্যাদার স্বীকৃতি দেয়া হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের বেতন কাঠামোর সার্বিক চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক এই গ্রন্থে। ট্রেড ইউনিয়নের দায়িত্ব সম্পর্কে কাজী জাফরুল ইসলাম বলেন: “ট্রেড ইউনিয়নের কাজ হচ্ছে শ্রমিক কর্মচারীদের আইন ন্যায় সঙ্গত অধিকার ও দাবি-দাওয়া কর্তৃপক্ষ সমীপে পেশ করা, তুলে ধরা এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায় ও প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশের সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়ন বিশ্বাস করে যে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে দাবি দাওয়া এবং অধিকার প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে কল্যাণকর পন্থা। কারণ, জোর করে, শক্তি প্রয়োগ করে বা ভয় দেখিয়ে অথবা হুমকি দিয়ে দাবি আদায় করা যঅয় না এবং কখনো কখনো দেশেও তার ফলাফল কখনো কর্মজীবীদের জন্য কল্যাণকর হয় না। গ্রন্থটি প্রণয়নে দেশি-বিদেশী ৪৫টি গ্রন্থ। প্রবন্ধের সহায়তা নিয়েছেন তিনি। এটি সাংবাদিকদের জন্য জরুরি একটি গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

এ চারটি গ্রন্থ ছাড়াও সংবাদপত্র ও সাংবাদিক বিষয়ক আরো দুটি গ্রন্থের সহায়তা নিয়েছেন তিনি। এটি সংবাদিকদের জন্য জরুরি একটি গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। এ চারটি গ্রন্থ ছাড়াও সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা বিষয়ক আরো দুটি গ্রন্থের পান্ডুলিপি তিনি তৈরি করেছেন। একটি ‘সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা’, অন্যটি ‘চট্টগ্রামের সংবাদপত্রের ১২০ বছর।’ দুটি গ্রন্থ ইতোপূর্বে দৈনিক আজাদীতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থাকারে প্রকাশের পূর্বেই তিনি চলে গেলেন অন্যলোকে। সংবাপত্র ও সাংবাদিকতা বিষয়ক উপযুক্ত গ্রন্থাবলি ছাড়াও আরো কয়েকটি বই তাঁর প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে মধ্যযুগের মুসলিম শাসকেরাই বাংলা সাহিত্যের স্থপতি (প্রকাশক: বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি), অধ্যাপক গোলাম আজম গং রাষ্ট্রদ্রোহী নন, জাতিদ্রোহী, স্মৃতিতে অমলিন একাত্তরের অবরুদ্ধ দিনগুলি, মরণোত্তর পদোন্নতি (শৈলী) উল্লেখযোগ্য। আমরা জানি, কাজী জাফরুল ইসলাম ছিলেন একজন সক্রিয় লেখক। প্রচুর লেখালেখি করতেন। ফলে বেশ কয়েকটি বইয়ের পান্ডুলিপি তৈরি ছিল, যেগুলো ছিল গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশের অপেক্ষায়। এসব গ্রন্থ আশা করি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান বা প্রকাকশকরা প্রকাশ করতে উদ্যোগী হবে আগামীতে। তাহলেই আমরা পাবো পূর্ণাঙ্গ কাজী জাফরুল ইসলামকে।