সংসদ রিপোর্টারদের সুরক্ষা নেই

বৃহস্পতিবার, ০৭/০৩/২০১৩ @ ৬:১২ অপরাহ্ণ

প্রেসবার্তাডটকম ডেস্ক:
televisionসংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদে দেয়া ক্ষমতাবলে সংসদ সদস্যরা সংসদে যা কিছুই বলুন না কেন, বা যে সিদ্ধান্তই নিন না কেন, তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা চলে না। এমনকি আদালতও সংসদের কোনো কার্যধারা আমলে নিতে পারেন না। এখানেই সংসদ সদস্যদের ‘প্রিভিলেজ’ বা বিশেষ অধিকার।

কিন্তু সংসদ সদস্যদের ওইসব বক্তব্য যে সংবাদকর্মীরা পরিবেশন করেন, সংবিধানে তাদের কোনো সুরক্ষা নেই। ফলে সংসদে যদি বিচার বিভাগ কিংবা কোনো বিচারপতির সমালোচনা করে কেউ বক্তব্য দেন এবং সাংবাদিকরা যদি সেই সংবাদ পরিবেশন করেন, সেক্ষেত্রে আদালত সংসদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে না পারলেও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হলে কিছু করার থাকবে না। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় তাই সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সংসদ রিপোর্টারদের সুরক্ষার বিষয়টিও সামনে চলে এসেছে।

সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে, “(১) সংসদের কার্যধারার বৈধতা সম্পর্কে কোন আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না। (২) সংসদের যে সদস্য বা কর্মচারীর উপর সংসদের কার্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রণ, কার্যপরিচালনা বা শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা ন্যস্ত থাকিবে, তিনি সকল ক্ষমতা-প্রয়োগ সম্পর্কিত কোনো ব্যাপারে কোনো আদালতের এখতিয়ারের অধীন হইবেন না। (৩) সংসদে বা সংসদের কোনো কমিটিতে কিছু বলা বা ভোটদানের জন্য কোনো সংসদ-সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না। (৪) সংসদ কর্তৃক বা সংসদের কর্তৃত্বে কোনো রিপোর্ট, কাগজপত্র, ভোট বা কার্যধারা প্রকাশের জন্য কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না। (৫) এই অনুচ্ছেদ-সাপেক্ষে সংসদের আইন-দ্বারা সংসদের, সংসদের কমিটিসমূহের এবং সংসদ-সদস্যদের বিশেষ-অধিকার নির্ধারণ করা যাইতে পারিবে।”

এখানে সংসদ সদস্যদের যেমন বিশেষ অধিকার এবং সুরক্ষা দেয়া হয়েছে, তেমনি ৭৮ অনুচ্ছেদের ৪ ধারায় সংসদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তারা সংসদের কর্তৃত্বে কোনো রিপোর্ট, কাগজপত্র, ভোট বা কার্যধারা প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করা যাবে না বা আদালতও কোনো কার্যধারা গ্রহণ করবেন না। কিন্তু ওই রিপোর্ট বা কাগজপত্র অথবা আলোচনা যদি সংবাদপত্রে কিংবা অন্য কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, সেক্ষেত্রে সংবিধান কোনো সুরক্ষা দেয়নি।

এ বিষয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সংবিধান সাংবাদিকদের যথেষ্ট সুরক্ষা দিয়েছে। যেমন ভারতের সংবিধানের ৩৬১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে : [361A. (1) No person shall be liable to any proceedings, civil or criminal, in any court in respect of the publication in a newspaper of a substantially true report of any proceedings of either House of Parliament or the Legislative Assembly, or, as the case may be, either House of the Legislature, of a State, unless the publication is proved to have been made with malice: Provided that nothing in this clause shall apply to the publication of any report of the proceedings of a secret sitting of either House of Parliament or the Legislative Assembly, or, as the case may be, either House of the Legislature, of a State.

অর্থাৎ কোনো সাংবাদিক যদি সংসদের কোনো আলোচনা, সিদ্ধান্ত, রিপোর্ট ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে কোনো সংবাদ প্রকাশ করেন এবং তার ওই কাজ যদি রাষ্ট্রদোহিতামূলক না হয়, সেক্ষেত্রে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়া যাবে না। এই অনুচ্ছেদটি সংসদ সাংবাদিকদের জন্য একটি বড় সুরক্ষা।

কিছুদিন আগে হাইকোর্টের বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী জাতীয় সংসদের স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদের একটি রুলিংকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল বলে মন্তব্য করেন। এ নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। সংসদের বৈঠকে সংসদ সদস্যরা ওই বিচারপতির কঠোর সমালোচনা করেন। এমনকি তার ব্যক্তিগত অনেক বিষয়ও তারা আলোচনায় নিয়ে আসেন। তিনি কোন সরকারের আমলে নিয়োগ পেয়েছেন, পরে কোন সরকার তাকে স্থায়ী নিয়োগ দিয়েছে ইত্যাদি বিষয়ও সংসদ সদস্যরা উত্থাপন করেন এবং স্পিকারের রুলিংকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলার অপরাধে তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে বিচারের দাবি তোলেন। সংসদ সদস্যরা এই বিচারপতির বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনেরও অভিযোগ আনেন।

এর আগে ২০১২ সালের ২৯ মে স্পিকার উচ্চ আদালত সংলগ্ন সড়ক ভবন সরিয়ে নিতে হাইকোর্টের একটি নির্দেশনার উল্লেখ করে বলেন, “আদালতের কোনো রায়ে মানুষ ক্ষুব্ধ হলে তারাও বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে।” তিনি বলেন, “মহামান্য আদালত যদি মনে করেন যে, আমরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারব, এটা ঠিক না। সবারই সহনশীল হওয়া দরকার।”

এরপর একজন আইনজীবী সংবাদপত্রে প্রকাশিত স্পিকারের ওই বক্তব্য বিচারপতি শামসুদ্দীন চৌধুরীর নজরে আনলে বিচারপতি তার এজলাসে বলেন, “স্পিকারের ওই বক্তব্যের কারণে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা যায়। এ সময় তিনি স্পিকার সম্পর্কে আরো কিছু ‘আপত্তিকর’ কথা বলেন যেগুলোর বিরুদ্ধে সংসদে কঠোর সমালোচনা হয়। যদিও শেষমেষ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।”

এরপর অতি সম্প্রতি হাইকোর্টের আরেক বিচারপতি মিজানুর রহমান ভূঁইয়াকে নিয়েও সংসদে ব্যাপক সমালোচনা হয়। শাহবাগ আন্দোলনের কর্মী ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারের খুন হবার পর ওই বিচারপতি পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু খবরের ক্লিপিং প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য বিচারপতিদের কাছে পাঠান যেখানে তিনি রাজীবকে ‘মুরতাদ’ উল্লেখ করেন। কিন্তু কয়েকটি গণমাধ্যমে এ বিষয়ে খবর প্রকাশিত হলে সংসদ সদস্যরা এ নিয়ে সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় ওই বিচারপতির তীব্র সমালোচনা করেন এবং তার বিরুদ্ধেও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি জানান। এ সময় স্পিকার আবদুল হামিদ সংসদ সদস্যদের ওই প্রস্তাবের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদকে লক্ষ্য করে বলেন, তিনি যেন এ বিষয়টির একটি সুরাহা করেন। অন্যথায় তিনি (স্পিকার) এ বিষয়ে একটি রুলিং দেবেন।

এ সময় আইনমন্ত্রী সংসদকে জানান, তিনি বিচারপতি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে পাঠানোর জন্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলবেন এবং এরপর সোমবার রাষ্ট্রপতি ওই অভিযোগটি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে পাঠান।

দুজন বিচারপতিকে কেন্দ্র করে সংসদে বিচার বিভাগ নিয়ে বেশ কিছুদিন যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়, সেসব আলোচনা সংসদের বাইরে হলে যেকোনো নাগরিক এমনকি সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধেও আদালত অবমাননার মামলা হতে পারত। কিন্তু যেহেতু সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদ তাদের বিশেষ অধিকার দিয়েছে, তাই তারা সুরক্ষা পেয়েছেন। কিন্তু ওইসব ঘটনার সংবাদ পরিবেশন করেছেন এবং করছেন যারা, তাদের কোনো সুরক্ষা নেই।

শোনা যাচ্ছে, এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী একটি বেসরকারি বিল আনবেন। যেখানে তিনি সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকারের বিষয়টিকে আরও মজবুত করা এবং সেইসঙ্গে সাংবাদিকদের সুরক্ষার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করবেন।

মন্ত্রীদের বাইরে অন্য কোনো সাধারণ সংসদ সদস্য যে বিল আনেন, সেটিকে বেসরকারি বিল বলা হয়। সাবের হোসেন চৌধুরী ইতিমধ্যে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি বিল এনেছেন। যার মধ্যে সম্প্রতি একটি বিল পাসও হয়েছে। যদিও বাংলাদেশে বেসরকারি বিল পাস হবার উদাহরণ খুবই কম।

সূত্র -নতুন বার্তা