একটি পত্রিকা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়া ও কিছু কথা…

বৃহস্পতিবার, ২১/০২/২০১৩ @ ৭:৪৯ অপরাহ্ণ

আলম দিদার:
Didar২০১০ সালের প্রথম দিকে হঠাৎ করে চট্টগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিক আমার অগ্রজ চ্যানেল আইয়ের ব্যুরো প্রধান চৌধুরী ফরিদ ভাই আমাকে ফোন দিয়ে বললেন, দেখা করতে। অন্য একটা কাজে ব্যস্ত থাকায় সেই দিন দেখা করতে না পারলেও পরে জানতে পারি উনি আমাকে একটি স্থানীয় পত্রিকায় জয়েন করার জন্য ডেকেছেন। আমি ওই পত্রিকার নাম শুনে এবং ব্যবস্থাপনায় যারা আছেন তাদের সম্পর্কে জেনে আগ্রহী হয়নি সেই মুহুর্তে।
পরে আরেক অগ্রজ সাংবাদিক চ্যানেল ২৪ এর ব্যুরো প্রধান কামাল পারভেজ ভাই ফোন দিলে আমি আর না করতে পারিনি। মূলত চাকরির চেয়ে এই দুই জন মানুষের কথায় আস্থা রেখেই ওই পত্রিকায় কাজ শুরু করি। আমার পরিচিত অনেক বড় ভাই আমাকে এই ব্যাপারে না করলেও চিন্তা করলাম দেখিনা কি হয়?
এরই মধ্যে ওই পত্রিকায় আমার কাজের বয়স ৬ মাস পার হতে না হতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে আমি আড়াই মাসের জন্য কাজের বাইরে থাকি (বেতন ছাড়া)। কিন্তু নিউজ ট্রিটমেন্ট, সাংবাদিকতার মূল ¯্রােতের বাইরে গিয়ে কিছু অকাজ করা, রুচির বাইরে গিয়ে নিউজ চাপানোসহ নানা বিষয় নিয়ে পত্রিকা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমার সব সময় মন মালিন্য হত। এরপরও সহকর্মীদের পরামর্শে কিছুটা নীরবে, কিছুটা প্রতিবাদে কাজ চালিয়ে যেতে লাগলাম। একপর্যায়ে দেখলাম তাদের নোংরামির জায়াগাটা একটা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আর সহ্য করতে পারিনি। নৈতিকতার জায়গা থেকে প্রতিবাদ জানিয়েছি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর নয় এই প্রতিষ্ঠানে এসব লোকজনের অধীনে কাজ করা। করতে থাকি প্রতিবাদ।
এরই মধ্যে সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট হিসেবে যোগদান করি নতুন ধারায় অনলাইন পত্রিকার ধারণা নিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলামেইল২৪ডটকমে। তাই ছেড়ে দিলাম আমার কর্মস্থল ওই পত্রিকাটি। মানুষ তার পুরনো কর্মস্থল ছেড়ে আসলে কষ্ট পায়। তবে এই হাউসের ক্ষেত্রে আমার কোন আক্ষেপ বা মন কষ্ট নেই। বরং আমি মনে করি আমার সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে বাজে সময়টা কেটেছে ওই ১২ টা মাস। ওই পত্রিকায় যোগদানের আগে কামাল পারভেজ ভাই আমাকে বলেছিলেন, ‘বেতন নিয়ে চিন্তা কর না, অন্তত দুই বছর বেতন রেগুলার হতে পারে। কিন্তু উনার সেই ধারণাকে মিথ্য করে দিয়ে পত্রিকার সম্পাদকের নানা টালবাহানায় পত্রিকায় কর্মরতরা ৬ মাস পর থেকে নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। আমারও চার মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে।
একদিন বেতন চাইলে পত্রিকাটির সম্পাদক আমাকে বলেছেন, ‘পত্রিকায় কাজ করলে বেতন লাগে কিনা?’ আমি এই প্রশ্ন শুনে অবাক হয়ে গেলাম এবং তাকে পাল্টা একটা যুক্তি দিয়ে বললাম, ‘একজন পীর সাহেব গভীর রাতে একটি বড় পুকুরে তাহুজুদ এর নামাজ পড়তে ওজু করতে নামেন। কিন্তু ওই সময় ওই পুকুরের অন্য পাড়ে আরেক জন চোর হাত-পা পরিস্কার করতে নামেন। তখন পীর সাহেব ভাবেন আজ শুধু তিনি না অন্য একজনও তার সঙ্গে নামাজ পড়বেন। আর চোর ভাবেন আজ শুধু তিনি না অন্য একজনও চুরি করবেন।’ তাকে বললাম, এখন আপনিই সিদ্ধান্ত নেন কে আমি কে আপনি? উনি একথা শুনার পর কিছু না বললেও তার চরিত্রটি নিজে বুঝে গেছে নিশ্চয়।
এখন চুড়ান্ত সিন্ধান্ত হচ্ছে আমি ওই পত্রিকায় আর কাজ করছিনা। নৈতিকার প্রশ্নে কোন আপোষ নয়। একটা কথা বলে রাখা ভাল, যে দুই জন অগ্রজ সাংবাদিক আমাকে ওই পত্রিকায় যোগ দিতে বলেছিলেন, তারা দুই জনই পত্রিকাটি প্রকাশের দশ দিনের মধ্যে তাদের সেখান থেকে প্রত্যাহার করে নেন। আমি কৃতজ্ঞ তাদের প্রতি। ভেবে খুশি লাগছে, জীবনের চরম একটা ক্ষতির হাত থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করলাম। আক্ষেপ একটায় সাংবাদিকতার ক্যারিয়ারে কিছুটা সময় অযথা ব্যয় করলাম সেই জন্য।

লেখক: আলম দিদার, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, বাংলামেইল২৪ডটকম
E-mail: [email protected]