সাংবাদিক ও ভাষাসৈনিক ছৈয়দ মোস্তফা জামাল যেমন ছিলেন

সোমবার, ১৮/০২/২০১৩ @ ১১:৩৮ অপরাহ্ণ

সোহেল মো. ফখরুদ-দীন:
ভাষা সৈনিক, প্রচার বিমুখ প্রয়াত সাংবাদিক, সমাজসেবক ছৈয়দ মোস্তফা জামাল ২০০৪ সালের ২২ এপ্রিল আমাদের শোক সাগরে ভাসিয়ে চিরতরে চলে গেলেন। আমি তাহার ৮ম মৃত্যু বার্ষিকীতে রূহের মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ যেন তাকে ক্ষমা ও বেহেস্ত নসিব করুন।
satkania journalist
ঢাকাস্থ চট্টগ্রাম সমিতির প্রাক্তন কর্মকতা ও পটিয়া উপজেলার শোভন দন্ডীর শিক্ষাবিদ ও কবি ওয়ালি মিঞা মাষ্টার ছৈয়দ মোস্তফা জামালকে নিয়ে লিখেছেন –

“ছৈয়দ মোস্তফা জামাল খাটেন বহুতর,
সমিতির কাজে তিনি যান ঘরে ঘর।
সেক্রেটারীর শুরুভাব তিনি বহন করে,
দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি চার বৎসর ধরে।
সমাজকর্মী ছৈয়দ ছোলতান, জামাল তাঁর ছেলে
বসতি দেখবেন আছে মির্জাখীলে গেলে,
প্রাথমিক শিক্ষকদের খেদমত করিয়া
সত্তর বছর বয়স তাঁর গেল কাটিয়া।
জনাব ছোলতানের ছিল পর হিতে মন,
তাইত জামাল পিতারমত সমাজকর্মী হন ॥”
ছৈয়দ মোস্তফা জামাল পেশায় সাংবাদিকতা হলেও এ পেশাকে পরিপূর্ণভাবে আর্তমানবতার সেবায় তিনি কাজে লাগান। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজ সেবার জন্য যুগ যুগ ধরে ছৈয়দ মোস্তফা জামাল মানুষের অন-রে বেঁচে থাকবেন। সৎ সাংবাদিকতা ও নিষ্ঠার সাথে সমাজসেবার কারণে আর্থিক টানা পোড়নের জন্য তিনি কোন বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে যেতে পারেননি। সৎ মানুষের জন্য যথাসাধ্য কল্যাণ করার আজীবন চেষ্টা করেছেন।

তিনি বলতেন, ‘‘বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের সমস্যাদি চিহ্নিত, তাদের বক্তব্য সংবাদপত্রের মাধ্যমে সমাজে তুলে ধরা সম্ভব হলে মহান আল্লাহর নিকট সওয়াব ও রহমত পাওয়া যায়।’’ প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকতা একটি মহৎ ও সম্মানী পেশা। যার আসল উদ্দেশ্যই হচ্ছে সমস্ত প্রাণীকুলের সমস্যাদি চিহ্নিতকরণ এবং সমাধানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা। দেশ ও জাতির প্রতি কর্তব্যপরায়নতা, রাজনৈতিক পরিমন্ডলে জাতীয় নেতৃবৃন্দকে কর্তব্যের প্রতি সচেতন রাখার জন্য, রবুরিয়ত কায়েম, সর্বোপরি স্বীয় পিতার আদর্শ অনুকরণে জাতীয় রাজনীতির সাথেও ছৈয়দ মোস্তফা জামাল সংশ্লিষ্ট ছিলেন। মাওলানা ভাসানীর পথ ধর, রবুবিয়ত কায়েম করার শ্লোগানে উজ্জীবিত ছিলেন আজীবন।
ছৈয়দ মোস্তফা জামাল আত্নজীবনী লিখেন ১৯৯৭ সালে। ভূমিকায় লিখা ছিলেন নিম্মরূপঃ “সকল প্রশংসা আল্লাহ্‌তালার। লাখ লাখ দরুদ ও সালম সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ পয়গম্বর হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সঃ) এর প্রতি। আল্লাহ্‌ সকলের গুনাহ্‌ মাফ করুন এবং আমরা যেন প্রত্যেকে প্রত্যেকের হক আদায় করি এবং মাফ করে দেয়ার তওফিক দিন। আমিন”। তার পূর্ব পুরুষ আরব, তুরস্ক, দিল্লী ও ঢাকায় বসবাস করতেন। দিল্লির বাদশাহ্‌ জাহাঙ্গীরের আমলে চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া গ্রামে হযরত কাতাল পীর শাহ্‌ (রঃ) এর প্রতিষ্ঠিত মসজিদ, মাদ্রাসা ও সমাজ কল্যাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে জনসেবার জন্য তাঁর পূর্ব পুরুষ লাখরাজ সম্পত্তি লাভ করেন। সাংবাদিক ও সমাজসেবক ছৈয়দ মোস্তফা জামাল জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৪ সালের ৮ ই জানুয়ারী সোমবার পবিত্র রমজান মাসে। তার দাদা ছৈয়দ আলিম উল্লাহ্‌ শাহ্‌ আরাকানে ইসলাম প্রচারের কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
তিনি খেলাফত আন্দোলনের একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন এবং বিখ্যাত ছৈয়দ আহমদ বেরেলভীর অনুসারীদের সাথে পবিত্র হজ্ব আদায় করেন। তাঁর বাবা ছিলেন কোলকাতাস’ নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির প্রথম সাধারণ সম্পাদক ও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের কারাবরণকারী নেতা মরহুম আলহাজ্ব মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ। ১৯৫১ সালে ছৈয়দ মোস্তফা জামাল তমদ্দুন মজলিশের বৃহত্তম সাতকানিয়া থানার সাধারণ সম্পাদক নিবার্চিত হন। এ বৎসর সাতকানিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের ছাত্র মিলনায়তন সম্পাদক পদেও তিনি নির্বাচিত হন। ১৯৫১ সালে ঢাকার ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক এর সাতকানিয়া প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে পড়েন।
১৯৫২ সালে বৃহত্তর সাতকানিয়া থানার রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আন্দোলনের আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ঐ সময় ব্যাপক মিছিল সভা, অবরোধ কর্মসূচী পালন এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলা এর পক্ষে সক্রিয় প্রচার চালান। সাতকানিয়ার আহবায়ক হিসেবে ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও এপ্রিল মাসে ঢাকায় ভাষা সম্মেলনে অংশ নেন। ঐ সময় তখনকার সদস্য কারামুক্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে চট্টগ্রামসহ ভাষা আন্দোলন বিষয়ে মত বিনিময় করেন। এই সালে শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক চট্টগ্রামে পূর্ব পাকিস্থান প্রাথমিক শিক্ষক সম্মেলন উদ্বোধন করেন। সম্মেলনের সংগঠক পিতা মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদের সাথে তিনি সর্বক্ষন কাজ করেন।
১৯৫৪ সালে জেলা যুক্ত ফ্রন্ট কমিটির সহ-প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রচার সম্পাদক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক ডঃ মাহফুজুল হক। মরহুম ডঃ মাহফুজুল হকের নেতৃত্বে ১৯৫৪ সালে শেরে বাংলার সাথে সাক্ষাৎ করে চট্টগ্রাম থেকে একজন মন্ত্রী নিতে অনুরোধ করেন। ১৯৫২ সালে দৈনিক আজান, ১৯৫৩ সালে দৈনিক সংবাদের সাতকানিয়া সংবাদদাতা, ১৯৫৪ সালে ঢাকায় দৈনিক মিল্লাত ও সপ্তাহিক সৈনিক এ সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৮ সালে দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক নাজাত, ১৯৫৯ সালে দৈনিক ইত্তেহাদে রিপোর্টার, ১৯৬০ সালে দৈনিক পয়গামের সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭২ সালে দৈনিক স্বদেশ এর ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক ও বার্তা সংস্থা সি.পি. আই ও দৈনিক ইত্তেফাকের দক্ষিণ চট্টগ্রাম প্রতিনিধি নিযুক্ত হন। ১৯৫৭ সালে তিনি পাকিস্তান কিশোর মজলিশ গঠন করেন। মওলানা মোহাম্মদ বজলুল রহিম, শিল্পী হাসান রেজা, ডাঃ ফখরুল ইসলাম চৌধুরী, ব্যাংকার এ.কে.এম মহিউদ্দিন খোকন ঐকমিটির সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৬০ সালের শেষভাগে দৈনিক আজাদীর ঢাকা ব্যুরো প্রধান নিযুক্ত হন। এ সময় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সংবাদদাতা ইউনিটের উপ প্রধান ছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের রাওয়াল পিন্ডিতে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খাঁনের অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং পাক-ভারতের বিরোধপূর্ণ এলাকা মারি, মোজাফ্‌ফারাবাদ ও কাশ্মীর সফর করেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের লাহোরে সমাজ সেবা সম্মেলনে অংশ নেন। ১৯৬৭ সাল থেকে ৩ দফায় ঢাকাস’ চট্টগ্রাম সমিতির সাধারন সম্পাদক ছিলেন।
ছৈয়দ মোস্তফা জামাল ছিলেন নিরহংকার ও নিবেদিতপ্রাণ বিরল সমাজসেবী, জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ নুরুল ইসলাম তাঁর সময়ে চট্টগ্রাম সমিতির সভাপতির পদ অলংকৃত করেন। ঢাকাস’ যক্ষ্মা সমিতিরও কার্যকারী কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। মাসিক মদীনা সম্পাদক মওলানা মুহিউদ্দিন খান সভাপতি ও তিনি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঢাকায় মওলানা ইসলামাবাদী স্মৃতি সংসদে কাজ করেন। ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি ও সাতকানিয়া কচি কাঁচার মেলা গঠন করেন। ৭৪ সালে এর সম্মেলন হয়। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি পটিয়া প্রেসক্লাবেরও সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বতারায় যোগ দেন।
১৯৮০ সালে অবিভক্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহকারী মহাসচিব নির্বাচিত হন। এ সময় মাওলানা ইসলামাবাদী একাডেমী গঠিত হলে ব্যারিষ্টার বজলুস সাত্তার সভাপতি, মোস-ফা জামাল সাধারণ সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটির উদ্যোক্তা পরিচালক নির্বাচিত হন।
তিনি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে)’র সদস্য, দৈনিক পূর্বতারার সাবেক বার্তা সম্পাদক ছিলেন। তিনি সাতকানিয়া সাহিত্য বিশারদ কচি কাঁচার মেলার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। বাংলাদেশ সীরাত মিশন চট্টগ্রাম জেলা শাখার সভাপতি, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজ কল্যাণ সমিতির সহ-সভাপতি। ১৯৬০ সাল থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য ছিলেন। তিনি ঢাকার বাংলা কলেজের গভর্নিং বড়ির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। কবি কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিশের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি আলেমা খাতুন ভাসানীর নেতৃত্বধীন ন্যাপ ভাসানীর সাবেক কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় ঈদ জামাত কমিটির সাবেক প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ সমাজকল্যাণ সমিতির সহ-সভাপতি, চকবাজার আজিজুর রহমান জনকল্যাণ পরিষদ, সমাজ কল্যাণ ত্রাণ কমিটি, অপরাধী সংশোধন সংস’া, আলহাজ্ব নুর মোহাম্মদ সওদাগর আলকাদেরী (রঃ) স্মৃতি সংসদের সদস্য, ডঃ মাহফুজুল হক স্মৃতি সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি, কবি আলাদীন আলীনুর সাহিত্য সংসদের সম্পাদক, বাংলাদেশ দ্বীনি একাডেমী এবং খোলাফত আলা মিনহাজিন নবুয়াত সদস্য ছিলেন।
মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবদী গবেষণা একাডেমীর কেন্দ্রের সভাপতি ছিলেন। তিনি শাহ মোহাম্মদ বদিউল আলম, মঘীস’ানে (দক্ষিণ চট্টগ্রাম) ইসলাম প্রচার, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও ডক্টর এম মাহফুজূল হক পুস-কের লেখক। তিনি ২০০১ সালে শেরে বাংলা জাতীয় পুরষ্কার লাভ করেন। একই সালে ঢাকাস্থ চট্টগ্রাম সমিতি, সমিতিতে অসমান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সমিতির সম্মাননা পদক লাভ করেন। সাংবাদিকতায় কৃতিত্ব পূর্ণ অবদানের জন্য ২০০১ সালে বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি চন্দনাইশ ইউনিট তাঁকে স্বর্ণ পদকে ভুষিত করেন, ২০১০ সালে মরনত্তোর সাংবাদিক সফিউদ্দিন আহমদ পদক পান।
তিনি ১৯৯১ সালে ন্যাপ ভাসানীর পক্ষে চট্টগ্রাম মহানগর (চট্ট- ৯), ১৯৯৬ সালে চন্দনাইশ ও ২০০১ সালে সাতকানিয়া- লোহাগাড়া আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
সাংবাদিকতা জীবনে তিনি অসংখ্যবার প্রেস ইনষ্টিটিউটের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। প্রবীণ বয়সেও প্রশিক্ষণে অংশ নিতে দ্বিধা করতেন না। ২০০৩ সালের প্রথম দিনে উচ্চরক্ত চাপ, জ্বর, ডায়াবেটিস, প্রষ্টেট গ্লান্ডের আকৃতি বড় হওয়া ইত্যাদি রোগের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হন। দীর্ঘ আড়াই মাস হাসপাতালে কাটিয়ে বাসায় ফিরলেও প্রচন্ড শারীরিক দুর্বলতার কারণে শয্যাশায়ী থেকে যান। তখন আর সভা-সমাবেশে যেতে পারেন নি।
টানা ১ বছর ১ মাস ১১ দিন চট্টগ্রাম শহরের পাঠানটুলীস’ বাসভবনে চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি ২২ এপ্রিল ২০০৪ বৃহস্পতিবার রাত ৮ টা ৫ মিনিটে শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন। ২০১২ সালের এই দিনে ৮ম মৃত্যু বার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে স্মারণ করছি।

লেখক ঃ যুগ্ন-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, (বাসাস) কেন্দ্রীয় কমিটি।
ইমেল : [email protected]