স্মরণ : একজন বিস্মৃত ভাষাসৈনিক ও সাংবাদিক

সোমবার, ১৮/০২/২০১৩ @ ১১:৩২ অপরাহ্ণ

॥ মীযানুল করীম ॥

satkania journalistসত্তরের দশকের মাঝামাঝি। ফেনী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ভার্সিটিতে ভর্তির ব্যাপারে গিয়েছি চট্টগ্রাম। বন্দরনগরীর কদমমোবারক এলাকায় একজন পরিচিত লোকের ঠিকানায় গিয়ে উঠলাম। পাশেই ঐতিহাসিক কদমমোবারক মসজিদ। একদিন নির্জন দুপুরে দেখি, একজন মোটা গোছের মাঝবয়সী লোক মসজিদের বারান্দায় একাকী বসে কী সব কাগজপত্র দেখছেন মনোযোগ দিয়ে। মানুষটির মুখে চাপদাড়ি, গায়ে সাধারণ পোশাক। দেশের আর দশজন সাধারণ নাগরিকের মতো।
আসলে ইনি বিশিষ্ট ভাষাসৈনিক ও অভিজ্ঞ সাংবাদিক ছৈয়দ মোস্তফা জামাল। চট্টগ্রামে তাকে দেখার আগেই বোধ হয় নামটার সাথে পরিচিত ছিলাম। যখন মসজিদে দেখেছিলাম, তার কাছাকাছি সময়ে একদিন সেখানে মনীষী মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর কবরের পাশে তার স্মরণসভা হয়েছিল। যতটা মনে আছে, ওই অনুষ্ঠানে বিনোদবিহারী চৌধুরী, অ্যাডভোকেট বদিউল আলম, হাকিম আলতাফুর রহমান প্রমুখের সাথে মোস্তফা জামালেরও বক্তব্য শুনেছিলাম।

তার বাবা ছৈয়দ ছোলতান ও মওলানা ইসলামাবাদী দু’জনই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে নেতাজী সুভাষ বোসের গোপন আজাদ হিন্দ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দু’টি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। মোস্তফা জামালের বাবা ছিলেন ১৯৩৯ সালে নিখিল বঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। বাবা যেমন শিক্ষাবিস্তারের মাধ্যমে সমাজসেবার ব্রত নিয়েছিলেন, তেমনি ছেলে সাংবাদিকতাকে একই উদ্দেশ্যে গ্রহণ করেছিলেন। মোস্তফা জামাল মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর দৈনিক আজাদ, প্রখ্যাত সাংবাদিক মুজিবুর রহমান খাঁ সম্পাদিত দৈনিক পয়গাম ও দৈনিক নাজাতে সাংবাদিকতা করেছিলেন। এ ছাড়া চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদীর ঢাকা ব্যুরোর প্রথম দায়িত্বশীলরূপে অনেক দিন কাজ করেছেন। তিন যুগেরও অধিক কাল তিনি জড়িত ছিলেন সংবাদপত্রের সাথে। তিনি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহকারী মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছিলেন।
আজকাল ভাষাসৈনিকের ছড়াছড়ি রাজনৈতিক আশীর্বাদের সুবাদে। ভাষা আন্দোলনের সাধারণ সৈনিকও ছিলেন না প্রকৃত অর্থে, এমন অনেকে প্রচার পাচ্ছেন অসাধারণ ভাষাসেনাপতি হিসেবে। অথচ ছৈয়দ মোস্তফা জামালের মতো ত্যাগী ও সংগ্রামী ভাষাসৈনিক আজ সম্পূর্ণ বিস্মৃত। সাংবাদিক মহলে কিংবা চট্টগ্রামেও রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনে ও সাংবাদিকতায় তার ভূমিকা সম্পর্কে তেমন কেউ খবর রাখেন না। মোস্তফা জামাল রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য এবং চট্টগ্রামে বৃহত্তর সাতকানিয়া শাখার আহ্বায়ক ছিলেন বলে জানা যায়। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছিল যে সাপ্তাহিক পত্রিকা, সেই ‘সৈনিক’-এর সহসম্পাদক ছিলেন। কাজ করেছেন ভাষা আন্দোলনের প্রাণপুরুষ প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের ‘দ্যুতি’ পত্রিকাতেও। ষাটের দশকে ভাষাসৈনিক আবুল কাসেমের বিশেষ উদ্যোগে এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সহায়তায় ঢাকার মিরপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙলা কলেজ। প্রতিষ্ঠাকালেই এই মহতী উদ্যোগে মোস্তফা জামাল সম্পৃক্ত হয়েছিলেন।

বাংলাভাষাকে ক্রমশ উচ্চশিক্ষার মাধ্যমরূপে প্রচলন করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। ছৈয়দ মোস্তফা জামাল ছিলেন নীরবে নিভৃতে কাজ করার মানুষ। চালচলনে অতিসাধারণ এবং একান্তই প্রচারবিমুখ। তার পরনে মামুলি প্যান্টশার্ট কিংবা পাঞ্জাবি-টুপি, পায়ে স্যান্ডেল, হাতে কাগজপত্র ভর্তি একটি ব্যাগ; রাস্তায় ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছেন এমন দৃশ্য আমাদের অনেকের চোখে ভাসে।
চট্টগ্রামের মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের মতো ব্যক্তিকেও আমরা অনেকটা ভুলতে বসেছি। ভুয়া, দলবাজ ও প্রচারবাতিকগ্রস্তদের হিড়িকে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ও শামসুল হকের মতো ভাষাসৈনিক বিস্মৃত। সাংবাদিকতার অঙ্গনে আকরম খাঁ ও আবদুস সালামের মতো কিংবদন্তি ব্যক্তিদেরকেও তুলে ধরা হচ্ছে না। সে দেশে ছৈয়দ মোস্তফা জামালের মতো নিরীহ, নির্বিরোধ, সরল মানুষকে স্মরণ না করাই যেন নিয়তি। তবুও এবার চট্টগ্রামে স্মরণসভার আয়োজন করেছেন কয়েকজন সহৃদয় ব্যক্তি। মোস্তফা জামাল ৬৯ বছর বয়সে ২০০৪ সালের ২২ এপ্রিল ইন্তেকাল করেন। আজ অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তার রূহের মাগফিরাত কামনা করি।

লেখক: একজন ফ্রি ল্যান্স সাংবাদিক ও কলাম লেখক, ইতিহাস চর্চ্চা কেন্দ্র চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি, ব্যক্তিত্ব গবেষণা কেন্দ্র , চট্টগ্রামের নির্বাহী পরিচালক ও সাধারণ সম্পাদক -বর্তমান , মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান স্মৃতি ট্রাষ্ট্র,সাতকানিয়ার অবৈতনিক সচিব(২০০৭-বর্তমান). এবং জাতীয় তরুণ লেখক সমিতি চট্টগ্রাম-ঢাকা;র সাবেক সভাপতি (১৯৮৮-১৯৯২)

সর্বশেষ