একজন সাংবাদিকের প্রতিকৃতি

সোমবার, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৩

জাহিদ রেজা নুর

সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী ও বার্তা সম্পাদক। ইংরেজ আমলের শেষে তার সাংবাদিকতা জীবনের শুরু, পাকিস্তান আমলজুড়ে তিনি ছিলেন সক্রিয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ৬ দিন আগে, ১০ ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরের একটি দল তাঁকে শান্তিনগরের ভাড়া বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
shiraj
সিরাজুদ্দীন হোসেনের জীবন ও কর্মের মূল্যায়নের চেষ্টা খুব একটা হয়নি। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সিরাজুদ্দীন হোসেনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ব্যাপারে স্মৃতিকথা লিখেছেন, তাতে মূল্যায়নের কিছু আভাসও আছে; সবগুলো লেখা এক করে নিয়ে পড়লে হয়তো একজন নির্ভীক সাংবাদিক বেরিয়েও আসবেন। কিন্তু স্মৃতিপটে সিরাজুদ্দীন হোসেন নামের বইটি পড়ার মতো ধৈর্য কেন থাকবে সাধারণ পাঠকের, যখন তাকে নিয়ে, তার কর্মকাণ্ড নিয়েও নেই আলোচনা-প্রচারণা। তাঁর স্মৃতিরক্ষার ক্ষেত্রেও নেই রাষ্ট্রীয় কোনো উদ্যোগ। পারিবারিকভাবে তার মৃত্যুবার্ষিকীতে (আসলে অন্তর্ধান দিবস) কিছু আয়োজন না করলে তাকে ভুলেই থাকে মানুষ।

সিরাজুদ্দীন হোসেন সম্পর্কে জানা এ জন্যই জরুরি যে তিনি কোনোদিন শাসক শ্রেণীর কারো কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি স্তরে তার যুক্ততা ছিল। কলম সচল ছিল প্রতিটি ক্ষেত্রেই। এ কারণেই আন্দোলনকারী সর্বমহলের কাছেই তিনি ছিলেন প্রিয় পাত্র।

আমাদের মনে রাখতে হবে, তিনি কাজ করতেন ইত্তেফাকে। মানিক মিয়ার ইত্তেফাক ছিল স্বাধিকার আন্দোলনের সেই সময়কার মুখপত্র। রাষ্ট্রবিপ্লব কিংবা সমাজ-বিপ্লব-এর কোনোটার পক্ষে ছিল না ইত্তেফাক। ভোটের রাজনীতির প্রতিই আস্থা ছিল ইত্তেফাকের।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন বাঙালীকে তার সংস্কৃতি, রাজনীতি চেতনায় দীপ্ত করেছিল, তার পথ ধরেই বিকশিত হয়েছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদ। রাজনীতির মাঠে কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপের মতো সমাজ বদলের আহ্বান জানানো দলগুলো থাকলেও কেন আওয়ামী লীগের দিকেই বাংলাদেশের জনগণের আস্থার প্রকাশ ঘটল, তার বিশ্লেষণ করতে গেলেও বাঙালী জাতীয়তাবাদের কথা এসে পড়ে। আর হ্যাঁ, আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ইত্তেফাকের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। সেই ইত্তেফাকেই বার্তা সম্পাদক ছিলেন সিরাজুদ্দীন হোসেন।

শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, শামসুদ্দীন মোল্লা, আসফউদ্দৌলা রেজা, কাজী গোলাম মাহবুবরা ছিলেন সিরাজুদ্দীন হোসেনের সহপাঠী। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে তারা একত্রে পড়তেন। ইংরেজ শাসনের শেষদিকে পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে এঁরা সবাই ছিলেন সোচ্চার। লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তানের মন্ত্রে এঁরা সবাই দীক্ষিত হয়েছিলেন। জিন্নাহ এঁদের চোখে ছিলেন স্বপ্নের মহানায়ক। আগাগোড়া বিলেতি সাহেব জিন্নাহ যখন পাকিস্তান আন্দোলন শুরু করলেন, তখন এই অঞ্চলের মুসলমানেরা তাঁকে সমর্থন দিলেন। এই অঞ্চলের মেধাবী হিন্দুরা দেশত্যাগ করলে যে মেধাশূন্যতা হবে, তা কীভাবে পূরণ করা হবে, সে চিন্তাও তখন কারো মাথায় ছিল না। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানার কোনো ধারণা পর্যন্ত ছিল না। সাতচল্লিশের দেশবিভাগের পর পরই সঙ্গত কারণে বাংলার মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়েছিল, পাকিস্তানী শাসকদের মতলব। মূলত ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই পূর্ববঙ্গের বাঙালী প্রথম আত্মপরিচয়ের সন্ধানে সচেষ্ট হয়, সেই ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামে একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার এই রাষ্ট্র গঠিত হয়।

এই পুরো সময়টিতে সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন সক্রিয়। কলকাতার আজাদ পত্রিকায় তার চাকরি জীবন শুরু হয়েছিল। বার্তা বিভাগে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরু করার সময়ই তার সাংবাদিকতা জীবনের প্রজ্ঞা ও দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়। মোহাম্মদ মোদাব্বেরের স্মৃতিচারণের ওপর নির্ভর করলে বলতে হয়, ১৯৪০ সালের শেষভাগে জনৈক আহম্মদ হোসেন কলেজ থেকে আনকোরা বেরিয়ে আসা সিরাজুদ্দীন হোসেনকে তার কাছে নিয়ে আসেন। সংবাদ বিভাগে একটি চাকরির আর্জি ছিল তার। সাংবাদিকতায় অনভিজ্ঞ এই তরুণকে কী করে কাজ দেবেন মোহাম্মদ মোদাব্বের? এর আগে অনেক এমএ পাস ছেলেও ধোপে টেকেনি। তারপরও মোহাম্মদ মোদাব্বের, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, কেজি মুস্তাফা, রুহুল কুদ্দুস প্রমুখের উপর দায়িত্ব দেয়া হয় সিরাজকে কাজ শেখাবার। খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস অবশ্য বলেছেন, তিনিই সিরাজকে মোহাম্মদ মোদাব্বেরের কাছে নিয়ে এসেছিলেন।

কে জি মুস্তাফা লিখেছেন ১৯৪৮ সালে দৈনিক আজাদে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু সংবাদ প্রকাশের প্রসঙ্গটি। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, সংবাদপত্র একটি টিমওয়ার্কের ব্যাপার। বার্তা বিভাগের মূল দায়িত্বে থাকেন বার্তা সম্পাদক। যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, তখন দৈনিক আজাদ প্রকাশিত হচ্ছে কলকাতা থেকে। পত্রিকার বার্তা সম্পাদক মোহাম্মদ মোদাব্বের। রাত একটার মধ্যে যে খবরগুলো এসেছে, সেগুলো দিয়ে ডামি করে কম্পোজ করিয়ে সাংবাদিকরা যে যার বাড়ি ফিরে গেছেন। যাঁরা হোস্টেলে থাকতেন, তারা অত রাতে আর হোস্টেলে ফিরতে পারতেন না, তাই রাতে ঘুমানোর জন্য তাদের সম্বল ছিল অফিসের টেবিল। রাত কাটানোর জন্য সিরাজুদ্দীন হোসেনের দখলেও তখন বার্তা বিভাগের টেবিল।

রাত দেড়টার দিকে সিরাজুদ্দীন হয়তো ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য উঠেছিলেন। টেলিপ্রিন্টারের খটখট শব্দ শুনে কৌতূহলী হয়ে তিনি টেলিপ্রিন্টারে একটি খবর দেখে চমকে উঠলেন। জিন্নাহর মৃত্যুসংবাদ। বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সিরাজুদ্দীন হোসেন সেই সংবাদটি অনুবাদ করে ডামি ভেঙে খবরটি ধরিয়ে প্রেসে পাঠিয়ে দিলেন। কারো সঙ্গে আলোচনা না করে এই কাজটি তিনি করেছিলেন পত্রিকার সংবাদ প্রকাশের গুরুত্বটি ভেবে।

সেদিনের কথাটি মুস্তাফা নূরউল ইসলামের বর্ণনায় এ রকম: “…দুচারদিনের মধ্যেই জানা গেল সেই ব্যাপারটা-কলকাতার অফিসে কী কাণ্ড করেছিল সিরাজ। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিরোধানের সংবাদ এসেছে টেলিপ্রিন্টারে। তখন গভীর রাত। ফার্স্ট পেজের মেকআপ সেরে প্রিন্ট অর্ডার দিয়ে নিউজের নাইট এডিটর বাড়ি চলে গেছেন। সিনিয়ররাও আর কেউ নেই। সবাই যার যার মতো ঘরে ফিরে গেছেন। সিরাজ কেবল অফিসে। এদিকে ফর্মা মেশিনে উঠেছে। ভোর রাতে পত্রিকা ছেপে, ভাঁজা হয়ে শেষ করতে হবে। কনিষ্ঠতম সাংবাদিক সিরাজ বিরাট সেই দায়িত্বটা নিয়েছিল যা করবার অধিকার তার ছিল না। মেশিন থেকে ফর্মা নামিয়ে মেকআপ ভেঙে সংবাদটা মুদ্রণের ব্যবস্থা করেছিল। নইলে কী হতো? স্টেটসম্যান, অমৃতবাজার, আনন্দবাজার, যুগান্তরে বেরোত সেই সংবাদ আর পাকিস্তানের ঝাণ্ডাধারী আজাদে নেই পাকিস্তানের জনক ‘কায়েদে আজমে’র এন্তেকালের খবর। বলা যেতে পারে আজাদকে সে যাত্রায় একপ্রকার বাঁচিয়ে দিয়েছিল সিরাজ।” এভাবেই সিরাজুদ্দীন হোসেন সাংবাদিকতার সামনে সারিতে চলে আসেন।

দেশবিভাগের কিছুদিন পর কলকাতা থেকে ঢাকায় আসার পর আজাদের সঙ্গেই সখ্য ছিল তাঁর। মনে রাখতে হবে, আজাদ তখন মুসলিম লীগের মুখপত্র। তবু সেই পত্রিকাটি ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২২ তারিখ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত যে ভূমিকা পালন করেছে, তা অতুলনীয়। সে সময় সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন আজাদের বার্তা সম্পাদক। আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন পরিষদ থেকে বেরিয়ে আসায় এবং মাওলানা আকরম খাঁর সঙ্গে মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দের পরিচ্ছন্ন বিরোধ থাকায় আজাদের পক্ষে এই ভূমিকা নেওয়া সহজ হয়েছিল। সে সময়কার আজাদে সিরাজুদ্দীন হোসেন যে কীর্তি গড়েছেন, তা অমর হয়ে থাকার মতো।

কে জি মুস্তাফা তাঁর লেখায় সে কথা উল্লেখ করেছেন এইভাবে, “বার্তা সম্পাদকরূপে সিরাজুদ্দীন হোসেনের সাফল্য অনন্য সাধারণ। শুধু সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নয়, রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও।”

মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ। তাঁর পত্রিকায় ১৯৫০ সালের দাঙ্গা-বিরোধী সংবাদ পরিবেশন এবং ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীর ছাত্রহত্যার সংবাদ ব্যানার হেডলাইনে প্রকাশ শুধু সৎসাহসের পরিচায়ক নয়, আন্দোলনের সঙ্গে সাংবাদিকদের গভীর একাত্মতাবোধের পরিচায়কও বটে। এই একাত্মবোধ ছিল বলেই সিরাজুদ্দীন হোসেন সাংবাদিকদের কাতারে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবেই থাকবেন।
ভাষা আন্দোলনের নানা ঘটনা তিনি পরে বিশ্লেষণও করেছেন। দুর্ভাগ্য আমাদের, সিরাজুদ্দীন হোসেনের অভিজ্ঞতাজাত তথ্যকে কেউ কোনোদিন কাজে লাগায়নি। অথচ সে সময়ের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকের বার্তা সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পেছনে কমিউনিস্টদের সম্পৃক্তি খোঁজার চেষ্টা সবসময়ই করে গেছে তৎকালীন সরকার। সরকারি ট্রাস্টের বাংলা ও ইংরেজি দুটি পত্রিকায় যখন তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রীর ‘যে কথা এতদিন বলিনি’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, তখন সিরাজুদ্দীন হোসেন ‘ভাষা আন্দোলনের ডায়েরি’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখে মুখ্যমন্ত্রীর মিথ্যাচারের কড়া প্রতিবাদ করেন। মুখ্যমন্ত্রী নানা কূট কৌশলে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত ঘটনার জন্য আদৌ তিনি দায়ী নন।

মুখ্যমন্ত্রী লিখেছিলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারী তারিখে গুলিবর্ষণের সময় আমি পরিষদে ছিলাম। দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমি সব কথা জানতে পারি। গুলিবর্ষণ সম্পর্কে আমি কিছুই অবহিত ছিলাম না। কারণ এটা ছিল শহরের প্রশাসনিক দায়িত্ব। এ ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে আমার কিছুই করণীয় ছিল না। ঘটনাস্থলে তদানীন্তন ডিআইজি, পুলিশ সুপার ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন এবং তারাই বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।’

সিরাজুদ্দীন হোসেন লিখলেন, “মুখ্যমন্ত্রীর উপযুক্ত কথাই বটে। পরিষদের দু’শো গজের মধ্যে ছাত্ররা বিক্ষোভ করিতেছে। মুখ্যমন্ত্রী পরিষদে গিয়াছেনও, কিন্তু কিছুই তিনি দেখেন নাই, কিছুই তিনি শোনেনও নাই। গুলীবর্ষণের মত ঘটনাটিও তিনি ‘অবহিত’ ছিলেন না, কেননা ওটা ছিল শহরের প্রশাসনিক দায়িত্ব। অতএব, মুখ্যমন্ত্রীর তাতে কি করিবার থাকিতে পারে? কেউ যখন মুখ্যমন্ত্রী হইয়াও ‘নৈর্ব্যক্তিক মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা’ পালন করেন, তখন আর তার সম্পর্কে কিই-বা বলিবার থাকিতে পারে। তবে তিনি যখন বলিতে চাহেন যে ‘রাজনৈতিক ছাত্রমাত্রেই জানেন, ঘটনার অন্তরালেও ঘটনা থাকে যা একজন দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি ইচ্ছে করলেই ব্যক্ত করতে পারেন না’, তখন স্বভাবতই রাজনীতির ছাত্রমাত্রের জন্যই অতীতের বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাসের কিছুটা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন হইয়া পড়ে বৈকি।” এরপর সিরাজুদ্দীন হোসেন বায়ান্নর ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিনগুলিতে কী ঘটেছিল, তার মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করে দেন যে, ক্ষমতায় থাকলে নেতাদের এক চেহারা, আর ক্ষমতাহীন অবস্থায় আরেক চেহারা।

সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন আগাগোড়া অসাম্প্রদায়িক একজন মানুষ। ১৯৬৪ সালে পূর্ববাংলায় যখন দাঙ্গা শুরু হলো, তখন এই প্রবণতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন তিনি। দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। পত্রিকার ব্যানার হেডিং হলো, ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও।’ এই শিরোনাম দাঙ্গা প্রতিরোধে যথার্থ অবদান রেখেছিল।

অনামী-ছদ্মনামে সিরাজুদ্দীন হোসেন উপসম্পাদকীয় লিখতেন। শালীনতা বজায় রেখে তীব্র ভাষায় কীভাবে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে আঘাত করা যায়, তার নমুনা পাওয়া যায় এ সকল উপসম্পাদকীয়তে। একটি দৃষ্টান্ত: “সাক্ষাৎ অভিজ্ঞতা হইতে যখনই পত্রিকার পৃষ্ঠায় কলেরায় মৃত্যুর কোন খবর ছাপা হইয়াছে, সঙ্গে সঙ্গে প্রেসনোটে তাহার প্রতিবাদ আসিয়াছে। পত্রিকার খবরকে মিথ্যা আখ্যায়িত করিয়া বলা হইয়াছে, ‘কলেরায় নয়, স্ট্রং ডাইরিয়ায় লোকটার মৃত্যু হইয়াছে’ জানি না মৃত্যুর ঘটনাটি অস্বীকার করিতে না পারিলেও কলেরাকে স্ট্রং ডাইরিয়া বলিয়া চালাইয়া তাহারা কী বুঝাইতে চাহিতেন। এদেশে অনাহারে কাহারও মৃত্যু হইয়াছে, সরকারি তদন্তে কখনো তাহা সপ্রমাণিত হইতে দেখা যায় নাই। অতীতে এদেশের স্ট্রংম্যানদের ধমকে আমাদের অফিসারদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও অনেক কিছু করিতে হইত, আমরা জানি। কিন্তু বর্তমানে পরিবর্তিত পরিবেশে সে অবস্থা যখন আর নাই, তখন সর্বক্ষেত্রে আমলা মহলের মানসিকতার আমূল পরিবর্তন হইবে, ইহাই সকলে আশা করিয়াছিলাম।

কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের প্রতিবাদের ব্যাপারে আমরা আজও সেই একই ট্রাডিশন অনুসৃত হইতে দেখি। খবর প্রকাশিত হইল, ‘পাবনা জেলার সুজানগর থানার কয়েকটি গ্রামের জনসাধারণ বন্যায় মারাৱক ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। অনেক ঘরবাড়ী ও ক্ষেতের ফসল বিনষ্ট হইয়াছে। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্যবৃদ্ধিহেতু অনেককে উপবাসে কাটাইতে হইতেছে।’ সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন যন্ত্রের তৎপরতা শুরু হইল। স্বয়ং ডিসি এবং এসডিও সাহেব সরেজমিনে তদন্ত করিলেন। তদন্তে নাকি তাহারা দেখিলেন, খবরটি অত্যন্ত ‘অতিরঞ্জিত’ ও ‘সঠিক নহে’। প্রেসনোটের মাধ্যমে জানাইলেন, ‘আসল ঘটনা হইল পদ্মা নদীর জলসীমা বৃদ্ধি পাওয়ায় সুজানগর থানার নিম্নাঞ্চলের কতিপয় স্থানে পানি প্রবেশ করে; কিন্তু ঘরবাড়ী বা ফসলের কোনো ক্ষতি হয় নাই।’ ডিসি এবং এসডিও সাহেব আবার লিখিলেন, ‘অনাহার বা উপবাসের কোন ঘটনা নাই এবং খাদ্যশস্যের উচ্চমূল্যের কোনো খবরও তাদের গোচরে আসে নাই।’ তদন্তের বলিহারি রিপোর্টই বটে! প্রকাশিত রিপোর্টটিতে এমন অভিযোগ ছিল না, যাহাতে আকাশ ভাঙ্গিয়া মাথায় পড়িতে পারিত। কিন্তু খবরটিকে মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত বলিয়া চিহ্নিত করিতে গিয়া তাঁহারা যাহা বলিয়াছেন, তাহাতে আশ্বস্ত বোধ করিবার মত কিছু আছে কি?

সুজানগর থানার নিম্নাঞ্চলের কতিপয় বাসগৃহে পানি প্রবেশ করিল, কিন্তু ঘরবাড়ী বা ফসলের কোনো ক্ষতি হইল না-ইহা কেমন কথা! পানির ধর্ম স্কুলের ছাত্রদেরও জানা। এতদসত্ত্বেও যখন শুনি নিম্নাঞ্চলে প্রবেশকালে বন্যার পানি লাফাইয়া জমিজিরাত পার হইয়া কেবল বসতবাড়ীতে প্রবেশ করে, তখন অবস্থাটা কী দাঁড়ায়? দ্বিতীয়ত প্রদেশের গ্রামাঞ্চলে খাদ্যপরিস্থিতি আজ কাহারও অজানা নহে। এতদসত্ত্বেও সুজানগরের বন্যা উপদ্রুত অঞ্চলে কেহ যদি অনাহারে বা উপবাসে না থাকিয়া থাকে; খুশীর কথা। কিন্তু তদন্তকারী অফিসারদ্বয় এ প্রশ্নেও রায় দিতে গিয়া স্থানীয় অধিবাসীদের প্রতি কতখানি সুবিচার করিয়াছেন, তাহা কেবল তাহারাই বলিতে পারেন।”

অনুসন্ধানী রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে জনকের ভূমিকায় ছিলেন সিরাজুদ্দীন হোসেন। এবিএম মূসা লিখেছেন, “সিরাজুদ্দীন হোসেন শুধু এশিয়ার নয়, বিশ্বের সাংবাদিকতায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিলেন ‘ছেলে ধরা’ সম্পর্কে ইত্তেফাকে কয়েকটি সত্য ঘটনা উদঘাটন করে। অনুসন্ধানমূলক রিপোর্টিং-এ। তার এই অবদান সাংবাদিক জগতে বিরাট আলোড়ন তুলেছিল।”
রোকনুজ্জামান খান (দাদাভাই) লিখেছেন, ‘ষাটের দশকের কথা। পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকে তখন আশঙ্কাজনকভাবে শিশু অপহূত হচ্ছে, দৈনিক ইত্তেফাকে এ সম্পর্কিত সংবাদও ছাপা হচ্ছে। সংঘবদ্ধ শিশু অপহরণকারী দলের কারসাজির ফলেই যে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, সে বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু একদিন পূর্ববঙ্গ পুলিশের আইজি এক প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করে মন্তব্য করলেন যে, শিশু অপহরণের এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা।’ আইজির প্রেস কনফারেন্সের এ সংবাদ ইত্তেফাকেও ছাপা হলো। এবং পরক্ষণেই সিরাজুদ্দীন হোসেন পুলিশের এ মন্তব্য মিথ্যা প্রমাণ করবার জন্য চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। আর এই প্রচেষ্টার ফলে শিশু অপহরণের একবিরাট কাহিনী উদ্ঘাটিত হলো। রূপকথার মতোই সে কাহিনী ছিল বিস্ময়কর ও ভয়াবহ।

“সিরাজুদ্দীন হোসেন দু’জন রিপোর্টার পাঠালেন ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও, ত্রিশাল ও ভালুকা-এই তিন থানার বিরাট সীমান্ত অঞ্চল ছিলো গোচারণ ভূমি। এই বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে লম্বা লম্বা ঘাস জন্মাতো। কোনো ফসলের আবাদ হতো না। এক একটি ঘাস মানুষের মাথা ছাড়িয়ে যেত।…গোচারণ ভূমির মাঝে মাঝে ছিল ছোট ছোট চালাঘর, রাখালদের রান্না এবং রাতে মাথা গোঁজার জন্য। সংঘবদ্ধ শিশু অপহরণকারীরা ছোট ছোট ছেলেদের চুরি করে এই গোচারণ ভূমিতে নিয়ে আসত। এখানে ছিল তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ঘন তৃণভূমির মাঝে মাঝে ছিল ফাঁকা জায়গা। এই সব জায়গায় লোক-চক্ষুর আড়ালে চলতো অপহূত শিশুদের নানারূপ অসামাজিক কাজের প্রশিক্ষণ। তাদের পকেটমারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। কেউ শিখতো ঘেটুনাচ। কচি শিশুদের হাত-পা বিকলাঙ্গ করে ভিক্ষার কাজেও লাগানো হতো।…শিশু অপহরণকারীদের এই স্বর্গরাজ্য আবিষ্কৃত হলো সিরাজুদ্দীন হোসেনের উদ্যোগে, ইত্তেফাকের সাংবাদিকদের জীবন বাজীরাখা প্রচেষ্টায়।”

বাংলা সংবাদপত্রে কাজ করতেন বলে সিরাজুদ্দীন হোসেনের সার্বিক প্রতিভা বাইরের জগতে সুপরিচিত ছিল না। তবে তখন আইপিআই-এর এশীয় শাখার প্রধান ছিলেন বাঙালী-অমিতাভ চক্রবর্তী। তাঁর সুবাদেই সিরাজুদ্দীন হোসেন বহির্বিশ্বে পরিচিত হয়েছিলেন।

“১৯৬১ সালের মার্চ মাসে ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় এশীয় সেমিনারে সংবাদপত্রে সংবাদ পরিবেশনের কায়দা-কানুন সম্পর্কে একদল সাংবাদিক পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোর নগরীতে এক সেমিনারে যখন আলোচনা করছিলেন, তখন কে ভাবতে পেরেছিল যে, বৈঠকের এই আলোচনা সহস্র মাইল দূরে পূর্ব পাকিস্তানের বহু শিশুর উপকারে আসবে? তবু একটি দৈনিকের একজন সাংবাদিক সন্ধানী মন ও ধৈর্য সহকারে এই সেমিনারে প্রাপ্ত শিক্ষাকে বাস্তবায়িত করতে গিয়ে বিরাট সাফল্য অর্জন করেছেন।”-আইপিআই বুলেটিনের সম্পাদক হ্যারল্ড ইভান্স এভাবেই মূল্যায়ন করেছিলেন সিরাজুদ্দীন হোসেনকে।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় ইত্তেফাকের সংবাদ পরিবেশনা ছিল অসাধারণ। তবে একাত্তর সালটি ছিল সিরাজুদ্দীন হোসেনের রাজনৈতিক সাংবাদিকতার উজ্জ্বলতম অধ্যায়। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার কথা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১ মার্চে পরিষদ স্থগিত করে বাঙালীদের হূদয়ে যে ক্ষোভের আগুন জ্বেলে দিলেন, তাতেই জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে গেল পাকিস্তান।

সে সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের সমর্থনে ইত্তেফাকের মিশন জার্নালিজম আজ ইতিহাসে সাধারণ উৎসুক মানুষ একে অন্যকে জিজ্ঞেস করতেন, আজকের ইত্তেফাকের হেডিংটা কী ছিল? ইত্তেফাক যা লিখছে, সেটাই ছিল বাঙালীর ভাষ্য। আন্দোলনের বিভিন্ন স্তরে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সঠিক পরামর্শ দিয়েছেন সিরাজুদ্দীন হোসেন। দেশের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকাটির বার্তা সম্পাদকের বিশ্লেষণ শোনার পর শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে তাঁর সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া সহজ হতো।

আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সেদিনকার সাংবাদিকতা ও রাজনীতির সম্পর্কটিকে স্পর্শ করা কঠিন কাজ। সে সময় যাঁরা সাংবাদিকতা করতেন, তাঁদের ছিল আন্দোলন করার ইতিহাস। রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিল প্রগাঢ়। তাঁরা রাজনীতিবিদদের ভাবনা-চিন্তাকে প্রভাবিত করার মতো বলিষ্ঠ ছিলেন। কখন কোন বিবৃতি দেওয়া উচিত, কোন বিবৃতি ছাপা উচিত হবে না, এগুলো নিয়েও পত্রিকার বার্তা সম্পাদকরা রাজনীতিবিদদের পরামর্শ দিতেন। এমনকি বিবৃতি না দিলেও শেখ মুজিবুর রহমান অথবা তাজউদ্দীন আহমদের নামে পত্রিকায় বিবৃতি পেস্টিং হয়ে যাওয়ার পর তাঁদেরকে জানানো হতো, আজ তাদের এই বিষয়ে বিবৃতি যাচ্ছে। সে সময় পত্রিকাই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচারমাধ্যম। টেলিভিশন ছিল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত। টেলিভিশন দেখার সঙ্গতিও ছিল না সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের। তাই পত্রিকার-সংবাদের ওপরই নির্ভর ছিল দেশের মানুষ।

১ মার্চ যখন ইয়াহিয়ার বেতার ভাষণে পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা এলো, তার পর থেকেই ইত্তেফাকে প্রকাশিত হতে থাকল একের পর এক জ্বালাময়ী রিপোর্ট। মানুষকে আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে সেই রিপোর্টগুলো ছিল এক কথায় অসাধারণ।

সিরাজুদ্দীন হোসেনের শিরোনামগুলোর দিকে নজর দেওয়া যাক। ৩ মার্চ তিনি শিরোনাম করলেন, ‘বিক্ষুব্ধ নগরীর ভয়াল গর্জন’। ‘আমি শেখ মুজিব বলছি’ শিরোনামে জনগণের উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের বিবৃতি প্রকাশিত হলো। শেখ মুজিব বলেছেন, ‘সৃশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালন এবং যাতে লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগের মতো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে তার প্রতি কড়া নজর রাখার জন্য আমি জনগণের প্রতি আহ্বান জানাইতেছি।’ শেখ মুজিব শান্তি ও শৃঙ্খলার মধ্যেই আন্দোলন চালিয়ে যেতে বলেছিলেন।

৫ মার্চে সিরাজুদ্দীন হোসেন ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম করেছিলেন, ‘জয় বাংলার’ জয়। এখানে দেখতে হবে ঊর্ধ্ব কমা দুটি কোথায় আছে। জয় বাংলা বলতে বাংলাদেশকেই বোঝানো হচ্ছে।

এভাবে প্রতিদিনই শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য জানিয়ে দেয়া হতো দেশবাসীকে। সিরাজুদ্দীন হোসেন একাত্তরে দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেননি অথবা নিতে পারেননি। মূলত দশজনের বিশাল সংসারটিই তাঁকে ঢাকায় থাকতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে বার বার তিনি প্রবাসী সরকারের কাছে গোপন তথ্য পাঠিয়েছেন। বিশেষ করে এখানকার পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন কনসুলেট প্রধান আর্চার ব্লাডের রিপোর্টটি তিনি গোপনে তাজউদ্দীন আহমদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। মুসলিম লীগের কোন নেতা অবরুদ্ধ বাংলায় দালালি করে কী বাগিয়ে নিচ্ছে, তা নিয়ে ‘ঈমানের বরকতে’ শিরোনামে তথ্য পাঠিয়েছেন।

ইত্তেফাকের রিপোর্টার শফিকুল কবিরের স্মৃতিচারণে ঘটনাটি এ রকম: “সিরাজ ভাইয়ের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয় ৩০শে নভেম্বর, মঙ্গলবার। ইত্তেফাকে তাঁর জন্য বসে অপেক্ষা করছি। বাইরের কাজ সেরে তিনি অফিসে এলেন সাড়ে বারোটার দিকে। অফিস কক্ষে প্রথমেই রাইটিং প্যাড টেনে নিয়ে খুব দ্রুত কিছু লিখতে লাগলেন। মাত্র একটি স্লিপ লেখার পরই অফিস কক্ষে অন্যান্য লোকজন ঢুকে গেল। তিনি লেখা বন্ধ করলেন। লেখা স্লিপটি সতর্কভাবে গুঁজে দিলেন আমার হাতে। কিছুক্ষণ পর লোকজনের ভীড় কমলে তিনি বললেন, ‘অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এই তথ্যগুলো আমি পেয়েছি। তোকে আরও কিছু জোগাড় করে দেব। এগুলো ‘ওপারে’ পাচার করার ব্যবস্থা করতে হবে।’ সিরাজ ভাইয়ের লেখা সেই স্লিপটি এখনো সঙ্গে করে বয়ে বেড়াচ্ছি। তার হুবহু অনুলিপি তুলে ধরছি এখানে-

“ঈমানের বরকতে”
১. মন্ত্রী আবুল কাশেম-ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ের মালিক, বর্তমান নাম কাশেম টেঙটাইল মিলস।
২. মওলানা আমিনুল ইসলাম-সদরঘাটের বিখ্যাত ব্রাহ্মসমাজ লাইব্রেরী ও যাবতীয় সম্পত্তির মালিক। এপ্রিলের প্রথমভাগে লাইব্রেরী লুট করিয়ে ১০ টাকা মণ দরে বই বিক্রি করেন। ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ ইৎরঃধহরহপধও একই দরে বিক্রি হয়। সম্প্রতি নিজ নামে এ্যালট করিয়ে দখলদার।
৩. মাওলানা আবদুল মান্নান-মদনমোহন বসাক মন্দির ভবনের বর্তমান মালিক।”

একাত্তরের অবরুদ্ধ বাংলায় বসেই তিনি যে পত্রিকা বের করেছেন, তাতে সূক্ষ্মভাবে বাঙালীর বিজয়বার্তা প্রকাশিত হয়েছে।

কীভাবে সিরাজুদ্দীন হোসেন বিভিন্ন প্রতিবেদনকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রবাহিত করতেন, তার পরিচয় পাওয়া যাবে ১৯৭১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামীর মূখপত্র দৈনিক সংগ্রামের সংখ্যাটিতে। তারা তাদের প্রতিবেদনের নাম দিয়েছিল, ‘শিরোনামে কারচুপি’। রিপোর্টটির কিছু অংশ তুলে দেওয়া হলো : “…সম্প্রতি আমাদের সহযোগী (ইত্তেফাকের কথা বলা হচ্ছে-লেখক) এ পুরনো রীতিকে নতুনভাবে রপ্ত করতে শুরু করেছেন দেখা যাচ্ছে। সহযোগীটি দেশের স্বার্থানুকূল সংবাদ পরিবেশন করতে বেশ অস্বস্তি বোধ করে থাকেন। দেশের জনসাধারণের জন্য নিরুৎসাহজনক খবর পরিবেশন করার পক্ষে তাঁর উৎসাহ যেন অপেক্ষাকৃত বেশী। কিন্তু সেন্সরশীপ এবং সেন্সরশীপের পর সুস্পষ্ট সামরিক নির্দেশের বাধা সামনে থাকায় সহযোগীটি স্পষ্টভাবে মুখ খুলতে পারছে না। কিন্তু দুরভিসন্ধি চরিতার্থের প্রবণতাকে আটকেও রাখতে পারছেন না। তাই নিরুপায় সহযোগীটি সংবাদ বিকৃত করার পথ পরিত্যাগ করে শিরোনামাকে দুরভিসন্ধি চরিতার্থের একটি মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এমনভাবে শিরোনাম দেয়ার কসরত করছেন যাতে করে তা দুরভিসন্ধি চরিতার্থের সহায়ক হয়। …১৩ই সেপ্টেম্বর এপিপি কুমিল্লা থেকে একটি খবর পরিবেশন করে। খবরে বলা হয়, গৃহত্যাগীদের একটি দল পাকিস্তানে ফিরে আসার সময় হিন্দুস্থানী সেনারা তাদের উপর গুলী চালায়। এতে ৬ জন গৃহত্যাগী নিহত হয় এবং ২২ জন আহত হয়। এপিপির খবরে আরও বলা হয়, সীমান্ত এলাকায় পাহারারত পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের নিরস্ত্র ভাইবোনদের উপর ভারতীয় সৈন্যদের গোলাবর্ষণের মত এহেন উষ্কানীমূলক কার্যকলাপ সত্ত্বেও অসীম ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। এ সংবাদের কোথাও কোনো অস্পষ্টতা নেই এবং সন্দেহেরও কোনো অবকাশ নেই। ঘটনার নিখুঁত বিবরণই শুধু এতে দেয়া হয়নি, আমাদের সেনাবাহিনী ঘটনাটি প্রত্যক্ষও করেছেন। কিন্তু সহযোগীটি এ সংবাদের এমন শিরোনামা দিয়েছেন যার মধ্যে বিমাতাসুলভ মনোভাব সুস্পষ্ট। সহযোগী সংবাদটির শিরোনামা দিয়েছেন, ‘প্রত্যাগমনেচ্ছু উদ্বাস্তুদের উপর ভারতীয় গুলীবর্ষণের অভিযোগ’।

শিরোনামাটি পড়লে প্রত্যেকেরই এ ধারণা হবে যে, সহযোগী তৃতীয় পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে সংবাদটি মূল্যায়ন করেছেন। সংবাদটিতে তার কোনো আগ্রহ নেই। অন্যের সংবাদ পরিবেশন করা হলো মাত্র-এধরনেরই একটি ভাব পরিস্ফুট। অন্যান্য পত্রিকার সঙ্গে তুলনা করে দেখলে সহযোগীটির সাথে অন্যান্য পত্রিকার মানসিকতার পার্থক্য পরিষ্কার বোঝা যাবে। দৈনিক পাকিস্তান আলোচ্য সংবাদটির শিরোনামা দিয়েছিল, ‘ভারতীয় সৈন্যরা এখন পথে মাইন পুতে রাখছে ও গুলি করছে’। আজাদের শিরোনামা ছিল, ‘ভারতীয় চর ও সৈন্যদের প্রোথিত মাইন বিস্ফোরণে বহু লোক হতাহত।’ সংগ্রামের শিরোনামা ছিল, ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকারীদের উপর ভারতীয় সৈন্যরা গোলাবর্ষণ করছে’। পূর্বদেশের শিরোনামা ছিল, ‘ওরা আসার পথে মাইন পেতেছে।’ দৈনিক পয়গামের শিরোনামা ছিল, ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে বাধা দেয়ার জন্য গোলাবর্ষণ, পাকিস্তানী নাগরিকদের ফেরার পথে মাইন স্থাপনের ফলে ১৩ জনের মৃত্যু’। এসব শিরোনামার সাথে আমাদের আলোচ্য সহযোগীর শিরোনামাটিকে পাশাপাশি রাখলেই বোঝা যায় সহযোগীর মনে কী রয়েছে এবং কি বলতে চাচ্ছেন।”

আরো একটি সংবাদের শিরোনাম নিয়ে সংগ্রাম তুলনা করেছে। এরপর প্রশ্ন তুলেছে এভাবে: হিন্দুস্থানের বিরুদ্ধে যায় এবং আমাদের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল হয়, এমন সব খবরের শিরোনামা নির্ধারণে সহযোগীটির পজেটিভ ভূমিকার অভাব কেন? তৃতীয়পক্ষের দৃষ্টিই বা তিনি অনুসরণ করছেন কোন কারণে? কিন্তু ২৫শে মার্চের পূর্বে তো সংবাদের শিরোনামা নির্ধারণে তাঁর পজিটিভ ভূমিকার অভাব ও তৃতীয় পক্ষের দৃষ্টিকোণ দেখি না? ২৫শে মার্চের পরে কে তাহলে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে? কিন্তু কেন ঘটেছে? হিন্দুস্থান ও তার অনুচরদের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে গোটা জাতি আজ যে অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে ব্যাপৃত, তার সাথে কি সহযোগীর কোন দ্বিমত রয়েছে? মুসলমানদের স্বার্থের চেয়ে হিন্দু স্বার্থ তার কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে কি?”

এই একটি উদাহরণ থেকেই বোঝা যায়, সিরাজুদ্দীন হোসেনের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস ইত্তেফাক তখন কী করছিল। মনোযোগী পাঠক বিটউইন দ্য লাইনস পড়ে বুঝে নিতে পারতেন ইত্তেফাক কী বলতে চাইছে। এখানে আরো একটি বিষয় মনে করিয়ে দিতে চাই, ইত্তেফাক ছাড়া আর যে পত্রিকাগুলো প্রকাশিত হতো সেগুলো কিন্তু যথার্থই গা বাঁচিয়ে চলেছে। অথচ স্বাধীনতার পর সে সকল পত্রিকা স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াতে রীতিমত প্রতিযোগিতা শুরু করে।

সিরাজুদ্দীন হোসেনকে নিয়ে, তার সাংবাদিকতা নিয়ে, গবেষণা হওয়া উচিত বলে মনে করি। তাঁর অনুবাদ, তাঁর খবর রচনা ও সম্পাদনা ইত্যাদি নতুন যুগের সাংবাদিকদেরও প্রেরণা জোগাবে। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ নিয়ে তাঁর একটি অনবদ্য বই আছে, লুক ইনটু দ্য মিরর নামে। সেই বইটি ইতিহাসের ছাত্রমাত্রেরই অবশ্যপাঠ্য। কিন্তু সে বইটির খবর কি কেউ রেখেছে? ইংরেজি থেকে অসংখ্য বই তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছেন এবং তাতে দেশীয় মহান ব্যক্তিদের সংযুক্ত করেছেন, সে-ইতিহাস ক’জনার জানা?

আসলে একজন মানুষের মূল্যায়ন করতে হলে যে মমত্ববোধ ও বিষয়ের প্রতি গভীর জ্ঞান প্রয়োজন, তার অভাবেই আমরা মূল্যায়নের পথ মাড়াই না। আর একারণেই সিরাজুদ্দীন হোসেনের মতো মানুষেরা রয়ে যান দৃষ্টির আড়ালে। সিরাজুদ্দীন সম্পর্কে কয়েকজন সাংবাদিকের মূল্যায়ন দিচ্ছি এ কারণে যে, এটাকে আমি শেষের শুরু বলে মনে করছি। সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন বলেছেন, “দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক ও পরবর্তী সময়ে কার্যনির্বাহী সম্পাদকরূপে তিনি যে ভূমিকা রেখে গিয়েছেন, তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশেষ করে দৈনিক ইত্তেফাকের সংবাদ পরিবেশন, সংবাদের শিরোনাম রচনা এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের যে ধারা বা ট্রাডিশন সিরাজুদ্দীনের হাতে রচিত হয়, তা এ অঞ্চলের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নতুন পথের সূচনা করে।…তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ইত্তেফাক আজ যে পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে তার ভিত রচনায় সিরাজুদ্দীনের কৃতিত্ব খাটো করে দেখা যায় না। একটি পত্রিকা চালু হয় সুষ্ঠু টিমওয়ার্কের উপর। পত্রিকার টিম ওয়ার্কের নেতৃত্বের দক্ষতার ওপরও কাজের সার্বিক সাফল্য নির্ভর করে। দুর্বল নেতৃত্ব ব্যর্থতাই ডেকে আনে। আমার মনে হয়, সিরাজুদ্দীন হোসেনের নেতৃত্ব ছিল বলিষ্ঠ। সেই সঙ্গে তার দক্ষতাও ছিল অনুকরণীয়।”

ইব্রাহিম খাঁ বলেছেন সিরাজুদ্দীন হোসেনের অনুবাদ বিষয়ে। তাঁর ভাষায়, ‘ফ্রাঙ্কলিন প্রকাশনার পরিচালক আবদুল মতিন সাহেব একদা সিরাজুদ্দীন হোসেন সাহেবকৃত একটি ইংরেজী থেকে বাংলা তরজমা আমাকে দেখতে দিলেন। তার তরজমার মুনশীয়ানা, তার ভাষার চমৎকারিত্ব, তার মুক্তোর মত হরফ মনে হলো সবদিক বিবেচনায় তাঁর মত দক্ষ অনুবাদক তৎকালে বাংলা সাহিত্যে বিরল।’

মোহাম্মদ মোদাব্বের ছিলেন সিরাজুদ্দীন হোসেনের প্রথম বার্তা সম্পাদক। তিনি লিখেছেন, “…আরো ভালভাবে যাচাই করার জন্য আমি সিরাজকে নিজের পাশে বসিয়ে বড় বড় সংবাদ ওর হাতে দিতাম এবং তা কিভাবে সংক্ষিপ্ত করে অনুবাদ না করে নিজের ভাষায় লিখতে হবে তা বুঝিয়ে দিয়ে ছেড়ে দিতাম। সিরাজ অতিনিপুণ সাংবাদিকের মত সংবাদ লিখে যখন আমার হাতে দিত, তখন হয়ত আশঙ্কায় ওর বুক দুরুদুরু করতো, কিন্তু আমার অন্তর আনন্দে আপ্লুত হত। মাত্র পনের দিনের শিক্ষানবিশী। তারপর ওর বেতন সিনিয়র সাব এডিটরের পর্যায় ধার্য করলাম। অনেকে আপত্তি করেছে, নতুন মানুষ একেবারে সিনিয়রদের সারিতে এসে গেল? কিন্তু কারুর আপত্তি গ্রাহ্য করিনি। যোগ্যতার মূল্য দিয়েছি, মুখ দেখে বেতন ধার্য করিনি।”

সিরাজুদ্দীন হোসেনের মৃত্যুর পর তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘যাঁহারা ইতিহাস রচনার যোগ্যতা রাখেন, শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন তাঁহাদের অন্যতম। সিরাজের রক্তসিক্ত মাটিতে আমরা সোনার ফসল ফলাইব। শহীদ সিরাজ অর্থ উপার্জনকে বড় করিয়ে দেখেন নাই, বরং সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মাধ্যমে জনগণের সেবা করিয়াছেন। একনিষ্ঠ দেশসেবক সিরাজুদ্দীন হোসেন যে ইতিহাস সৃষ্টি করিয়াছেন, জাতি সেই পথ অনুসরণ করিয়া ভবিষ্যতের দিকে আগাইয়া যাইবে। সেদিনের বহু নিম্নমানের সাংবাদিক ট্রাস্ট পরিচালিত কাগজে কাজ করিয়া প্রচুর অর্থ উপার্জন করিয়াছেন, কিন্তু আদর্শবাদী সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন তাহা করেন নাই।’ সিরাজুদ্দীন হোসেনের মৃত্যুর সাড়ে তিন বছরের মধ্যে একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে তাজউদ্দীন আহমদকেও। তাঁরও মূল্যায়ন হয়নি। এ জাতি কি মূল্যায়নে সত্যিই কৃপণ?

সিরাজুদ্দিন হোসেন দেশ মাতৃকার সমস্ত লড়াই-সংগ্রামে কলম হাতে ছিলেন সক্রিয়। তাই অনেকের ন্যায় তাঁকেও পাকিস্তানী হানাদার দোসর ঘাতকের টার্গেটে পরিণত হতে হয়েছিল। স্বাধীনতার মাত্র সপ্তাহখানেক পূর্বে এদেশের শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করে দেশকে মেধাশূন্য করার চক্রান্ত বাস্তবায়ন করেছিল হানাদার সহযোগী রাজাকার-আলবদর চক্র। স্বাধীন দেশে সেই ঘাতকেরা রয়ে গেছে বিচারের আওতামুক্ত। ঘাতক-যুদ্ধাপরাধীদের আমরা বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করতে পারি নি। পক্ষান্তরে সংবিধান কেটে-ছেঁটে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দুয়ার উন্মোচন করে এদেরকে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করা হয়েছে। চিহ্নিত ঘাতক নেতাদের মন্ত্রী করে ক্ষমতার অংশীদার পর্যন্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক সুবিধার মোহে ঘাতকদের কৃত অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত হয় নি।

স্বাধীনতার পর দালাল আইনে এদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। অভিযুক্ত অনেকের সাজা হয়েছিল। অনেকের বিচারও চলছিল। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর রক্তাক্ত ঘটনার পরই সব পাল্টে যায়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী সামরিক সরকারে চিহ্নিত ঘাতকদের মন্ত্রীও করা হয়। যার ধারাবাহিকতা গত সরকারেও আমরা দেখেছি। যুদ্ধাপরাধী-ঘাতকদের বিচার করতে না পারার খেসারত দিতে হয়েছে ও হচ্ছে জাতিকে। দেশে বর্তমানে যে অনির্বাচিত ও অরাজনৈতিক সরকার বিরাজ করছে তারা তাদের সাংবিধানিক এখতিয়ার বহির্ভূত নানা কর্ম করে চলেছে অথচ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে জনদাবী উপেক্ষা করে রহস্যজনকভাবে নীরব। ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। রাষ্ট্র ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনেকে যেমন একইভাবে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে নীতিগতভাবে সম্মত। তাহলে বিচারের বাধাটা কোথায়? অতীতের সরকারগুলোর ন্যায় বর্তমান সরকারের নিশ্চয় রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নেই। তাহলে দেশ-জাতি-মানবতার এই শত্রুদের কেন বিচার হবে না? এই প্রশ্ন ত্রিশলক্ষ বীর শহীদদের পরিবারের সদস্যদের যেমন, একইভাবে দেশবাসীরও। তথ্যসূত্র: ত্রৈমাসিক নতুনদিগন্ত