মাসুদ নিজামী সার্থক-চিরঞ্জীব

সোমবার, ১৮/০২/২০১৩ @ ১১:০২ অপরাহ্ণ

শেখ রকিব উদ্দিন

আমার পেশাগত সাংবাদিকতাজীবন প্রায় ৫৫ বছরের। এই অর্ধশতাব্দীর সাংবাদিকতাজীবনে দেশ ও বিদেশে এক ডজনের বেশি পত্রিকার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলাম। দীর্ঘ সাংবাদিকতাজীবনে বহু দেশি-বিদেশি প্রতিভাধর সাংবাদিকের সাহচর্যে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার। তাদের মধ্যে মরহুম মাসুদ নিজামী অন্যতম।

masudঅধুনালুপ্ত ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে আমি সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দিই। তার বেশ সময় পর মাসুদ নিজামীর সঙ্গে আমার পরিচয়। এরপর তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও পেশাগত মৈত্রী গড়ে ওঠে। মাসুদ নিজামীর সাংবাদিকতাজীবন মূলত শুরু হয় দৈনিক আজাদেই। এর আগে তিনি কিছুদিন ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকায় কাজ করেছেন। পরবর্তীকালে তিনি ‘দৈনিক মিল্লাত’, ‘দৈনিক ইনকিলাব’সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার মধ্য দিয়ে এ দেশের সাংবাদিকতা পেশার বিকাশে অবদান রাখেন।

প্রায় চার-পাঁচ বছর আমার সহকর্মী ছিলেন মাসুদ নিজামী । স্বাধীনতার আগে ও পরে আমি রিপোর্টিং বিভাগের দায়িত্বে ছিলাম আর মাসুদ নিজামী ছিলেন ডেস্কের সিনিয়র পদে। সম্ভবত, শিফট ইনচার্জ। সেদিনের ‘দৈনিক আজাদ’-এর শিফট ইনচার্জ অত্যন্ত মর্যাদাবান ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে সর্বক্ষেত্রে সমাদৃত হতেন। ডেস্কের দায়িত্বে থাকলেও তিনি দেশ-বিদেশের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে মাঝে মাঝে উপসম্পাদকীয় লিখতেন। তার লেখার দৃষ্টিভঙ্গি, বাংলা ভাষার ওপর দখল, শব্দচয়ন, উপস্থাপনা, প্রকাশভঙ্গি এবং বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানের গভীরতা আমাকে মুগ্ধ করত। ওই সময় মাসুদ নিজামী একজন প্রথম শ্রেণীর সাংবাদিক ও প্রবন্ধকার ছিলেন। বিশেষ করে, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের ওপর তার লেখার দক্ষতা ছিল অসাধারণ। তার মধ্যে আরেকটি প্রতিভা আমি লক্ষ করেছি- তিনি ছিলেন একজন প্রথম শ্রেণীর অনুবাদক। ইংরেজি থেকে বাংলায় তর্জমা করায় মাসুদ নিজামীর যে দক্ষতা, তা সবাইকে বিস্মিত করত। ওই সময় দৈনিক আজাদ ছাড়াও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কর্মরত সাংবাদিকেরা তার ভূয়সী প্রশংসা করতেন।

সাংবাদিক ইউনিয়নে মাসুদ নিজামী অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। ‘দৈনিক আজাদ’-এর ইউনিট চিফ হিসেবে তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ শুরু করেন। এই কাজে আমি তাকে উৎসাহিত করতাম। এরপর ধীরে ধীরে নিজ যোগ্যতা ও প্রতিভায় মাসুদ নিজামী সাংবাদিক ইউনিয়নের বিভিন্ন পদ অলংকৃত করেন এবং সার্থকভাবে দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু দুঃখজনক, মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে তিনি আর সক্রিয় সাংবাদিকতা পেশা অব্যাহত রাখতে পারেননি। অপরিণত বয়সে মাসুদ নিজামী এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে যান। সম্ভবত ব্যাধিগ্রস্ত মাসুদ নিজামী একসময় বিএফইউজের সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

মাসুদ নিজামীকে যারা দেখেছেন, তার সাহচর্যে এসেছেন; যারা একবার তার প্রতিভা প্রত্যক্ষ করেছেন; তার স্পষ্টভাষী ও বিনয়ী ব্যবহারের আওতায় যারা একবার এসেছেন, তাদের স্মৃতিপটে মাসুদ নিজামী চির অমর, চির অম্লান হয়ে থাকবেন।

তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য দুটি পঙক্তি দিয়ে শেষ করতে চাই:
‘জীবনের ক্লান্ত তরঙ্গ ক্ষণকালের জন্য তটভূমিতে আছড়ে পড়ে/ আবার ফিরে গেল সে মহাসমুদ্রের অতল নীরে।’

সব গুণে গুণান্বিত, বিশেষ করে, সাংবাদিক অন্তঃপ্রাণ এই মানুষটির জীবন সার্থক, চিরঞ্জীব। আমি তার আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।