ওরিয়ানা ফালাচি ও জুলফিকার আলী ভুট্টো (৩)

বুধবার, জানুয়ারি ১, ২০১৪

:: কাজী আবুল মনসুর ::

ওরিয়ানা ফালাচি ও জুলফিকার আলী ভুট্টো” শিরোনামে সাক্ষাতকারটির
২য় পর্বের শেষে যেখানে এসে থেমেছিল, সেখান থেকে শুরু. . .

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সাথে জুলফিকার আলী ভুট্টো।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সাথে জুলফিকার আলী ভুট্টো।

ওরিয়ানা ফালাচিঃ কিন্তু বিচারে তিনি অভিযুক্ত হয়েছিলেন এবং তার সাজা হয়েছিল।

জুলফিকার আলী ভূট্টোঃ না। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং তখন থেকে সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে সম্পূর্ণ ইয়াহিয়া খানের এখতিয়ারে ছিল তার সাজার ব্যাপারে সিন্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি। এই শাস্তি পাঁচ বছর বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড অথবা মৃত্যুদন্ডও হতে পারতো। কিন্তু ইয়াহিয়া কোন সিদ্ধান্তই নিলেন না। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল এবং তার মনে আরো অনেক কিছু ছিল।

ওরিয়ানা ফালাচিঃ মুজিব আমাকে বলেছিলেন যে, তারা তার কবর খুঁড়েছিল।

জুলফিকার আলী ভূট্টোঃ আপনি জানেন সেই কবরটা কি ছিল? এয়ার রেইড শেলটার। তারা কারাগারের চারপাশের প্রাচীর ঘেঁষে খুঁড়েছল। বেচারী মুজিব। ভীত হয়ে সবকিছুর মধ্যে মৃত্যুর নিশানা দেখেছে। কিন্তু আমি মনে করি না যে ইয়াহিয়া তাকে হত্যা করার কথা ভাবছিলেন। ২৭ শে ডিসেম্বর আমি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করে ইয়াহিয়া খানের সাথে সাক্ষাত করলাম। তিনি উন্মত্ত, মাতাল। তাকে দেখতে মনে হচ্ছিল ডোরিয়ান গ্রে’র পোট্রেট। আমাকে বললেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে মাররাতœক ভুল ছিল মুজিবর রহমানকে মৃত্যুদন্ড না দেয়া। আপনি মনে করলে তা পারেন।’

ওরিয়ানা ফালাচিঃ আপনি কি বললেন?

জুলফিকার আলী ভূট্টোঃ আমি বললাম যে, আমি তা করবো না এবং অনেক ভেবেচিন্তে, আমি মুজিবকে মুক্তি দিতেই প্রস্তুত হলাম। সেনাবাহিনীর কথিত বর্বরতার কারণে সকলের দ্বারা নিন্দিত পাকিস্তানের জন্য কিছু সহানুভুতির প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। ভাবলাম ক্ষমাশীলতায় অনেক সহানুভূতি পাওয়া যাবে। এছাড়া, আমি ভাবলাম যে এই উদারতায় যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে আনার কাজ ত্বরান্বিত হবে। অতএব বিলম্ব না করে লায়ালপুরে নির্দেশ পাঠালাম মুজিবকে রাওয়ালপিন্ডিতে আমার কাছে নিয়ে আসতে। নির্দেশটা সেখানে পৌছলে মুজিব আতংকিত হয়ে পড়লো। জড়ানো কথায় তিনি বলতে চাচ্ছিলেন যে তারা তাকে এখান থেকে বের করে মেরে ফেলবে।

সফরের সময়টাতেও তিনি সুস্থির ছিলেন না, এমনকি তার নির্দিষ্ট বাংলোতে এসেও একই অবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের জন্য চমৎকার বাংলো। আমি যখন একটি রেডিও, একটি টেলিভিশন এবং বেশ কিছু কাপড় চোপড় নিয়ে সেখানে গেলাম তিনি অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে বললেন, ‘আপনি এখানে কি করছেন?’ আমি তাকে বিস্তারিত বললাম যে, আমি প্রেসিডেন্ট হয়েছি। তার সুর পাল্টে গেল সাথে সাথে। দু’হাত আমার গলা জড়িয়ে ধরে বললেন যে তার জীবনে এর চেয়ে আনন্দের কোন খবর নেই। আল্লাহ সবসময় আমাকে পাঠাচ্ছেন তাকে রক্ষা করার জন্য….। এরপরই আমি যা ভেবেছিলাম, তিনি ইয়াহিয়া খানকে আক্রমণ করে আমাকে বললেন যে, আমি তার মুক্তির বিষয় বিবেচরা করতে পারি কিনা। লন্ডন হয়ে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পূর্বে আমি আরো দু’বার তার সাথে সাক্ষাত করেছি।

দু’বারই তিনি কোরান শরীফ বের করে কোরান স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করেছেন যে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করবেন। ভোর তিনটায় আমি যখন তাকে বিদায় জানাই তখনো বিমানে তিনি এই প্রতিজ্ঞার সাথে আমার বুকে বুক মিলালেন, আমাকে ধন্যবাদ জানালেন এবং বললেন, ‘চিন্তা করবেন না মিঃ প্রেসিডেন্ট, আমি শীঘ্রই ফিরে আসবো। আপনার সুন্দর দেশকে আমি আরো ভালভাবে জানতে চাই। আপনার সাথে শীঘ্র আমার দেখা হবে, খুব শীঘ্র’

ওরিয়ানা ফালাচিঃ তাকে মুক্তি দিয়ে আপনি কি কখনো অনুতাপ করেছেন?
জুলফিকার আলী ভূট্টোঃ না, কখনো না। তিনি যাই বলুন না কেন, আমার মত তিনিও একজন পাকিস্তানী। একাধিকবার আমরা একই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছি, একই শাস্তি লাভ করেছি- কিন্তু সবকিছুর উর্ধে আমাদের একটা বন্ধন রয়েছে। জানুয়ারীর একটি দিনে আমি তাকে যেমন দেখেছি সেভাবে তাকে সব সময় স্মরণ করি, তিনি আমার হাত ধরে অনুনয় করেছেন, ‘আমাকে বাচাঁন, আমাকে বাঁচান।’ তার জন্যে আমি আসলেই করুণা অনুভব করি।

বেচারী মুজিব- বেশীদিন পারবে না। আট মাস, বড়জোর এক বছর- এরপরই তাকে অরাজকতা, বিশৃংখলা ইত্যাদি হজম করতে হবে, যা তার নিজেরই সৃষ্টি। আপনিই দেখুন, বাংলাদেশ এখন ভারতের একটি স্যাটেলাইট। শীঘ্রই এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের স্যাটেলাইট হবে। কিন্তু শেখ মুজিব কমিউনিষ্ট নন। তিনি যদি গুছিয়ে উঠতে পারেন তাহলে তো কথা নেই, কিন্তু পারবেন বলে মনে হয় না। সে অবস্থায় তার পিঠের উপরে দেখবেন মাওবাদীদের, যারা যুদ্ধের আসল বিজয়ী। এখনই তারা তার বোঝা হয়ে আছে।

রাজনৈতিকভাবে মুক্তিবাহিনী হিসেবের বাইরে। তাদের না আছে কোন আদর্শিক প্রস্তুতি, না আদর্শনিষ্ঠা অথবা শৃংখলা। সামাজিকভাবে তারা গোলযোগের উৎস- তারা কেবল জানে কিভাবে শূন্যে গুলি করতে হয়। মানুষকে আতংকিত করে, চুরি করে, ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি তোলে। ‘জয় বাংলা’ বলে চীৎকার চীৎকার করে কারো পক্ষে একটি দেশ চালানো সম্ভব নয়। অপরদিকে বাঙ্গালী মাওবাদীরা…. যদিও তারা খুব প্রশিক্ষিত নয়- তবু মাও এর লাল বই অর্ধেক পাঠ করেছে। কিন্তু তারা সুস্পষ্ট একটি শক্তি এবং ভারতীয়রা তাদের ব্যবহার করতে পারবে না। তাছাড়া আমি এটাও মনে করি না যে, তারা পাকিস্তানের ঐক্যের বিরোধী ছিল।

আল্লাহ ভালো জানেন, কিভাবে এই জটিল ও বিপজ্জনক সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব- শুধু কল্পনা করুন, মুজিবকে এগুলো মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তাছাড়া দেশটি বড়ই দুর্ভাগা। জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, ঝড় লেগেই আছে। বলা যায় একটি দুর্ভাগা তারকার নিচে ধেমটির জন্ম। আমাদের ভুললে চলবে না যে দেশটা সবসময়ই বিশ্বের মন্দ অবস্থানে ছিল। আপনি ১৯৪৭সাল অথবা ১৯৫৪ সালের ঢাকা দেখে থাকবেন। একটি নোংরা গ্রাম, সেখানে একটা রাস্তাও ছিল না। আর এখন সবকিছু ধ্বংস করা হয়েছে। সেজন্যে মুক্তিবাহিনীর ডিনামাইটকেও ধন্যবাদ। বাংলদেশ…।

ওরিয়ানা ফালাচিঃ আমি অবাক হচ্ছি, আপনি বাংলাদেশ বলছেন।

জুলফিকার আলী ভূট্টোঃ অবশ্যই আমি বলছি রাগে এবং ঘৃণায়। যদিও এখনো এটি আমার কাছে পূর্ব পাকিস্তান। কিন্তু সঠিকভাবেই অথবা ভুলেই হোক, কিংবা ভারতীয়দের দ্বারা সামরিক কার্যকলাপের ফলেই হোক পঞ্চাশটি রাষ্ট্র এটাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমাকে মানতে হবে। আমিও স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত, যদি ভারত আমাদের যুদ্ধবন্দীদের ফেরত দেয়, যদি বিহারীদের উপর নির্যাতন বন্ধ হয়, যদি পাকিস্তানের ঐক্যের পক্ষের লোকদের উপর নিপীড়ন না করা হয়।

আমরা যদি নিজেদেরকে আবার একটি ফেডারেশনে যুক্ত করি, তাহলে প্রথমেই আমাদেরকে ক’টনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে এবং আমার মনে হয় দশ অথবা পনের বছরের মধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ একটি ফেডারেশনে যুক্ত হতে পারে এবং হওয়া উচিত। তা না হলে এ শুণ্যতা কে পূরণ করবে পশ্চিমবঙ্গ, ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়। পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিম বঙ্গের মানুষের মধ্যে অভিন্ন কিছুই নেই। পূর্ববঙ্গের বাঙ্গালী ও আমাদের মধ্যে ধর্ম অভিন্ন। ১৯৪৭সালে দেশবিভাগের ধারণাটা ছিল চমৎকার।

ওরিয়ানা ফালাচিঃ আপনি চমৎকার বলছেন? দুই হাজার কিলোমিটার দূরে দু’টি জায়গা নিয়ে একটি দেশের জন্ম এবং তার মাঝখানে ভারত?
জুলফিকার আলী ভূট্টোঃ এই দুটি ভ’খন্ডই পচিঁশ বছর একত্রে ছিল, সকল ভুলভ্রান্তির পরও। একটি রাষ্ট্র শুধুমাত্র ভৌগলিক বা ভ’খন্ডের ধারণা নয়। যখন পতাকা এক, জাতীয় সঙ্গীত এক, ধর্ম এক- দরত্ব সেখানে কোন সমস্যাই নয়। মোঙ্গলরা যখন ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল তখন এই অংশের মুসলমানরা একশ’দিনে দেশের অপর প্রান্তে যেতো। এখন বিমানে মাত্র দু’ঘন্টার পথ। আমার কথা কি আপনি বুঝতে পারছেন।

ওরিয়ানা ফালাচিঃ না মিঃ প্রেসিডেন্ট। আমি বরং ইন্দিরা গান্ধিীকে ভালো বুঝি যখন তিনি বলেন যে, ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ ছিল ভুল এবং ১৯৭০ এর দশকে ধর্মের নামে যুদ্ধ হাস্যকর।

 জুলফিকার আলী ভুট্টো।

জুলফিকার আলী ভুট্টো।

জুলফিকার আলী ভূট্টোঃ মিসেস গান্ধির স্বপ্ন একটাই- গোটা উপমাহাদেশ দখল করা, আমাদেরকে শাসন করা। তিনি একটা কনফেডারেশন পছন্দ করেন, যাতে বিশ্ব থেকে পাকিস্তান মিশে যায় এবং সেকারণেই তিনি বলেন, আমরা ভাই-ইত্যাদি। আমরা ভাই নই। কখনো ভাই ছিলাম না। আমাদের ধর্ম আমার আত্নার গভীর পর্যন্ত, আমাদের জীবন ব্যবস্থার মধ্যে। আমাদের সংস্কৃতি ভিন্ন, দৃষ্ঠিভঙ্গি ভিন্ন। জন্ম থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত একজন হিন্দু ও একজন মুসলিম আইন ও রীতির অধীন, যার মধ্যে কোন আপোষ নেই। দু’টিই শক্তিশালী ও আপোষহীন বিশ্বাস। ইতিহাসে দেখা গেছে দু’টোর কোনটিই একে অপরের সাথে আপোষে পৌঁছতে পারেনি। শুধুমাত্র রাজতন্ত্রের একচ্ছত্র শাসনে, -বিদেশী আধিপত্যের সময় অর্থ্যাৎ মোঙ্গল থেকে বৃটিশ পর্যন্ত কোন রকম জোড়াতালি দিয়ে আমাদেরকে এক রাখা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু একটি ঐক্যবদ্ধ প্রীতির সম্পর্ক কোনদিন গড়ে উঠেনি।

ইন্দিরা গান্ধী আপনাকে যেভাবে বলেছেন, আসলে হিন্দুরা সেরকম শান্ত বা ন¤্র সৃষ্টি নয়। তাদের পবিত্র গরু সম্পর্কে তারা শ্রদ্ধাশীল কিন্তু মুসলমানদের প্রতি নয়। তারা সবসময় আমাদের সাথে দুর্ব্যবহার ও অত্যাচার করেছে। ১৯৪৪সালে আমার সাথে একটি ঘটনা আমি কোনদিন ভুলবো না। আমার আব্বা-আম্মার সাথে কাশ্মীরে ছুটি কাটাতে গেছি। অন্য বালকরা যা করে আমিও তেমনি দৌড়ে পাহাড়ে উঠছিলাম নামছিলাম এবং এক পর্যায়ে আমি খুব পিপাসার্ত হলাম। অতএব আমি নিকটেই এক লোকের কাছে গেলাম। যে পানি বিক্রি করছিল। পানি চাইলাম। লোকটি পানির মগ ভরলো। আমার হাতে দিতে গিয়েও থেমে জিজ্ঞাসা করলো, ‘তুমি হিন্দু না মুসলমান?’ উত্তর দিতে আমার দিদ্বা হচ্ছিল- ক্ষিপ্ত হয়ে পানিটা চাইলাম। শেষে বললাম, ‘আমি মুসলমান।’ লোকটি মাটিতে ফেলে দিল পানির মগ উপুড় করে। ঘটনাটা ইন্দিরা গান্ধীকে বলবেন।

ওরিয়ানা ফালাচিঃ আপনারা দু’জন পাশাপাশি দাঁড়াতে পারেন না, পারেন কি?

জুলফিকার আলী ভূট্টোঃ আমি তাকে শ্রদ্ধাও করি না। আমার কাছে তিনি একজন সাধারণ নারী, সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্না। তার মধ্যে বড় কিছু নেই। শুধু যে দেশটা তিনি শাসন করেন সেটা বড়। আমি বলতে চাই, সিংহাসনটার কারণে তাকে বড় মনে হচ্ছে, যদিও তিনি খুব ছোট এবং তার নামটাও। বিশ্বাস করুন, তিনি যদি শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী হতেন, তাহলে আরেকজন মিসেস বন্দরনায়েক ছাড়া কিছুই হতেন না। যদি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হতেন…..। অবশ্য আমি তাকে গোন্ডা মেয়ার এর সাথে তুলনা করতে চাই না। গোন্ডা মেয়ার তার চেয়ে অনেক উপরে। তার একটা সুন্দর মন আছে, সুস্থ বিচারশক্তি আছে এবং তাকে ইন্ধিরা গান্ধির চেয়ে আরো অনেক কঠিন সমস্যার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়। তাছাড়া গোন্ডা মেয়ার ক্ষমতায় এসেছেন তার নিজের মেধার ফল।

অপরদিকে মিসেস বন্দরনায়েক ক্ষমতায় এসেছেন মিঃ বন্দরনায়েকের বিধবা স্ত্রী হওয়ার কারণে এবং ইন্ধিরা গান্ধী ক্ষমতায় এসেছেন নেহেরুর মেয়ে হওয়ার কারণে। নেহেরুর মেয়ে না হলে, তার সকল শাড়িতে, কপালের লাল টিপে, সুন্দর হাসি দিয়েও তিনি কখনো আমাকে আকৃষ্ট করতে সফল হতেন না। লন্ডনে তার সাথে যখন প্রথম সাক্ষাত তখন থেকেই তিনি আমাকে আকৃষ্ট করতে পারেননি। আমরা দু’জনই একটা ক্লাশে যেতাম এবং ইন্দিরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিস্তারিত নোট নিতেন।

তাকে বলতাম ‘আপনি কি নোট নিচ্ছেন, না থিসিস লিখছেন?’ থিসিস সম্পর্কে বলতে হয়, আমি বিশ্বাস করি না যে, অক্সফোর্ড হতে ইতিহাসে ডিগ্রি নেয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে। আমি অক্সফোর্ডে তিন বছরের কোর্স শেষ করেছি দুই বছরে। তিন বছরেও তার পক্ষে কোর্স শেষ করা সম্ভব হয়নি।

ওরিয়ানা ফালাচিঃ আপনি কি একটু বাড়াবাড়ি করছেন না, একটু অন্যায়? আপনি কি সত্যিই মনে করেন যে, তার মাঝে কিছু নেই অথচ দীর্ঘ সময় ধরে টিকে আছেন কি করে? অথবা বলতে চান, তার মাঝে কোন যোগ্যতা নেই, কারণ তিনি নারী?

জুলফিকার আলী ভূট্টোঃ না, না। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মহিলাদের বিরুদ্ধে আমার কোন বক্তব্য নেই, যদিও আমি মনে করি না যে, পুরুষের চেয়ে মহিলারা ভালো রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারে। ইন্দিরা গান্ধী সম্পর্কে আমার অভিমত নৈর্ব্যক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ। জেনেভা কনভেনশনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন না করে এবং আমাদের যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে না দিয়ে যে কঠোর আচরণ তিনি করেছেন সে ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত না হয়েই আমি তার সম্পর্কে বলছি। আমি তাকে সবসময় কিভাবে দেখিঃ একজন স্কুল বালিকার মত সতর্ক ও পরিশ্রমী, কিন্তু উদ্যোগ ও কল্পনাশক্তিশূন্য একজন নারী। বলা যায় অক্সফোর্ডে পড়াশুনার সময়- ও লন্ডনে নোট নেয়ার সময় তিনি যেমন ছিলেন, এখন বরং তার চেয়ে ভালো। ক্ষমতা তাকে আতœবিশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু তার সাফল্যের মাঝে সফলতা নেই। সাফল্যের প্রশ্নটির সাথে কতটা তা মেধা যোগ হয়েছে তার অনুপাত দেখতে হবে। পাকিস্তান ও ভারত যদি কনফেডারেশনভুক্ত দেশ হতো তাহলে মিসেস গান্ধির পদটা লাভ করা আমার পক্ষে কঠিন হতো না। তার সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বন্দ্বে আমার কোন ভয় নেই। আমি বলতে চাই, তিনি যখন যেখানে চান সেখানেই তার সাথে সাক্ষাত করতে আমি প্রস্তুত। ঠিক ভিয়েনার কংগ্রেসের পর ট্যালীব্যান্ডের মতো। যে বিষয়টি আমাকে পীড়া দেয় তা হলো ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিকট হতে গার্ড অব অনার এবং সেই ভদ্রমহিলার সাথে দৈহিক সংস্পর্শ। এ ভাবনা আমাকে পীড়িত করে। হায় আল্লাহ। এটা যেন আমাকে ভাবতেও না হয়। বরং আমাকে বলুন, মিসেস গান্ধি আমার সম্পর্কে কি বলেছেন?

ওরিয়ানা ফালাচিঃ তিনি বলেছেন, আপনি ভারসাম্যহীন একজন লোক। আজ এক কথা বলেন, আগামীকাল আরেকটা। কেউ বুঝতে পারে না আপনার মনে কি আছে?

জুলফিকার আলী ভূট্টোঃ হ্যাঁ। আমি সরাসরি এর জবাব দিচ্ছি। দার্শনিক জন লকের একটি বক্তব্যই আমি করেছিঃ “ছোট মনের গুণই হলো সামঞ্জস্যবিধান।” অন্যভাবে বলা যায়, আমি মনে করি একটি মৌলিক ধারণা অত্যন্ত দৃঢ় থাকা উচিত। মূল ধারণার মধ্যে একজন অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করতে সক্ষম হয়। একবার এই প্রান্তে, আরেকবার অপর প্রান্তে। একজন বুদ্ধিজীবি কখনো একটিমাত্র ও সংক্ষিপ্ত ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না- তার ভাবনার স্থিতিস্থাপকতা থাকা উচিত। তা না হলে একটি গন্ডির মধ্যে গোঁড়ামির মধ্যে তিনি নিমজ্জিত হন। একজন রাজনীতিবিদও তাই। রাজনীতি একটি আন্দোলন- এবং রাজনীতিবিদকেও হতে হবে সচল। একবার তাকে ডানে, আরেকবার বামে যেতে হবে। তাকে আসতে হবে দ্বন্দ্ব ও সন্দেহ নিয়ে। অব্যাহতভাবে তার পরিবর্তন হবে, পরীক্ষা নিরীক্ষা করবেন, সবদিক থেকে আক্রমণ করবেন। ফলে বিরোধীর দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে আঘাত হানতে পারবেন। মূল ধারণার দিকে যিনি দ্রুত মনেযোগী হন, তার কাছেই শিখা যায়। তার কাছেই শিখুন যিনি সত্য প্রকাশ করেন।

দৃশ্যতঃ সামঞ্জস্যতা বুদ্ধিমান মানুষের প্রধান গুণ। মিসেস গান্ধি যদি তা না বুঝেন, তাহলে তিনি তার পেশার সৌন্দর্য বুঝেন না। তার পিতা এ বিষয় খুব ভালোভাবে বুঝেছিলেন।

চলবে….

লেখক: সম্পাদক, প্রেসবার্তাডটকম।