স্মরণ: সাংবাদিক মাসুদ নিজামীর জীবন ও কর্ম

সোমবার, ১৮/০২/২০১৩ @ ১০:৫৭ অপরাহ্ণ

এইচ এম জালাল আহমেদ

মাসুদ নিজামী ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের গোয়ালভাওর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা এস এম ওবায়েদ উল্লাহ ছিলেন স্কুলশিক্ষক। মা মোসাম্মদ মরিয়ম জোহরা (৮৫)। স্ত্রী আফজালা বেগম লুলু ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি হাইস্কুলের সিনিয়র শিক্ষক।

masudচার ভাই দুই বোনের মধ্যে মাসুদ নিজামী ছিলেন সবার বড়। তিনি ১৯৬২ সালে এসএসসি, ১৯৬৭ সালে এইচএসসি এবং ১৯৭৪ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে বিএ পাস করেন। মেজ ভাই এ কে এম আনোয়ারুল কাদের (এমএসএস) কৃষিবিদ ও ব্যাংকার। সেজ ভাই এ টি এম এ লতিফ এমবিবিএস ডাক্তার। ছোট ভাই জহিরুল হক রানা (এমএসএস) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সিনিয়র সাংবাদিক ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) কোষাধ্যক্ষ।

মাসুদ নিজামী ১৯৬৯ সালে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকায় সাব-এডিটর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ‘দৈনিক আজাদ’ হয়ে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকায় সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন। এখানে দীর্ঘদিন চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৮০ সালে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধের কারণে কর্মচ্যুত হন।

এরপর তিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক কিষাণ’ পত্রিকায় বিশেষ সংবাদদাতা হিসাবে এবং রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বার্তা’র ঢাকা ব্যুরোতে কাজ করেন। পরে তিনি ‘দৈনিক জনতা’য়ও কিছুদিন কাজ করেন। দীর্ঘ বেকারত্বের পর তিনি ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে নতুনভাবে প্রকাশিত ‘দৈনিক মিল্লাত’ পত্রিকায় বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। আরো পরে তিনি ‘দৈনিক ইনকিলাব’-এ প্রথমে বিশেষ সংবাদদাতা এবং পরে নগর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিক ইউনিয়নের কার্যক্রম জোরদার করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে ১৯৯৮ সালে তিনি ‘ইনকিলাব’ থেকে চাকরিচ্যুত হন।

এরপর তিনি ইংরেজি দৈনিক ‘গুড মর্নিং’-এ যোগদান করলেও মূলত তার সম্পাদনায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘পল্লীবাংলা’ নিয়ে তিনি ব্যস্ত থাকেন। তবে অর্থাভাবে এই কাগজটিও নিয়মিত প্রকাশ করতে পারেননি। এ সময় তিনি বরিশাল বিভাগ সাংবাদিক সমিতি, ঢাকার সভাপতি; বাংলাদেশ জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন আন্দোলনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আমৃত্যু এই তিনটি সংগঠনের সভাপতি ছিলেন।

মাসুদ নিজামী কেবল একজন দক্ষ সংবাদকমী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ ইউনিয়নকর্মী ও অসাধারণ সংগঠক। সাংবাদিকতায় আসার আগে তিনি সুনামের সঙ্গে স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। পড়াশোনার ফাঁকে তিনি শিক্ষকতা করে পরিবার ও ছোট ভাই-বোনদের লেখাপড়ায় সহায়তা করেছেন। নানা সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তার নিজের লেখাপড়া যেমন বিঘ্নিত হয়েছে, তেমনি সময়মতো সংসারও শুরু করতে পারেননি।

স্কুলশিক্ষকতা করার সময় ১৯৬৮-৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তিনি স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অবিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়নে তিনি একজন বড় মাপের নেতা ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহসভাপতি ও সহকারী মহাসচিব এবং ডিইউজের সহসভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদকসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সাংবাদিক সমাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তা ছাড়া তিনি বাংলাদেশ উপকূলীয় কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ শ্রমিক মুক্তি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকাস্থ বরিশাল বিভাগ সমিতি এবং মেহেন্দিগঞ্জ সমিতিরও নেতা ছিলেন। এর বাইরে তিনি অনেক সমাজকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

‘দৈনিক ইনকিলাব’ থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর শক্তিমান লেখক, দক্ষ ইউনিয়ন নেতা, অনলবর্ষী বক্তা মাসুদ নিজামীর মন ভেঙে যায়। কার্যত, তিনি সারা জীবনের জন্য বেকার হয়ে পড়েন। মাত্র ৫০ বছর বয়সে তার শেষ বেকারত্ব বলা যায় এটা। এরপর নয় বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। অবশ্য শেষ দুই বছর তিনি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। দীর্ঘ বেকারত্ব, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন তাকে নিদারুণ পীড়া দিলেও তিনি দমার কিংবা আপোষের পাত্র ছিলেন না। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস তাকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলে। অত্যন্ত বিনয়ী, সৎ ও সাহসী মানুষটি একসময় রোগের কাছে পরাস্ত হন।

২০০৫ সালে তিনি কিডনি ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরে গেলেও কিছুদিনের মধ্যে তাকে আবার হাসপাতালে যেতে হয়। শেষ বছরটা তিনি বেঁচে ছিলেন হিমোডায়ালাইসিসের মাধ্যমে। এ সময় সাংবাদিক নেতা, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় তার এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা চলে। সারা জীবন অন্যের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া মানুষটি শেষ জীবনে অন্যের সহযোগিতা নেয়ার প্রয়োজন হওয়ায় মন খারাপ করতেন, হতাশা প্রকাশ করতেন। কারণ, তিনি যে দিতে পছন্দ করতেন, নিতে নয়।

২০০৭ সালের ৩০ জানুয়ারি ৫৯ বছর বয়সে তিনি রাজধানীর মিলেনিয়াম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর অশীতিপর মা, স্ত্রী, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব প্রতিবছরের মতো এবারও তাকে স্নেহ-ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন।

সর্বশেষ