ওরিয়ানা ফালাচি ও জুলফিকার আলী ভুট্টো

বুধবার, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৩

:: কাজী আবুল মনসুর ::

১৯৫০ সালে এল মাত্তিনো দেল'ইতালিয়া সেন্ট্রাল পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন ওরিয়ানা ফালাচি। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধ এবং মিডল ইষ্ট ও দক্ষিন আমেরিকায় তিনি প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি বহু রাষ্ট্রনেতা ও রাজনীতিবিদের সাক্ষাতকার নিয়েছেন। সাক্ষাতকারগুলোতে ফালাচির নিজস্ব সাহসী ও বিতর্কিত ভঙ্গী প্রচুর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

১৯৫০ সালে এল মাত্তিনো দেল’ইতালিয়া সেন্ট্রাল পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন ওরিয়ানা ফালাচি। ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধ কাভার এবং মিডল ইষ্ট ও দক্ষিন আমেরিকায় তিনি প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি বহু রাষ্ট্রনেতা ও রাজনীতিবিদের সাক্ষাতকার নিয়েছেন। সাক্ষাতকারগুলোতে ফালাচির নিজস্ব সাহসী ও বিতর্কিত ভঙ্গী প্রচুর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ইটালির সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচির সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সাক্ষাতকারটি অনেকে পড়েছেন। অনেকে দিয়েছেন মন্তব্য। আসলে যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশ সম্পর্কে সে সময় বলা ছিল কঠিন। তবে আমার মনে হয়েছে ফালাচি আসলে ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে আক্রমন করেছেন বেশি। তারপরও বাংলাদেশ সম্পর্কে বিদেশী এ সাংবাদিকদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলাদা। বর্তমান প্রজন্মের সাংবাদিকদের এ বিষয়গুলো জানার জন্য এ আয়োজন। ভালো এবং মন্দ দুটো দেখার পরে নিজের সিদ্ধান্তটি নেয়া আবশ্যক বলে আমি মনে করি।

একইভাবে ফালাচি সাক্ষাতকার নিয়েছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর। যে সাক্ষাতকারে ভুট্টো কমেন্ট করেছেন শেখ মুজিবর রহমান সম্পর্কে। আবার ফালাচি একই সাক্ষাতকারে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে ভুট্টোর মনোমালিন্য সৃষ্টি করে দেন।

বঙ্গবন্ধু ফালাচিকে ইতিবাচকভাবে আমন্ত্রণ না করলেও ভুট্টো নিজেই সাক্ষাতকার দিতে প্রস্তত ছিলেন। ভুট্টোর ইচ্ছে ছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সাক্ষাতকারের আয়োজন। মূলত বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাতকারটি প্রচারের পরই ভুট্টো তাকে আমন্ত্রণ জানান সাক্ষাত দেয়ার জন্য।

ভুট্টো সম্পর্কে ওরিয়ানা ফালাচির প্রথম মন্তব্য, তীক্ষ্ম বুদ্ধিমান। ধূর্ত, শিয়ালের মতো বুদ্ধিমান। মানুষকে মুগ্ধ করতে পারে। বিভ্রান্ত করতেই তার জন্ম।’

১৯৮৯ সালে প্রকাশিত নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট অবলম্বনে তার সাক্ষাতকারটি পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরলাম..।

ভুট্টো আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন হাসি ছড়িয়ে খোলা হাত বাড়িয়ে। তিনি দীর্ঘ. মেদবহুল। তাকে দেখতে একজন ব্যাংকারের মত, যে কাউকে পেতে চায় তার ব্যাংক একাউন্ট খোলার জন্য। চুয়াল্লিশ বছর বয়সের চেয়েও অধিক বয়স্ক মনে হয় তাকে। তার টাক পড়েছে এবং অবশিষ্ট চুল পাকা। ঘন ভুরুর নিচে তার মুখটা বিরাট। ভারী গাল, ভারী ঠোট, ভারী চোখের পাতা। তার দুচোখে রহস্যময় দুঃখময়তা। হাসিতে কিছু একটা লাজুকতা।

বহু ক্ষমতাধর নেতার মতো লাজুকতায় তিনি দুর্বল ও পঙ্গু। সবারই নিজের মধ্যে দ্বন্দ্ব। যতই তাকে পাঠ করা হোক, ততই সেরকম। অতএব তাকে বহুভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এবং তার প্রতিটিই যথার্থ উদার, কর্তৃত্ববাদী, ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিষ্ট, নিষ্ঠাবান ও মিথ্যুক। নিঃসন্দেহে তিনি সমসাময়িক জটিল নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। শুধুই একজন। যে কেউ বলবে ভুট্টোর কোন বিকল্প নেই। ভুট্টো মরলে পাকিস্তান মানচিত্র হতে মুছে যাবে।

অভিজাত পরিবারে তার জন্ম। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালির্ফোনিয়াতে এবং পরে বৃটেনে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। তিনি ডিগ্রী নিয়েছেন আন্তর্জাতিক আইনে। ত্রিশ বছর বয়সের পরই তিনি আইয়ুব খানের একজন মন্ত্রী হন, যদিও পরে তাকে অপছন্দ করেন। যখন তার বয়স চল্লিশের কিছু কম তখন আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের মন্ত্রী হন। বেদনাদায়ক ধৈর্য্যের সাথে তিনি প্রেসিডেন্টের পদ পর্যন্ত পৌছান। কিছু সহযোগীর দ্বারা এ পর্যন্ত আরোহণকে নিষ্কন্ঠক রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ক্ষমতা প্রেমের চেয়েও অনেক বেশি আবেগের বস্তু। যারা ক্ষমতা ভালোবাসেন তাদের পেট শক্ত, নাকটা আরো শক্ত। বদনামে তাদের কিছু যায় আসে না ভুট্টোও বদনামের তোয়াক্কা করতেন না। তিনি ক্ষমতা ভালোবাসেন। এ ধরনের ক্ষমতার প্রকৃতি আন্দাজ করা কঠিন।..

ভুট্টোর গোপন স্বপ্ন এক নায়ক হওয়া। তার সাথে সাক্ষাতকার সমাপ্ত হয়েছে ছয়দিনে পাচঁটি পৃথক পৃথক বৈঠকে। তার অতিথি হিসেবে কয়েকটি প্রদেশও সফর করেছি এ সময়ে। প্রথম সাক্ষাতকার রাওয়ালপিন্ডিতে, দ্বিতীয় লাহোরের পথে বিমানে বসে, তৃতীয় সিন্ধু হালা শহরে, চতুর্থ ও পঞ্চম বৈঠক করাচিতে। আমি সবসময় তার পাশে বসেছি, টেবিলেই হোক আর যাত্রাপথেই হোক এবং চাইলে আমি তার একটি চিত্রও আঁকতে পারতাম। সমাবেশে বক্তৃতার সময় মাইক্রোফোনের সামনে কর্কশভাবে চিৎকার করেন তিনি, প্রথমে উর্দু পরে হিন্দীতে।

বক্তৃতার সময় দু’হাত আকামে ছুড়তে থাকেন। সবকিছুর মাঝে প্রকাশ করেন কর্তৃত্ব। হালার জনসমাবেশে লোকজন যখন তার কথা শুনার জন্য অপেক্ষা করছে, শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গও সেখানে। কিন্ত তিনি কষে বসে লিখছেন। যখন সভাস্থলে পৌছেন তখন রাত। কার্পেটের উপর দিয়ে রাজপুত্রের মতো পা ফেলে তিনি এগিয়ে মঞ্চে উঠলেন। রাজপুত্রের মতো আসন গ্রহণ করলেন এবং আমিও তার পাশে বসলাম। বেশ কিছু গোফওয়ালা লোকের পাশে আমিই একমাত্র মহিলা, যেন সুপরিকল্পিত একটি প্ররোচনা।

আসনে বসে তিনি দলের নেতাদের, গর্ভনর, বিরোধী নেতাদের একে একে অভ্যর্থনা জানালেন। সবশেষে এক দরিদ্র লোক তার সাথে নিয়ে এলো রঙ্গিন কাপড় ও মালায় সজ্জিত একটি বকরি। এটি তার সম্মানে কোরবানী হবে!

ইনিই হচ্ছেন আভিজত্যের প্রতীক জুলফিকার আলী ভুট্টো। মুসলমান ভুট্টো পাশ্চাত্য সংস্কৃতি যাকে মেওলিকভাবে বদলাতে পারেনি। এটা কোন দুর্ঘটনা নয় যে তার স্ত্রী দু’জন।..ভুট্টো আমাকে তার করাচী ও রাওয়ালপিন্ডির বাড়ীতে আমন্ত্রণ করে তার অবস্থানের পক্ষে যুক্তিগুলো প্রদর্শন করেন- ইন্দিরা গান্ধী, শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া খানকে কঠোরভাবে আক্রমণ করে। তার বাড়ীগুলো রুচিশীল সাজে সজ্জিত। প্রাচীন ইরানী গালিচা, মূল্যবান ধাতব পাত্রের সমাহার। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বাড়ীর প্রাচীরে তার সবচেয়ে ক্ষমতাধর আন্তর্জাতিক সহকর্মীদের উদ্বৃতি সম্বলিত ফটোগ্রাফ। শুরু হয়েছে মাও সে তুং দিয়ে।

নৈশাহারের সময় আমরা মদ পান করলাম। সম্ভবত ক্যাভিয়ার। উপস্থিত ছিলেন তার দ্বিতীয় স্ত্রী নুসরাত। সুন্দরী, ভদ্র আচরণ তার। পরে এলো তার ছেলে। দীর্ঘ চুল বিশিষ্ট প্রাণবন্ত ছোট্ট বালক। এখন ভুট্টো আধুনিক। ভুট্টো তুখোড় বক্তা, গ্রন্থ রচয়িতা, যিনি ইংরেজি জানেন উর্দুর চেয়েও ভালো এবং পাশ্চাত্যের যে কোন লোককে আকৃষ্ট করার মতো।

ভুট্টো তার সাক্ষাতকারে ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে তুলনা করেন এক নগন্য মহিলা, যার বুদ্ধিশুদ্ধিও অতি সাধারণ, কল্পনাশক্তি শূন্য এবং যে তার পিতার অর্ধেক মেধাও পাননি। ভুট্টো তার সাথে সাক্ষাতের এবং হাত মেলানোর ধারনাকে বিরক্তিকর বলে মনে করেন। পরে এমন আপত্তিকর মন্তব্য যোগ করেন যা আমার পক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।’ আমি নিজেও ভুট্টোর এ ধরনের মন্তব্যে অস্বস্তিবোধ করছিলাম। তাকে নিবৃত্ত করতেও চেষ্টা করেছি। কিন্ত ভুট্টো আমার পরামর্শ শুনেননি।

ভুট্টো ও ইন্দিরা গান্ধীর তখন সাক্ষাত হওয়ার কথা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য। নয়াদিল্লীর সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে বিশেষ কিছু বাক্যে সতর্ক হয়ে আমাকে অনুরোধ জানালেন সাক্ষাতকারের পুরোটা তার কাছে পাঠাতে এবং আমি টেলিগ্রাম করে তা পাঠালাম। সেটা পাঠ করে তিনি ঘোষণা করলেন যে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার বৈঠকটি হবে না। ভুট্টো হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে আমাকে খুজতে লাগলেন। অবশেষে তার ইটালীর রাষ্ট্রদুতের মাধ্যমে আমাকে আবার খুঁজে বের করলেন। আমার সন্ধান পেলেন আদ্দিস আবাবায়। সেখানে আমি গিয়েছি হাইলে সেলাসির সাক্ষাতকারের জন্য। আমাকে সবচেয়ে আপত্তিকর অনুরোধটাই করা হলো।

আমাকে দ্বিতীয় একটি রির্পোট লিখে যেন বলা হয়, আমি কখনো তার সাক্ষাতকার নিয় নি। আমাকে বলতে হবে, ইন্দিরা গান্ধী সম্পর্কে মন্তব্য আসলে ভুট্টোর নয়, আমারই কল্পনা! এবং আমি ভেবেছিলাম ভুট্টো এরকম হতে পারেন।’ রাষ্ট্রদুতকে আমি বললাম ‘আপনি কি পাগল? আপনার প্রধানমন্ত্রীও কি পাগল হয়ে গেছেন?’ রাষ্ট্রদুত বললেন, মিস ফালাচি আপনি নিশ্চয় বুঝবেন। ষাট কোটি মানুষের জীবন নির্ভর করছে আপনার উপর, তারা আপনার হাতে।” আমি তাকে জাহান্নামে যাওয়ার অভিশাপ দিলাম। কিন্ত ভুট্টো হাল না ছেড়ে আমাকে খুঁজতে থাকেন। যেখানেই আমি গেছি সেখানে এক গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তানী আমাকে সাক্ষাতকার অস্বীকার করতে অনুরোধ করেছেন।

আমি চিৎকার করে বলেছি,তাদের দাবী অসম্ভব এবং অপমানজনক।’ এ দুঃস্বপ্নের অবসান তখনই ঘটলো যখন ইন্দিরা গান্ধী মহানুভবতার সাথে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, ভুট্টো এ ধরনের ভুল আর করবে না এবং তারা উভয় শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করলেন। যখন তারা হাত মেলালেন ও হাসি বিনিময় করলেন টেলিভিশনে তা দেখে আমার খুব মজা লাগছিল। ইন্দিরার হাসি ছিল বিজয়ের। ভুট্টোর হাসিতে অস্বস্তি…।

অনেক রাজনীতিবিদ ওরিয়ানা ফালাচির মুখোমুখি হয়ে বিচলিত বোধ করেছেন, হেনরি কিসিঞ্জার তার সাক্ষাতকার দেওয়ার অভিজ্ঞতাকে বলেছেন “প্রেসের সঙ্গে সবচেয়ে ধ্বংসাত্বক কথোপকথন।”

অনেক রাজনীতিবিদ ওরিয়ানা ফালাচির মুখোমুখি হয়ে বিচলিত বোধ করেছেন, হেনরি কিসিঞ্জার তার সাক্ষাতকার দেওয়ার অভিজ্ঞতাকে বলেছেন “প্রেসের সঙ্গে সবচেয়ে ধ্বংসাত্বক কথোপকথন।”

ভুট্টোঃ আমার অবশ্যই বলা উচিত কেন আমি আপনার সাথে সাক্ষাতের জন্য আকাংখিত ছিলাম। কারণ আপনিই একজন সাংবাদিক যিনি শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে সত্যটা লিখেছেন। আপনার লেখাটা আমি দারুণ উপভোগ করেছি। তাছাড়া…দেখুন মার্চ মাসে ঢাকায় অত্যাচারের ব্যাপারে আমার কিছু করার ছিল, এটা খুব সুখপাঠ্য ছিল না।

ফালাচিঃ কিছু করার ছিল মানে? মি. প্রেসিডেন্ট, ঢাকায় তারা সরাসরি বলেছে যে, আপনিই ধ্বংসযজ্ঞটা চেয়েছিলেন। আপনি মুজিবের গ্রেফতার চেয়েছিলেন এবং সেজন্যই আপনি ২৬ মার্চ সকাল পর্যন্ত ঢাকায় ছিলেন।

ভুট্টোঃ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের উচু তলায় আমার স্যুটের জানালা পথে ধংসের দৃশ্য দেখা, হুইস্কি পান এবং সম্ভবত নিরোর মতো বাঁশি বাজাতে। কিন্ত তারা কোন সাহসে একটি বর্বরোচিত ঘটনার সাতে আমাকে জড়াতে চায়? পুরো ঘটনাটি পরিচালিত হয়েছিল এক জঘন্য উপায়ে। তারা সকল নেতাকে নিরাপদে ভারতে পালিয়ে যেতে দিয়ে যাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে যারা কোন কিছুর জন্য দায়ী নয়। শুধুমাত্র শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। একটু ভেবে দেখুন, আমি হলে আরো চাতুর্যের সাথে কাজটা সম্পন্ন করতাম, আরো বৈজ্ঞানিকভাবে এবং কম নিষ্ঠুরতায়। টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ব্যবহার করতাম এবং সকল নেতাই গ্রেফতার হতো।

কেবল ইয়াহিয়া খানের মতো একটি বিরক্তিকর মাতালের পক্ষে এতো জঘন্যভাবে এবং রক্তপাত ঘটিয়ে এ ধরনের অপারেশন ঘটানো সম্ভব। সেই যাই হোক, এ ধরনের উন্মত্ততা হোক, এটা চাওয়ার পেছনে আমার কি স্বার্থ থাকতে পারে? আপনি কি জানেন যে, ইয়াহিয়া খানের প্রথম শিকার শেখ মুজিব না আমি হওয়ার কথা ছিল? আমার পার্টির বহু লোক জেলে ছিল এবং ১৯৭০ সালে শেষদিকে, হ্যা ১৯৭০ সালের ৫ নভেম্বর তিনি শেখ মুজিবকে বলেছিলেন ‘আমি ভুট্টোকে গ্রেফতার করবো কি করবো না?’

একটি মাত্র কারণে তিনি তার সিদ্ধান্ত বদলেছিলেন, তা হলো পূর্ব পাকিস্তানে পরিস্থিতি যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন, পশ্চিম পাকিস্তানে তা পারতেন না। এছাড়া মুজিব কখনোই বুদ্ধিমান ছিলেন না। সে নিজেকে কোনঠাসা করে রেখেছিলো। ২৫ মার্চের দুঃখজনক ঘটনায় আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। ইয়াহিয়া খান আমাকেও বোকা বানিয়ে ছেড়েছিলো। পরের দিন তিনি আমাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিযেছিলেন এবং দিন শেষে জেনারেল মোহাম্মদ ওমর আমাকে জানালেন যে, ইয়াহিয়া খান চেয়েছিলেন আমি যাতে ঢাকায় অবস্থান করে ‘সেনাবাহিনীর দক্ষতা প্রত্যক্ষ করি!’ আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, এর সব কথাই সত্যি।

ফালাচিঃ রাইট মি. প্রেসিডেন্ট। কিন্ত আমার অবাক লাগে যে, সেই ভয়াবহ রাতে এবং পরবর্তী মাসগুলোতে আসলে কি ঘটেছিলো, ইতিহাস কখনো তার সঠিক ব্যাখ্যা দেবে কি না? শেখ মুজিবর রহমান..

ভুট্টোঃ মুজিবকে তো আপনি দেখেছেন আজন্ম মিথ্যুক। মিথ্যা ছাড়া কথাই বলতে পারে না…এই অভ্যাসটা তার নিজের থেকেও শক্তিশালী। মর্জি হলে মুজিব ঢালাওভাবে কথা বলে। যেমন, সে বলে ত্রিশ লাখ মানুষ মরেছে। সে পাগল, বদ্ধ পাগল। ওরা সবাই পাগল। সংবাদপত্রগুলো আবার তার কথা পুনঃপ্রচার করে ‘ত্রিশ লাখ নিহত, ত্রিশ লাখ নিহত’। ভারতীয়রা সংখ্যাটা বলেছিল দশ লাখ। সে এটাকে দ্বিগুণ, এরপর তিনগুণ করলো। এই লোকটার বৈশিষ্ট্য এরকম।

জলোচ্ছাসের সময় সে একই কান্ড করেছে। শুনুন, ভারতীয় সাংবাদিকদের মতে, সে রাতে মারা পড়েছিল ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার মানুষ। মিশনারীরা বলেছিল ত্রিশ হাজার। আমার পক্ষে যেভাবে সম্ভব হয়েছে সে বিচারে মৃতের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারের মতো। এটা অনেক বেশি। নৈতিকভাবে যদি কাজটা সমর্থনযোগ্যও হয়। আমি সংখ্যা কমাতে চাই না, আমি তাদেরকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে চাই-পঞ্চাশ হাজার ও ত্রিশ লাখের মধ্যে বিরাট পার্থক্য। শরনার্থীদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। মিসেস গান্ধী বলেন, এক কোটি লোক। অথচ আমাদের হিসেবে বিশ লাখের বেশি হবে না।

আরেকটা প্রসঙ্গ বলি, মহিলারা ধর্ষিতা ও নিহত হয়েছে এটা আমি বিশ্বাস করি না। এটা তো নিশ্চিত যে বাড়াবাড়ির কোন কমতি ছিলো না। ঘটনা সর্ম্পকে অবহিত করতে বলার পরও মাত্র চারটি ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে। এটাকে যদি দশ দিয়ে পূরণ করি তাহলে চল্লিশ করতে পারি? মুজিব ও গান্ধির ছড়ানো সংখ্যা থেকে আমরা এখনো দুরে।

ফালাচিঃ মি. প্রেসিডেন্ট মুজিবের ত্রিশ লক্ষ যদি ঢালাও বর্ণনা হয়, তাহলে টিক্কা খানের মাত্র চারটি ঘটনার বর্ণনা রীতিমতো ফাজলামো। চরম নারকীয়তা সংঘটিত হয়েছে। বলতেন কিভাবে? আমি এমন একজন আপনার সাথে কথা বলছি যে ঢাকায় বহু মৃতদেহ দেখেছে। আপনি এটাকে কি নৈতিক সমর্থন যোগ্য মনে করছেন? আপনি কি যথার্থই বুঝাতে চাচ্ছেন ধ্বংসযজ্ঞটা নৈতিক দিক থেকে সঠিক ছিল?

ভুট্টোঃ প্রত্যেক সরকারের, প্রত্যেক দেশের অধিকার রয়েছে প্রয়োজন হলে বল প্রয়োগ করার। দেশ গড়ার স্বার্থে স্ট্যলিনও করেছে মাও সে তুংও করেছেন বাধ্য হয়ে। হ্যাঁ এখন কোথায় রক্তপাত ঘটিয়ে দমন করা হবে এবং তা সমর্থনযোগ্য হবে কিনা সেটাই বিচার্য। মার্চ মাসে পাকিস্তানের ঐক্য নির্ভর করেছিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নির্মূল করার উপর। কিন্ত যারা এর জন্য দায়ী তাদের বদলে জনগনের উপর এমন নিষ্ঠুরতা চালানোর কোন প্রয়োজন ছিল না। …আমি কঠোরভাবে এই পন্থা গ্রহণের বিরোধীতা করেছি- বিশেষ করে কেউ যখন মুখ খুলতে সাহস করে নি।

ফালাচিঃ তবু আপনি টিক্কা খানকে সেনাবাহিনীর প্রধান নিয়োগ করেছেন- যে জেনারেল ধ্বংসযজ্ঞের নির্দেশ দিয়েছিলো, তাই না?

ভুট্টোঃ টিক্কা খান একজন সৈনিক হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে গিয়েছিলেন সুনির্দিষ্ট নির্দেশ নিয়ে এবং ফিরেও এসেছে সেই নির্দিষ্ট আদেশে। তাকে যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তিনি তাই করেছেন, যদিও সবকিছুতে তার সম্মতি ছিল না। আমি তাকে নিয়োগ করেছি কারণ আমি জানি যে, তিনি এ ধরনের শৃংখলার সাথে আমার নির্দেশও পালন করবেন এবং তিনি কখনো রাজনীতিতে নাক গলাবার চেষ্টা করবেন না। আমি গোটা সেনাবাহিনীকে ধংস করতে পারি না। তাছাড়া ঢাকার ঘটনা নিয়ে তার বদনাম আসলে অতিরঞ্জিত। এ ঘটনার জন্য একজনই কেবল দায়ী-ইয়াহিয়া খান।

তিনি এবং তার উপদেষ্টারা ক্ষমতা নিয়ে এতই মদমত্ত ছিলেন যে, সেনাবাহিনীর মর্যাদার কথাও বিস্মৃত হয়েছিলেন। তারা সুন্দর গাড়ী সংগ্রহ, বাড়ী তৈরি, ব্যাংকারদের সাথে বন্ধুত্ব করা, বিদেশে অর্থ পাচার ছাড়া আর কিছুই ভাবার সুযোগ পাননি। ইয়াহিয়া খান দেশের সরকার সম্পর্কে উৎসাহী ছিলেন না। নিজের জন্য ক্ষমতা ছাড়া আর কিছুতে আগ্রহী ছিলেন না। ঘুম থেকে উঠেই যিনি মদ পান শুরু করেন এবং ঘুমোতে যাবার পূর্ব পর্যন্ত মদ পান বন্ধ করতেন না। এ ধরনের একজন নেতা সম্পর্কে কি আর বলা যেতে পারে। তার সাথে কিছু করা যে কি বেদনাদায়ক, সে ধারনারও বাইরে। তিনি হচ্ছেন জ্যাক দি রিপার।

ফালাচিঃ ইয়াহিয়া খান এখন কোথায়? তার ব্যপারে আপনার কি সিদ্ধান্ত?

ভুট্টোঃ রাওয়ালপিন্ডির কাছে এক বাংলোতে গৃহবন্দী। হ্যাঁ বাংলোটা সরকারী। তাকে নিয়ে আমার বেশ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার দায় দায়িত্ব অনুসন্ধান করার জন্য আমি একটা ওয়ার কমিশন গঠন করেছি। ফলাফল পাবার অপেক্ষায় আছি। তাতে আমার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে। কমিশন যদি তাকে দোষী দেখে তাহলে তার বিচার হবে। আমরা যে পরাজিত হয়েছি এ পরাজয় ইয়াহিয়া খানের….

চলবে…

লেখক: সম্পাদক, প্রেসবার্তাডটকম।